“এতদিন পরে এসে যেটা বোধ করি, সব মানুষকেই জীবনে কখনো না কখনো কোন স্টেজে এসে একটা স্ট্রাগল করতে হবে।একটা ফাইট দিতে হবে তার সোস্যাইটি বা ফ্যামিলি, বা মেন্টাল বা ফিন্যান্সিয়াল, এনভারনমেন্ট এগুলার বিরুদ্ধে।ফ্যাক্ট হচ্ছে – যে কষ্ট আগে শুরু করে দেয় সে জীবনের ট্র্যাকে এগিয়ে গেলো, সো যারা ভাবে যে ‘এখন না পরে করবো, পরে করবো, দেখা যাবে’ তারা আসলে পিছায়া যাচ্ছে।যে শুরু করছে সে আসলে এগিয়ে গেলো”।বলছিলেন মোঃ মোরসালিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে ‘ড্রইং এন্ড পেইন্টিং’ বিষয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করে মাস্টার্স করছেন।এখন কাজ করছেন ‘অন্যরকম গ্রুপে’ ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার হিসেবে।মাঝের সময়টাতে কাজ করেছেন কার্টুন ম্যাগাজিন ‘রস+আলো’-তে।অন্তর্মূখী স্বভাব সত্ত্বেও হয়েও নিজেকে প্রকাশ করেছেন গোছানো আর পরিণত চিন্তা দিয়ে।

কষ্ট আসলে নেগেটিভ জিনিস না, কষ্ট আসলে পজিটিভ জিনিস

লিখেছেন...admin...ফেব্রুয়ারী 23, 2016 , 5:34 পূর্বাহ্ন

rename

খোশগল্প.কম: প্রথমে শুরু করি ছোটবেলা দিয়ে, কোথায় বড় হইছেন?

মোরসালিন: আমি বড় হইছি গ্রামে।আমার বাড়ি হচ্ছে ফেনীতে, ফেনীর একদম শেষ উপজেলা যেটা পরশুরাম, ইন্ডিয়ার কাছাকাছি।স্কুল লাইফ ওখানেই ছিলাম।এর পরে কলেজ লাইফে ঢাকায় চলে আসি।আমার কলেজ ছিলো বি.এফ শাহীন কলেজ।তারপর তো ঢাকা ইউনিভার্সিটি।

খোশগল্প.কম: ছোটবেলায় কি খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিলেন?

মোরসালিন: আমি স্কুল লাইফে থাকতে আমার এলাকায় পরিচিত ছিলো ভালো স্টুডেন্ট হিসেবে, মোটামুটি ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম, ফার্স্ট বয় ছিলাম প্রায় সবসময়।খারাপ স্টুডেন্ট হই কলেজে ওঠার পরে।

খোশগল্প.কম: খারাপ স্টুডেন্ট বলতে? এটা কি হঠাৎ বাবা-মার কাছ ছাড়া হয়ে যাবার ইফেক্ট?

মোরসালিন: না, ব্যাপারটা এরকম না।আমাকে পড়তে বসার জন্য আব্বু-আম্মু কখনো বলে নাই, আমার তেমন মনে পড়ে না আমাকে পড়ার জন্য কখনো মারছে বা বলছে।

খোশগল্প.কম: স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে পড়তেন…

মোরসালিন: না।আমি ঐরকম পড়তামও না, আমার এডভান্টেজ ছিলো যে অল্প পড়লেও পারতাম।আমি পরীক্ষার আগের রাতেও পড়ে পরীক্ষা দিয়েছি।আমি জানি না কেন আমি হাইস্ট মার্ক পাইতাম, আমার নিজের কাছেও অবাক লাগতো।এটাও টেস্ট করছি আমার প্রস্তুতি অত ভালো না, তারপরেও রেজাল্ট ভালো হইছে।পরে চিন্তা করে মনে হইছে স্যাররাই মনে হয় চান না ফার্স্ট বয় তার প্লেস হারাক।স্যারদের ভেতরে একটা গতানুগতিক চিন্তা কাজ করে যে যেহেতু ফার্স্ট বয় নিশ্চয়ই ভালো লিখছে।এটা আমার চিন্তা করে মনে হইছে এরকম হতে পারে, যে আমি প্রতিবারই ফার্স্ট হই, অথচ সেকেন্ড, থার্ড বয় এত পরিশ্রম করে ইভেন তারা আমাকে হিংসা করতো এবং এটা তাদের আচরণে বোঝা যেতো। আমাদের গার্ডিয়ানরা প্রায়ই বলেনঃ পড়াশুনায় হিংসা থাকা ভালো , টোটালি রং কনসেপ্ট এটা ! হিংসা জিনিসটাই খারাপ , সেটা পড়াশুনায় কি , আর অন্য ব্যাপারেই কি। যাইহোক, আমি দেখতে একটু ছোটখাটো ছিলাম আমার ক্লাসমেটদের চেয়ে , আকারে ইঙ্গিতে বোঝা যেত যে তারা আমাকে হিংসা করতো।তখন আমার খারাপ লাগতো, এত কষ্ট করে পড়ালেখা করে কিন্তু ওরা পারতেছে না কেন, আমি কিছু না করেই এমনি এমনি ফার্স্ট হচ্ছি। এমনও হইছে আম্মুকে বলছি “আম্মু, আমি সবসময় ফার্স্ট হইলে কেমন হবে, ওদেরও তো ইচ্ছা করে ফার্স্ট হইতে ওরা তো চেষ্টা করতেছে” আর আমার পড়াশুনায় ভালো হওয়ার কারণ ছিলো আমি ছোটবেলা থেকেই বুঝে পড়ার পক্ষে আমি জানি না এইটা কীভাবে আমার ভেতরে আসছে, আমি সব কিছু খুব ডিটেইলে বুঝে শুনে পড়তে চাইতাম।

খোশগল্প.কম: আপনার ভাইবোনদের মধ্যে তো আপনি বড়, তো ওরকম ভাবে গাইড দেবারও তো কেউ ছিলো না।

মোরসালিন: না, আমার বড় বোন ছিলো কিন্তু আমি কাউকে ফলো করতে পছন্দ করতাম না।কেউ যদি আমাকে বলতো যে ফার্স্ট হইতে হবে, হাইস্ট মার্ক পাইতে হবে তখন আমার আরও বিরক্ত লাগতো, একটা সময় আব্বু আম্মুই বুঝতে পারতো যে ওকে বলতে হবে না, ও এমনিই পড়বে।আমাকে কখনো প্রেসার দিতো না।আর বুঝে পড়ার যে ব্যাপারটা ছিলো এরকম, আমি ছোটবেলা থেকেই এনালিটিকাল মাইন্ডের ছিলাম, কোন জিনিস দেখলেই খুব এনালাইসিস করি, ঐ জায়গা থেকে দেখা যাইতো জানার-বুঝার আগ্রহ থাকতো।আমার আপু ছিলো আমার থেকে এক ক্লাস উপরে, আমি আমার ক্লাসে বসে এক ক্লাস উপরের বই আমার পড়া হয়ে যেত, এরকম করে করে শেষ হয়ে যাইতো।পড়ে আগাই রাখতেছি ব্যাপারটা এরকম না, আমার কাছে মনে হইতো আর কী কী গল্প আছে এরকম!আপুর বইগুলা আপুর আগে আমার শেষ।আর বোঝার ব্যাপারটা এরকম, আমি ইন ডেপথে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করতাম বলে হয়তো বাকী বাইরের বিষয়ও বুঝতে পারতাম, ছোটবেলা থেকে প্রচুর বই পড়তাম, প্রচুর পত্রিকা পড়তাম, আমার পড়ার জায়গাটা সীমাবদ্ধ ছিলো না, এজন্য হয়তো অনেক কিছুই বুঝতে পারতাম।কলেজ লাইফ বা ভার্সিটি লাইফে এসে আমি কেন খারাপ স্টুডেন্ট হইলাম তার কারণ হচ্ছে আমি ঐ বুঝে পড়ার কনসেপ্টটা আর কন্টিনিউ করতে পারি নাই।আমি ঢাকায় নতুন আসি এবং এইখানে আমার কোন টিচার ছিলো না, যখন ক্লাস হইতো আমি ছটফট করতাম জানার ও বুঝার জন্য বাট আমি পারতাম না।

খোশগল্প.কম: এটার জন্য কি শিক্ষক কে দায়ী করবেন?

মোরসালিন: হ্যাঁ, কলেজ লাইফ হচ্ছে আমার জীবনের সবথেকে খারাপ সময়, ঐ সময়ে আমার জানা-বোঝা জিরো লেভেলে চলে গেছিলো, ইভেন এমনও হইছে ক্লাসের স্যারদের আমি প্রশ্ন করে ইনসাল্টেডও হইছি, কারণ ক্লাসের আর কেউ প্রশ্ন করে না, আর তুমি কি এমন হইছো! এমন হইছে যে আমি বুঝতে পারতেছি স্যার যা পড়াচ্ছে তা অনেক শর্টকাটে পড়াচ্ছে, আমি ওনার চেয়ে ওই টপিকে বেটার জানি।ঐটাতে আমি খুব দমে যাই, আমি মিশতে পারতাম না, কথা বলতে পারতাম না, আমার খুব ভয় লাগতো, আমার মনে হইতো যে এরা ঢাকার ছেলেমেয়ে, আমার চেয়ে অনেক ভালো ভালো স্কুল থেকে আসছে, এরা বেটার, ওদের সাথে কথা বলা যাবে না, প্রশ্ন করা যাবে না, হাসাহাসি করে।আমি ছোটবেলা থেকেই ইন্ট্রোভার্ট তো তখন আরো খোলসের ভেতর ঢুঁকে যেতে লাগলাম।যেটাতে আমি বুঝতে পারলাম আমি খারাপ স্টুডেন্ট হয়ে যাচ্ছি, এই হচ্ছে খারাপ স্টুডেন্ট এর ব্যাখ্যা।ভার্সিটিতে এসে দেখলাম একই, শিক্ষাব্যবস্থার আসলে সব জায়গায় সমস্যা।

খোশগল্প.কম: যখন ফেনীতে ছিলেন, একদম গ্রামে, নাইন-টেনে পড়তেন, তখন কী আসলে এখনকার মত সচেতন ছিলেন নাকি এই খারাপ সময়ের অভিজ্ঞতাই আসলে বড় পরিসরে আসতে সাহায্য করছে?

মোরসালিন: বড় পরিসর বলতে?

খোশগল্প.কম: বড় পরিসর বলতে একদম গ্রাম থেকে এসে চারুকলায় পড়ার মত নিজেকে তৈরী করা বা একবাক্যে বলতে নিজের কিছু মৌলিকতা তৈরী করা তো গ্রামের পারস্পেক্টিভ থেকে বড় পরিসরই!

মোরসালিন: আমি আসলে জানি না এটা আসলে বড় পরিসর কিনা।না, আমি এরকম ভাবে ভাবতাম না, আমি সবসময় যেটা করছি, বি ইউরসেলফ! আমার আশেপাশে স্টুডেন্টরা কি বলতেছে, ফ্রেন্ডরা কি বলতেছে, বাবা-মা কি বলতেছে আমি সবার কথা কানে নিতাম , সেগুলো আমার চিন্তাজগতের একটা স্টোররুমে জমা থাকতো , আমি সেগুলো নিয়ে চিন্তা করতাম। বাট যতক্ষণ না আমি সেটা নিজে না বুঝতাম , ততক্ষন মেনে নিতাম না। আমি নিজেকে সেটা নিয়ে কোশ্চেন করতাম, নিজে জিনিসটা বুঝতাম , তারপর মেনে নেওয়া।

খোশগল্প.কম: মানে আগে থেকেই নিজের ব্যাপারগুলোতে কনশাস ছিলেন?

মোরসালিন: হ্যাঁ, আমি একটু কনশাস ছিলাম।আমার থিওরি হচ্ছে – কোশ্চেন এভ্রিথিং!

খোশগল্প.কম: বাট সেটা বড় হবার জন্য না, জাস্ট বোঝা বা মেন্টাল স্যাটিসফেকশন?

মোরসালিন: হ্যাঁ, আমি ঐযে বি ইউরসেলফ হইতে চাইছি এবং আমি সেটাই হইছি একচুয়ালি।কোথায় এসে দাঁড়াইছি বা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো এটা আসলে বড়-ছোট কোন কিছু মনে হয় না।মনে হইছে যে আমি যা তা থাকতে পারতেছি কিনা , আমি যা ভাবি , বিশ্বাস করি , সেটাই নিজের ভেতর ধারণ কতে পারছি কিনা ।এইটা আমার কাছে ম্যাটার করে, আমি ঐরকম কোন লক্ষ্য সেট করি নাই।বড় হবো , এটা করবো , সেটা করব , ওরকম না। ছোটবেলায় পাইলট হবার ইচ্ছা ছিলো। বাট একটা জিনিস আমি ছোটবেলা থেকে ফিল করতাম যে আমার ভেতরে অন্যরকম কিছু একটা আছে এবং আমি যখন কুয়োর ব্যাঙ ছিলাম, মানে গ্রাম শহরের তুলনায় কুয়ো, আবার পৃথিবীর তুলনায় শহরটাও একটা কুয়ো।কিন্তু ঐ কুয়োর ছোট জায়গা থেকেও আমি ফিল করতে পারতাম আই হ্যাভ সামথিং ডিফারেন্ট! আমার নিজস্বতা বলে কিছু একটা আছে, আমি সামহাউ ফিল করছিলাম আরকি।

খোশগল্প.কম: আচ্ছা।কলেজে আসার পরের কথা বলেন, যখন ঢাকায় একা থাকা শুরু করলেন

মোরসালিন: আমি যেটা বলবো আমি ইনফিরিয়রিটি কম্পপ্লেক্সে ভুগতাম, যে আমি ছোট, আমি কিছু বুঝি না বা আমি কিছু পারি না।তো ঢাকায় আসার পরে দেখলাম যে এটা আরো প্রকটভাবে দেখা দিলো আমার ভেতরে।কারণ হচ্ছে আমার স্কুলে তেমন কোন ফ্রেন্ড ছিলো না, কলেজ লাইফেও না , এখানে লক্ষণীয় যে – ক্লাসমেট আর ফ্রেন্ড – এইদুটো টার্ম আমার কাছে ভিন্ন।যাইহোক , আমি প্রচুর র‍্যাগিং এর শিকার হইছি, ইভেন মেয়েদের কাছ থেকেও এডাম টিজিং এর শিকার হইতাম।তো এসব দেখে দেখে আমি একদম নিজের ভেতর ঢুঁকে গিয়েছিলাম, আমার কাছে মনে হইতো যে আমার কিছুই নাই।মিশতেও পারতাম না।

খোশগল্প.কম: ডিপ্রেশন?

মোরসালিন: প্রচুর পরিমাণে, এমন হইছে যে ragging এর এক পর্যায়ে আমার গাঁয়ে হাতও তোলা হইছে।

খোশগল্প.কম: কিরকম ragging?

মোরসালিন: আমি জানতাম যে কলেজে এদের বাবা-মা সব বড় বড় অফিসার, এরা হচ্ছে গাড়িতে করে আসে, গাড়িতে যায়, অনেক বড়লোক মানুষ আর কি, ভাবতাম যে এমনও মানুষ হয়। কত প্রাচূর্য! সব মিলিয়ে মনে হইতো যে আমি এইখানে টিকতে পারবো না বা আমি এইখানের যোগ্য না।ইভেন ২-৩ মাস পরে আমার কলেজ চেইঞ্জ করে গ্রামে চলে যাওয়ার কথা ছিলো, আব্বু বললো যে ‘কষ্ট করছিস যখন, আরেকটু কষ্ট কর’।পরে যাওয়া হয় নি।আসলে গ্রামের মধ্যবিত্ত ফ্যামিলিতে যেটা হয় একটু ভালো রেজাল্ট করলে তাদেরকে ঢাকায় পাঠায় দেওয়া হয়।ভাবে যে ঢাকায় অনেক ভালো কলেজ, ছেলে পড়বে, অনেক বড় হবে।অনেকটা থ্রী ইডিয়টসের মতন ‘গারিবি মিট যায়েগা’-আমাদের অর্থনৈতিক দারিদ্র্যতা দূর হবে একসময়।আমার আব্বু আম্মুও হয়ত ঐরকম চিন্তা করে পাঠিয়ে দিছে । বাট আমি এমনি ইন্ট্রোভার্ট বা অসামাজিকই ছিলাম বলা যায় যে আমি স্কুল টু বাসা, ইভেন বিকালে যখন আম্মু বলতো যে খেলতে যা, তখনও আমি বের হইতাম না।আমি ঘরে থাকতে পছন্দ করতাম, ঘরে থাকা বলতে হয় টিভি দেখতেছি, নয়তো যন্ত্রপাতি নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করতেছি, নয়তো বই পড়তেছি , ছবি আঁকতেছি।এমন ছিলাম যে আমাকে আম্মু বাজারে পাঠাইতো না, পাঠাইলে দেখা যাইতো আমাকে পচাঁ মাছ দিয়ে দিছে আমি টেরই পাই নাই, আমি ঐটাই নিয়ে আসতাম, তারপর লিস্টে লিখে না দিলে আমি বাজারে গিয়ে সব ভুলে যাইতাম।তখন ঐ টেনশনে থাকতাম বাসায় গেলে আম্মু বলতে ঐটা তো আনিস নাই।তো যে ঘর ছাড়া কিছু চিনে না, এইরকম একটা মানুষকে একা ঢাকায় পাঠায় দেয়া আত্মঘাতী টাইপের সিধান্ত ছিলো বলা যায়।

খোশগল্প.কম: এখন এইটা নিয়ে কী বোধ করেন?

মোরসালিন: এতদিন পরে এসে যেটা বোধ করি, সব মানুষকেই জীবনে কখনো না কখনো কোন স্টেজে এসে একটা স্ট্রাগল করতে হবে।একটা ফাইট দিতে হবে তার সোস্যাইটি বা ফ্যামিলি, বা মেন্টাল বা ফিন্যান্সিয়াল, এনভারনমেন্ট এগুলার বিরুদ্ধে।গ্রোথের জন্য এই স্ট্রাগলটা খুব দরকার, ম্যচিওরিটির জন্য স্ট্রাগলটা দরকার।বাংলায় বলি যেটা – কষ্ট করা।যদি মানুষ হইতে হয় তাইলে কষ্ট মাস্ট, এইটা থাকতেই হবে।ফ্যাক্ট হচ্ছে – যে কষ্ট আগে শুরু করে দেয় সে জীবনের ট্র্যাকে এগিয়ে গেলো, সো যারা ভাবে যে ‘এখন না পরে করবো, পরে করবো, দেখা যাবে’ তারা আসলে পিছায়া যাচ্ছে।যে শুরু করছে সে আসলে এগিয়ে গেলো।যে ছেলেটা বাবা না থাকায় প্রাইমারি স্কুল থেকেই ফ্যামিলির ব্যয় নির্বাহ করে তার বোধ, মূল্যবোধ, তার তেজ, সিম্প্যাথি এই জায়গাগুলোতে সে অনেক অনেক ম্যাচিউরড তার তুলনায় যে কিনা ভার্সিটি শেষ করে তারপরে ফ্যামিলিকে সাপোর্ট দেয়।হয়তো ফিন্যান্সিয়ালি তার আয় অনেক কম, বাট একজন মানুষ হিসেবে তার এক্সপেরিয়েন্স, তার বোধের জায়গাটাতে সে অনেক বেশী পরিপূর্ণ । সে সঠিক সময়ে সঠিক জিনিসের ভ্যালু বুঝতে পারে। সঠিক সময়ে সঠিক জিন্সের ভ্যালু বুঝতে পারা অনেক বড় গুন। তো আমার কাছে অনেক সময়কেই আমার মনে হইতো যে আমার লাইফের সবথেকে কষ্টকর সময়, বাট এখন আমার কাছে মনে হয় যে আসলে আমি এগিয়ে আছি। এটা কীভাবে বুঝি, আমার ভার্সিটির ফ্রেন্ডদের দেখে।আমি ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ারে যে জিনিসগুলা নিয়ে ভাবতাম, টেনশন করতাম, যেসব জিনিস গুছাতাম, এখন আমি দেখি আমার ফ্রেন্ডরা মাত্র ঐ জিনিসগুলা নিয়ে ভাবতে শুরু করতেসে, তখন তারা খুব ফ্রাস্টেটেড হয়ে যাচ্ছে।আমি যখন এগুলা ফার্স্ট ইয়ারে এগুলা বলতাম তখন ওরা এগুলা নিয়ে হাসাহাসি করতো, ‘কি একটা আতেল আসছে’! তখন আমিও বুঝতে পারতাম না, ওদের ভেতর লাইফ নিয়ে এই জিনিসগুলা নাই কেন? ইন্ট্রোভার্ট হওয়াতে আমি বেশী কথা বলতে পছন্দ করতাম না এখনো তেমন কথা বলি না, মিশতেও পারি না।

খোশগল্প.কম: আপনি এখন তো বেশ কথা বলছেন!

মোরসালিন: না।এটা আমার এডাপ্টেড।আমি যে মানুষের সাথে কথা বলতে পারি না, আমি এটা অনেক আগে বুঝতে পারছি।আমি লাইফের চেইঞ্জে বিশ্বাসী।আমার পার্সোনালিটি ইন্ট্রোভার্ট, কথা বলতে পারি না, কোন প্রোগ্রামে গেলে এক কোণে বসে থাকি, এগুলা আমার বেসিক, আমি এরকমই, ওকে।আমি ধরতে পারছি আমার প্রবলেমগুলা, এটা পারফেকশন না, পারফেকশন হচ্ছে ব্যালেন্স যেটা।আমার কাছে মনে হইছে যে আমার ভেতর টোটাল ইন্ট্রোভার্সনেস, আমি বুঝতে পারছি আমাকে এক্সট্রোভার্ট হইতে হবে, কোথায় হইতে হবে, কোথায় থাকা দরকার? আমার কথা বলা দরকার কোথায়? এরকম করে আমি আমার ল্যাকিংস গুলা আইডেন্টিফাই করি।তারপর ওগুলার চর্চা করে করে আমি সেগুলা ডেভেলপ করার চেষ্টা করি। আমি উদ্ভাসে মুলত এই কারণেই ক্লাস নেয়া শুরু করি যাতে আমি মানুষের সামনে কথা বলার সাহস অর্জন করতে পারি, এক্সট্রভার্ট হওয়া শিখতে পারি। আমার কাছে হইলো কোন মানুষ যদি নিজেকে উন্নত মানুষে পরিণত করার চেষ্টা না করে তাহলে সে আর কিসের শিক্ষিত মানুষ!

খোশগল্প.কম: নিজের ল্যাকিংস ফাইন্ড আউট করতে পারা একটা সূক্ষ্ণতা, আপনি কীভাবে করতেন?

মোরসালিন: ইন্ট্রোভার্ট মানুষের এটা একটা সুবিধা।তারা বলে কম, এর অর্থ এটা না যে তারা জানে কম, এর অর্থ তারা শুনে বেশী, তারা দেখে বেশি।তো আমি কম বলতাম বলে আমি চারপাশে অনেক দেখতাম, ইনফর্মেশন গেদার করতাম।আমার ইন্ট্যুইশন দিয়ে পরে আমি ডটগুলা কানেক্ট করে করে একটা সরল রেখা তৈরী করতে পারতাম এবং দেখতাম এটা কাজ করেতেছে মানুষের বেলায়।সো নিজেকে ঘাঁটানো, ঐযে কোশ্চেন এভ্রিথিং! নিজের কাছে নিজে স্বচ্ছ থাকার একটা ওয়ে।যেমন উদাহরণ দিয়ে বলি আমি যে পরিমাণে ইন্ট্রোভার্ট এইভাবে আমার কাজ কখনো মানুষের কাছে পৌঁছাবে না, তখন আমি কি করলাম? আমি অনেক আগে থেকে ফেইসবুক ইউজ করি, তখনো ফেইসবুক বাংলাদেশ অত জনপ্রিয় হয় নাই।তো আমি আমার কাজগুলা টাইপোগ্রাফি, এমবিগ্রাম, কার্টুন ফেসবুকে দেয়া শুরু করলাম।এতে করে আমার একটা ভার্চুয়াল পোর্টফলিও তৈরী হইলো , প্লাটফর্ম তৈরি হল। যেটা বলা যায় আমার ইন্ট্রভার্ট সত্বা একটা অল্টারনেটিভ পাথ ইউজ করে এক্সট্রভার্ট হওয়ার কাজটা সেরে নিচ্ছে।আমাকে আমার ফ্রেন্ডরাও বলে পারফেকশনিস্ট, আমিও বুঝি যে আমি পারফেক্ট করতে চাই, এটা এই নিজেকে চর্চার মধ্যে রাখার একটা ফল।আমি মনে করি মানুষের পারফেক্ট হওয়ার দরকার।মানুষের কমন থিওরি হচ্ছে ‘আরে! কেউই পারফেক্ট না, সো পারফেক্ট হইতে চায়া লাভ নাই’ মানুষ পারফেক্ট না এইটা নিয়ে আমি বদার না, কিন্তু আমার বিরক্ত লাগে মানুষ জানে কোথায় চেইঞ্জ আনা দরকার , কিন্তু তারপরও সেই জায়গায়টায় সে এফোর্ট দেয় না পারফেক্ট করার জন্যে।বরং প্রাউডলি বলে যে ‘আমি এমনই’!এইটা বলার মধ্যে কোন ক্রেডিট নাই, বরং ডেভেলপ করার মধ্যে ক্রেডিট।নিজের স্বকীয়তা আর নিজের ত্রুটি – এই দুটো জিনিস আমরা গুলিয়ে ফেলি।

খোশগল্প.কম: আচ্ছা, এই প্রসঙ্গে যদি বলি আপনি কেন জন্মাইছেন?

মোরসালিন: আমি কেন মানুষ হয়ে জন্মাইছি এইটার উত্তর আমার জানা নাই বাট খুঁজতেছি।আমি জানি যে এইটার উত্তর আমি পাবো না তবে যেটা পাবো সেটা হচ্ছে যে নিজেকে আরও ভালো করে জানতে পাবো !আর নিজের জন্য একটা পারপাস খুঁজে নেওয়া।এইটাকে যদি পারপাস বলি তাহলে আমার কাছে পারপাস হচ্ছে – ডুয়িং সামথিং গুড, ফর পিপল।

খোশগল্প.কম: কিছুদিন আগে আপনার একটা স্ট্যাটাস ছিলো এরকম শিল্পীদের নিয়ে যে , আর্টিস্টরা অনেক সময় ব্যয় করে, পরিশ্রম করে এক একটা হাইপার রিয়েলিস্টিক পোট্রেট বা ছবি আঁকে, যেটা একটা ডিএসএলারও এখন করতে পারে, তো আসলে আর্টিস্টদের কৃতিত্ব কোথায়! শেষ দিকটা আমার মনে নাই আপনি একটু বলবেন?

মোরসালিন: বি এন আর্টিস্ট, ডোন্ট বি এ ডিএসএলার?

খোশগল্প.কম: হ্যাঁ, এটাই।এটার মূল বিষয়টা কি যেন ছিলো একটু বলেন

মোরসালিন: মূল অর্থ ছিলো শিল্পীর কাজ সৃষ্টি করা, কপি করা না।

খোশগল্প.কম: হ্যাঁ।আপনি নিজের কাজের ক্ষেত্রও এক্সেক্ট এই জায়গাটাতেই, বস্তু বা অবস্তুগত জিনিসকে চিত্রে ধারণ করা, তো এর বিপরীতে গিয়ে আপনি আসলে কি করতে সাজেস্ট করেন?

মোরসালিন: আচ্ছা এটার ব্যাখ্যাটা হচ্ছে, আমি তো বললামই যে কোশ্চেন এভ্রিথিং।কোশ্চেন করে যেটা লজিকাল, রেশনাল মনে হয় সেটা আমি এক্সেপ্ট করি।সমাজ যেটা বলে চোখ বন্ধ করে সেটা আমি মেনে নিতে পারি না।আমি ভালো স্টুডেন্ট থাকা স্বত্বেও শিক্ষাব্যবস্থার উপর আমি ক্ষ্যাপা, কারণ শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি আল্টিমেটলি কোথায় গিয়ে ইফেক্ট করে এটা আমি ভার্সিটি এসে ভালোভাবে বুঝতে পারছি।চারুকলা মোস্ট ক্রিয়েটিভ ফিল্ড, বাট এখানের মানুষরাই সবচেয়ে বেশী ট্র্যাডিশনাল, এখানে মানুষের চিন্তা সবচেয়ে বেশী বাক্সে আবদ্ধ এবং এরাই চেইঞ্জকে সবচেয়ে বেশী ভয় পায়।আমার কাছে আর্টিস্টের মূল পরিচয় হচ্ছে সে যা চিন্তা করে সেটা সে তার কাজে এক্সপ্রেস করবে, সে যা চিন্তা করলো সেটা সে কত সুন্দর ওয়েতে এক্সপ্রেস করতে পারলো।তার চিন্তা থাকতে হবে, তার একটা ফিলোসফি থাকতে হবে, তার জীবনকে দেখার আলার দৃষ্টি থাকতে হবে।আর আরেকটা জিনিস – আমার মতে আর্টিস্ট “হওয়ার” জিনিস না, পরাশুনা করে সারটিফিকেট নিয়ে কেউ আর্টিস্ট হয়না, Artists are born, not made! আমরা যেটা ফ্যাকাল্টিতে দেখি সামনে একটা অবজেক্ট থাকলো, ওইটাকে কপি করো! হ্যাঁ, ওকে স্টাডির জন্য এটা অবশ্যই দরকার। কোন জিনিস কীভাবে আঁকতে হয় সেটা শেখার জন্য এটা অবশ্যই দরকার।কিন্তু এর মানে এই না যে সারাজীবন আমাকে এইটাই আঁকতে হবে। সেনাবাহিনীর কমান্ডো ট্রেইনিং হয়, এটা লার্নিং, বাট যুদ্ধে গিয়েও কিন্তু কেউ কমান্ড দিবে না, তখন তোমাকে নিজেকে নিজের মত করে সিচুয়েশন ট্যাকল দিতে হবে। এখানে ছেলেমেয়েদেরকে চার বছর ধরে এটা শেখানো হয় – হাউ টু কপি! মাস্টার্সে গিয়ে বলা হয় ‘নাউ ক্রিয়েট!’ তখন তারা ব্ল্যাংক হয়ে যায়।তাদের মাথায় তখন কিছু থাকে না , তখন তারা হিউম্যান আঁকা শরু করে, পটারি আঁকা শুরু করে। সার্কাসের হাতিকে অনেক ছোটবেলায় এনে ট্রেইন আপ করানো হয় শেকলে বেঁধে , তখন তারা ভাবে আমরা তো দুর্বল, শেকল ছেড়ে পালাতে পারবো না। বাট যখন হাতিগুলা বড় হয় তখন তাদের শিকল বা খাঁচায় আবদ্ধ রাখা হয় না, কিন্তু তারা তাদের ঐ আবদ্ধ মন থেকে আর বের হইতে পারে না , ওরা শারীরিকভাবে স্বাধীন হয়েও মানসিক ভাবে পরাধীন।থার্ড ইয়ার, ফোর্থ ইয়ারে গিয়ে ছেলেমেয়েরা অনেক ডিপ্রেসড হয়ে যায়, তারা আর নিজেদের খুঁজে পায় না। অথচ প্রত্যেকটা আর্টিস্টই ইউনিক হবার কথা , নিজের স্বকীয়তা খুঁজে বের করার কথা এতদিনে। আর্টিস্ট হওয়া টা কোন ফ্যাক্টরি প্রোডাক্ট না যে ৪ বছর পড়লাম আর হয়ে গেলাম আর্টিস্ট , এটা রেদার একটা জার্নি ; নিজেকে খুঁজে পাওয়া , নিজেকে আবিষ্কার করার জার্নি।

খোশগল্প.কম: এজ এন আর্টিস্ট আপনার উদ্দেশ্য কী?

মোরসালিন: আমার কাছে মনে হয় আমি আমি কি হইতে পারলাম এইটা অতটা ম্যাটার না।আমি কি দিতে পারলাম এইটাই বিষয়।আমার দেশকে কিছু দেয়ার আছে, যত ছোট পরিসরেই হোক সেটা কতটা দিতে পারলাম আর এমন না যে আমি একাই চেইঞ্জ হইলাম, আশপাশটাকেও চেইঞ্জ করতে পারলাম কিনা। তবে আমার ইচ্ছে আমি স্পেসিফিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কাজ করব, এই শিক্ষা ব্যবস্থার উপর আমি প্রচণ্ড ফেড আপ আসলে।

খোশগল্প.কম: সাক্ষাৎকার শেষ করবো, শেষ প্রশ্নটা করি- মানুষ হিসেবে যতটুকু বয়সই পার করেছেন, ভ্রমণের এই পর্যায়ে এসে জীবন থেকে শিখেছেন এরকম যে কোন একটা বিষয় নিয়ে বলেন।

মোরসালিন: শিখছি আসলে অনেক কিছুই।একটা বলি, সেটা হচ্ছে আমরা আমাদের লাইফের কষ্টগুলোকে অনেক মিস ইন্টারপ্রিট করি।আমরা ভাবি যে ‘আমাদের লাইফে এত কষ্ট কেন!’ কষ্ট নেগেটিভ জিনিস।আমি যেটা শিখছি কষ্ট আসলে নেগেটিভ জিনিস না, কষ্ট আসলে পজিটিভ জিনিস।যদি কেউ বুঝতে পারে প্রতিটা কষ্ট হচ্ছে এক একটা শিক্ষা, প্রত্যেকটা কষ্ট এইটা রিমাইন্ড করিয়ে দেয় যে এটা কোন একটা ভুল চিন্তা বা ভুল সিদ্ধান্তের ফলাফল, তাহলে বেটার। আমরা যেটা করি কষ্টটাকে একটা শাস্তি হিসেবে নিই, তারপর কিছুদিন যায় তারপর ভুলে যাই।আমি যেটা শিখছি সেটা হল মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হচ্ছে – পেইন, খারাপ সময়।হ্যাপিনেস থেকে মানুষ কিছু শিখে না, হ্যাপিনেস হচ্ছে রেজাল্ট।তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত কষ্টটা থেকে লেসন না নিবা তুমি ঐ কষ্টে আবার পড়বা।লাইফ আমাদেরকে লেসন দেয়ার জন্য কষ্টটা দেয়, তুমি একবার লেসন নিলে তুমি ঐ সেইম কষ্টটা আর কখনো পাবা না।এজন্য আমার নিজের পছন্দের একটা কথা বলি – ‘দ্য বিগার পেইন ইউ এক্সেপ্ট দ্য স্ট্রংগার ম্যান ইউ বিকাম!’

খোশগল্প.কম: অনেক ধন্যবাদ এতক্ষণ ধরে কথা বলার জন্যে।

মোরসালিন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত