রত্না বিশ্বাস, কাজ করছেন পথশিশুদের জন্যে করা ‘অদম্য বাংলাদেশ’ ফাউন্ডেশনে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের একজন নিয়মিত সদস্য।শখের জায়গায় আছে বেহালা বাজানো, ফটোগ্রাফী।পড়ছেন চাইল্ড সাইকোলজি এন্ড সোশ্যাল রিলেশনশিপ বিষয়ের শেষ বর্ষে।

একটা স্বপ্ন আছে, বাচ্চাদের জন্য আশ্রমের মত তৈরী করা

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 12, 2016 , 10:25 পূর্বাহ্ন

10987307_744667048986516_6149562199172309270_o

খোশগল্প.কম: কেমন আছেন?

রত্না: ভালো আছি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার নিজের ব্যাপারে ইন ডিটেইল বলেন।

রত্না: আমার গ্রামের বাড়ি বাগেরহাট, জেলা শহরে।জেলা শহর হইলেও অত শহর না।আমার বাবা হাই স্কুলের টিচার।ছোটবেলায় আমাকে প্রথমে একটা প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করাই দেয়, আমাকে আমার দাদা মানে বড় ভাই নিয়ে যায়।দুই দাদার কাছেই আমার পড়ার হাতে খড়ি বলা যায়।ছোট থাকতে পড়ালেখার ওরকম চাপ ছিলো না, কেউ চাপ দেয়ও নাই।বাবা স্কুল টিচার ছিলো, বাবা বাইরেই বেশী সময় দিতো, আমাদের দিকে এত সময় দেয়ার সময় হতো না।হাইস্কুলে এসে বাবা যে স্কুলে ছিলো ঐ স্কুলে ভর্তি হইছি,  এই সময় এসে মানুষের সাথে কম মিশতাম।বাবার সাইকেলে করে স্কুলে যেতাম, আসতাম।শুধু ক্লাসমেটদের সাথে মিশতাম, রেস্ট্রিকশন ছিলো না, তবুও মেশা হইতো না।আমার আবার নিজ থেকে যে মিশবো এইটা হয়ে উঠতো না, আর টিচারের মেয়ে এইজন্য হয়তো অন্যরাও একটু দূরে দূরে থাকতো।অনার্সে এসে নিজ থেকে মেশার এটেম্পট নিছি বাট এর আগে হইতো না।কালচারাল পার্টিসিপেশন ও খুব বেশী ছিলো না, প্রাইমারীতে স্পোর্টস এ পার্টিসিপেট করতাম, হাই স্কুলে এসে করি নাই।লাস্ট ক্লাস ফাইভে থাকতেই স্পোর্টস, ছবি আঁকাতে ছিলাম, তারপরে প্রাইজ ও পাইছিলাম।ঐ শেষ, আর করা হয় নি।, থ্রীতে থাকতে একবার নাচ পারফর্ম করছিলাম, প্রাইজ ও পাইছিলাম, ছোট থাকতে নাচের প্রতি খুব এট্রাকশন ছিলো।তো নাচের অল্টারনেটিভ হিসেবে ডিসপ্লেতে কয়েকবার পার্টিসিপেট করতাম।

ছোটবেলায় একেক সময় একেক জিনিস হইতে চাইতাম।যখন সবার কমন জিনিস ডাক্তার এইটাই চাইতাম একদম ছোটবেলায় সবার যেমন থাকে।ক্লাস নাইন-টেন এরকম সময়ে খুব ইচ্ছা ছিলো পাইলট হবার, খুব বেশী ইচ্ছা ছিলো।তখন চোখের পাওয়ারে সমস্যা হয় তখন ডিফেন্সের এই স্বপ্ন বাদ দিই।ইন্টামিডিয়েটে এসে সাইন্স থেকে হিউম্যানিটিসে চলে গেলাম।তারপর তো ইচ্ছা ছিলো ল’ নিয়ে পড়বার।সেগুলো কিছুই হইলো না, পরে তো এসে ভর্তি হইলাম এই হোম ইকনোমিকসে।

 

খোশগল্প.কম: নাচ শিখেছেন?

রত্না: শিখা হয় নাই! আমিও জোর দিয়ে বলিনি, বাসায় ও দেয়া হয় নি।

 

খোশগল্প.কম: কেন?

রত্না: আমি কারো কাছে মুখ ফুটে বলতে পারি না, আমার মনে হয় কি আমার কেন বলতে হবে বাবা-মা কেন বোঝে না, কেন বুঝবে না।

 

খোশগল্প.কম: আপনি কি অন্তর্মূখী স্বভাবের?

রত্না: ছোট থাকতে কোন কিছু দরকার ছিলো? আমি কিছু বলতাম না, শুধু কাঁদতাম!মুখ ফুটে বলতাম না।

 

তারপর ইন্টারমিডিয়েট থেকে ইচ্ছা ছিলো ঢাকা এসে পড়বো, ফ্যামিলি থেকেও এই ইচ্ছা ছিলো বলা যায়।দাদারা বাইরে পড়তো, বাইরে বলতে খুলনায়।আমার বড় দুই ভাই, তো দাদারা পড়ছে, আমিও পড়বো এরকম একটা টেন্ডেন্সি ছিলো।ভার্সিটি চয়েসে স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছিলো, পরে রাজশাহীতে পরীক্ষা দিতে গিয়ে ঐ ক্যাম্পাসও পছন্দ হয়। পরে তো হোম ইকোনমিকসে ভর্তি হই, এইটা সম্পর্কে আমি জানতাম না, আমার দাদাই বলছে।

 

খোশগল্প.কম: আপনি বেহালা বাজান সম্ভবত, কবে থেকে?

রত্না: এই বছর থেকে, আমার প্লান ছিলো কিছু একটা শিখবো।ফার্স্টে আমাকে দাদাই বলছে এটার কথা।দাদা বললো যে ছায়ানটে গিয়ে শিখতে।আমারও আগ্রহ ছিলো, একেবারে আগ্রহ না থাকলে হত না, দাদাই আমাকে অনেক বলছে শেখার জন্য, অনুপ্রেরণাটা দিতো।

 

খোশগল্প.কম: বেহালাই কেন?

রত্না: এটার প্রতি আমার ফ্যাসিনেসন ছিলো, দাদা যেমন বলছিলো সেঁতার এর কথা।বাট আমার আগ্রহ ছিলো বেহালার প্রতি কেন জানি।

 

খোশগল্প.কম: ফটোগ্রাফিও করেন মে বি.

রত্না: পারি এরকম না, দাদার ক্যামেরা আছে, মাঝে মাঝে দু’য়েকটা ছবি তুলি এই আর কী।শিখার ইচ্ছা ছিলো, কিন্তু সময়ে কুলিয়ে উঠতে পারি নাই।

 

খোশগল্প.কম: ‘অদম্য বাংলাদেশে ফাউন্ডেশন কাজ করছেন কীভাবে?

রত্না: এর মধ্যে ক্লাসফ্রেন্ডের মাধ্যমে মজার ইশকুলের কথা জানি।ও আমাকে বলে আমি করবো কিনা, তখন ’১৩ তে একদিন আসি, পরে চিন্তা করি যে আমি কাজ করবো।

 

খোশগল্প.কম: এখানে কাজ করার পেছনে চিন্তাটা মূলত কী?

রত্না: আচ্ছা।আমার কিন্তু পথশিশু সম্পর্কে এত ধারণা ছিলো না।ঢাকা আসার আগে আমি জানতামই না এই শব্দটাই, দেখার সুযোগও হয় না।ক্লাস ফাইভে থাকতে একটা পরীক্ষা ছিলো, মূল্যায়ন পরীক্ষা, এই পরীক্ষা অন্য স্কুলে গিয়ে দিতে হত।তখন একটা মেয়ের সাথে আমার কথা হইছে, ও এতিমখানায় থাকতো।ও বলতো যে ও যে এতিমখানায় থাকে ওখানে পড়াশুনা করায়, খাওয়া-দাওয়াও দেয় কিন্তু খুব কষ্ট করে থাকতে হতো, কাজ করতে হতো।ও বলছে ওদের নিজেদের বাথরুম ওদের নিজেদের পরিষ্কার করতে হয়, নানান কষ্টের কাজ করাইত।এই কথা শুনে আমার খুব খারাপ লাগছিলো, আমার মনে হইছে যে আমি যদি কখন রাখি এরকমই কাউকে খাওয়া-দাওয়া, পড়াশুনা দিইই যদি তাহলে পুরোপুরি না কেন? মানে খাবার এর বদলে তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছি, ওরা তো সন্তুষ্ট না।তখন থেকে মাথার মধ্যে ঢুঁকে কিছু করবো এই ধরনের যাদের বাবা-মা নাই।যখন ঢাকা আসি তখন তো ঐভাবে পরিচিত কেউ ছিলো না, ধারণাও ছিলো না যে স্টুডেন্ট লাইফে কিছু করতেও পারবো।আমার চিন্তা ছিলো যখন আমি স্বাবলম্বী হব, পড়ালেখা শেষ হবে তখন কিছু করবো।পরে যখন দেখলাম স্টুডেন্ট লাইফেই কিছু করার সুযোগ আছে তখনই ইচ্ছা জাগলো কিছু করার।

 

খোশগল্প.কম: আপনি চাইল্ড সাইকোলজি এন্ড সোশ্যাল রিলেশনশিপ নিয়ে পড়ছেন,  কাজের ক্ষেত্র কি এখানেই হবে?

রত্না: এখন আমার প্লান এই সাবজেক্টে, এখন ইচ্ছা আছে ইউনিসেফ, সেইফ দ্যা চাইল্ডে জব করার ইচ্ছা আছে।আমার এতদিন প্লান ছিলো না বিসিএস এর জন্যে, এখন সবাই বলে বিসিএস এর জন্য পড়াশুনা শুরু করতে।প্রথমে ধারণা ছিলো দেবো না, এখন মনে হচ্ছে পড়াশুনা করার দরকার।না পাইলেও অন্য চাকরীর জন্য তো দরকার হবে আমার।সেজন্য ভাবছি এই বছর থেকে চিন্তা করছি এই বছর থেকে পড়াশুনা করতে।

 

খোশগল্প.কম: ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে সদস্য হলেন কী চিন্তা থেকে?

রত্না: বিশ্বসাহিত্যে কেন্দ্রে গেছিলাম আমরা কয়েকটা ফ্রেন্ড, বই পড়ার আগ্রহ এগুলাও আমার দাদার তৈরী করে দেয়া, ছোট থাকতে অন্যরা যেমন বই পড়ে আমার তেমন পড়ার সুযোগ হয় নাই।হাই স্কুলে আসার পর যা বই পড়ছি।বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আসা, ছায়ানটে আসা এগুলো সম্পূর্ণ আমার দাদার জন্যে আসা।দাদার অনুপ্রেরণা না পাইলে এগুলান আমার কিছুই হইতো না।দাদাই সব কিছুতে উৎসাহ দিতো।স্কুলে সিক্সে থাকতে দাদা আমার হাতে বই দেয়।দাদা বই রাখতো, আমি নিয়ে পড়তাম।

এখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একটু কম যাওয়া হয়।আলোর ইশকুল আর পাঠচক্রে যাওয়া হয় শুধু।

 

খোশগল্প.কম: প্যাশন কী নিয়ে আপনার

রত্না: গান এর গলা খুবই বেসুরে, কোনভাবে চেষ্টা করলেও আমার হবে না।আবৃত্তিতে ছিলাম, ঐটাও বলা যায় হতাশ হইছি।সেজন্য আর অন্যকিছুতে কন্সেন্ট্রেশন দেই না, ভায়োলিনেই বেশী সময় দিতে চাচ্ছি।

এখন আমার ইচ্ছা খুবই চাকরি-বাকরি কিছু করতে চাই না, আমার ভায়োলিনটা নিয়ে আগাতে চাই।এইটার প্রতি সময় দেয়া, প্যাশন হিসেবে নেয়া।

 

খোশগল্প.কম: ‘কিছু একটা করে যাবার জন্যে পৃথিবীতে জন্মেছি, সেটা কী– এর উত্তরে কী বলবেন?

রত্না: জন্মাবার কোন কারণ নাই।হা হা হা ।আমার কাছে মনে হয় মানুষ মারা যাচ্ছে, বাচতেছে এইটার আমি কোন লজিক খুঁজে পাই না।হচ্ছে, জীবনটা কোন ভাবে চলে যাচ্ছে এরকম।

একটা স্বপ্ন আছে, বাচ্চাদের জন্য আশ্রমের মত তৈরী করা, যেখানে সব ধর্মের বাচ্চারাই সমান ভাবে থাকবে।থাকা, খাওয়া, পড়ালেখা, প্রার্থনা করবে মোদ্দ কথা অসাম্প্রদায়িক ভাবে।

 

খোশগল্প.কম: অসাম্প্রদায়িকতা কী অর্থে? যার যার প্রার্থনা সে সে নাকি একটাই ধর্ম ?

রত্না: আমি ধর্মটাকে কখনোই এত মাতামাতির কিছু দেখি না।আমার কাছে এরকম জন্ম থেকে আমি একটা ধর্ম পাইছি, চলতেছে।কেউ এ একজন আছে এইটা মনের ভেতরে বিশ্বাস করতে হবে, আমাকে এইটা দেখাইতে হবে এমন না।আমি খুব বেশী পূজা করি না হয়তো, মন্দিরে যাই না।আমি মনে করি বিশ্বাসটা ভেতরের, এরকম গেলেই ধর্ম পালন হবে এরকম আমি মনে করি না।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত