৬ ভাই-বোনের মধ্যে তিনিই একমাত্র পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছেন।’৭১ এ ম্যাট্রিক পাশ করে ক্রমে ইন্টারমিডিয়েট, বিএ পাশ করে আসলেন ঢাকায়, শ্বশুরকে সাথে নিয়ে ঘুরে ঘুরে চিনলেন শহর।চাকরী করতে শুরু করলেন বুড়িগঙ্গার পাড়ে একটা গ্লাস ফ্যাক্টরীতে।চাকরী থেকে অবসরে গেলেন, ব্যাবসা ধরলেন।তারপর জামালপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা সালামত সালাম হয়ে গেলেন ঢাকার স্থায়ী বাসিন্দা কিংবা ব্যাবসায়ী।

এক খাতায় কতবার যে লেখছি হিসাব নাই

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 12, 2016 , 10:54 পূর্বাহ্ন

12187654_461467740704645_7089931147513420604_n

খোশগল্প.কম: কেমন আছেন?

সালাম: ভালো।

 

খোশগল্প.কম: আপনার ছেলে বলছিলেন যে আপনি এই এলাকার না, আপনি এসছেন জামালপুর থেকে?

সালাম:হ্যাঁ, আমার জন্ম এইখানে না।

 

খোশগল্প.কম: কত বছর বয়সে এখানে আসছিলেন?

সালাম:বিএ পাশ কইরা আসছিলাম আরকি, ২৫-২৬ বছর হইছিলো আর কি।

খোশগল্প.কম: কত সালে হইতে পারে এইটা?

সালাম:৭৬-৭৭ এ।

 

খোশগল্প.কম: আপনি বিএ পাশ করছেন, অথচ চাকরী করছেন বেসরকারী একটা গ্লাস তৈরী করা কোম্পানীতে-কেন, আপনার তো ঐ সময়ে আরো ভালো কিছু করার সুযোগ ছিলো

সালাম:চেষ্টা করলে তো সরকারী ভালো পোস্টে চাকরী করা পারতাম।কিন্তু তহন বাড়িতে সবার বড় ছিলাম তো, পাশ করার পর পরই বাইর হয়া পড়ছি, সামনে যেইটা পাইছি ঐটাই করছি, ঢাকায় আসছি, চলন তো লাগবো।বাপে বসায়া বসায়া বিএ পর্যন্ত পড়াইছে আর কত।এইজন্যে যেইটা পাইছি ঐটাই করছি, আল্লাহ খারাপ তো রাখে নাই।

খোশগল্প.কম: আপনার ছোটবেলা নিয়ে বলেন?

সালাম: ছোটবেলায় থাকতাম গ্রামে, ৫ ভাই আমরা।ভায়েগো মধ্যে আমিই বেশী পড়ালেখা করছি।ফাইভ পাশের পরেই বাড়ি ছাইড়া দিলাম, চাচার বাড়িতে লজিং থাইকা পড়ছি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার অন্য ভাইয়েরা ?

সালাম:অরা ম্যাট্রিক এর উপরে আর কেউ পরে নাই।

 

খোশগল্প.কম: ওনারা পড়েন নাই কেন?

আসলে আমি একটু ভালো ছাত্র ছিলাম, দাদার কথা আছিলো অর মাথা ভালা, অরে পড়াইবা।এই জন্যে বাড়িতে থাকি নাই, কষ্ট কম হইছে, বাইরে থাইকা পড়ছি।আর ভাইয়েরা তো মনে কর বাড়িতে থাইকা কাম করছে তারপরে পড়ছে।তহন তো ম্যালা কাম ছিলো, খাওন পাওয়া যায় নাই, আমার ত এই কষ্টটি করতে হয় নাই।অরা এই ধানের সময়ে মাইলের পর মাইল যায়া মনে কর ধান বেঁচতো, পাটের সময় পাট তুলতো, তারপর তো তহন মনে করো বন্যা, খরান এগুলাই লাইগাই থাকতো, এগুলা তো তোমরা বই এ পড়ছোই।ভাত পাইছে তো তরকারি পায় নাই, তরকারি পাইলে কমে পড়ছে, এমন কষ্ট কইরা পড়ন যায়? আমি তো লজিং থাকছি বড় বাড়িতে, অত কষ্ট পাই নাই।

 

খোশগল্প.কম: আপনার ঐ সময়ের পড়ালেখার কথা বলেন।

সালাম:হা হা হা।আমগোরে পড়লেখা কি শুনবা, আমরা তো তোমগো মতন কচিং করি নাই, কচিং তো দূরের কথা স্কুলেই তো অত পড়ি নাই।খাতা পাই নাই, এক খাতায় কতবার যে লেখছি হিসাব নাই, বড় হইয়াও সিলেটে লেখছি, কলম কিনছি খালি পরীক্ষার আগ দিয়া, বাপ-মা কাপর-চোপড় দিতে পারে নাই।এক লুঙ্গি কইয়দিন পড়ছি, আবার স্কুলের শার্ট? মা এই লাউ বেইচা, কলা বেইচা, আন্ডা বেইচা পরীক্ষার ফিস দিতো, বহু কষ্ট করছি।এই জন্যেই তো আমার পোলা-মাইয়ারে খাতা-কলমের কি কষ্ট বুঝতে দেই নাই, চাওয়ার আগে হাজির থাকছে সব।বিএ পাশ কইরা ঢাকা আসছি, আর এখন ছেলেমেয়েরা তো চালু।

 

খোশগল্প.কম: আপনার ছেলে-মেয়েরা আপনার মত পড়ালেখা করে নাই, এইটা নিয়া দুঃখ হয় মা?

সালাম:আমার মেয়ে কিন্তু বিএ পাশ করছে।আমার বড় ছেলে বাদে বাকি দুইটা কিন্তু ভালো ছাত্র ছিলো, মেয়েটারে পড়াইতে পারছি কিন্তু ছেলেটা খারাপ সঙ্গে পড়ালেখা বাদ দিছে, তাও এখন কয় ‘আব্বু তহন যদি পড়তাম তাইলে কত ভালো হইতো’

 

খোশগল্প.কম: আপনার মেয়ে বিএ পাশ করছেন?

সালাম:হ, আমার মেয়েরে ছোটবেলায় একবার বলছিলাম ‘আম্মু, আমি বিএ পাশ করছি, তোমার এম.এ করণ লাগবো’ সেই কথা মেয়ে মনে রাখছে, অর কথা আমার আব্বুয় বলছে আমারে বিএ করতে হবে, আমার আব্বু বিএ পাশ করছে, আমি এমএ করবো, বিএ পাশ করার পরে বিয়ে দিছি, পরে মাস্টার্স এ ভর্তি হইছিলো ইন্তু জামাই এ আর পড়াই নাই।এখন জামাই না পড়াইলে আমি আর কি করবো।তারপরেও আমাদের ফ্যামিলির মইধ্যে ওঁই সব থিকা বেশী পড়ছে।ছোটবেলায় ও ভালো ছাত্রী ছিলো।

 

খোশগল্প.কম: আপনার গ্রামের বাড়ি জামালপুর, আপনি ঢাকা বা ঐ দিকে স্থায়ী না হয়ে এইদিকে হলেন কেন?

সালাম: এই খানেই মনে করো ২৫বছর চাকরী করছি, ছেলে-মেয়ে বড় হইছে, ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিছি, এই জায়গার মানুষে চিনে, একটা অভ্যাস, বুঝো না? এর জন্যেই এই দিকেই বাড়ি করছি।

 

খোশগল্প.কম: আচ্ছা আপনি তখন বলছিলেন আপনি বিএ পাশ করার পর প্রথম ঢাকা আসছেন, এসে কি করছেন ?

সালাম: বিএ এর পরে আসছি দুই’বার একবার বাবার আলসার হইছিলো তখন হাসপাতালে ভর্তি ছিলো, আরেকবার চাকরী খুঁজতে শ্বশুর এর সাথে।যখন প্রথমবার আসছি ঢাকা শহরের তো কিছুই দেখি নাই।তুমি বিশ্বাস করবা না আমি আমগো জামালপুর জেলাতেই তাঁর আগে ৩ বার গেছি, হা হা হা।শুনলে হাসবা, ঢাকা আইসা দেখি কল চাপলে পানি পড়ে, মানুষের টয়লেট ও যে এত সুন্দর থাকে ঢাকা আইসা দেখলাম।এত মানুষ আর মানুষ, সবাই শার্ট-প্যান্ট পড়া ভদ্রলোক, গরীব নাই, সবাই বাসা-বাড়িত থাকে, ২ তালা ৩ তালা বিল্ডিং।তারপরে আসলাম চাকরীর খোঁজে শ্বশুর এর সাথে, আমার শ্বশুর পুরা ঢাকা চিনে, আমি তাঁর পিছনে পিছনে হাঁটি হা হা হা।

 

খোশগল্প.কম: আপনার শ্বশুর চিনলেন কীভাবে?

সালাম: হ্যায় আবার পুলিশে চাকরি করতো, ’৭১ এ পেনশনে গেছে, ঢাকাতেই থাকতো।তো তাঁর সাথে ঘুইরা ঘুইরাই মনে করো ঢাকা চিনছি।

 

খোশগল্প.কম: আপনি তো এখন আর চাকরী করেন না, তাহলে এখন কি করেন?

সালাম: দোকান আছে বলছে না আমার ছেলে, ঐখানেই বসি।মাঝে মাঝে বসি, রেগুলার না।মাঝে মাঝে তাবলীগ জামাতের সাথে ৩ দিন গিয়া মসজিদে থাইকা আসি, আবার আসি, এইভাবেই চলতাছে, বাসায় কেউ নাই, এই বয়সে এই ভাবে থাকে আর কি।

 

খোশগল্প.কম: তাবলীগ কি আগেই করতেন না ইদানিং করছেন?

সালাম: আগে করতাম না, এই কিছুদিন ধইরা বাসার সামনে মসজিদে লোক আসছিলো তারপর তাদের সাথে মিলি আর কি।

 

 

 

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত