অর্থহীন লেখা যার মাঝে আছে অনেক কিছু। হ্যাঁ, এই লেখার মাঝেই আছে অনেক কিছু। যদি তুমি মনে করো, এটা তোমার কাজে লাগবে, তাহলে তা লাগবে কাজে। নিজের ভাষায় লেখা দেখতে অভ্যস্ত হও। মনে রাখবে লেখা অর্থহীন হয়, যখন তুমি তাকে অর্থহীন মনে করো; আর লেখা অর্থবোধকতা তৈরি করে, যখন তুমি তাতে অর্থ ঢালো। যেকোনো লেখাই তোমার কাছে অর্থবোধকতা তৈরি করতে পারে, যদি তুমি সেখানে অর্থদ্যোতনা দেখতে পাও। …ছিদ্রান্বেষণ? না, তা হবে কেন?

প্রতিটা সম্পর্কের জন্য আমি ট্রাস্টফুল, কেয়ারিং এবং আমি শব্দগুলোকে অনেক মূল্য দেই

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 26, 2016 , 12:41 অপরাহ্ন

js

খোশগল্প.কম: বুয়েটে ইঞ্জিনিয়ারিং লাইনে ভর্তি হওয়ায় পিছনে কোন সুস্পষ্ট কারণ আছে কি?

জিসান: আমার ইচ্ছা ছিল ইকোনমিক্স এ পড়ব বা এই ধরণের সাবজেক্টে এ পড়ব। কিন্তু সোশ্যাল বা ফ্যামিলির জায়গা থেকে অপশন দেওয়া হয় ২ টা, হয় ডাক্তার নাহয় ইঞ্জিনিয়ার!   ম্যাথ পছন্দ করি বলে, একটা পছন্দের জায়গা থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং।

খোশগল্প.কম: তুমি তো সাইন্সের ছিলে, তবুও কেন ইঞ্জিনিয়ারিং-ডাক্তারি রেখে ইকনোমিক্স এ পড়তে চেয়েছিলে?

জিসান: আমাদের যখন বাচ্চাদের সাইন্স শিখানো হয় তখন আমাদের এইটা ডিসাইড করার অপশন থাকে না। ইকনোমিক্স নিয়ে যখন একটু একটু ধারণা পেতে শুরু করলাম তখন মনে হওয়া শুরু করল এটা ইন্টারেস্টিং। ইকনোমিক্সে ম্যাথ আছে, আর ম্যাথ ভালো লাগত তাই। আমাদের মনে হয় বাংলাদেশে যত না ইঞ্জিনিয়ারের প্রয়োজন তার থেকে বেশি দরকার অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ, কিংবা মনোবিদ। আমরা প্রতিবছর আমাদের দেশে যতটুকু ইঞ্জিনিয়ার দরকার আমরা তার থেকে বেশি উৎপাদন করে ফেলছি।

খোশগল্প.কম: সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াটা তাহলে উপভোগ করছ না?

জিসান: সত্যি বলতে লেভেল ২ /টার্ম ১ পর্যন্ত খুব একটা ইনজয় করিনি, কিন্তু লেভেল ২ /টার্ম ২ তে এসে যখন ইঞ্জিনিয়ারিং এর কোরে ঢুকলাম তখন মনে হইছে, না এখানেও কিছু ইন্টারেস্টিং বিষয় আছে। টিচারদের সাথে কথা বললাম, তাদের কাজ নিয়ে জানতে পারলাম তার মানে আমার কাছে অপশন আছে।কিন্তু অপশন সফল করার জন্য রাস্তাটা একটু বেশি কঠিন এটলিস্ট বাংলাদেশের পেক্ষাপটে। তারপর যদি হই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান।

খোশগল্প.কম: তাহলে তো মধ্যবিত্ত পরিবারের হিসাবে তোমার কোন দায়িত্ব পালন করতে হয় পরিবারের?

জিসান: এটা তো উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত সবার জন্যই। আর প্রত্যেকেরই পরিবারের জায়গায় দায়িত্ববোধে থাকে । যে কোন ফ্যামিলিকে যদি মধ্যবিত্ত পেরিয়ে ট্রানজিটে উচ্চমধ্যবিত্ত পিরিয়ডে যেতে হয় তাহলে মাঝের কেউ না কেউ একজন থাকতে হয়। যে কোন একজন এটাকে উঠাতে হয়, আমার কাছে মনে হয় এটা আমার দায়িত্ব এ শিফটিং বা ট্রানজেকশনটা দেওয়া যাতে তারা মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত পর্যায়ে যেতে পারে ।

খোশগল্প.কম: এ উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সময় তোমার নিজকে ওভার কনফিডেন্ট মনে হয় না?

জিসান: না নিজকে তো ওভার কনফিডেন্ট মনে হয় না, এমনকি মাঝেমধ্যে মনে হয় আমার কনফিডেন্ট এ ঘাটতি আছে। বড় হওয়ায় পেক্ষাপটটা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে খুব একটা সহজ না। মুখে হয়তো বলা যায় আমি এটা করব ওটা করব, কিন্তু বাস্তবতায় হয়তো দেখা যায় সেটা কতটা সমর্থন করবে  দেখার বিষয় আমার পরিবেশ , আমার সামর্থ্য, আমার চেষ্টা এই তিনটার একসাথে মিল ঘটানোই মোটেও সহজ কিছু না। তাহলে অনেক মানুষ সফল হত, গুটিকয়েক না।

খোশগল্প.কম: তুমি তো একজন বিতার্কিক, তাহলে তোমার এই কনফিডেন্ট ঘাটতির পিছনে কোন প্রভাবক কাজ করেছে?

জিসান: বিতার্কিক অন্য জনের সামনে কনফিডেন্টলি কথা বলতে পারে  কিন্তু নিজের সঙ্গে কথা বলতে পারে কিনা এটা বেশ বড়সড় প্রশ্ন।  আমার কাছে মনে হয় নিজের সাথে কথা বলা, পৃথিবীর অনেকগুলো কঠিন কাজের মধ্যে একটা। কারণ অন্যদেরকে ঠকানো যায় কিন্তু নিজকে কিভাবে ঠকাবো?

খোশগল্প.কম: তোমার ভালো গুণ জানতে চাইলে কোনগুলো বলবে?

জিসান: আমার কাছে মনে হয়, আমার ভালো গুণ কি সেটা বলা মুশকিল। তবে আমার মধ্যে কিছু দোষ নাই বলে আমি বিশ্বাস করি। ১ নাম্বার মানুষকে ঠেকানোর কোন চিন্তা ভাবনা আমার মধ্যে নাই,  ২ নাম্বার হল, ফ্যামিলি হোক বা কোন সম্পর্কের সাথে যুক্ত শব্দ গুলোর মূল্যায়ন আমার কাছে অনেক বেশি। সেটা হতে পারে পরিবার, হতে পারে বন্ধু-বান্ধব, হতে পারে যে কোন সম্পর্ক।  প্রতিটা সম্পর্কের জন্য আমি ট্রাস্টফুল, কেয়ারিং এবং আমি শব্দগুলোকে অনেক মূল্য দেই। হতে পারে এটা আমার দুর্বলতাও।

খোশগল্প.কম: তুমি এই যে বললে, ”তুমি  মানুষকে ঠকাও না”। এটা কি সাফল্য অর্জনের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে?

জিসান: যদি সহজে সফলতা অর্জন করতে চায় তাহলে এটা প্রতিবন্ধকতা না। উপরে উঠতে যাওয়ার সবচেয়ে সহজাত প্রবৃত্তি হচ্ছে অন্যকে ঠকিয়ে যাওয়া। আমি আসলে এভাবে চলতে চাই না, তাই আমার জন্য সাফল্য অর্জনটাও কঠিন। প্রতিটা সম্পর্ককে আপনি যদি সমান মূল্য দিতে চান তাহলে আপনি মাঝেমধ্যে নিজকে বন্দি মনে করবেন। আপনি যে ইন্ডিপেনডেন্ট এই সেন্সটা চলে যাবে। একটা সিদ্ধান্ত নিতে হলে সব ধরনের পারসপেকটিভ থেকে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

খোশগল্প.কম: তুমি একজন বিতার্কিক হিসাবে, রাজনৈতিক ও সামাজিক অনেক ইস্যু নিয়ে বিতর্ক কর। একজন মানুষ হিসাবে বা বিতার্কিক হিসাবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ফিল কর?

জিসান: হুম, আমি দায়বদ্ধতা ফিল করি। যেমন আমার চিন্তাভাবনা ছিল, আমাদের দেশের প্রতিটা মানুষ যখন রাজনৈতিক ভোট দেয় আওয়ামী লীগ ভোট দেয়, কারণ তার বাবা -মা অথবা ফ্যামিলির ব্যাকগ্রাউন্ড আওয়ামী লীগ। অথবা এখানে ভোট দিলে সে ফ্যাসিলিটি পাবে এই জন্য। আমার এই জায়গাটাতে মনে হয়, যদি নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই সেন্স টা গ্রো করানো যায়, আমার ভোট আমি দিব এটার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল,যাকে  তার ভোট দিব তার  সম্পর্কে জেনে দেব, ফিউচার ভেবে দিব। আমার ভোট হয়তো একটা, কিন্তু অনেকগুলো একটার মূল্যায়ন তো অনেক বেশি।এই জায়গা থেকে আমার মনে হয় পরিবর্তন  দরকার। আমি এটা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছিলাম। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে আমি যেটা করে কাজটা করে শিক্ষা পেয়েছি তাদেরকে সেভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যেমনটা আমি বিতর্ক করে কিছুটা শিক্ষা পেয়েছি, সাফল্য পেয়েছি কিনা পাইনি কিংবা আমি বিতর্ককে আপন করে নিয়েছি কিনা?  সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিতর্ক থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এটা যদি করানো ট্যুর, চিন্তার জগতটা যদি বড় করানো যেত তাহলে হত হয়তো। আমি এই ব্যাপারে ইনিশিয়েটিভ নিয়েও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছি।

খোশগল্প.কম: বিতর্ক জগতের মানুষের কি ভূমিকা ছিল তোমার এই ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসায়?

জিসান: না। বড় সাফল্য পেতে হলে সেটা  আমাকেই করতে হবে। অন্য কাউকে ধরে বা অন্য কাউকে দিয়ে পেলে এর পিছনে তাহলে তো আমার কোন ভূমিকা নাই। পথ যদি মসৃণই হয় তাহলে আমি কিন্তু সাকসেসফুল না, পথই কিন্তু সাকসেসফুল। সামনে বাধা আসলে অতিক্রম করতে না পারলে এটা আমারই ব্যর্থতা। এটা আমি স্বীকার করে নিব। তবে  বিতার্কিক জগতের মানুষের যতটা না বিতার্কিক হয়ে, খানিকটা দাম্ভিক ও হয়ে উঠে। তাই মনে হয় এই জগতের মানুষের ও একটু ভিন্নতার প্রয়োজন আছে।

খোশগল্প.কম: তোমার নিজের মধ্যে বাস্তবতার কারণে কোন পরিবর্তন এসেছে?

জিসান: আমার মধ্যে ১/২ বছর ধরে একটা রিয়্যালাইজেশন হয়েছে, যেটা হচ্ছে খুব ছোট বয়স থেকে মানুষের কাছে যদি খুব রেসপনসিবিলি একটা চিএ ফুটিয়ে তুলি তাহলে হচ্ছে মানুষ আমার উপর এক্সপেকটেশন বেশি করবে। আমার উপর চাপ বাড়বে  এবং আমি আমার স্বাধীনতা হারাব। তাই ছোটবেলা থেকে একটু প্রত্যাশা ভঙ্গ করা, একটু  দুষ্টামি, একটু হতাশ হওয়া প্রয়োজন। আমি আমার ব্যক্তিগত লাইফ থেকে বলতে পারি খুব রেসপনসিবিলিটির দেখানোর প্রয়োজন নাই। যখন যেখানে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই শো করব। আর বাকিটুকু যথেষ্ট শয়তানি, ফাজলামি সব করব। আর একটা কথা হচ্ছে আমি কখনও খুব একটা হতাশ হইনি, মানুষের জীবনে হতাশ হওয়ায় দরকার আছে। উপরে উঠার পিছনে হতাশার সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে। কেউ যদি হতাশ হয় এবং পজিটিভলি নিতে পারে সে ভালো উপরে উঠতে পারে। আমার কাছে মনে হয়, আমার লাইফের আরেকটা শিক্ষা হচ্ছে আমি খুব কম হতাশ হয়েছি, আমার হতাশ হওয়ায় আরও বেশি প্রয়োজন আছে।

খোশগল্প.কম: তোমার লাইফের এমন কোন ঘটনা, যা তোমাকে এখন অব্দি সবচেয়ে বেশি হতাশার জন্ম দিয়েছে।

জিসান: সেটা হচ্ছে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা। মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়ার পর বাবা বলেছিল, জীবনে প্রথম কোন লিস্ট দেখছি যেখানে আমার ছেলের নাম লিস্টে নাই। এই কথাটা আমাকে কিছুটা হতাশায় ফেলেছে এবং পড়ালেখায় কিছুটা এফেক্ট ফেলেছে। হতাশ হবার চেয়ে বেশি ফ্রাসটেডেট হয়েছিলাম। হতাশ হলে নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতাম, কিন্তু ফ্রাসটেডেট হওয়ার কারণে হয়তো নিজকে খুব বেশি টাইম দিতে পারিনি। আর একটা হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি পরীক্ষার হলে, ঘড়ি নিয়ে না যাওয়ার কারণে আমার কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ মনে হয়েছে প্রথম মিনিটটা।যতকিছুই বললাম সব পড়ালেখা কেন্দ্রিক। আমার রিয়েল লাইফে হতাশ হওয়ায় মতন কিছুই হয়নি। আমার কাছে মনে হয় আমার ফ্যামিলি বন্ডিং অনেক স্ট্রং। ফ্যামিলি বন্ডিং স্ট্রং হলে তারা তোমাকে হতাশ হওয়ায় জায়গা দিবে না।

খোশগল্প.কম: তোমার জীবনে এমন কোন ভুল যা তোমাকে অনুশোচনায় ভোগায়?

জিসান: আমি আসলে জীবনটাকে সহজ ভাবে নিয়ে ফেলছিলাম, এটাই একটা ভুল। এতটা সহজ ভাবে আমি চিন্তা করেছিলাম, আমি খুব সহজে স্মুথলি এগিয়ে যাব। আর একটু জটিল চিন্তা করলে প্রতিটা জায়গায় হয়তো আর একটু উপরে উঠতে পারতাম সবক্ষেত্রেই। তবে অনুশোচনাবোধ নেই আমার।

খোশগল্প.কম: উপরে উঠতে পারা বলতে কি বুঝায়?

জিসান: উপরে উঠতে পারা বলতে, তথাকথিত আশেপাশের মানুষ যা বোঝে, সেটা নিজের ভিতরের পরিবর্তন হয়তো। কিন্তু সাকসেস রেট যদি বলি অনেকটা উপরে যেত। যদি বলি অর্গানাইজেশন এর ক্ষেত্রে আরও একটু সিরিয়াস থাকতাম তাহলে আরও একটু ভালো জায়গায় যেতে পারতাম। পড়ালেখার ক্ষেত্রে যদি আরও একটু সিরিয়াস হতাম, তাহলে হয়তো আরও ভালো জায়গায় থাকতাম। যেটা আমরা মধ্যে ভালো করার ইচ্ছা বাড়াত।

খোশগল্প.কম: বুয়েটে এত সমস্ত প্রোগামে অংশগ্রহণ কর, সঞ্চালন কর। ভার্সিটি লাইফে সবচেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হচ্ছে সিজিপিএ, তোমার কি মনে হয় এইসব কাজে অংশগ্রহণ করলে কাজগুলো সিজিপিএ র জন্য প্রতিবন্ধক?

জিসান: আমি যেটা বিশ্বাস কর, সিজিপিএ একটা মানদণ্ড যেটার উপর সাকসেস রেট নির্ভর করে। এটা অনেক হাই থাকতে হবে এমনটাইও না, আবার যাদের হাই তাদের ক্রেডিট দিতে হবে। সিজিপিএ র পাশাপাশি আমার বেঁচে থাকার জন্য কিছু উপাদান দরকার, আমি যে সব এক্টিভিটি করে সে গুলো আমাকে শান্তিতে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে ভার্সিটি লাইটা যতটা না সিজিপিএ র লাইফ তার চেয়ে বেশি জীবনকে জানার লাইফ, জৈবিকতা জানার লাইফ। জৈবিকতা জানি বা না জানি জীবনকে সবটুকু জানতে চাই। শুধু সিজিপিএ ধারী হলে জীবন জানা যাবে ব্যাপারটা এমন না। আমার সিজিপিএ খুব খারাপ না হলেও মোটামুটি একটা পর্যায়ে আছে, যেটা নিয়ে আমি হতাশ না।

খোশগল্প.কম: মৃত্যু নিয়ে তোমার ভাবনা কি?

জিসান: মৃত্যু তো আমার আসবেই, পরকালে যেহেতু বিশ্বাস আছে সেহেতু কিছু প্রস্তুতি নেওয়া উচিৎ। জানি না নিতে পারছি কিনা। তবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিৎ। আমি মারা যাওয়ার পর মানুষ আমাকে মনে রাখবে কি রাখবে না, বা আমি মারা গেলে আউটপুট আসবে কি আসবে না, মাঝেমধ্যে আমি এইটা চিন্তা করি?  এদের মধ্যে ২ টা শ্রেনীভেদ থাকবে, একপ্রকার যারা আমার মৃত্যুতে খুশি হবে, আর এক প্রকার যারা দুঃখ পাবে। দুঃখ পাওয়ার জন্য কারণ লাগে না, কিন্তু ঘৃণা পাওয়ার জন্য কারণ লাগে। আমার কাছে মনে হয় একটা মানুষ কতটা ভালো বা খারাপ এই ক্যালকুলেশন দিয়ে বিচার করা যায়। আমার মৃত্যুর পর কেউ যদি খুশি হয়, তার সাথে সম্পর্ক ঠিক করা উচিৎ অবশ্যই ।

খোশগল্প.কম: তুমি নিজকে কতখানি চিনো, এ ক্ষেত্রে নিজকে কত দিবে?

জিসান: খুব বেশি না। আমার কাছে লাইফের গোলই হচ্ছে নিজকে চিনা। সুতরাং আমি এখন পর্যন্ত লাইফের পথেই আছি সেহেতু চিনার কিছুই হয় নাই। এখন ও অনেক কিছু আসবে নিজকে চেনা আর জানার।

খোশগল্প.কম: বুয়েট লাইফে তোমার Rag খাওয়া বা দেওয়ার ঘটনা আছে?

জিসান: নাহ, আমার কাছে মনে হয়, যাদের Rag দেওয়া হয় তারা কিছু করে বা যারা Rag দেয় তারাও খুব রেসপনসিবিলিটি নিয়ে Rag দেয় তাও না। জিনিসটা হচ্ছে এর মধ্যে কেউ বিনোদনও খুঁজে পায়, আবার কেউ হতাশও হয়। বুয়েটের ক্যাম্পাস আপন করে নেবেই, সেটা rag দেওয়ার আগে হোক বা পরে হোক।

খোশগল্প.কম: তুমি নটরডেমে কলেজ থেকে অনারেবল ম্যানশন পেয়েছিল, এর অভিজ্ঞতাটা বল?

জিসান: আমি নটরডেমে জীবনটা অনেক সহজ করে নিয়ে ফেলেছিলাম, যার কারণে আমার ডিবেটিং ক্লাবে তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। সদ্যই তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় নটরডেম থেকে কিছু একটা নিয়ে ফেরার ইচ্ছা ছিল। বলতে পারি সেই ইচ্ছাটার একটা প্রতিফলন হচ্ছে অনারেবল ম্যানশন পাওয়া। এর জন্য আমরা বন্ধুরা আমাকে অনেক উৎসাহিত করেছে। আমি নটরডেমে এ খুব একটা ভালো সাফল্য পাইনি। এপ্লিকেশন করার পিছনেও ভূমিকা রেখেছ বন্ধুরা, এপ্লিকেশনে তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছে বন্ধুরা। অনারেবল ম্যানশন পাওয়ার পর মনে হচ্ছিল খালি হাতে যাচ্ছি না। আমি একটা জায়গায় ২ টা ্ বছর সময় দিয়ে দিলাম অথচ সেখান থেকে খালি হাতে ফিরে যাওয়া এমনটা ঠিক না। হ্যাঁ অনেক কিছু শিখে যাচ্ছি, কিন্তু অনারেবল ম্যানশন আমাকে খালি হাতে যাওয়ার থেকে বাঁচিয়েছে। আমি গ্রেটফুল ফ্রেন্ডদের প্রতি, ক্লাবের প্রতি, ক্লাবের মোডারেটের প্রতি কলেজের প্রতি ও।

খোশগল্প.কম: এটা বস্তুগত প্রাপ্তি , আইডিয়াল বা নটরডেম এ তোমার অবস্তুগত প্রাপ্তি কি? যা তোমার সারাজীবনের সম্বল।

জিসান: আমাকে যদি কেউ এই প্রশ্ন করে, আমার লাইফে সবচেয়ে বড় অর্জন কি?  আমি তাহলে বলি, ফ্রেন্ড সার্কেল।  এমন একটা ফ্রেন্ড সার্কেল পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। এই ফ্রেন্ড সার্কেলর প্রত্যকেই সাকসেসফুল, তারা ইনফ্লুয়েন্সিং, শেয়ারিং এবং আমার গল্পের টপিক এ কোন বাজে কিছু উঠে আসে না। আমার চিন্তাভাবনার জগতে লিমিটেড কিছু থাকে না। সেখানে সাহিত্য থাকে, আইন থাকে, বিতর্ক থাকে, সেখানে নষ্টামিও থাকে। আমার এই ব্যালেন্স বোধহয় বন্ধুদের জন্য তৈরি হইছে। আমার পুরো জীবনে ৯০ শতাংশ জায়গা জুড়ে নটরডেম ও আইডিয়ালের ভূমিকা। আর অবস্তুগত যদি আর একটা কিছু বলি সেটা হল, আমার মধ্যে এখন ও যে ইসলামিক মানসিকতা আছে কিংবা ভালো কিছু করার ইচ্ছা আছে অনুপ্রেরণার আছে তার-পেছনে আইডিয়া স্কুলের সকালের তালিমের একটা ভূমিকা আছে এবং টুপি মাথায় দিয়ে স্কুলে যাওয়ার ভূমিকা আছে। এটা হচ্ছে আমার আইডিয়া থেকে প্রাপ্তি। আর নটরডেম থেকে প্রাপ্তি হল কিছু অসাধারণ কিছু মানুষের সাথে মিশতে পারা। দ্বিতীয়ত হল ভালো মানুষের সাথে যদি একসাথে চলা যায় , ভালো ক্যাম্পাসে যদি  একসঙ্গে চলা যায় তাহলে নিজকে যাচাই করার জন্য সহজ হয়ে যায়। আমি যদি এখানে ৫০ তম হই, তারমানে আমি অনেক ভালো মানুষের মধ্যে ৫০তম হয়েছি।  যার কারণে আমি আমার স্কুল কলেজের কাছে কৃতজ্ঞ।

খোশগল্প.কম: ভালো মানুষ বলতে কি বোঝায়?

জিসান: আইডিয়াটা কমপ্লেক্স। ভালো মানুষ বলতে সবাই যদি ১০০%  ক্লিয়ার থাকত, তাহলে প্রতিটা মানুষ এখন যতটা ভালো আছে তার থেকে খানিকটা ভালো থাকত। আমি নিজকে এখনও ভালো মানুষ মনে করি না। কিন্তু খারাপ মানুষের গুণাবলী কম বলে বিশ্বাস করি। ভালো মানুষ কিনা জানি না?  যেমন আমি এখন পর্যন্ত নেশা করিনি কিন্তু ভার্সিটির ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ ছেলেরা নেশাগ্রস্ত। আমি মুক্ত থাকতে পেরেছি।  আমি ৩ টা কারণে মুক্ত থাকতে পেরেছি,  এক স্কুল-কলেজ, দুই বাবা-মা, তিন বন্ধু-বান্ধব। এটা একটা মানদণ্ড হতে পারে। আমি যেহেতু সম্পর্ককে মূল্য দেই সেই জায়গা থেকে ভালো মানুষ, আমি যেহেতু কাউকে ঠকাই না সে ক্ষেত্রে আমি ভালো মানুষ। তবে হ্যাঁ, আমি ভালো মানুষ কিনা এটা যাচাইয়ের দায়িত্ব আমার না, যারা আমার পাশের মানুষ, আমার সামনে  কথা বলে তারা। তবে ভালো মানুষ থাকার চেষ্টা করি।

খোশগল্প.কম: তোমার এতদূর আসার পিছনে অনুপ্রেরণার হিসাবে কে বা কারা ছিল?

জিসান: ফ্রেন্ড সার্কেল। আমার  স্কুলে যে অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল সেটা কিন্তু না। আমার ৯/১০ এ এসে একটা সার্কেল এ ঢুকলাম যাদের সাথে গল্প করার জন্য আমরা পড়ালেখা করা লাগছে। কলেজ এ এসে দেখলাম আমি যদি বুয়েটে না যাই, সার্কেল যদি বুয়েটে যায় তাহলে আমি গল্প করব কি টপিক নিয়ে।  এজন্য বলি আমার ফ্রেন্ড সার্কেল আমাকে অনেক অনুপ্রেরণার দিয়েছে। আর যদি কারো নাম বলতে হয় তাহলে, প্রত্যাশা, সুমাইয়া, তানভীর ও কোচিংয়ের প্রিন্স ভাইয়া আর সবশেষে মাসুম।

খোশগল্প.কম: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক্সট্রা কারিকুলাম একটিভিটি কে যেভাবে প্রমোট করা হয়, তুমি কি এটা বৃদ্ধির পক্ষে?

জিসান: আমার কাছে মনে হয় শিক্ষার কার্যক্রম কো কারিকুলাম একটিভই প্রমোট করে না। এটা আরও বাড়ানো উচিৎ। শুধু ফিজিক্স পড়ে চিন্তা ভাবনার জগত বড় হয় না। শুধু ফিজিক্স পড়ে ফিজিক্সের জগত বড় হয়। কিন্তু সার্বজনীন চিন্তাভাবনা বলতে সেখানে একটু রাজনীতি, একটু অর্থনীতি, একটু খেলা সবকিছুরই ছোঁয়া লাগবে। একটু আনন্দের প্রয়োজন আছে, চলারপথে অনেক বাধাবিপত্তি আসবে তা অতিক্রম করতে পারার শিক্ষার প্রয়োজন আছে। লিডারশীপের প্রয়োজন আছে। নিজকে উপস্থাপন করার প্রয়োজনীয়তা আছে। লাইফে বড় কিছু করতে হলে সবকিছুরই একটা মিশন থাকতে হবে। যেগুলো কো-কারিকুলাম একটিভিটির বাইরে পাওয়া যায় না। যদি কো-কারিকুলাম একটিভিটি থাকত তাহলে একটা স্টুডেন্ট যাচাইয়ের মানদণ্ড ট্রিপিকাল এডুকেশনের বাইরে ও থাকত। হয়তো যে ছেলের ফিজিক্স ভালো লাগে না , ডিবেট ভালো লাগে। সে হয়তো সেখানেই সাইন করত। আমার কাছে মনে হয় গণতান্ত্রিক চর্চাটা ভালো ভাবে না হওয়ার একটা প্রধান কারণ হচ্ছে আমরা কো-কারিকুলাম একটিভিকে ভালো ভাবে প্রমোট করি না।

খোশগল্প.কম: এমনিতেই যদি তোমাকে বলা হয়, তুমি পৃথিবীতে আমনা একটা আবিষ্কার করবে যা তুমি সমাজের সমস্যা চেঞ্জ করতে পারবা। তাহলে তুমি কি আবিষ্কার করতে ?

জিসান: আমি হয়তো এমন একটা ওয়ে অবিস্কার করতাম, মানুষের চিন্তাভাবনার জগত থেকে অতিরিক্ত মাএায় আকাঙ্ক্ষায় প্রবণতা দূর করা যেত। তাহলে হয়তো পৃথিবীটা আরও অনেক বেশি ভালো থাকত।

খোশগল্প.কম: অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা না থাকলে কি মানুষ বড় হতে পারবে?

জিসান: আমি শব্দটা ব্যবহার করেছি অতিরিক্ত মাএায়। আকাঙ্ক্ষা প্রবণতা অবশ্যই ক্যালকুলেটিভ হতে হবে । আমার কাছে যেটা মনে হয় বড় হতে হলে ড্রিমার  হলে হবে না ও সাথে থিঙ্কাস হতে হবে। এ দুইটার মিশে আপনাকে বড় করে তুলতে পারে। অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা প্রবণ হলে আপনি হতাশ হবেন। আর অতিরিক্ত হতাশা আপনাকে কখনোই বড় হতে দেবে না।

খোশগল্প.কম: নিজকে নিয়ে ফিউচার প্লান কি?

জিসান: আমি যেহেতু সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ছি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে কিছু একটা করা। বড় প্রবলেম সলভ করতে পারায় চেয়ে আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারদের বেশি ভাবা উচিৎ বাংলাদেশের পেক্ষাপটে চিন্তা করা। কোন কাজ করলে আমার দেশের যানজট কমবে, কি করলে মানুষের থাকার ব্যবস্থা করা যাবে, কি করলে মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে এই ধরনের আইডিওলজি নিয়ে রিসার্চ করতে চাই। বলতে গেলে বাংলাদেশের সমস্যা নিয়ে রিসার্চ করতে চাই। জায়গায় রিসার্চ করার মানুষের খুব অভাব। সবাই বিদেশে-চলে গিয়ে  রিসার্চ করেই বিদেশে থেকে যায় বিদেশের প্রযুক্তি নিয়ে। কেউ হয়তো আমাদের দেশের প্রযুক্তির কথা ভাবে ও না। আর একটা স্বপ্ন আছে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছি, যারা ম্যাকানিকাল, নেভাল, কেমিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে তাদের নিয়ে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ভ্যালি তৈরি করতে চাই। যারা সবাই এখানে আইডিয়া শেয়ার করবে, নিজেদেরকে উজাড় করে দেশের জন্য কাজ করবে। জানি এটা সম্ভব না, তবুও আশা ছাড়ছি না।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত