ফরিদুল ইসলাম নির্জন। দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ছাড়াও বিভিন্ন সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল সমুহে কবিতা, গল্প, রম্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে লিখছেন দীর্ঘদিন। তার দুটি প্রকাশিত বই হলো ‘মাঠে ভূতের মেলা’ যা ছিল শিশু-কিশোর গল্প গ্রন্থ এবং অন্যটি হলো উপন্যাসের বই ‘আজো খুঁজি তারে’

“আলোচিত নয় আলোকিত মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই”

লিখেছেন...admin...মার্চ 17, 2017 , 5:53 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: প্রথমেই যদি নিজের পরিচয় দিতে বলি তবে কি বলবেন?

নির্জন: নিজের পরিচয়ের কথা যদি বলি তবে বলবো, আমি ফরিদুল ইসলাম নির্জন। বাংলাদেশের একটি মুসলিম পরিবারের অতি সাধারণ ঘরের একটি ছেলে। বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জব করছি। তবে আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়কিংবা যেই পরিচয় দিতে আমার নিজের কাছে ভালো লাগে, সেটা হলো আমি একজন লেখক। এই লেখালেখির সাথে প্রায় অনেক বছর জড়িয়ে আছি। এই লেখালেখি করেই আমি নিজের আত্মার শান্তি খুঁজে পাই। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে এই লেখালেখিই আজকের ফরিদুল ইসলাম নির্জনকে সবার কাছে পরিচিতি দিয়েছে লেখক হিসাবে। আর আমার অন্য আরেকটি পরিচয় আমাকে আড্ডাবাজও বলতে পারেন। যেকোন আড্ডার শিরোমণি হতে আমার একটুও অসুবিধে হয়না। অবশ্য আমার এই চঞ্চলতা কিংবা আড্ডার ব্যাপরটি শৈশব থেকেই ছিলো। শৈশব থেকে অনেক ডানপিটে না থাকলেও আর আট-দশজন গ্রামের ঘর পালানোর ছেলেদের  দলেই ছিলাম। সেই থেকে আড্ডাবাজ হয়ে বেড়ে উঠা।

খোশগল্প.কম: তাহলে আপনার শৈশবের গল্পটা শুনতে চাই। কিভাবে কাটিয়েছেন শৈশব?

নির্জন:  আমরা মধ্যবিত্ত একটা পরিবারেই বড় হয়েছি। আমার গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থাটা যদিও এখন কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবুও আধুনিকতার ছোঁয়া এখনো  গিয়ে পৌঁছায়নি। তো আমাদের সময়টাতে তো ছিলো আরো নাজুক অবস্থা। সেখানেই কেটেছে আমার শৈশব। আসলে শৈশবতো সবার জীবনেই ভালো লাগার একটা সময়, ভালোবাসার একটা সময়। এই সময়গুলো প্রত্যেক মানুষই ফিরে পেতে চায়। বলতে পারেন একটা সময় মানুষের কাছে শৈশব মানেই একটা ফিরে পাবার আকাঙ্খার নাম। আমার বেলায়ও তার বিপরীত ঘটে নি। শৈশবের ভালোলাগার সময়, ভালোবাসার সময়টি দারুণভাবে কাটিয়েছি। আমাদের গ্রামের পাশে একটা নদী ছিলো, বন্ধুরা মিলে সবাই ওখানে আমরা আড্ডা দিতাম। শৈশবে নদীর সাথে সখ্যতা ছিলো আমার নিবিড়। বলতে পারেন আমি শৈশবে একদম ডানপিটে না থাকলেও ছিলাম আর আট-দশটা গ্রামের ঘর পালানো ছেলেদের কাতারে।

খোশগল্প.কম: সেই ছোটবেলা থেকে লেখালেখির ছোঁয়াটা কিভাবে পেয়েছেন বলে মনে করেন?

নির্জন: প্রকৃতপক্ষে ছোটবেলা থেকে আমার লেখা হয়নি। তবে, সাহিত্যের প্রতি আমার টান সৃষ্টি হয়েছিলো ছোটবেলা থেকেই। আমি যখন স্কুলে ভর্তি হই তখন কোন এক অজানা কারণেই বাংলা বিষয়টি আমাকে অন্যান্য বিষয়ের চেয়ে অনেক টানতো। যার ফলে আমি বাংলা বিষয়টিকে অনেকবার পড়তাম। আবার বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলে এই বইয়ের গল্প নিয়েই গল্প জুড়ে দিতাম। কখনো কখনো বইয়ের গল্পের সাথে বানিয়ে নিজেও কিছু গল্প জুড়ে দিতাম। আবার যখন ছড়া পড়তাম, তখনো ছড়া নিয়ে বন্ধুদের সাথে আবার প্রতিযোগিতা করতাম। টোটালি এটাকেই বারবার রিহার্সেলে রেখেছি, সেজন্যই হয়তো সাহিত্যের প্রতি এমন টান এখনো পর্যন্ত কমেনি। এখনো স্পষ্ট মনে আছে আমি যখন ক্লাস ফোরে ছিলাম নিজের বাংলা বই শেষ করে ক্লাস ফাইভ সিক্সের বাংলা বই পড়া শুরু করতাম। আবার সেই বই শেষ করে নতুন বই পাবার এক ধরণের আকাঙ্খা ছিলো। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো তখন আমাদের গ্রামে কিংবা বিদ্যালয়ে যদি সাহিত্যের কোন গ্রন্থাগার থাকতো কিংবা আমার বই পড়ার আরো সুযোগ থাকতো তাহলে ছোটবেলা থেকে বড়ো হতে হতে সাহিত্যের একটা সুন্দর জগতের সাথে আরো ভালোভাবে আবদ্ধ হতে পারতাম।

খোশগল্প.কম: তাহলে কিভাবে শুরু হয়েছিলো আপনার লেখালেখি?

নির্জন: লেখালেখির শুরুটা হলো ক্লাস ফাইভ সিক্স থেকেই। ওই যে বললাম বাংলা বই পড়ার প্রতি আসক্ত ছিলাম। সেই থেকে নিজে চেষ্টা করতাম কিছু লেখার জন্য। কিন্তু, লেখাগুলো লেখা হয়ে উঠতো না। বলতে পারেন কাকের ঠ্যাং, বকের ঠ্যাং লিখতাম আর কি। ভাবতাম লেখার শেষে এক লাইনের সাথে আরেক লাইনের মিল হয়ে গেলেই হয়ে গেলো ছড়া। আবার এই ছড়াগুলো একটু বড় হলেই হয়ে গেলো কবিতা। তবে মজার ব্যাপার হল এমন লিখেও অনেকের প্রশংসা পেতাম যার ফলে উৎসাহ পেয়ে আমি কি ভুল লিখছি নাকি অন্যকিছু এমন ভবনা কখনো আসেনি। এভাবেই লেখালেখি চলতে থাকলো। তারপর আস্তে আস্তে বড় হওয়ার সাথে সাথে পড়তে পড়তে সাহিত্যের বিশাল একটা জগতের সাথে পরিচয় হতে থাকে। ততদিনে জেনে গেছি কেমন করে ছড়া তৈরি হয় কেমন করে কবিতা তৈরি হয়। তখন আমি কবিতা লেখা শুরু করলাম। কবিতাগুলো জাতীয় দৈনিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাসিক পত্রিকায়ও পাঠাতে থাকলাম। এভাবেই লেখালেখির জগৎটা আমার আপন হয়।

খোশগল্প.কম: আপনিতো লিখতেন কবিতা। কিন্তু, এখন গল্প, উপন্যাসে আসলেন যে?

নির্জন: হুম, কবিতাই লিখতাম শুরুর দিকে। তারপর টার্ন করে গল্পে কিংবা উপন্যাসে আসা। আসলে এই কাজটি করেছি আমি কবিতাকে শ্রদ্ধা করেই। আমি যখন কবিতার অন্তর্হিত বিষয়গুলো আস্তে আস্তে জানতে থাকলাম তখন দেখলাম কবিতার ইন্টারনাল বিষয়কে শিল্পে রূপায়ন করা অনেক কঠিন একটা ব্যাপার। তারপরেও লিখে যেতাম। চেষ্টা করতাম বরাবরই ভালো করার জন্য। একবার স্কুলের মাঠে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম তখন বন্ধুরা যায়যায়দিন  পত্রিকার একটা গল্প দেখিয়ে আমাকে বললো তুইতো এমন লিখতে পারবিনা। তুইতো ছোট ছোট লেখা লেখিস। দেখ কতো সুন্দর গল্প। তারপর আমি গল্পটা পড়লাম। সত্যি ভীষণ ভালো লেগেছিলো। তার পাশাপাশি জেদও চেপে ছিল আমি কেনো এমন লেখা লেখতে পারবো না। তখন যায়যায়দিন পত্রিকা তরুণদের জন্য একটা মাইল-ফলক ছিলো। সেখানে নানা ধরণের গল্প ছাপানো হতো। তো, আমি একদিন একটা গল্প লিখেই ফেললাম। তারপর সাহস করে পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলাম। তার কিছুদিন পরেই পত্রিকায় আমার লেখাটি ছাপা হয়। তখন নিজের কাছে এক অন্যরকম অনুভূতি কাজ করেছিলো। তখন বন্ধুদের কাছেও আমার সেই লেখাগুলো দেখিয়েছি। তারপর আর কি, অজানা কারণে এই সাইডটা আমার ভীষণ ভালো লেগে গেলো। তখন আমি লিখতে থাকলাম দু-হাত খুলে।

খোশগল্প.কম: পত্রিকাগুলোতে তো আপনি অনেকদিন কন্ট্রিবিউট করেছেন। কিন্তু, এখনকার উঠতি লেখকের অনেকেই এই তাল ধেরে রাখতে পারেনা। এর পিছনে আসলে কারণ কি?

নির্জন: প্রথমে আপনাকে ধন্যবাদ দেই আপনি দারুণ একটা প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। হুম, আমি অনেকদিন লিখেছি এমনকি এখনো লিখছি। আসলে বর্তমানে যে উঠতি লেখকরা তাদের তাল ধরে রাখতে পারেনা তার পিছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে বলে আমি মনে করি। প্রথম দিকে একজন উঠতি লিখকের যখন একটা লেখা পত্রিকায় ছাপা হয় তখন সে অনেক আনন্দ পায়। তারপর সময়ের সাথে সাথে সে  তার লেখার বিনিময়ে কিছু বেনিফিট পেতে চায় কিন্তু পত্রিকাগুলো একেবারে উদাসীন। তারা তরুণ লেখকদের জন্য প্রণোদনা মুলক কিছুই করেনা। বরং আরো বেশি খাটিয়ে নেয়। একারণেই মুলত এক সময় আর টিকে থাকেনা। কারণ সময়ের সাথে যশ বা খ্যাতির সাথে মানুষের অর্থেরও একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যদি এই চেইন না মানা হয় তবে তরুণ লেখক সৃষ্টি হবে কোথায় থেকে? মোটকথা হচ্ছে সব পত্রিকাগুলোই তরুণ লেখকেদের জন্য কোন প্রণোদনা সৃষ্টি করেনা। হোক সে আর্থিক কিংবা পুরষ্কার। তার জন্য প্রথম প্রথম ভালো লাগা থাকলেও পরে আর থাকেনা।

খোশগল্প.কম: শুরুটা হয়েছিলো আপনার ছড়া-কবিতা দিয়ে, তারপর গল্প। রম্যও লিখেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। এই বই মেলায় আপনার উপন্যাসের বই ‘আজো খুঁজি তারে’ প্রকাশিত হয়েছে। আপনি কোন ক্যাটাগরিতে কম্ফোর্ট ফিল করেন?

নির্জর:  এখন বর্তমানে আমি গল্প এবং এ উপন্যাসে এ দুটিতেই কম্ফোর্ট ফিল করি। এ দুটি শাখাতেই আমি আমার লেখালেখির সবটা উজাড় করে দিচ্ছি। আর সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে আমি এদুটি শাখাতে আমার লেখার ছন্দ খুঁজে পেয়েছি।

খোশগল্প.কম : ভবিষ্যৎ নিয়ে কেমন পরিকল্পনা আছে?

নির্জন: ভবিষ্যৎ নিয়ে একটাই পরিকল্পনা। আমি যেহেতু লেখালেখি করি তাই এই লেখালেখিটাই তুমুলভাবে চালিয়ে যাবো। আলোচিত নয় আলোকিত মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই। আমার প্রতিটা লেখাই মান সম্মত হয় সেদিকে আরো প্রগাঢ় দৃষ্টি রাখতে চেষ্টা করবো।

খোশগল্প.কম: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আমাকে সময় দেওয়ার জন্য।

নির্জন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। ভালোবাসা রইলো আপনার প্রতি।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত