মোঃ মাহফুজুর রহমান, বর্তমানে একই মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে সিনিয়র সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আছেন । নীতির সংঘর্ষে ছেড়ে দিয়েছেন আগের ইন্টারন্যাশনাল এবং ব্যাংক এ অনলাইন স্পেশালিষ্ট এর কাজ । স্বপ্ন দেখেন অভিভাবকদের জন্য স্কুল করার ।

আমি সবসময় নিজকে আলু তরকারীর মত মনে করি

লিখেছেন...admin...মার্চ 21, 2016 , 6:08 পূর্বাহ্ন

unnamed (2)

খোশগল্প.কম: আপনি তো স্কুলজীবনে ভালো ছাএ ছিলেন, তাহলে ইন্টারে সাইন্স থেকে কমার্সে চলে গেলেন কেন?

মাহফুজুর: তখন মনে হয়েছিল বিজনেস করব, বিজনেস নিয়ে লাইফটাকে গ্রো করব, তাই কমার্সে পড়া শুরু করলাম ।

খোশগল্প.কম: তারপর আবার কমার্স থেকে সিএসই পড়ার আগ্রহ তৈরি হল কিভাবে?

মাহফুজুর: ইন্টারের পর আবার সিএসই পড়ার আগ্রহ তৈরি হল। তখন মনে হয়েছে এখান থেকেই আমি ক্যারিয়ারটা গ্রো করতে পারব।

খোশগল্প.কম: কমার্স থেকে সিএসই তে গিয়ে কীরকম বেগ পেতে হয়েছিল?

মাহফুজুর: তেমন একটা না, প্রোগ্রামিং আমার আগে থেকেই ভালো লাগত। প্রোগ্রামিং নিয়ে আমার কোন সমস্যা হয় নাই। কিন্তু অন্যান্য সাবজেক্ট নিয়ে আমার একটু ঝামেলা হয়েছিল।  ম্যাথম্যাটিক্যাল বিষয়, যেমন ক্যালকুলাস, ইন্টিগ্রেশন ক্যাচ করতে আমার একটু বেশি সময় লেগেছে। এটা যারা ইন্টারে করে এসেছে তাদের হয়তো খুব একটা সময় লাগেনি ক্যাচ করতে। তারপরও সমস্যা হয় নি, পার হয়ে গেছি।

খোশগল্প.কম: এখন সিএসই এর কোন ফিল্ডে আছেন?

মাহফুজুর: সফটওয়্যার এ আছি এখন।

খোশগল্প.কম: কখনও প্রোগ্রামিং কনটেস্ট করা হয় নাই?

মাহফুজুর: না, এমন হয় নাই। তবে এসইএম করা হয়েছে। কিন্তু কোন কনটেস্ট এ যাওয়া হয় নাই ।

খোশগল্প.কম: আপনি তো পড়ালেখার পাশাপাশি দোকান চালিয়েছেন, ব্যবসা করেছেন, টিউশনি করিয়েছেন, কোচিংয়েও সময় দিয়েছিলেন। কোন জায়গাটা থেকে সবচেয়ে বেশি শিখেছেন ?

মাহফুজুর: আমি ৫ম সেমিস্টার থেকে জব শুরু করি। নানা কারণেই আমি জব শুরু করি। আমি খুলনা থেকে পড়াশোনা করেছি, খুলনা থেকে ঢাকায় এসে জব চালিয়ে নিতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আমার জীবন যুদ্ধে চলার মত নতুন করে শিখার সব বিষয়গুলো আমি ঢাকা থেকে শিখেছি। ঢাকায় প্রথম ২/৩ বছরে আমি অনেক কিছু শিখেছি।

খোশগল্প.কম: খুলনা থেকে প্রথম ঢাকায় এসে নিজকে কিভাবে মানিয়ে নিলেন?

মাহফুজুর: আমি সবসময় নিজকে আলু তরকারীর মত মনে করি। মাছ-মাংস যাই রান্না করা হোক না কেন সেখানে আলু দেওয়া যায়। তেমনি আমিও নিজকে এমনভাবে তৈরি করেছি যেন যে কোন জায়গাটাতে সবার সাথেই মিশে চলতে পারি। আর সে ভাবে নিজকে গড়ে নিয়েছি। এভাবে চলার কারণে হয়তো খুব সহজেই মিশতে পেরে গেছি।

খোশগল্প.কম: সবার সাথে মানিয়ে চলতে গিয়ে কখনও নীতি বিসর্জন দেওয়া লাগে নি?

মাহফুজুর: কিছু জায়গায় হয়তো দেয়া লেগেছে। তবে খেয়াল রেখেছি যেন এমন কিছু বিসর্জন দিতে না হয় যা আর পাওয়া যাবে না। চেষ্টা করেছি যেন নীতি বিসর্জন দেওয়া না লাগে । আমার যে লাস্ট জবটা চেঞ্জ করেছি, সেটা নীতি প্রাসঙ্গিক। আমার ব্যাংকের চাকরি ভালো লাগে না , ব্যাংকগুলোর ইনকাম আসলে সুদের টাকা থেকে । আপনি যদি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন, তাহলে ইসলাম এটাকে সাপোর্ট করে না। সেক্ষেত্রে আস্তে আস্তে নিজেকে সামলে নিয়ে ব্যাংক থেকে সরে আসলাম। কিছুদিন আগে আমাকে একজন জিঙ্গেস করল, সরকারি চাকরিতে কেন ঢুকছি না। আমি উত্তর দিলাম, আমার মামা খালুও নাই বা টাকা  নাই যে আমি সরকারি চাকরিতে ঢুকব। তাছাড়া ঢুকলে আবার নানা রকমভাবে ঘুষের সাথে জড়িয়ে পড়তে হবে। আমি না নিতে চাইলেও উপরের চাপ বা টিমের জন্য নিতে হবে । আমার বন্ধুরা, আমার কলিগরা সবাই আমাকে দেখছে। আমি অনেক সুযোগ হাতে পেয়েও হাতছাড়া করেছি।  শিং মাছের মত কাদার মধ্যে থেকেও গায়ে কাদা লাগাতে দেই নি।

খোশগল্প.কম: আপনার কখনও মনে হয় নাই, নীতির জন্য অনেক কিছু হারিয়েছেন?

মাহফুজুর: পার্থিব অনেক কিছুই হারিয়েছি। নীতি বিসর্জন দিলে হয়তো এতদিনে অনেক কিছুই করে ফেলতে পারতাম। তবে হারিয়েছি বলে কোন আক্ষেপ নেই, বরং একটা ভালো লাগা আছে। অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা হয়তো ভালো কিছু দিবেন। অনেক ভালো আছি।অত্যন্ত মানসিক শান্তিতে আছি।

খোশগল্প.কম: আপনি তো চাকরির সাথে পড়ালেখাও করেছেন, রেজাল্ট কেমন ছিল আপনার?

মাহফুজুর: খুব একটা ভালো না। আমি ১ম সেমিস্টারে সিএসই তে এসে পুরো বাংলাদেশে ফার্স্ট হলাম, তারপর ২য় সেমিস্টারে খুলনায় ফার্স্ট হই। তারপর যখন চাকরি শুরু করলাম তারপর থেকে আর খুব একটা ভালো হয় নি। চাকরি না করলে হয়তো আরও ভালো হতে পারত।

খোশগল্প.কম: কখনও পিএইচডি বা দেশের বাইরে গিয়ে পড়ার ইচ্ছা নেই?

মাহফুজুর: ইচ্ছা আছে, কিন্তু শুধুমাত্র পড়ালেখা করার মত অবস্থা আমার নেই। নিজের পড়ালেখার খরচ নিজেই চালাই এবং ফ্যামিলিকেও সাপোর্ট দিতে হয়। তবে ইচ্ছা আছে দেশের বাইরে গিয়ে পড়ার।

খোশগল্প.কম: পরিবারের পিছুটানের জন্য দেশের বাইরে গিয়ে পড়তে পারলেন না, এটা নিয়ে আক্ষেপ হয় না?

মাহফুজুর: না কখনোই হয় না।

খোশগল্প.কম: পিছুটান ব্যাপারটাকে পজিটিভলি বা নেগেটিভলি দেখেন?

মাহফুজুর: এটাকে কোন ভাবেই দেখি না।

খোশগল্প.কম: আপনি গার্জিয়ানদের নিয়ে একটা স্কুল খুলতে চান এটা নিয়ে কিছু বলুন

মাহফুজুর: আমাদের দেশের বাচ্চাদের মূল্যবোধের অবক্ষয় বেড়ে যাচ্ছে, এরা নিজস্ব শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে না। একটা ছেলে ইউনিভার্সিটি পাশ করার পরও তারমধ্যে মূল্যবোধ থাকে না। একটা বাচ্চাকে মূল্যবোধ শেখানোর জায়গা হল বাবা-মা ও পরিবার। সেই বাবা-মা ই যদি না শেখাতে পারে কিভাবে আমার বাচ্চা বড় হবে, কিভাবে আমার বাচ্চা মানুষ হবে, বড় হয়ে কি করবে? এখনকার বাবা-মায়েরা এগুলো বাচ্চাকে  শিখাতে পারে না। একটা বাচ্চার মানসিক বিকাশ ৭০ ভাগই হয় মায়ের গর্ভে। বাবা-মায়ের উচিৎ তখন থেকেই তাদের ব্যবহার এর উপর সচেতন থাকা । তার বেশি ভালো  তারা যদি বিয়ের পর থেকে সচেতন থাকে ।আমার বাচ্চা কি করবে, আমার বাচ্চা কিভাবে মানুষ হবে?  এমন মেন্টালিটি নিয়ে যদি একটা বাচ্চা ১০ টা মাস একটা গর্ভে কাটিয়ে আসে, অবশ্যই সে বাচ্চার সঠিক মূল্যবোধ তৈরি হবে। তাই আমার ইচ্ছা, বাবা-মাকে শিখানোর কিভাবে তার বাচ্চা ভালো মানুষ হবে। দেখা যায় আমাদের দেশে ৮/১০ বছর বয়সে তাকে ফোর্স করে মাইর দিয়ে এটা ওটা শিখানো হয়, এটা শুধুই ফোর্স করা। এই শিক্ষা তার কোন কাজেই আসে না।

খোশগল্প.কম: এই কাজে কতটা আগালেন?

মাহফুজুর: অনেক পিছুটান আছে,অনেক সমস্যাও আছে। এখনও তেমন কিছু করতে পারি নি। তবে ইচ্ছা আছে করব। একা একা তো করা সম্ভব না, যদি এমন কাউকে পাই তাহলে অবশ্যই ভালো কিছু করব।

খোশগল্প.কম: “আমাদের বাজার” সম্পর্কে কিছু বলেন

মাহফুজুর: এটা আমার একটা ভার্সিটি প্রজেক্ট ছিল। আর্থিক সমস্যা বা ডোনার না পাওয়ার কারণে খুব একটা সামনে আগাতে পারিনি এটা নিয়ে। তবে ইচ্ছা আছে এটা নিয়ে আগানোর।

খোশগল্প.কম: ছোটবেলায় যা হতে চেয়েছিলে, আর এখন যা হতে পেরেছেন, তারমধ্যে কতটুক সফল হতে পেরেছেন?

মাহফুজুর: এটা খুব ডিফিকাল্ট প্রশ্ন, পেয়েছি অনেক কিছুই। আবার মাঝেমধ্যে মনে হয় আরও অনেক কিছু করতে পারতাম। তবে ভালো আছি অন্যের থেকে।

খোশগল্প.কম: আপনার কাছে সুখের সংজ্ঞা কেমন?

মাহফুজুর: আমার কাছে সুখের সংজ্ঞা নেই, কারো কাছে কোটি-কোটি টাকা থাকা মানেই সুখ আবার কারো কাছে ভিন্ন কিছু । এক এক জনের কাছে ব্যাপারটা এক এক রকম ।

খোশগল্প.কম: আপনার শৈশবের কিছু গল্প শুনতে চাই।

মাহফুজুর: শৈশব সবসময় সবার স্বর্ণালী সময় হয়। আমাকে এখন ও যদি সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে আমি আবার ও ৫/৬ ক্লাসে চলে যেতাম সেখান থেকে ৯/১০ ক্লাসে জীবনটাকে আটকে রাখতাম।

খোশগল্প.কম: শৈশব কোথায় কেটেছে?

মাহফুজুর: খুলনায়, খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলে। আমি শৈশবে থেকেই খুব ঠাণ্ডা মেজাজের ছিলাম। নিউজপ্রিন্টের একটা পুকুর ছিল সেখানে বসে থাকতাম, একটা মসজিদ ছিল সেখানে গোরাস্তানের পাশে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়েছি। এবারও খুলনায় নিউজপ্রিন্টে গিয়ে ঐ জায়গা-গুলোয় অনেক সময় বসে ছিলাম। আমি খুব দুরন্ত ছিলাম না শৈশবে। ক্লাস ৮ এ পড়ার সময় খেলা বাদ দিয়ে দিয়েছি। আমি বোলার ছিলাম, একটা এক্সিডেন্ট এর পর খেলা ছেড়ে দেই। তবে এখনও দাবা খেলি। দাবা খেলাটা খুব পছন্দের। যে কারো সাথে যে কোন সময় ভালো কনটেস্টে খেলতে পারব।

খোশগল্প.কম: আপনি মানুষের সাথে কম মিশতেন, তার মানে কি আপনি ইন্ট্রোভাট?

মাহফুজুর: হুম, এটা ফ্যামিলি থেকেই পাওয়া। আমার ফুল ফ্যামিলিই ইন্ট্রোভাট। কিছু মানুষ আছে না জটলা পাকানো দেখলেই মাথা ঢুকিয়ে দেয়। আমাদের পরিবারের কেউই এমন না। এমনিতেই সবার সাথে কথা বলতাম, কিন্তু কারো ভিতরে ঢুকতাম না। এই অভ্যাসটা এখন পাল্টে গেছে কর্পোরেট অফিসে ঢুকার পরে। এখন ভাবি, মানুষের সাথে কথা বলার দরকার আছে, তার ভিতরটা দেখার ও দরকার আছে।

খোশগল্প.কম: এই অবস্থা থেকে মানুষের জন্য কী করতে চান?

মাহফুজুর: যে সব এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছে দিব। কিছুদিন আগে সিলেট ঘুরতে গিয়েছিলাম, সেখানে সবাই মজা করতে ছিল। কিন্তু দেখলাম সেখানকার স্থানীয় মানুষগুলো হয়তো ৩ বেলা খাবারও যোগাড় করতে পারে না। আর ও অনেক জায়গায় ঘুরতে গিয়ে একই অবস্থা দেখলাম। কোনদিন সামর্থ্য হলে এদের মাঝে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিব, একটা স্কুল করার ইচ্ছা ও আছে এদের জন্য ।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত