রুবেল হোসেন, সারাদিন কাটে যার মোবাইলের বাটন চাপতে চাপতে, এক হাতে হয়তো মোবাইলের নাম্বার চাপছেন,অন্যহাতে আবার সিম বিক্রি করছেন ।অতি ব্যাস্ত মানুষদের মধ্যে একজন।কামরাঙ্গীরচর খলিফা ঘাট এলাকায় ব্যাবসা করছেন মোবাইল আর ফ্লেক্সি লোড এর।এলাকা ভিক্তিক একটা “ব্লাড ডোনেশনের” একটা গ্রুপ ও আছে।আজ কথা হচ্ছে তার সাথে…..

তার নাম্বার প্রতিবার লেখা ঝামেলা , তার থেকে একটু কষ্ট করে মুখস্থ করে ফেললাম

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 17, 2016 , 5:54 অপরাহ্ন

12552937_197234043961091_1022687744722090484_n

খোশগল্প.কম: শীতকাল কেমন উপভোগ করছেন ?

রুবেল: ভালো ,তবে বেশি ভালো না।শীতকাল অলসদের জন্য ভালো।আমি অলস না, দোকান আছে তাই সকাল সকাল উঠতে হয়।সকালে কার না ঘুমাতে ভালো লাগে ?

 

খোশগল্প.কম:তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে,আপনি অলস না?

রুবেল: না।আমি ১২ বয়স থেকে কাজ শুরু করছি, এখনও সকাল ৮ টা থেকে রাত ১২/১ টা পর্যন্ত দোকান করি।

 

খোশগল্প.কম: শৈশবকাল নিয়ে কিছু বলেন?

রুবেল: আমার জন্ম ১৯৮৮ সালে, ৪ বছর পর আমরা ঢাকায় চলে আসি, ১৯৯২ থেকে আমি এখন ও এই এলাকায় থাকি ।আমার শৈশবকাল খুব কষ্টের ছিল বলতে পারেন, আমি ১২ বয়স থেকে কাজ শুরু করেছি।অন্য ছেলেদের মতন আমার বিকাল বেলায় খেলার সময় ছিল না।সবাই যখন খেলতে যেত ,স্কুলে যেত আমি তখন মানুষের দোকানে যেতাম কাজ করার জন্য।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে কখনো স্কুলে যান নি ?
রুবেল: না, আমি কোনদিনই স্কুলে যাই নাই।আমি শুধু প্রথম কয়েকদিন ক, খ পড়েছিলাম তারপর আর না।তখন পরিবারের অবস্থা খুব খারাপ ছিল।স্কুলে পাঠানোর মতন অবস্থা ছিলো না আমাদের ।আর তাই খুব অল্প বয়সে কাজে লেগে যাই।

 

খোশগল্প.কম: ঐ সময়ে কি কাজ করতেন, কোথায় কাজ করতেন?

রুবেল: আমি ২০০১ থেক কাজ শুরু করি, তখন আমি গাউছিয়া তে কাজ করতাম একটা স্বর্ণের দোকানে।প্রতিদিন ২ টাকা করে দিত।আমি দোকানের চা, পানি এনে দিতাম, তারপর আমি অনেক দিন নিউ মার্কেট এ কাজ করছি ।অনেক পরে এসে আমি ব্যাবসা শুরু করি ।

 

খোশগল্প.কম: শৈশবকালের জন্য দুঃখ হয় না বা কখন ও মনে হয় না শৈশবটা আর ও ভালো হতে পারত…?

রুবেল: হুম,মনে হয়। কিন্তু ভাই যেইটা চলে গেছে সেটা নিয়ে দুঃখ করে আর কি হবে।আমার হয়তো আর কপালে ছিল না।সবাই সব কিছু পারে না করতে ,আমি পারি নাই, এটা নিয়া দুঃখ ও নাই এমন একটা ।

 

খোশগল্প.কম: আপনি এই এলাকায় অনেক পরিচিত ,আর কারণ কি?

রুবেলঃ আমি ২০০০ সাল থেকে এই এলাকায় ভাই, তা ছাড়া এই এলাকার মানুষ গুলা আমাকে একটু বেশিই ভালবাসে, কেন জানি না ।হয়তো মানুষ গুলো ভালো বলে। না হলে আমি ভালো বলে (এ কথা বলে হেসে দিলেন)

 

খোশগল্প.কম:আমি প্রায়ই দেখি,আপনি ২ হাতে ২ টা ফোনে নাম্বার চাপতে পারেন, এটা কি করে শিখলেন,কবে থেকে শিখলেন?

রুবেল: আমি ৭ বৎসর ধরে মোবাইলের ব্যাবসা এবং ফ্লেক্সিলোড করি। সে দিক থেকে দেখলে এতদিন ধরে লোড করতে করতে ২ হাতেই চাপতে পারি, এটা এখন অভ্যাস হয়ে গেছে।এখন চোখ বন্ধ করে নাম্বার তুলতে পারি এবং অনেক দ্রুত তুলতে পারি।

 

খোশগল্প.কম:লোক মুখে শুনলাম এই এলাকার প্রায়ই বেশিরভাগ মানুষের ফোন নাম্বার আপনার মুখস্ত, কিভাবে করলেন এত মানুষের নাম্বার মুখস্থ ?

রুবেলঃ আজ যে লোকটা আমার দোকানে ফ্লেক্সি লোড করতে আসছে, সে আমার এলাকায় থাকে, তারমানে সে আবার আসবে আমার দোকানে লোড করতে। তাই ভেবে দেখলাম তার নাম্বার প্রতিবার লেখা ঝামেলা , তারথেকে একটু কষ্ট করে মুখস্থ করে ফেললাম। এভাবে আজ অনেক মানুষের নাম্বার মুখস্থ হয়ে গেছে এখন।

 

খোশগল্প.কম: আপনার কখন ও মনে হয় নাই, এটা আপনার প্রতিভা?

রুবেল: হুম,মনে হইছে।অনেক মানুষ ই অবাক হয়।আমার ও মাঝে মাঝে ভালো লাগে আমার দোকানের সামনে মানুষ এসে শুধু বলে যায় কত টাকা ফোনে লাগবে,আমি দিয়ে দেই।বেশির ভাগ মানুষই কিন্তু নাম্বার বলে যায় না ।

 

খোশগল্প.কম:আপনি এই এলাকায় একটা “ব্লাড ডোনেশনের” একটা গ্রুপ আছে , যেটার আপনার উদ্যোগে তৈরি হয়েছে?

রুবেল: একবার আমার মা অসুস্থ হয়ে গেলেন, অপারেশন করতে হবে।রক্ত লাগবে ৫ ব্যাগ। ও নেগেটিভ রক্ত ,খুব কম পাওয়া যায় এ গ্রুপের রক্ত।আমি আমার ফোন লিস্টের সবাই কে ফোন দিছি, বাঁধনে গিয়ে কয়েকদিন অপেক্ষা করছি।এমন কি কুমিল্লা থেকে গিয়ে রক্ত আনছি।কত মানুষ কে যে আমি ফোন দিছি ভাই ,তা শুধু আমি জানি ।এমন কোন ব্লাড ব্যাঙ্ক নাই যে আমি যাই নাই ।তারপর ২ ব্যাগ সংগ্রহ হইছে ।কত মানুষ যে খাটছে এই রক্তের জন্য তবুও পাই নাই । তারপর আমি একা একাই ফোনের সব মানুষের নাম্বার তার রক্তের গ্রপের নাম লিখে সেভ করছিলাম । আমি ভাবলাম আমি কষ্ট করছি, যেন আর কারো কষ্ট না হয়।তাই এলাকার কিছু তরুণ ছেলেদের কে একসাথে করে সবার রক্তের গ্রুপ সংগ্রহ করা শুরু করলাম।এখন প্রতি সপ্তাহেই মানুষ এসে আমার কাছে রক্তের জন্য আমি সংগ্রহ করে দেই ।

 

খোশগল্প.কম: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

রুবেল: ব্যবসা করার ,আর বড় করে ।

 

খোশগল্প.কম:জীবনের এ জায়গায় এসে আপনার কোন জিনিসটা আপনার জন্য সবচেয়ে ভাললাগার ?

রুবেল: আমি পড়ালেখা করি নাই, আমি কখনও ভাবি নাই, আমি এত মানুষের সাথে পরিচিত হতে পারবো, সবার সাথে এত ভালো সম্পর্ক থাকবে।এত মানুষ আমাকে ভালবাসবে। সত্যি বলতে ভাই এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।

 

খোশগল্প.কম:মানুষের ভালবাসা পাওয়ার মূলমন্ত্র কি?

রুবেল: ভাই সবার জন্য সমান ভাবে চিন্তা করা, সবাই কে ভালবাসতে হবে, স্বার্থ ছাড়া চিন্তা করতে হবে ।

 

খোশগল্প.কম:আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাকে এত ব্যাস্ততার মধ্যে সময় দেওয়ার জন্য।
রুবেল: আপনাকে ও ধন্যবাদ।

 

 

 

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত