রাব্বী আহমেদ।  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ, লেখা দিয়েই সবার মাঝে থাকতে চান। ইতিমধ্যে একক এবং যৌথভাবে বই বেড়িয়েছে বইমেলায়। লেখালেখির ক্ষেত্রে অনুপ্রেরনা মানেন নিজেকেই। ছাত্রাবস্থায় মধ্যবিত্ততা কিছুটা বাধা হলেও হার মানতে চান না এই তরুন লেখক।

অনেকেই লেখকের অটোগ্রাফ পেতে ভালোবাসে, কারণ অটোগ্রাফ স্মৃতি হয়ে থাকে

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 10, 2016 , 9:12 পূর্বাহ্ন

rby

খোশগল্প.কম: লেখালেখির শুরুটা কবে থেকে?

রাব্বি: লেখালেখির শুরু সপ্তম শ্রেণী থেকে। যখন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হই। তখন টুকটাক লিখতাম কলেজ থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকায় লেখা ছাপা হবার লোভে। সেগুলো হয়তো প্রস্তুতি পর্যায় ছিল। তবে ২০১১ সালে ক্যাডেট কলেজ থেকে বের হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর লেখালেখি সিরিয়াসলি করার চেষ্টা করছি।

খোশগল্প.কম: আপনার ক্যাডেট কলেজ নিয়ে লেখা আছে হয়তো…..

রাব্বি: হুম, ক্যাডেট কলেজে কৈশোরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে। আমার পুরো সোসালাইজিং প্রক্রিয়ার সাথে এই খাকি চত্বর জড়িয়ে আছে। ক্যাডেট কলেজ নিয়ে বেশ লিখেছি। অনেক লেখাতেই কলেজের কথা এসেছে। স্মৃতিচারণ, মজার ঘটনা সব মিলিয়ে। আসলে স্কুল এবং কলেজ একই প্রতিষ্ঠান। তাই অনেক স্মৃতি। সর্বশেষ বইমেলায় ক্যাডেট কলেজের মজার ঘটনার সংকলন “ক্যাডেট রম্য” প্রকাশ পেয়েছে বইপত্র প্রকাশন থেকে। যার বেশকিছু বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছে।

খোশগল্প.কম: সেরমক একটি ঘটনা শেয়ার করতেন যদি…

রাব্বি: ক্যাডেট কলেজে দুই ধরণের স্মৃতি আছে। আনন্দের এবং কষ্টের। কি শুনতে ইচ্ছুক?

খোশগল্প.কম: সবাই আনন্দের কথাই শুনে,আমরাও হয়তো শুনব তবে এখন কষ্টেরটাই শুনি।

রাব্বি: গাবদাকে মনে পড়ে। গাবদা মানে ওয়াহেদ। আদর করে নাম দিয়েছিলাম গাবদা। একটু মোটা ছিল। ক্যাডেট কলেজের সামরিক পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হয়তো একটু কষ্টও হয়েছিল। এক সন্ধ্যার কথা। সেনাবাহিনীর এক সদস্য গাবদাকে প্যারেড শেখাচ্ছে। গাবদার মোটা দেহ বেয়ে দরদর করে ঘাম নামছে। ততক্ষণে খেলার সময় শেষ। সবাই যে যার মতো রুমে চলে গেছে। শুধু গাবদাকে তখনো প্যারেড শেখানো হচ্ছে। কোনো একটা ভুল করেছে নিশ্চয়ই। শৈশবে মা-বাবাকে ফেলে জীবন গড়ার এক মহান তাগিদে নিজেকে আবদ্ধ করেছে ক্যাডেট কলেজের চার দেয়ালে। সেই সন্ধ্যার এই কষ্টময় মুহূর্ত চোখে যেতেই অনুরোধ করলাম ওকে ছেড়ে দেওয়ার। সেনাবাহিনীর সে মানুষটি অনুরোধ রাখলেন। গাবদা কিছুক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু একটা বলতে চাওয়ার প্রবল আকুতি ওর চোখেমুখে। হুট করে বড়দের সঙ্গে কথা বলার নিয়ম নেই ক্যাডেট কলেজে। তাই হয়তো ও নীরবে প্রস্থান করেছিল। গাবদার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে দেখা ক্যানটিনে। উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে বড়দের অতিক্রম করে কিছু কেনা অসম্ভব ছিল। ব্যাপারটা চোখে পড়তেই ভিড় ঠেলে ওকে কিছু কিনে দিলাম। আর বললাম, ওই গাবদা, তোমার এই নাম কে দিয়েছে? ও চাপা স্বরে বলল, ভাইয়া, সবাই ডাকে। গাবদার চোখে লজ্জার আভা। ভাবলাম, এভাবে সবার সামনে গাবদা ডাকা ঠিক হয়নি। গাবদা চলে যাওয়ার পর মনে হলো, ওকে ‘সরি’ বলতে পারতাম। কেন জানি না অজ্ঞাত কারণে ওকে খুব পছন্দ করতাম। ক্যাডেট কলেজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে যা কখনো ওকে জানাতে পারিনি। অনুভব করতাম মোটা হওয়ার কারণে ওর ভেতরে কিছু চাপা কষ্ট আছে। সবাই ওকে তাচ্ছিল্য করে। সেই চাপা কষ্ট ও কাউকে বলতে চায়। একবার ভাবলাম, ওকে রুমে ডাকব। কথাগুলো শুনব, একসঙ্গে দুঃখ প্রকাশও করব।গাবদার কথাগুলো শোনা হয়নি। এক সকালে গাবদা চলে গেল হুট করে। সকালের রুটিনমাফিক দৌড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ শুনি কেউ একজন দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গেছে। ভিড় ঠেলে দেখি গাবদা। আমাদের ওয়াহেদ। ওয়াহেদকে পাঠানো হয় শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজে। ফিরে আসে বিকেল পাঁচটায়। ওয়াহেদকে রাখা হয় কলেজের মসজিদের সামনে। কিছুক্ষণ পর চলে যাবে ওয়াহেদ। চিরদিনের জন্য। সবাই ওয়াহেদকে দেখতে গেলেও আমি যেতে পারিনি। শুধু দূর থেকে তাকিয়ে দেখলাম আমাদের গাবদা ঘুমিয়ে আছে। কিছু একটা বলতে চাওয়ার প্রবল আকুতিতে ও তখন ম্রিয়মাণ। সবাই গাবদাকে শেষবারের মতো দেখছে। একসময় চলে যায় ওয়াহেদ। কলেজের বিশেষ ব্যবস্থায় ওকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে শুনেছিলাম, সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ। স্ট্রোক করার পর ২০ মিনিট শ্বাস ছিল। সে রাতে বরিশাল ক্যাডেট কলেজে নেমে আসে নিস্তব্ধ নীরবতা। বুকের ভেতর শূন্যতার স্রোত বয়ে যায়। এর পর থেকে মাঝরাতে প্রায়ই ঘুম ভেঙে যায়। কখনো জোছনা ওঠে। প্রবল জোছনায় ভেসে যায় ক্যাম্পাস। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি অস্বচ্ছ জোছনার আবছায়া মায়াবী আলোয় একটি ছায়ামূর্তি। দূর থেকে মনে হয় গাবদা। বসে আছে চুপচাপ।গাবদা চলে যাওয়ার দিনটি ছিল ১০।১০।১০। এখনো অক্টোবরের দশ তারিখ এলে গাবদাকে মনে পড়ে।

খোশগল্প.কম: এই সব ব্যাপার গুলো লেখায় নিয়ে আসেন আপনার?

রাব্বি: গাবদাকে নিয়ে প্রথম আলোর ছুটির দিনে লিখেছিলাম। পরে আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘কাচের কুয়াশায়’ গাবদাকে নিয়ে একটা গল্পও ছিল ‘গাবদা’ শিরোনামে। লিখতে গেলে প্রথমেই জীবন অভিজ্ঞতাগুলো সামনে চলে আসে। তাই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভাবে আমার লেখায় চারপাশের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর প্রচ্ছন্ন ছাপ থাকেই।

খোশগল্প.কম: প্রথম বের হওয়া বই কোনটি?

রাব্বি: কাচের কুয়াশা।

খোশগল্প.কম: প্রথম নিজের বই হাতে পাওয়ার পরের অনুভূতি টি বুঝানোর মতো?

রাব্বি: খুব এক্সাইটমেন্ট কাজ করে। অনূভুতি অনেকটাই প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার মতো। তবে যেহেতু বাবা হইনি, তাই সন্তান হবার অনূভুতি জানি না। তবে, প্রথম বই হাতে পাবার পর বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে দুলতে হয়। লেখাগুলোকে খুব অচেনা মনে হয়।

খোশগল্প.কম: বই মেলার মাধ্যমেই তো প্রকাশের যাত্রা শুরু তাই না?

রাব্বি: না। ঠিক তা নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর যখন লেখালেখির মাত্রা বেড়ে যায় তখন আমি ও ক্যাম্পাসের আরেক তরুণ কবি এমরানুর রেজা মিলে এক ফর্মার একটি বই বের করি। ‘চুপকথা’ নামে। আক্ষরিক অর্থে সেটিই প্রথম প্রকাশ। কিন্তু, বইমেলা উপলক্ষে ছিল না।

খোশগল্প.কম: চুপকথার বিস্তার কেমন ছিলো?

রাব্বি: ‘চুপকথা’ ছিল কবিতার বই। আমার লেখাগুলো খুবই হালকা মেজাজের ছিল। প্রেমের। ক্যাম্পাসে বেশ জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিল কবিতাগুলো। আর রেজা ভাই নিজেও ‘আড়াইসিধা’ নামে একটা লিটল ম্যাগ সম্পাদনা করেন। তাই, তার দিক থেকেও বেশ বিস্তার ছিল সাম্প্রতিক সাহিত্য মহলে। সে অর্থে ‘চুপকথা’র ব্যাপক বিস্তৃতিই পরবর্তীতে একক বই করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

খোশগল্প.কম: বইমেলায় কয়টি বই গিয়েছে এ পর্যন্ত?

রাব্বি: একক চারটি। আর বিচ্ছিন্ন ভাবে বেশ কিছু।

খোশগল্প.কম: বই মেলায় এতো এতো জনপ্রিয় লেখকদের পাশে আপনি উদীয়মান। সে হিসেবে অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো?

রাব্বী: বইমেলার অভিজ্ঞতা খুব বিচিত্র। নতুন লেখক হিসেবে সবকিছুই অভিজ্ঞতার কাতারে পরে। যেমন যা ঘটে তাই জীবনে প্রথম। জনপ্রিয় লেখকদের বই যেমন মানুষ কেনে তেমনি নতুন লেখকদের বইও মানুষ কেনে। তবে সে তুলনায় অনেক কম। দেখা যায় নতুন লেখকদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই পরিচিত মানুষজন বই কিনতে আসে। তবে ফেসবুকের সুবাদে বেশ কিছু অল্প পরিচিত বা অচেনা মানুষের সাথেও দেখা হয়। এটি আনন্দ দেয়। তবে যখন অচেনা কেউ বই কেনে, অটোগ্রাফ নেয়, এটি বেশ আনন্দ দেয়।

খোশগল্প.কম: অটোগ্রাফের কথায় মনে হল “ভক্ত” ব্যাপারটির বিশ্লেষণ কেমন আপনার কাছে?

রাব্বী: ভক্ত না বলে শুভাকাংখী বলাই ভালো। ভক্ত শব্দটি আমার পছন্দের না। আর নতুন লেখক হিসেবে কাউকে ভক্ত ভাবতেও দুঃসাহস করি না। ভক্ত ব্যাপারটির সাথে অনেক বড় কিছু জড়ানো। এটি বেশ দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যেমন দীর্ঘকাল হুমায়ূন আহমেদের লেখা পড়েই নিজেকে তাঁর ভক্ত দাবী করা যায়। আর লেখালেখির প্রারম্ভে যারা বই কিনতে আসেন, এদের অনেকেই উৎসাহ জোগাতে বা কিছু লেখা ভালো লেগেছে তাই। আর অটোগ্রাফ নেয়ার সাথে ভক্ত হবার মিল নেই। অনেকেই লেখকের অটোগ্রাফ পেতে ভালোবাসে কারণ অটোগ্রাফ স্মৃতি হয়ে থাকে। অনেক বছর পর বুক শেলফ থেকে বইটি হাতে নিলে অটোগ্রাফ দেখে মনে পড়ে লেখকের সাথে মেলায় দেখা হয়েছিল। এই যা…

খোশগল্প.কম: সোশ্যাল নেটওয়ার্ক এও তো তাদের দারুন উপস্থিতি…

রাব্বী: আসলে সোস্যাল নেটওয়ার্কে ভক্তকূল বা পাঠক শ্রেণী গড়ে ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, এখানে যেহেতু ‘লাইক’ দেয়ার একটা ব্যাপার আছে এমন মানুষের আপাত ধারণা যে স্ট্যাটাসে যতবেশি ‘লাইক’ পড়বে তা তত বেশি ভালো লেখা। অথচ, এর হয়তো কোন সাহিত্যমান ই নেই। তাই দারুণ উপস্থিতি কথাটা ভুল। এদের মাঝে সিরিয়াস পাঠক কতজন তা দেখা জরুরী। অনেক ক্ষেত্রেই এরা লেখকের উপকারের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করে।

খোশগল্প.কম: সেটা কিভাবে?

রাব্বী: যেমন অনেক মানহীন লেখার নিচেই অজস্র কমেন্ট। অজস্র লাইক। এক পর্যায়ে লেখক এই লাইক আর কমেন্টের মোহে পড়ে যায়। তখন তার চিন্তা থাকে যে ধরণের লেখায় লাইক বেশি আসে সে ধরণের লেখা বেশি লেখা। ফলে, সত্যিকারের ভালো লেখা বেরিয়ে আসে কম। আর লেখক নিজেও জানে না, অনেক লাইক পেলেও আক্ষরিক অর্থে তাঁর লেখা কিছুই হচ্ছে না। পত্রিকায় ছাপা হওয়া বা বই আকারে প্রকাশ পাওয়াতো আরো পরের ব্যাপার।

খোশগল্প.কম: জি ভালো বলেছেন। লেখালেখির জগতে অনুপ্রেরনা কারা?

রাব্বী: নিজেই নিজের অনুপ্রেরণার বড় অংশ জুড়ে আছি বলে মনে হয়। এই জায়গাটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুব নড়বড়ে, তাই পারিবারিক ভাবে অনুপ্রেরণা পাওয়া যায় কদাচিৎ। আর নতুন লেখকদের কমই বন্ধু মহলে সমাদৃত। যদি বিখ্যাত কোন লেখকের নাম বলি তবে শাহাদুজ্জামান, হুমায়ূন আহমেদ, হেলাল হাফিজ এদের লেখা অনুপ্রেরণা জোগায়।

খোশগল্প.কম: নিজেই নিজের অনুপ্রেরনা!!!ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং….

রাব্বী: সক্রেটিসের ‘নিজেকে জানো’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলোরে। এই লাইনগুলো খুব প্রাসঙ্গিক , স্রোতের বিপরীতে কিছু করতে গেলে। আর দিন শেষে সবাইতো একা, আপন বলই সেরা বল।

খোশগল্প.কম: ফ্যামিলির অনুপ্রেরনা ব্যাপারটি কম কি অনিশ্চয়তার কারনে?

রাব্বী: আসলে মিডল ক্লাস ক্রাইসিস বলা যায়। মধ্যবিত্ত পরিবার গুলো নিশ্চয়তার জীবন চায়, যেহেতু তারা সারাজীবন অর্থনৈতিক টানা পোড়েনের ভেতর দিয়ে যায়। আর বাংলাদেশে লেখালেখিকে এখনো পেশা হিসেবে ভাবার পরিস্থিতি তৈরি হয় নি। তাই ফ্যামিলি লেখক চায় না, তারা চিকিৎসক , প্রকৌশলী, সরকারী কর্মকতা হিসেবে সন্তানদের দেখতে চায়। ছেলে লেখক বা কবি বলার চেয়ে ছেলে বিসিএস ক্যাডার বলার মাঝে আত্মতৃপ্তি বেশি কাজ করে। আর, সত্যি বলতে কি লেখালেখি করে উপার্জন করা বেশ কঠিন। জীবনে বাঁচার জন্য যতটুকু দরকার, এই দেশের প্রেক্ষাপটে লেখালেখি তা দিতে ব্যর্থ হয়। তাই অনিশ্চয়তাই বেশি কাজ করে।

খোশগল্প.কম: তবে প্রফেশন হিসেবে এগিয়ে থাকছে কোন জায়গাটি?

রাব্বী: ক্যারিয়ার বা প্রফেশন হচ্ছে জীবনের বাহক। জীবনকে চালিয়ে নিয়ে যায়। তবে এটাও মনে রাখা জরুরী জীবিকার জন্য জীবন নয়। জীবনের জন্য জীবিকা। প্রফেশন হিসেবে কোনটা এগিয়ে থাকছে তা নির্ভর করে ব্যক্তিচাহিদা কতটুকু তার ওপর। জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হচ্ছে আত্মতৃপ্তি। যে যা করে শান্তি পায়, তার তাই করা উচিত। তবে প্রোফেশনের সাথে প্যাশনের মেলবন্ধন হলে জীবনে অনেক কিছু করা যায় বলে মনে হয়। আবার দেখবেন, সরকারী বড় কর্মকর্তা বা অনেক বড় চিকিৎসক যখন লেখক হবার আশায় নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে বই বের করে, একটু কবি খ্যাতির জন্য বহু কাজ করে, তখন আসলেই সংশয়ে পড়ে যেতে হয়। তাই, কোন জায়গাটি এগিয়ে বলা কঠিন। একজন কিংবদন্তী লেখক হতে পারা অনেক কিছু না হতে পারাকে ছাপিয়ে যায়।

খোশগল্প.কম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, কোন বিভাগে?

রাব্বী: নৃবিজ্ঞান নিয়ে পড়ছি।

খোশগল্প.কম: বই বের করতে ফিনান্সিয়াল যে ব্যাপারগুলো রয়েছে সেগুলো ছাত্র অবস্থায় সামাল দেয়া কঠিন নয়?

রাব্বী: যদি লেখক নিজের টাকায় বই বের করে তাহলে বেশ কঠিন। আমার প্রথম বইটির অর্ধেক খরচ আমাকে বহন করতে হয়েছিল, কারণ প্রকাশক কোন রিস্ক নিতে চাননি। মনে আছে, বোর্ড থেকে প্রাপ্ত স্কলারশিপ এবং টিউশনি করিয়ে সে টাকা জোগাড় করেছিলাম। বাকি অর্ধেক কথাসাহিত্যিক মাসউদুল হক এবং এ এস এম ইউনুচ ভাই দিয়েছিলেন। তবে প্রথমবার বইটি আশানুরূপ বিক্রী হওয়ায় পরবর্তীতে আর বেগ পেতে হয় নি। অনেকের ক্ষেত্রেই হয়তো এমন না। যারা ছাত্র অবস্থায় নিজেদের টাকায় বই বের করে তাদের সীমাহিন স্ট্রাগলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

খোশগল্প.কম: এক্ষেত্রে কিছুইতো করার থাকে না, একজন ছাত্রের,হয়তো হাল ছেড়ে দিতে হয়…

রাব্বী: আগেই তো বললাম, লেখালেখি একটি বিরামহীন যাত্রা। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। মনে পড়ে, এক বিখ্যাত জাতীয় দৈনিকের রিসিপশনে পাঁচ ঘন্টা বসেছিলাম বিভাগীয় সম্পাদকের সাথে দেখা করার জন্য। প্রথমদিকে এই কষ্টগুলো সহ্য করতেই হবে। অজস্র লেখা পাঠাতে হবে, লেখা ছাপা হবে না। কেউ বই বের করতে চাইবে না। আঠার মত লেগে থাকা খুব দরকার। কারণ, প্রকাশকের কাছে বই একটা প্রোডাক্ট। সে এর ইকোনোমিক ভ্যালুটাই দেখবে। লেখকের আবেগ তার কাছে মূখ্য না। আর একটা বই ছাপাতে ২৫০০০-৩৫০০০ হাজার টাকার মত লাগে, তাও মাঝারি সাইজের বই। প্রকাশক কোন ভাবেই চায় না, এই রিস্ক নিয়ে নতুন কোন লেখকের বই বের করতে। তার দিক থেকে এটাও ঠিক আছে। কারণ, প্রতিবছর হাজার হাজার বই বের হয়। জনপ্রিয় কিছু লেখক বাদে, অন্য লেখকদের বই মানুষ কম কেনে। বই বিক্রী না হলে পুরোটাই লস। তবে, হাল ছেঁড়ে দিলে সব শেষ। নিজেকে প্রস্তুত করে কঠিন পথে আগাতে হবে।

খোশগল্প.কম: লেখক রাব্বী নাকি অনেক রোমান্টিক?

রাব্বী: হা হা। প্রেমের কথাই বেশি লিখি। হয়তো এ কারণেই মানুষ রোমান্টিক ভাবে।

খোশগল্প.কম: আর ব্যক্তি রাব্বী?

রাব্বী: ব্যক্তি আমাকে মাঝেমাঝে লেখার চেয়েও রোমান্টিক মনে হয়। কনফেস করলাম। কৈশোর থেকেই কাল্পনিক জগতে বেশি বিচরণ করেছি নারী বিবর্জিত ক্যাডেট কলেজ চত্বরে। তাই রোম্যান্টিকতা ভালো লাগে। কারণ, ওই সময়ে বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ ক্লাসিক উপন্যাস পড়ে ফেলেছিলাম। প্রেমের লেখা টানতো। প্রচুর প্রেমের কবিতাও পড়তাম। প্রেমময়তা তাই মজ্জাগত।

খোশগল্প.কম: লেখায় কোনটি বেশি টানে? গল্প না কবিতা?

রাব্বী: কবিতা।

খোশগল্প.কম: বাংলা আধুনিক লেখালেখি কি কিছুটা গৎছাড়া?

রাব্বী: লেখালেখির ধারা পাল্টাচ্ছে সময়ের সাথে সাথে। মানুষ থেকে মানুষের বিচ্ছিন্নতা, একাকীত্ব ফ্যান্টাসির সাথে বাস্তবতার দ্বান্দ্বিক অবস্থা, সব মিলিয়ে আধুনিক লেখালেখি বিচিত্র সব বিষয়কে ডিল করে। এখানে যেমন রোম্যান্টিকতা, প্রেম এসব আসে ভিন্ন আংগিকে। কোনকিছুই তো আগের মত নেই। এর ওপর ভর করছে বিভিন্ন সাইকোলজিকাল ডিসঅর্ডার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব। তাই আধুনিক লেখালেখিকে এমন মনে হয়। কিন্তু আদতে এটিও একটি নতুন ধারার জন্ম দিচ্ছে। গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, অকবিতা সব দেয়াল ভেঙ্গে মিলিয়ে যাচ্ছে । এটা সাহিত্যের জন্য ভালো।

খোশগল্প.কম: নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন কি?

রাব্বী: কিছু লাইন লিখে যাওয়া যা মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।

খোশগল্প.কম: নিজের সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে!!

রাব্বি: লেখালেখি নিয়ে বেশ কিছু ভাবনা আছে, তবে স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সত্যি না হলে কষ্ট হয়, ভাবনার ব্যাপারে এমন হয় না। ভাবনা গুলো যদি স্বপ্নের মত সত্যি হয়ে যায়, তখন হয়তো বুঝতে পারবো নিজেকে নিয়ে আদৌ কি স্বপ্ন দেখি প্রতিনিয়ত।

 

 

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত