ঝঙ্কার মাহবুব, নিজের স্ট্রাগলের কথাগুলো শেয়ার করছেন নিজের পেইজ থেকে । নিজের অভিজ্ঞতা গুলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন সবার মাঝে । মানুষকে প্রতিনিয়ত মোটিভেটেড করে যাচ্ছেন । প্রতিবছর ভিন্নও ভিন্নও টার্গেট নিয়ে নিজের গোলের পথে হাঁটছেন ।

ক্রিয়েটিভ মানুষগুলো বেশীরভাগই ইন্ট্রোভার্ট হয়

লিখেছেন...admin...মার্চ 10, 2016 , 6:11 পূর্বাহ্ন

jnkr

খোশগল্প.কম: আপনার পেইজে আপনার অনেক স্ট্রাগলের কথা বলা আছে, আপনি এগুলো বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন কেন?

ঝঙ্কার: আমি প্রথম দিকে এগুলি লিখতে চাই নি, আমার খুব শাই ফিল হত এগুলি লিখতে। আমি ভাবতাম মানুষ আমার এইসব গল্প কেন পড়বে, আমার অনেক কঠিন কঠিন গল্প আছে আরও। অনেক ছেলেদের আছে, কিন্তু ওদেরও লিখতে  শাই ফিল হয়। তারপর অনেক দ্বিধায় ছিলাম লিখব কি লিখব না; পরে ভাবলাম আমি যদি নিজের স্ট্রাগলের কথা না শেয়ার করি তা হলে কেউ জানবে না, শিখবে না। আমার লেখা পড়ে হয়তো কেউ নিজের একটা সমস্যার সমাধান পেতে পারে ।

খোশগল্প.কম: মোটিভেশনাল লেখার আগে কি আপনার লেখার অন্য কোন ধরন ছিল?

ঝঙ্কার: না, এগুলি লিখতে লিখতেই আসলে লেখা শুরু হয়ে যায়। আমি এইবারই প্রথম বই মেলায় যাই, আর এইবারই প্রথম গল্পের বই কিনি। স্ট্রাগল টু বি কনটি-নিউ, আর্ট অফ আঁতলামি এই সব লেখা গুলো লিখতে লিখতে শেষ পর্যন্ত এক একটা সিরিজ হয়ে যায়। একটা লিখার পর আর একটা লেখার চেষ্টা করতাম বা কোন লেখা বেশী বড় হয়ে গেলে কেটে ছোট করে আরও একটা বানিয়ে দিতাম।

খোশগল্প.কম: মোটিভেশনাল লেখা লিখেন সাধারণত যারা অনেক সফল হয়ে গেছেন, সে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে আপনার মন্তব্য কি?

ঝঙ্কার: আমি এখনও আসলে সফল না, অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আমি আসলে লেখাগুলো লিখতাম নিজের জন্য। আমি এখন কোন কাজে আটকে গেলে সহজ হয় আমার লেখাগুলোর জন্য। আমি হতাশ হয়ে গেলে নিজের কিছু সিলেক্টেড লেখা আছে ঐগুলো পড়ি। তখন আবার অনুপ্রেরণা পাই লেখাগুলো থেকে। আমি আসলে নিজের জন্যই লিখি।

খোশগল্প.কম: আপনি বুয়েটের সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল আর সাথে আইপিইর তুলনা করেছিলেন একটা লেখায়। আইপিই এর আসলে মার্কেট ভ্যালু নাই এমন একটা কথা আপনি লিখেছেন, এটার প্রসঙ্গটা কী ছিল ?

ঝঙ্কার: আমি কোথায় বলেছি রেফারেন্স টা পেলে ভালো হত, হয়তো এমন কিছুই বলি নাই। এমন কোন ব্যাপার না থাকাই ভালো। এমন মনোভাব পোষণ করা উচিত না। আমি যদিও বলে থাকি, এখন আমি ঐ বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করছি না। একটা কাজ যে কেউ করতে পারে প্যাশন নিয়ে আর সেটা করে সে অনেক দূর এগিয়েও যেতে পারে। আইপিই এর মাকের্ট ভ্যালু নাই, সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল এর মার্কেট ভ্যালু আছে বা নাই, এগুলো আসলে ব্যাপার না। ইন্ডাস্ট্রি আছে থাকবে, ডেভেলপ কান্ট্রিতে নাই ভ্যালু, কিন্তু ডেভেলপিং কান্ট্রিতে তো আছে। আর টিউশনির দিকে দেখতে গেলে ইলেকট্রিক্যাল আর সিভিল ছাড়া কাউকে মূল্য দেওয়া হয় না । সে জন্য বলা হয়তো ।

খোশগল্প.কম: বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষায় আপনার আশানুরূপ রেজাল্ট হয়েছিল ?

ঝঙ্কার: আমি হতাশ ছিলাম আসলে। আমি তখন ওমেকা তে সবসময় একটা ভালো পজিশনে থাকতাম ইঞ্জিনিয়ারিং কোচিংয়ের সময়। সেই হিসেবে আমি হয়তো ৩০০ র কাছাকাছি থাকার কথা ছিল, কিন্তু তা হয় নাই। আমি তখন বুয়েট সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। ভর্তি পরীক্ষার সময়ই শুধুমাত্র একবার বুয়েটে গিয়েছিলাম। ইন্টার পরীক্ষার পরই আমি বুয়েটের নাম শুনি প্রথম ।

খোশগল্প.কম: ছোটবেলার থেকেই কি বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন ছিল?

ঝঙ্কার: ছোটবেলায় আমি গ্রামে থাকতাম, তখন বুয়েট ঢাকা ইউনিভার্সিটি চিনতাম না। আমাদের এলাকায় এক ভাই চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। একবার ভাইয়ের এক বন্ধু আসল যে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আমিও গিয়েছিলাম দেখা করতে, তখন তাকে দেখে আমার ঐ সময়ে খুব কুল মনে হয়েছিল। তখন ভাবছিলাম, যে করেই হোক ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ব। কিন্তু এর বাইরে অন্য কিছু ভাবতাম না। ক্লাসে যেতাম, পড়ালেখা করতাম, ক্লাসে ফার্স্ট হতাম, পরের ক্লাসে কিভাবে  ফার্স্ট হওয়া যায় সেই চিন্তায় থাকতাম। কিন্তু এভাবে আসতে আসতে এসএসসি তে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে রেজাল্ট খুব খারাপ হয়ে গেল।

খোশগল্প.কম: এসএসসি তে এই অনাকাঙ্ক্ষিত রেজাল্টের কারণ কী ছিল বলে আপনি মনে করেন?

ঝঙ্কার: ওভার কনফিডেন্স, আমার টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট অনেক ভালো হয়েছিল। তারপর থেকে সবাই বলতে লাগল আমি বোর্ডে স্ট্যান্ড করব। আবার ঐ সময়টাতে আমাদের ঘর ভেঙ্গে নতুন করে করা হয়েছিল, এর কারণে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। আরও একটা কারণ ছিল আমি প্রথম দিকে অবজেক্টিভ এ ভালো ছিলাম, কিন্তু তারপর আর অবজেক্টিভ পড়া হয় নাই। এসব কারণ গুলো ই।

খোশগল্প.কম:  ফার্স্ট হওয়া ছাএরা হয়তো সেকেন্ড হতে পারে, কিন্তু এতটা বিপর্যয়ের পর পরিবার এবং সমাজের সবার প্রতিক্রিয়া কি ছিল?

ঝঙ্কার: আমার বাবা তখন আমার পাশে ছিল। আমর মা, বোন সবাই বলত আবার পরীক্ষা দিতে হবে । আর আশেপাশের মানুষগুলো বলাবলি করত যে ছেলেটা তো ভালো ছিল অথচ একটা সাবজেক্টে লেটার পেল, ওর থেকে যে খারাপ সেও তো ২ সাবজেক্টে লেটার পাইছে। ছেলেটা কি নেশা করে, নাকি প্রেম করে? এইসব কথাবার্তা চারদিকে ছড়াতে থাকল। তখন ভালো কলেজে ভর্তি হতেও স্টার মার্ক লাগত, আমার ঢাকার কোথাও ভর্তি হওয়ায় যোগ্যতা ছিল না। সবাই বলত আবার পরীক্ষা দিতে, কিন্তু আমার বাবা বললেন, যে ঘুরে দাড়াতে পারে সে একবারেই পারে, যে পারে না শতবারেও পারে না। আমি তারপর অনেক ঝামেলার পর কুমিল্লার একটা কলেজ এ ভর্তি হই। তারপর কলেজ এর প্রথম ২ টা পরীক্ষা খারাপ করলাম, তারপর একটু সিরিয়াস হলাম। বন্ধুদের সঙ্গ ছাড়লাম, নিজে নিজে অনেক রুল ডেভেলপ করলাম। তারপর প্রথম বর্ষে ফিজিক্সে আমি ৭৫ এ ৭৪ পেলাম ।

খোশগল্প.কম: ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষে এসে আপনি কো কো-কারিকুলাম একটিভিতে অনেক জড়িয়ে গেলেন, এটা কি ঠিক প্লান অনুযায়ী ছিল?

ঝঙ্কার: হুম, সবকিছুই আমার টার্গেট লেভেল এ ছিল। আমি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ায় পর ভাবলাম আমার টিউশনি দরকার নিজের খরচ চালানোর জন্য। তারপর আমি টিউশনি শুরু করলাম। প্রথম বর্ষের রেজাল্টের পর আমার বোন আমাকে বলব, তুই কি কোনদিনই ফার্স্ট হতে পারবি না। কথাটা আমার খুব লেগে যায়, তারপরের বারই ফোর এ ফোর পেয়ে যাই। এরপর ভাবলাম আমার এবার এক্সট্রা কো-কারিকুলাম একটিভিতে এগিয়ে থাকতে হবে। তারপর ই আসলে অনেক কিছুর সাথে যুক্ত হওয়া।

খোশগল্প.কম: বুয়েটের টিচার হওয়ায় কোন উদ্দেশ্যে ছিল?

ঝঙ্কার: না আসলে। আমি প্রতিযোগিতাটাকে সবসময়ই বেশী উপভোগ করতাম। ও আমার থেকে বেশি পেল, কত বেশি পেল? আমিও পরেরবার পাব। ক্লাসের ফার্স্টবয় আমার বন্ধু ছিল, তো ওর সাথেই আমার প্রতিযোগিতা হত। আমি এটা উপভোগ করতাম।

খোশগল্প.কম: আপনি কি ইন্ট্রোভার্ট হওয়াটা দোষের মনে করেন?

ঝঙ্কার: মোটেও না, ইন্ট্রোভার্ট হওয়া বরং ভালো।ইন্ট্রোভার্ট হওয়াটা একটা বড় গুণ।আমি নিজেও ইন্ট্রোভার্ট। ক্রিয়েটিভ মানুষ গুলো বেশীরভাগই ইন্ট্রোভার্ট হয়। বড় বড় গুণী মানুষরাও ইন্ট্রোভার্ট ছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন দেখে দেখে বক্তৃতা দিতেন, কথা বলতে খুব কম,;আইনস্টাইন খুব বড় সামাজিক মানুষ ছিলেন না , কিন্তু মানুষ তাদের মনে রেখেছে তাদের ক্রিয়েটিভিটির জন্য। ইন্ট্রোভার্টরা কাজ করার অনেক টাইম পায়।

খোশগল্প.কম: আপনি কমেডি শোতে অংশগ্রহণ করার কথা কেন ভাবলেন?

ঝঙ্কার: প্রতি বছরই আমার কিছু গোল থাকে। ইউএসএ যাবার পর আমরা উদ্দেশ্য ছিল কম্পিউটার সাইন্সে সুইচ করা। কম্পিউটার সাইন্সে সুইচ করার পর কী করব খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তখন কমেডি একটা এলিমেন্ট ছিল। আমি এখনও কমেডির পিছনে অনেক বেশি সময় দেই না। কমেডি শো আমি বছরে একবার করি, অন্যের মেটারিয়ালস গুলোকে একটা স্টোরিতে রূপান্তর করে দেই। কমেডির ব্যাপারে আমি কি করব জানি না? তবে আমার লিস্টে আছে। ছোটবেলায় আমি একবার কমেডিয়ান অভিনয় করে দ্বিতীয় হয়েছিলাম স্কুলের প্রোগামে। আমরা ২ জনই অভিনয় করেছিলাম, তার মধ্যে দ্বিতীয় হয়েছিলাম।

খোশগল্প.কম: কমেডি শো গুলোকে আপনি শুধু মানুষকে মজা দেওয়ার অংশ হিসেবে, নাকি সামাজিক সমস্যা গুলোর একটা চেঞ্জ আনার মাধ্যম হিসেবে দেখেন?

ঝঙ্কার: গান হচ্ছে এমন একটা মাধ্যম, যার মাধ্যমে এন্টারটেইনমেন্টও দেওয়া হয় আবার মেসেজও দেওয়া যায়। সায়ান নামে একটা ছেলে আছে গান গায়, আরও অনেকেই আছে এখন। গানও গাওয়া হল, মেসেজ দেওয়াও হল।কমেডিতে ও এমন পার্ট আছে। বাইরের দেশে এগুলি অনেক আছে, এইচবিও তে একজন আছে সোশাল ইস্যুগুলিকে এমন ভাবে দেখান, পরবর্তীতে তার চেঞ্জ হয়। বাংলাদেশে এখনও তো সোশ্যাল ও পলিটিকাল ইস্যুগুলোকে ঐ ভাবে দেখানো যায় না, কিন্তু এটা একটা শক্তিশালী মাধ্যম। আমাদের দেশেও এটা একটা পেশা হবে এবং সোশ্যাল চেঞ্জও হবে।

খোশগল্প.কম: এবার প্রোগ্রামিং নিয়ে আপনার একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রোগ্রামিং নিয়ে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের স্কিলড কেমন?

ঝঙ্কার: আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা প্রোগ্রামিং নিয়ে বেশ আগ্রহী। আমাদের দেশে প্রোগ্রামিং নিয়ে কোন প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা নেই, তারপরও খুব ভালো। যারা ভালো করছে তাদের নিজস্ব চেষ্টায় তারা ভালো করছে। বেশিরভাগ সাইন্সের ছাএছাএীরা এটা ভয় পায়। আমাদের দেশে আসলে অনেক প্রোগামার আছে, যারা ইনিশিয়াল স্টেজে চেষ্টা করছে বা করতেছে।

খোশগল্প.কম: সরকার প্রোগ্রামিং শিখানোর জন্য আইসিটি নামে একটা বিষয় চালু করছে, আপনার কী মনে হয়, এটা কোন লেভেলের বা গ্রেডের ছাএছাএীদের জন্য প্রযোজ্য?

ঝঙ্কার: এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এখনকার বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়িই টেকনোলজির কাছাকাছি চলে আসছে, এতে করে আর সমস্যা হওয়ায় কথা না। কিন্তু আমি অভিযোগ শুনেছি একটু কঠিন হয়ে গেছে। এটা আসলে উচিত ছিল ফাইভ-সিক্স থেকে ফান্ডামেন্টাল ভাবে শুরু করা, তারপর আস্তে আস্তে উপরের ক্লাসের দিকে দেওয়া।

খোশগল্প.কম: আমাদের দেশের মানুষের আসলে প্রফেশনাল দিক থেকে কোন ব্যাপারে পিছিয়ে আপনি মনে করেন?

ঝঙ্কার: পার্সোনাল গ্রোথ এর দিকে যত্নবান হতে হবে । মানুষের পার্সোনাল বিহেভিয়ার পাল্টানো একটু কষ্টের, কিন্তু চেষ্টা করলে সম্ভব। আমাদের দেশের মানুষ সাইকোলজি রিচ করে না, এটা রিচ করা দরকার।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত