পেশায় চা-বিক্রেতা, একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে স্থায়ী দোকানে চা বিক্রি করেন।নয় বছর চাকরি করতেন ‘জনকন্ঠ’ দৈনিক পত্রিকায়, রোড এক্সিডেন্টের পর থেকে এই পেশায় আছেন।হরতাল-অবরোধ, নির্বাচনী সহিংসতায় ব্যবসায় মন্দা নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন।তার নিত্যকার কথা নিয়ে খোশগল্পের সময়…

দোকান তো আমারে ছাড়ে না, আমি দোকানরে ছাড়ি, দোকান আমারে টাইনা নিয়া আসে

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 9, 2016 , 6:58 পূর্বাহ্ন

based

 

খোশগল্প.কম: কেমন আছেন মামা?

বাছেদ: আল্লাহয় রাখছে ভালোই।

 

খোশগল্প.কম: আপনার নামটা আগে বলেন মামা।

বাছেদ: আমার নাম মোঃ বাছেদ।

 

খোশগল্প.কম: আপনি কোথায় থাকেন?

বাছেদ: এই খানেই, সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ড এর পাশে।

 

খোশগল্প.কম: আপনি কি এখানেই বড় হইছেন?

বাছেদ: হ্যাঁ, আমার আব্বায় ’৭১ এ আমগোরে ঢাকা নিয়াসছে, এর পর থেকে আমরা এখানেই থাকি।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে আপনার আব্বার বাড়ি ছিলো কোথায়?

বাছেদ: আমার আব্বার বাড়ি ছিলো বিক্রমপুরে, আমরা কেউ ঐখানে থাকি না।আমার আব্বা ছোটবেলায়ই আমাদের এইখানে নিয়াসছে।তারপরে আমরা আর কোন সময় ঐখানে যাই নাই।ছোটবেলায় একবার গেছিলাম।আমরা ভাই-বোন সবাই এইখানেই মানুষ।আমার বাবা ও এইখানে মারা গেছে, আমাদের ছেলেমেয়েও এইখানে থাকে, আমরাও বিভিন্ন জায়গায় বিয়া করছি।আমাদের বিক্রমপুরের সাথে ঐরকম সম্পর্ক নাই।

 

খোশগল্প.কম:আপনার বাবা কী করতেন?

বাছেদ: আমার বাবা ছিলো এক মিলের মেকানিক।

 

খোশগল্প.কম: আপনারা কয় ভাই-বোন ছিলেন?

বাছেদ: আমরা ৪ ভাই, ৪ বোন।বোনেগো বিয়া দিয়া দিছি, বড় দুই ভাই মারা গেছে, বড়জন মারা গেছে অসুখ ছিলো, মেজ জন মারা গেছে এই রাস্তায় এক্সিডিন্ট হইয়া।আমি আর আমার ভাই বাইচা আছি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার ভাই কি করেন

বাছেদ: ঐ ভাইও মিলের মেকানিক।

 

খোশগল্প.কম: আপনি বিয়ে করছেন কোথায়?

বাছেদ: বিয়ে করছি কুমিল্লায়।

 

খোশগল্প.কম: আপনার বাড়ি তো ঐদিকে না, এত দূরে কীভাবে হইলো?

বাছেদ: ঐ ভাগ্যে ছিলো, একভাবে হয়া গেছে।

 

খোশগল্প.কম: আপনার ছেলেমেয়ে কয়জন?

বাছেদ: আমার ছেলে নাই, ২টা মেয়ে।বড় মেয়ের বয়স ১৬ বৎসর, বিয়ে দিয়া দিছি, নাতিও হইছে, ঐখানে জামাই বাড়িতেই থাকে।নানান কাহিনী হইছে অরে নিয়া, অনেক ঝামেলা পোহাইছি, অনেক খারাপ দিন গেছে অইগুলা বলতে চাই না।

 

খোশগল্প.কম: আর আপনার ছোট মেয়ে?

বাছেদ: ছোটটার বয়স ৪ বছর, সামনের রমজানে আল্লাহয় দিলে মাদ্রাসায় ভর্তি করায় দিবো।

 

খোশগল্প.কম: মাদ্রাসায় কী চিন্তা করে দিবেন?

বাছেদ: নরমাল লাইনে দিলে, যে পরিবেশ? মেয়েরা ভালো থাকবো না।দ্বীনের যে আসল জ্ঞানটা এইটা ভিতরে না থাকলে অদের চোখে রঙিন জিনিসটাই পরবো।এই জন্যে মাদ্রাসায় দিতে চাই।

 

খোশগল্প.কম: আপনি সবসময় টুপি পড়েন দেখছি, দাড়িও রাখছেন……

বাছেদ: জ্বি, আল্লাহয় দ্বীনের বুঝ দিছে, আগে তো দ্বীনের বুঝ ছিলো না, বুঝি নাই।এখন আল্লাহয় দিলে ২ চিল্লা দিছি, কিছুদিনের মধ্যে আরেক চিল্লা দেওয়ার ইচ্ছা আছে, বৃহস্পতিবার কাকরাইল মসজিদে রাত্রে বেলায় থাকি।জবান হেফাজতে রাখি, সৎ ভাবে ব্যবসা করি, আল্লাহর উপরে ভরসা করি।

 

খোশগল্প.কম: এখন তো চায়ের দোকান চালান, আগেও কী এই কাজ করতেন?

বাছেদ: আমি আগে জনকন্ঠে চাকরি করতাম, নয় বৎসর জনকন্ঠে চাকরি করছি।একদিন সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে এক্সিডিন্ট করলাম, আমার পায়ের উপর দিয়া গাড়ি গেছিলো।অনেক চিকিৎসা করতে হইছে, এক বৎসর চিকিৎসা করাইছি, চিকিৎসার খরচ কোম্পানীর থেকে দিছে, পরে একটা শেষ অপারেশন করতে বলছিলো আমি করি নাই।অপারেশনটায় রিকস ছিলো।১ বৎসর পরে যখন সুস্থ হইছি তখন আমাকে চাকরি থেকে বিদায় দিয়া দিছে।আমি তখন চাকরিহারা ২০০২ এ এক্সিডিন্ট করছি, প্রায় ২ বৎসর পরে আমি এইখানে আইসা চায়ের দোকান দেই, আগে ছিলাম পাশের এই দোকানে, এক বৎসর ধইরা এই দোকান নিছি।এখন এই দোকানে বসি।

 

খোশগল্প.কম: ব্যবসা হয় কেমন।

বাছেদ: ব্যবসা ভালো চলে না।আগে দিনে ৪০০০-৪৫০০ টাকার বেচছি, এখন তো বেচতেই পারে না।ব্যবসা কোনমতনে কীভাবে যে চালাইতেছি আমি জানি।একবারে মন্দায় পইরা গেছি, এক্কেরে বেচা-বিক্রি নাই।

 

খোশগল্প.কম: এখন কেন ব্যবসা নাই?

বাছেদ: নানান কারণে।হরতাল-অবরোধ, নির্বাচন, মানুষ নাই।

 

খোশগল্প.কম: এখন তাহলে আপনার মাসিক আয় কত?

বাছেদ: চলে, আল্লাহয় দেয়, মাস পার হয়া যায় কোনরকমে, দিন তো আর আটকায়া থাকে না।

 

খোশগল্প.কম: দোকান কি আপনার? দোকান ভাড়া কত?

বাছেদ: না, দোকান ভাড়া কারেন্ট বিল-টিল মিলায়া ৩,৫০০ টাকা।

 

খোশগল্প.কম: আপনার দোকান তো বেশ বড়, জায়গা আছে, এর মধ্যে ফ্রীজও রাখছেন, তাহলে শুধু চা কেন বিক্রি করেন?

বাছেদ: রানিং রোড না? এর মধ্যে রানিং লোকেরাই চা-পানি খায়।এর ছাড়া অন্য কিছু চলে না তো, এর আগে দিইয়া দেখছিলাম, চলে তো নাই, লস খাইছি।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে এটা ছাড়া অন্য কিছু করার চিন্তা করেন নাই?

বাছেদ: করছি! ছাইড়াও দিছি, ছাইড়া দিলে কী হবে! দোকান তো আমারে ছাড়ে না, আমি দোকানরে ছাড়ি, দোকান আমারে টাইনা নিয়া আসে।আমি দোকান ছাইড়া দিয়া ৩ মাস ছিলাম, ব্যবসায় এত লস!চিন্তা করছি এই ব্যবসা আর করবো না কিন্তু ৩ মাস আবার ফিরা আসছি,

 

খোশগল্প.কম: ঐ ৩ মাস কী করছেন?

বাছেদ: তখন যে কী করছি এই কথা আর কী বলবো।সারাজীবনে যা কষ্ট না করছি তার থিক্কা বেশী কষ্ট করছি এই তিন মাসে।কী করছি এইটা আমি জানি আর এক আল্লাহ জানে, আমি এইগুলা বলতে চাই না, বলবো ও না।আল্লহ গোপন রাখছে, গোপন থাকুক।ঐ ৩ মাসে আমার চেহারা-কাঠিন বদলায়া গেছিলো, এমন সূর্যের তাপ।কি যে করছি আমি!

 

খোশগল্প.কম: এখন আপনার কী চিন্তা-ভাবনা।

বাছেদ: এখন কোন চিন্তা-ভাবনা করি না, চিন্তা-ভাবনা করতে গেলেই বিপদ।চিন্তা ভাবনা কইরা এখন কিছুই করা যায় না।চিন্তা-ভাবনা কইরা কাজ করতে গেলেই সমস্যায় পরি।চিন্তা-ভাবনা, পরিকল্পনা করতে গেলেই সেই মত কাজ হয় না, আমি ভাবি এক, হয় আরেক।

 

খোশগল্প.কম: সবসময় তো আপনার গাঁয়ে শক্তি-সামর্থ্য থাকবে না, তখন কী করবেন?

বাছেদ: চিন্তা-ভাবনা করবো না, আল্লাহয় যেভাবে দিন চালায়।

 

খোশগল্প.কম: আপনাকে ধন্যবাদ মামা কাজের মাঝখানে এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্যে।

বাছেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত