হাসিনা বেগম। কাজ করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন নাহার হলে। ত্রিশ বছরের উপর কাজ করছেন একই জায়গায়। জীবনের এই শেষে এসেও হাল ছাড়েননি পরিবারের। যেখানে অন্য দুটো পরিবারের মতো এই সময়টা হয়ত কাটাতেন নাতি নাতনিদের সাথে খেলে গল্প করে, পরিবারের সৌন্দর্য হয়ে। নিখোঁজ ছেলের পানে তাকিয়ে আছেন এখোনো। চাকরী ছাড়েন না নিজের সম্বলটুকু আকড়া রাখার জন্য।

তারা কইতো মাইয়া মানুষ ভাতের “ডেক” টানব,ডেক টানতে পড়ালেখা লাগে না

লিখেছেন...admin...মার্চ 14, 2016 , 4:41 পূর্বাহ্ন

hsna

খোশগল্প.কম: দাদী ভালো আছেন?

হাসিনা: হ্যা আমি ভালো আছি।আপনি কেমন আছেন?

খোশগল্প.কম: ভালো। দাদী এই হলে কতদিন হইলো চাকরী করতেছেন?

হাসিনা: ত্রিশ বছর।

খোশগল্প.কম: তা তো অনেক দিন।কার মাধ্যমে পাইছেন চাকরীর খবর?

হাসিনা: আর পনেরো মাস আছে।কারো মাধ্যমে না, আমি নিজের চেষ্টায় চাকরী পাইছি।

খোশগল্প.কম: আপনি যখন চাকরীতে আসেন তখন তো চাকরীর জন্য এতো মানুষজন ছিলো না।আর মহিলা তো আরো কম….

হাসিনা: তখন বড় কথা হইলো চাকরী নিয়ে এতো হাতাহাতি ছিলো না।এখন তো সবই টাকার খেলা।শক্তির খেলা।আমার তো দাদী শক্তি নাই, আমিই তো মনে হয় চাকরীটা কাউরে দিয়ে যাইতে পারবো না।

খোশগল্প.কম: আপনাদের কি কাজের জন্য কাউকে ঠিক করে দিয়ে যেতে হয়?

হাসিনা: দিতে হয় বইলা না, তবে আমরা যদি আমাগো না দেখি তো কে দেখবো কন?

খোশগল্প.কম: দাদীর বাসা কই?

হাসিনা: বিক্রমপুর। আমরা চার ভাইবোন যখন ছোট তখনই আমরা টাউনে চইলা আসি।

খোশগল্প.কম: দাদী এই যে আপনি মেয়েদের একটা হলে চাকরি করছেন, সবাইকে এতো এতো পড়তে দেখছেন, আপনার কখনো ইচ্ছা হয়নি?

হাসিনা: ইচ্ছা আবার হয় না দাদী।তখন বাপ মায়ে পড়াইতে পাইরাও পড়ায়নি। তারা কইতো মাইয়া মানুষ ভাতের “ডেক” টানব,ডেক টানতে পড়ালেখা লাগে না।

খোশগল্প.কম: আপনার ভাইরা পড়াশুনা করছে?

হাসিনা: হ বড় ভাইরা করছে।

খোশগল্প.কম: আপনার ছেলে মেয়ে কয়টা?

হাসিনা: কি আর কই কষ্টের কথা। আমার দুই মাইয়া আর এক ছেলে। আমার বড় ছেলে বারো বছর ধরে নিখোঁজ।

খোশগল্প.কম: নিখোঁজ কিভাবে?

হাসিনা: তার বড় বোন তারে মারছিলো আয় রোজগার করার জন্য; সে রাগের মাথায় বাড়ি ছাইড়া চলে গেছে।

খোশগল্প.কম: খোঁজার চেষ্টা করেননি?

হাসিনা: করিনি আবার দাদী।এইখানে বইসা থাকি রিক্সায়ালা গুলারে দেখলে খারাপ লাগে।আমার পোলাটা কই আছে,কেমন আছে কিছুই জানি না।

খোশগল্প.কম: মেয়ে দুইটাকে পড়াশুনা করাইছেন?

হাসিনা: বড়টারে করাইতে পারি নাই।ছোট্টারে করাইছি। বড়টার এক ছেলে এক মেয়ে,ছোট্টার দুই ছেলে।

খোশগল্প.কম: তারা পড়াশুনা করছে?

হাসিনা: হুম তারা আবার পায় দেইখা পড়াশুনা করতে চায় না। বড় নাতনী এইবারে এস.এস.সি পরীক্ষা দিলো। বাকি গুলা পড়ে।

খোশগল্প.কম: মেয়ে দুইটার বিয়ে মনমতো দিতে পারছিলেন? আপনি তো তখন একা আয় উপার্জন করেন।

হাসিনা: মাইয়া দুইটার বিয়া মাশাল্লাহ ম্যালা ধুমধামে দিছিগো মা।

খোশগল্প.কম: কষ্ট হয়নি?

হাসিনা: তখন বুঝো না পোলাপাইন সব ছোট ছোট। এক পট চাল রানলে তিন বেলা খাইছি আর তখন তো টাকারও এতো দাম ছিলো না

খোশগল্প.কম: নাতি নাতনীদের ছোটবেলা দেখছেন।তো আপনার ছোট বেলার কথা মনে হয় না তাদের সাথে থাকতে থাকতে?

হাসিনা: হয় মা। গ্রামে বাবায় দশমীর মেলা দেখতে নিয়া যাইতো।বাতাসা,কটকটি কিন্যা দিতো।ওগুলান লুকায় রাখছি কেউ যেন না নেয়। তোমরা তো দাদী বতসরে একদিন পান্তা ভাত খাও আমরা তখন রোজ রোজ পান্তাই খাইতাম। ইলিশ তখন দেখলে জান শান্তি হয়ে যাইতো, আর অহন কি ইলিশ চোখের দেখাও দেখা যায় কও?

খোশগল্প.কম: তাহলে আপনার নাতি নাতনিরা আমার মতো ছোটবেলা পাচ্ছে না….

হাসিনা: তারা আরো বেশি খায়। এর উপর আমি চাকরি করতেছি, আমার যখন যা মনে হয় কিনা দেই; তারাও চায়। আমার সন্তানেরে আমি যা না খাওয়াইতে পারছি আলহামদুলিল্লাহ আমার নাতনীরা তার থেকে অনেক ভালা খায়।

খোশগল্প.কম: মা বাবার কথা কিছু বলেন দাদী।

হাসিনা: মা বাবা তো মেলা আগে মারা গেছে । আমার মায়ের চেয়ে আমার খালা আমারে বেশি আদর দিছে। খালার বাসা পাশেই ছিলো। তাও মায়ের বাসা থেকে দিন শেষে কেউ নিতে না আইলে কানতাম। তয় মায়ের রান্না অনেক ভালা আছিলো।

খোশগল্প.কম: মেয়েরা আপনার রান্না পছন্দ করে?

হাসিনা: বিশ্বাস করবা কিনা জানিনা  আমার কাছে আমার রান্নাই ভালো; ওই দুইটা রানতে পারে না।

দাদী শুনো, সবার সব দিনতো সমান যায় না।আমার পোলা মাইয়া কষ্ট করছে,এমনও হইছে ভাত কম, ভাতের মাড় মরিচ দিয়া খাইছে, আর এখন দেহো এমন কিছু নাই যে আমি করি নাই।তয় আগের কথা মনে হইলে গো মা জীবনে কিছু থাকে না। আমার বিয়ার পরেই তো বারোজন কর্মচারি কাজ করাইছি। আর এখন দেখো!!

খোশগল্প.কম: দাদার কি হইছিলো দাদী?

হাসিনা: দেশে গেছিলো। ফরিদপুর। ওইখান দিয়া আর ফিইরা আসে নাই। যাইতেও পারি নাই। সবাই কয় রক্তবমি করছিলো। বিশ্বাস করি না। আমি জীবনে যে কষ্ট করছি। এখনো কষ্ট করি।

খোশগল্প.কম: চাকরী ছাইড়া দিলে হয় না?

হাসিনা: না গো দাদী। জামাই গুলা কি আমারে দেখবো।তখন হাত পাইতা টাকা নিতে হইতো। ছেলের বউ, বাচ্চা দুইটা আছে তাগো কে দেখবো?

খোশগল্প.কম: ছেলে বিয়া করে চলে গেছে? নাতি দুইটা পড়ে?

হাসিনা: হ এইডাই তো কাল। অই দুই বাচ্চারে কি আর আমি ফালাইতে পারি কও?আর পড়াশুনা করানোর মেলা চেষ্টা করছি গো, করে না। আর আমার ছেলের বউ চালাক না,হের লাইগা আরো বিপদ। রানতে পারে না। আমিই রাইন্দা রাখি হেরা খায়।

খোশগল্প.কম: নাতি নাতিনরা কোন জিনিস খাওয়ার বায়না করে?

হাসিনা: গুড়া মাছ পছন্দ করে সবগুলা। শোন আরেকটা কথা কই,  আমি রান্দনের ধরন বুঝি। এখনকার মাইয়ারা তা বুঝে না।

খোশগল্প.কম: চাকরীর পর পেনশনের টাকাতো পাবেন। কোন প্ল্যান আছে?

হাসিনা: মা গো দুনিয়া আর কয়দিনের। টাকা পয়সা তো এই আছে এই নাই।নাতনী গুলাই সব রে মা।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত