নিলয় আরেফীন। পড়াশুনা করছেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে তৃতীয় বর্ষে। তবে ইচ্ছা ছিলো শিক্ষক হওয়ার বিশ্ববিদ্যালয় সেক্টরে। ফিজিক্স, কসমোলজি,জ্যোতি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার শখ ছিল। তবে যেহেতু সেটি হয়নি সেহেতু ইচ্ছে রয়েছে জেনেটিক ডিজঅর্ডার এর ওপর উচ্চতর ডিগ্রী নেবার।টাঙাইলের ছেলে নিলয়ের ইচ্ছা নিজ শহরে একটি কার্ডিয়াক হাসপাতাল দেয়ার। ,যেখানে নরমাল সমস্যার সেবা দেয়া থেকে জটিল ভাস্কুলার সার্জারিও হবে।অবসরে সময় কাটান গান গেয়ে,গান লিখে,ছবি তুলে।তবে ভবিষ্যত ডাক্তার নিলয়ের স্বপ্ন সুপারসনিক স্পিডে ছুটে চলা ঐ আকাশের দিকে।

আমরা বলে থাকি একটা ছেলে বা মেয়ে ডাক্তার হয় পাঁচ বার

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 18, 2016 , 10:04 পূর্বাহ্ন

ny

খোশগল্প.কম: আপনি তো সলিমুল্লাহ মেডিক্যালে পড়াশুনা করছেন….

নিলয়: হ্যা, এবার ৩য় বর্ষে।

খোশগল্প.কম: ইচ্ছা কি ছিলো মেডিকেলে পড়ারই?

নিলয়: আসলে ব্যাপারটা তেমন না,ইচ্ছে ছিল একজন ভাল টিচার হওয়ার,বিশ্ববিদ্যালয় লেভেল এর। একসময় ফিজিক্স, কসমোলজি,জ্যোতি পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার শখ ছিল। এখন অবশ্য সেটা আর প্রফেশনাল নেই,শুধু হবি হিসেবেই রয়ে গেছে। এখন ইচ্ছাটা একটু আলাদা,বাংলাদেশে জেনেটিক ডিজঅর্ডার এর বেশ রোগী আছে,জানা নেই তাদের জন্য বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আছে কিনা জানা নেই,এই ফিল্ডে উচ্চতর ডিগ্রী নেয়ার ইচ্চা আছে।

খোশগল্প.কম: আপনি তো এক বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ক্লাস করেন,অভিজ্ঞতা কেমন?

নিলয়: বেশ ভাল,অন্যরকম এক অনুভূতি। মনে হয় আমি অনেক ভাগ্যবান,যত সহজে এর অংশ হতে পেরেছি,মনে হয় না আর কেউ হতে পেরেছে। মনোবিজ্ঞান বিভাগে ক্লাস করি মাত্র তিন মাস,এর মাঝেই অনেক আপন করে নিয়েছিলাম,বেশ ভাল কিছু ফ্রেন্ডস পেয়েছি। আর সবচে বড় কথা আমার জীবনে উচ্চ শিক্ষার প্রথম ইন্সটিটিউশন। তাই অনুভুতি টা আরো প্রবল। ছাড়ার ইচ্ছে ছিল না,অনেকটা পারিবারিক কারনেই ছেড়ে দেয়া,বাবা মা চাইতেন যেন ডাক্তারি পড়ি। কিন্তু আমি সেই লাইফ এখনো মিস করি।

খোশগল্প.কম: তিন মাস ক্লাসের পর আবার নতুন আরেক পথে যাত্রা সেটা কেমন ছিলো?

নিলয়: ঠিক মনে নেই,মানুষ খুব স্ট্রেস এ থাকা সময় মনে রাখতে পারেনা,তবে খুব যে মসৃন ছিল তা বলব না,যখন ছেড়ে এসেছিলাম,মনে মনে সংকল্প করেছিলাম আর ফিরে যাবনা,আগামী ভর্তি পরীক্ষায় ভাল করতে হবে যে করেই হোক। ডিসিশন টা খারাপ ছিল না। এই জীবন টা কম রোমাঞ্চকর না।

খোশগল্প.কম: এই ভর্তি পরীক্ষা ব্যাপারটি বা এই যে চাপের কথা বললেন এটা একটা স্টুডেন্ট এর জন্য আসলেই অনেক দরকার?কি মনে হয়?

নিলয়: অনেক তাৎপর্যপূর্ণ একটি প্রশ্ন। আমার মনে হয় না আমি এর সঠিক উত্তর দিতে পারব। তবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এত উন্নত না,কারিকুলাম,প্রশ্ন পদ্ধতিগত সমস্যা আছে। যদি এডমিশন টেস্ট একেবারেই উঠিয়ে দেয়া হয় তবে সেখানে অনেক ঝামেলা হবে। এখানো প্রশ্ন ফাঁস হয়,তবে সেটা ২০%। বাকি ছেলেমেয়ে গুলো নিজেরাই পরিশ্রম করে ভাল কোথাও উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পায়। আর ভর্তি প্রস্তুতি সংক্রান্ত ব্যাপারে সবার মাঝে যে স্ট্রেস কাজ করে সেটা থাকবেই। সবই যে ঐ এক ঘন্টার ব্যাপার। তবে যথাসম্ভব স্ট্রেস না নিয়ে নিয়মিত স্টাডি করে যাওয়াই উত্তম।

খোশগল্প.কম: মেডিকেলে প্রথম ক্লাসটির কথা কিছু শুনতে চাই….

নিলয়: সেদিন অফিসিয়ালি প্রথম এপ্রন পড়ি,আমরা বলে থাকি একটা ছেলে বা মেয়ে ডাক্তার হয় পাচ বার,যেদিন চান্স পায়,যেদিন ভর্তি হতে আসে,যেদিন প্রথম এপ্রন পড়ে ক্লাসে যায়,যেদিন প্রথম ওয়ার্ডে যায় রোগী দেখতে আর সবশেষে যেদিন ডাক্তারি পাশ করে। সেদিন ছিল সকাল আট টার ক্লাস,ফিজিওলজি টিউটোরিয়াল। খুব বেশি বড় ক্লাসরুম না,ছোট,সবাই নতুন মুখ। সেদিন পড়ালেখা কিছুই হয়নি,পরিচয় আর কারিকুলাম বুঝতেই ক্লাস শেষ,সেদিন অনেক ভাল লেগেছিল। সবাই অনেক ইন্টারেস্টেড ছিল। যা এখন নেই,সেদিনের এপ্রন টা অনেক চকচকে ছিল,সেটাও এখন হলুদ।

খোশগল্প.কম: পরিপূর্ন ডাক্তার হতে আর কতদিন সব মিলিয়ে?

নিলয়: যদি পাস করে যাই এক চান্সে তাহলে আরও আড়াই বছর প্রায়। আর ইন্টার্নশিপ এক বছর।

খোশগল্প.কম: একটু আগে বললেন ওয়ার্ডে গিয়ে রোগী দেখার ব্যাপারটা। সেটা হয়েছে এখনো?

নিলয়: হ্যাঁ। সেটা হয়েছে। আমাদের থার্ড ইয়ার থেকেই ওয়ার্ড করতে হয়। আমাদের ফ্যামিলি, ফ্রেন্ড সার্কেল সবার ধারনা আমরা মেডিকেলে ভর্তি হলেই ডাক্তার হয়ে যাই,আসলে তা না। থার্ড ইয়ার থেকে হাসপাতালে প্লেসমেন্ট থাকে,এসময় রোগীদের সাথে আমরা তাদের সমস্যা নিয়ে কথা বলি,বিভিন্ন রোগ এর সাইন,সিম্পটম নিয়ে আলোচনা করি,রোগ বিবরণী লিখি।আর কিছু না। ওষুধপত্র কিছু শেখানো হয়না। ওসব ফোরথ আর ফিফথ ইয়ারের জন্য।

খোশগল্প.কম: ওয়ার্ডের অভিজ্ঞতা যদি শেয়ার করতেন।

নিলয়: শেয়ার করার মত সেরকম অভিজ্ঞতা নেই,তবে ইমারজেন্সি তে মাঝে মাঝে যাওয়া হয়। সেখানে কিছু পাকাপোক্ত অভিনয় দেখেছি। মেডিসিন ওয়ার্ড এ ছিলাম রাতে,সেখানে এক ভদ্রলোক আসলেন,সাথে এক মহিলা আর বাচ্চা নিয়ে,বললেন স্যার ইমারজেন্সি থেকে এখানে পাঠিয়েছে,দেখলাম বিষ খাওয়ার কেইস,বলে দিলাম আবার ইমারজেন্সি তে যান,দেখতেছি আমরা। উনারা চলে গেলেন,আমি ঘন্টা খানেক পর ইমারজেন্সি তে গেলাম,ঐ রোগীর কথা খেয়াল নেই,গিয়ে দেখি তখনো বসে আছে,বললাম বিষ খেয়েছে কে,লোকটি বলল আমার স্ত্রী, ঘুমের বড়ি খাইছে স্যার। জিজ্ঞেস করলাম কি ওষুধ, নাম জানেন? নাম জানেনা । কেন খাইছে?? রাগ করে খাইছে স্যার। একটু পর সিনিয়র এক ব্রাদার আসলেন,মহিলাকে নিয়ে এক বেডে হাত পা বাধা হল,দেন স্টমাক ওয়াস করা হল। আমরা কিন্ত জানতাম যে তার তেমন কিছু হবে না,কিন্তু তারপরও স্টমাক ওয়াশ এ জন্য করা হল যে আর জীবনে যেন উনি এই কাজ না করেন। ওয়াশ করার সময় বার বার বলছিল আমাকে মেরে ফেলল,আমি কিছু খাইনি,আল্লাহরর কসম আমি কিছু খাইনি। যে কষ্ট টা তার হয়েছে তাতে মনে হয় না সে আর কখনো বিষ বা ঘুমের ওষুধ খাবে।

খোশগল্প.কম: এই ব্যাপারগুলো ফেস করা অনেক কঠিন তার উপর প্রথম দিকে এগুলো আরো মেন্টাল প্রেসার হয়ে যায় না?

নিলয়: না।অনেকের ক্ষেত্রে হয়,আবার অনেকের ক্ষেত্রে হয়না। এভাবেই তো শিখতে হয় আমাদের।

খোশগল্প.কম: কোন ফিল্ডে স্পেসালাইজড হওয়ার ইচ্ছা?

নিলয়: আসলে আমার ব্যপার টা হল যখন যা পড়ি,মনে হয় সেটার উপরি কোর্স করব। মেডিসিন টা বেশি ভাল লাগে,সার্জারির হাত কেমন জানি না। তবে ভয় পাই না। এখনো ডিসিশন নেই নি,পাশ করার পর ভাবব। তবে মনে হয় মেডিসিন টাই বেছে নেব,আর আগেই বলেছি,জেনেটিক রোগ গুলো নিয়ে বেশ পড়ালেখার ইচ্ছে আছে।

খোশগল্প.কম: বাহিরে যাওয়ার ইচ্ছা কি রয়েছে?

নিলয়: নাহ।। সেটাও সময় বলে দেবে,তবে দেশে থাকার মজাটা আলাদা,আর আমার ইচ্ছা আমার শহর টাঙ্গাইলের স্যাটেল হওয়া। তবে সেটা আপাতত আগামি ১২ বছরের মাঝে হচ্ছে না। বিসিএস,FCPS করতে করতেই বুড়ো হয়ে যাব।

খোশগল্প.কম: নিজে কিছু করার ইচ্ছা?

নিলয়: একটা কার্ডিয়াক হাসপাতাল করার ইচ্ছা,যেখানে নরমাল সমস্যার সেবা দেয়া থেকে জটিল ভাস্কুলার সার্জারিও হবে।এটাও নিজ এলাকাতেই।

খোশগল্প.কম: বাসা থেকে ক্লাস করা হয় না ডর্মে রয়েছেন?

নিলয়: ডর্মে এই আছি।বাসায় যাই মাস খানেক পর পর।

খোশগল্প.কম: ডর্ম লাইফ…..

নিলয়: ডরম লাইফ টা অনেকের কাছে সুখময়,অনেকের কাছে বিরক্তিকর। আমার কাছে অনেক ভাল লাগে। সবার সাথে এক সাথে থাকা এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। আমি এই লাইফ নিয়ে হ্যাপি।

খোশগল্প.কম: নিজের ব্যস্ততম একটা দিন যদি বর্ননা করতে বলি!

নিলয়: অনেকের ধারণা আমরা মেডিকেল স্টুডেন্টস রা অনেক বিজি থাকি,খালি পড়া আর পড়া,মুখস্ত করতে হয় গাদা গাদা বই। ব্যাপার টা মোটেই সেরকম না। পড়ালেখার বাইরেও সব ঠিক রেখে অনেক কিছু করা যায়। আমাদের ক্লাস শুরু হয় সকাল ৭.৩০ এ। লেকচার,ওয়ার্ড, টিউটোরিয়াল মিলিয়ে প্রায় ২ টা বেজে যায়,তারপর আবার ইভিনিং ওয়ার্ড চলে ৩.৩০ থেকে বিকেল পর্যন্ত। তবে বিকেলে অনেক ক্ষেত্রেই যাওয়া হয় না। না গেলে কলেজ মাঠে গিয়ে ক্রিকেট খেলি,তা না হলে হলের ছাদে বসে থাকি। সন্ধ্যা থেকে রাত ১১/১২ টা পর্যন্ত আইটেম,পরীক্ষা থাকলে পড়তে হয়। আমি এর পরেও কয়েক ঘন্টা জেগে থাকি,গান প্রাক্টিস করি,গান লিখি,ইন্টারনেট সার্ফ করি।যখনি ঘুমাই,সকাল বেলা উঠে পড়তে হয়।

খোশগল্প.কম: গান গাওয়া কি অবসরের জন্য?

নিলয়: অনেকটা,তবে কেন জানি একটা টান লাগে গানের প্রতি,যদিও গাইতে পারিনা,বেসুরা গলা,তবুও লিখতে ভালবাসি,অনেক বন্ধু আছে যারা প্রফেশনালি গান করে,তাদের লিখে দেই। আর টুকটাক ফটোগ্রাফি টা করি। কাজ না থাকলে ইউটিউব দেখে দেখে ছবি আকা শিখি। আমার অনেক কিছুর ই অনুপ্রেরণা এই ইউটিউব। একদিন ও থাকতে পারিনা এটা ছাড়া।ইচ্ছা আছে একটা চ্যানেল করব,যেখানে ডিসকভারি, ন্যাট জিও, সাইন্স চ্যানেল এর মত ডকুমেন্টারি করব,বাংলায়,ডাবিং নয়,নিজেরা,দেশ এর জীব বৈচিত্র নিয়ে,ভাষা নিয়ে,দুর্যোগ নিয়ে,রোগ,মহামারি এসব থাকবে,থাকবে বাচ্চা দের জন্য সহজ ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক মজার মজার অনুষ্ঠান। আমি চাই উন্নত দেশের বাচ্চাদের মত আমাদের দেশের বাচ্চারাও ইন্টারেক্টিভ লার্নিং করুক।।

খোশগল্প.কম: এন্ড ফাইনালি….হোয়াট ইউ হেভ ড্রিম টু!?

নিলয়: ছোটবেলায় যখন আকাশ দেখতাম,নীল আকাশ টা কেমন যেন টানত,রাতের আকাশে তারা গুলো দেখেও জানি কেমন লাগত। মনে হত খুব কাছে থেকে দেখতে পারলে,মেঘ গুলো ছুয়ে দিতে পারলে,খুব মনে হত পাইলট হব,যুদ্ধ বিমানের। সুপারসনিক স্পিডে ছূটবো ঐ আকাশের দিকে,কিন্ত সেটা আর হয়ে ওঠেনি। তবে স্বপ্ন দেখা বাদ দিইনি। রাশিয়াতে এভিয়েশন ট্যুরিজম আছে,আপনি ১৫০০০ ইউরো খরচ করে মিগ -২৯ যুদ্ধ বিমানে প্রায় ২ ঘন্টা ঘুরতে পারবেন,আপনার সাথে থাকবেন একজন দক্ষ পাইলট,আপনি চাইলে নিজেও কিছুক্ষণ পাইলটের কমান্ড অনুযায়ী চালাতেও পারবেন। এবং আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে এজ অব স্পেসে। ইউটিউবে অনেক ভিডিও আছে। অনেক মজার। এটা আমার করার খুব ইচ্ছে। বুড়ো হয়ে গেলেও করব।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত