সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে “ইন্টারন্যাশনাল রিয়েলেন্সে মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে নিউজ পোর্টাল “প্রিয় ডট কমে“ কর্মরত আছেন। বাবার চাকরিসুত্রে ঘুরেছেন দেশের বহু জেলায়। লিখেছেন প্রথম আলো,কালের কন্ঠ,ইত্তেফাক,সমকালসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১১ টি।

“প্রতিটা সময়কেই আমি চূড়ান্ত সময় মনে করে লিখি”

লিখেছেন...admin...মার্চ 7, 2017 , 9:27 পূর্বাহ্ন

খোশগল্প.কম:  আপনার পরিচয়টা শুনি?

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: আমি, সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি। বর্তমানে লেখা-পড়া করছি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে। আর কর্মরত আছি প্রিয় ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টালে। তবে,আমার এই পরিচয়ের  মাঝেও আমি যেই পরিচয়ে সবচেয়ে বেটার ফিল করি সেটা হলো লেখক হিসাবে। বলতে পারেন লেখা-লেখিই আমার প্রধান নেশা এবং এটাই আমার  প্রধান পরিচয়।

 

খোশগল্প.কম: তো, এই নেশার(লেখা-লেখির) হাতে খড়ি কি ছোটবেলা থেকেই? 

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: না। আসলে লেখা-লেখির হাতে খড়ি একেবারে ছোট বেলা থেকে নয়। তবে, পড়া লেখার বাহিরে অন্য কিছু করা বা সাংস্কৃতি জগতের  প্রতি টান ছিলো আমার ছোট বেলা থেকেই। এমন করেই আমি ছোট বেলায়-ই গানে জড়িয়ে যাই। ক্লাস টুতে যখন ছিলাম তখন বাবা আমাকে গানের স্কুলে ভর্তি করে দেয়, তারপর শিশু একাডেমি এবং ছায়ানটেও আমি গান শিখেছি। কিন্তু, সময়ের স্রোতে স্রোতে এক সময় আমি  বুঝতে  পারলাম আসলে আমি গানের প্রতি ভালো কমফোর্ট ফিল করছিনা, সব মিলিয়ে এক পর্যায়ে গান করা হলোনা। তো, গান যখন ছোট বেলায় করতাম তখন এই গানের সাথে সাথে আমার আরো একটা নেশা ছিলো বই পড়া। আমি নানান রকম বই পড়তাম। যখনই কোন বই পেতাম তা পড়া শুরু করে দিতাম। শিশু একাডেমিতে যখন ভর্তি হয়েছিলাম, তখন সেখান থেকে অনেকগুলো বই দিয়েছিলো আমাকে,আমি সারা দিনই বইগুলো পড়তাম। তবে, এই বইয়ের প্রতি আমার প্রগাঢ় ভালোবাসার উৎসের কথা যদি বলতে হয় তবে আমি বলবো আমার দাদুর কারণেই হয়তো। আমার দাদু ছিলেন গ্রামের ডাক্তার উনি প্রচুর বই পড়তেন এমিনকি রুগীদের বাড়ি গেলেও কারো কারো বাসার ভালো কোন বই পেলে নিয়ে আসতেন। মূলত সেখান থেকেই বইয়ের রাজ্যটাকে চেনা। আর তাছাড়া আমি ব্যাক্তিগতভাবে মনে করি বই কেবল সুখ কিংবা দুঃখবোধ নয় এটা ভালো মন্দ থেকে শুরু করে অজানাকে জানতে শেখায়।আর এই পড়া থেকেই লেখার একটা ইচ্ছা জাগে মনে। আর সে জন্যই হয়তো  সময়ের পরিক্রমায়  এক সময় আমারো  লিখতে ইচ্ছে করছিলো। তখন বাংলাদেশ প্রতিদনের ডাংগুলি বিভাগে আমি লেখা পাঠাই। লেখা ছাপানো হয় পত্রিকায়। একবার পত্রিকা অফিস থেকে ফোণ করে বলল “আপনি ভালো লেখেন,আপনার আরো ভালো লেখা চাই“ তারপর লেখা-লেখির প্রতি উদ্দীপনা আরো বেড়ে গেলো। আর কি?চলতে থাকলো আমার লেখার জগৎ।

খোশগল্প.কম: কিছুদিন আগেও যেই আপনি লেখার ইচ্ছা করতেন। সেই আপনি অল্প সময়ে এগারোটি বইও লিখে পেলেছেন। আসলে মূল মন্ত্রটা কোথায়?

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: একদিক দিকে লক্ষ্য করলে আসলে কোন মূলমন্ত্র নেই। লেখা-লেখি শুরু করার পর সব সময়ই লিখে গেছি। সত্যি বলতে গেলেকি, বললাম না এটা নেশা হয়ে গিয়েছিলো।এখনো  না লিখতে পারলে আমার সবকিছু এলোমেলে লাগে,মেজাজটা খিটখিটে লাগে। মূলত এই বিরতিহীন ধারাবাহিকতায় আমার বইগুলো বের করা সম্ভব হয়েছে। আর আরেকদিকে লক্ষ্য করলে, আমার লেখার মূলমন্ত্র হলো, “আমি সব সনময়ই মনে করেছি, আজ হয়তো আমি নিজেকে প্রেসারে রেখে লিখতে পারছি কিন্তু কাল সেভাবে লিখতে পারবো কিনা সেটার বিন্দু মাত্র নিশ্চয়তা নেই। হয়তো আমি অসুস্থ হয়ে যেতে পারি, কোন দুর্ঘটনায় পড়তে পারি কিংবা মারাও যেতে পারি। তবে,সময়কে অবহেলা কেন? প্রতিটা সময়কেই আমি চূড়ান্ত সময় মনে করে লিখতাম। আর তার জন্যই বই লেখার পাশাপাশি পত্রিকাগুলোতেও সমান তালে লিখে যেতে পেরেছি। আমি মনে করি যারা লেখে তারা সকলে এমনটাই করলে হয়তো তাদের ভালোটা দিতে পারবে। অনেককেই দেখেছি লেখা-লেখি শুরু করে হৈচৈ করে কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কিছুদিন পরেই তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়না। কারণ আর কিছুই নয়,কারণ হলো নিয়মিতি না হওয়া কিংবা লেখায় ধারাবাহিকতা না আনা। এতে করে বিরতি করে লেখলে লেখার মূল ফর্ম খুঁজে পায়না। আর সে কারণেই হয়তো এমন লেখকদের আর পত্রিকার মলাটে খুঁজে পাওয়া যায়না। আমি বলছিনা আমি অনেক লিখেছি কিংবা অন্য কিছু। তবে, আমি মনে করি আমার এই ক্ষণিক সময়ে এতটুকু লেখার পিছনে এটাই আমার মূলমন্ত্র।আর আরেকটি ব্যাপার হলো বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা যেটা একজন লেখককে অদ্ভুতভাবে লেখা- লেখিতে সাহায্য করে। ভালো লেখকেদের প্রতিটি ভালো বই একজন মানুষ,সমাজ,রাষ্ট্র কিংবা বিশ্বকে সুন্দর একটা মেসেজ দেয়।দেয় অজানাকে জানার সুবর্ণ সুযোগ করে দিতে।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে আপনার প্রিয় লেখক কে?কিভাবে আপনি ভালো বই নির্বাচন করেন?

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: খুব কঠিন একটি প্রশ্ন করেছেন তবে এর সহজ উত্তর হলো আমার কোন প্রিয় লেখক নেই। কি অবাক  হলেন বুঝি? আসলে আমি মনে করি প্রত্যেক লেখকেরই সবগুলো লেখা ভালো নয় আবার সবগুলো লেখাও মন্দ নয়। এই দু‘য়ের মাঝে সব সময় চেষ্টা করেছি ভালো লেখাটাই সদরে গ্রহণ করতে।আমি নবীন-প্রবিন কোন লেখককেই তার নাম দিয়ে বিচার করিনি কোন সময়। লেখা দিয়েই তাকে আমি জাস্টিফাই করেছি সব সময়। তবে,অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে কোন লেখাটা ভালো কিংবা কোন লেখাটা মন্দ এমনটা নির্বাচন করতে গেলেই আপনি লেখকের সবগুলো বই পড়তে হবে। তার পর আপনি বুঝতে পারবেন কোন লেখাটা ভালো হয়নি কিংবা কোন লেখাটা ভালো হয়েছে কিংবা কোন লেখাতে আপনি তৃপ্ত নন। আমার ব্যাক্তিগত কথাই যদি বলি আমি রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের গল্পগুচ্ছ অনেক পড়েছি এমনকি এখনো হাজার ব্যাস্তার মাঝে আমার এই বইয়ের প্রতি ভালো লাগার ঘোর কাটেনি। অপর দিকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস আমাকে কেনো জানি ওভাবে টানেনি। বলছিনা লেখা মন্দ কিংবা অন্য কিছু,কেনো জানি আমি তৃপ্ত পাইনি। তার মানে এই নয় যে আমি পড়িনি। আমি সবগুলোই পড়েছি এন্ড দেন আমি বুঝতে পেরেছি আসলে এই লেখকের কোন বইটা আমাকে টানছে। আপনি পড়তে হবে তারপর আপানার নির্বাচন করে নিতে হবে লেখকের কোন বইটা আপনার প্রিয় বা আপনাকে দারুণভাবে টানছে।

খোশগল্প.কম: তো, আপনার এই পথ চলায় কখনো কি ফিল করেছেন কি যে,পড়া-লেখা আপনার লেখালেখিতে বাঁধা  হয়েছে?

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: না, আমার কখনোই  মনে হয়নি পড়া-লেখা আমার চলার পথে কিংবা লেখালেখির পথে বাঁধা হয়েছে। আসলে অনেকেই এমন অভিযোগ করে থাকে যে,পড়া লেখার কারণে সে স্বাধীনভাবে লেখা-লেখি করতে পারছেনা কিংবা অন্য কিছু। কিন্তু আমি ব্যাপারটা ওভাবে নেইনি। আমি সব সময়ই দুটোকে দুভাবে দেখেছি। আর এমনিতেই আমি এই ব্যাপরটা কখনোই ভালোভাবে নেইনি যে,“একজন পড়া-লেখা করবে দেন পড়া-লেখার সার্টিফিকেট দিয়ে একটা চাকরি নিবে“।এই প্রথাটা আমার কখনোই ভালো লাগেনি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এমন একটা ভুল প্রথার কারণেই পড়া-লেখা শেষ করেও অনেকে বেকার থাকে। আমি মনে করি একজন মানুষ তার নিজের জন্য পড়া-লেখার বাহিরেও অনেকগুলো স্কোপ রাখা উচিৎ। যাতে করে পরবর্তী জীবনটা সুন্দর হয়ে উঠে। চলতি পথে কখনো থমকে দাঁড়াতে না হয়। আর এই স্কোপগুলো তাকে একভাবে শুধু হেল্প করবে না নানানভাবে হেল্প করবে। আমি এক সময় অনেক মানুষের সাথে মিশতে পারতাম না। নতুন স্থানের মানুষগুলোর সাথে খাপ খাওয়াতে আমার ভীষণ কষ্ট হতো। এখন তেমনটি মোটেই হয়না। আর আমি মনে করি এটা কেবল পড়া-লেখার পাশাপাশি লেখা-লেখি, গান করা এবং অন্যান্য সাইডগুলোর সাথে যুক্ত হওয়ার জন্যই পেরেছি।

খোশগল্প.কম: এক সময় সবার সাথে মিশতে,আড্ডা দিতে পারতেন না অথচ এখন আপনিই বিভিন্ন আড্ডার মধ্যমণি।  কিভাবে এমন অমুলক পরিবর্তন আনলেন?

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: আসলে আপনাকে ব্যাপারটা খোলাশ করেই বলি। আমি ছোট বেলা থেকেই যাযাবর টাইপের জীবন উপভোগ করছি। অর্থাৎ ছোট বেলা থেকেই আব্বুর চাকরি সুত্রে কিছুদিন পরপরই আমার স্কুল পরিবর্তন হতো। ছোট বেলায় প্রায় এগারোটা স্কুল চেঞ্জ করেছি। এতে কোন স্থানেই আমি নিজেকে ভালো করে ম্যাচিং করতে পারিনি। কোন স্থানের পরিবেশের সাথেই আমার সখ্যতা সৃষ্টি হওয়ার আগেই আমি সেখান থেকে চলে আসতে হয়েছে।এতে করে আমার বন্ধুত্বের লিস্টটা একেবারে ছোট ছিলো।এমনকি আমি মনে করি একারণেই পরবর্তিতেও আমার যখন বন্ধু হতো তখন আমার প্রতি তাদের দায়িত্ব ছিলো ঢের, কিন্তু তার বিপরীতে আমি তাদেরকে ওভাবে ফিল করতম না। কেন করতাম না আমি সঠিক জানিনা। তবে, আমি মনে করি কিভাবে বন্ধুদের সাথে মিশতে হয় কিংবা মানুষের সাথে মিশতে হয় এই ব্যাপারটি রপ্ত করতে পারিনি। হয়তো তারই কারণে আমার এমন হতো। তো, যাই হোক সব কাটিয়ে এক সময় আমারা একটা জায়গায় স্থায়ী হই। আর তার সাথে আমার গান শেখা,শিশু একাডেমিতে ভর্তি হওয়া,ছায়ানটে ভর্তি হওয়া সবখানেই আমার বন্ধুত্ব বা পরিচিতি মানুষ সৃষ্টি হতে লাগলো। আর তারপরে লেখা-লেখিতো আমাকে বন্ধুত্বের আস্ত আসর উপহার দিলো। অনেক মানুষকে পাশে পেলাম। সাহিত্য আড্ডা, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা এগুলো সবই যেন আমাকে নতুন পৃথিবী উপহার দিলো। এখন যদি আমাকে আপনি অপরিচিত একটা আড্ডাতে ছেড়ে দেন সহজেই মাতিয়ে তুলতে পারবো আড্ডার আসর। আর বই প্রকাশের মাধ্যমেতো আমারও কিছু পাঠক সৃষ্টি হয়েছে তাদের সাথেও মেশা হয় দারুণভাবে। আর এই প্রাপ্তিটার পিছনে কিছু প্রকাশকদের কথা বলতেই হবে। যাদের কারণে বই প্রকাশে আমি সাহস করেছি। আসলে তরুণ লেখকদের  দিকে অনেক প্রকাশকরাই এগিয়ে আসছে। যেটা আসলেই ভালো লাগছে।

 

16832014_175127292984214_4988547079757521195_n (1)

 

খোশগল্প.কম: কিন্তু, তরুণ লেখকদের বেশির ভাগেরইতো অভিযোগ হলো প্রকাশকরা তাদের বই নিতে চায়না কিংবা বই প্রকাশের জন্য টাকা চেয়ে  বসে।

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: আসলে ব্যাপরটি তা নয়। একজন নতুন লেখক যদি প্রকাশকদের বই প্রকাশ করতে বলে, তখন তারা নিজেরাই একটু চিন্তায় থাকে চলবেতো?। আর প্রকাশকদের কথা কি বলবো। কারণ বই প্রকাশের ক্ষেত্রে টাকা-পয়সা খরচেরেও ব্যাপার একটা আছে। তো,আমি মনে করি প্রকাশকদের এই ভয় বা চিন্তা দুর করার জন্য নতুন লেখকরা বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা দরকার এতে করে তারা কিছু পাঠকও সৃষ্টি হবে আর অনেক প্রকাশকরাও পজেটিভলি ভাববে তাদের প্রতি। আমি বিভিন্ন পত্রিকায় দু-হাত খুলে লিখেছি। এখনো লেখা-লেখি নিয়েই ব্যাস্ত আছি। ফলে আমার বই প্রকাশে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি।

খোশগল্প.কম: অফিসের ব্যাস্ততা।আর লেখা-লেখিতে ব্যাস্ততা আছেই। তার মাঝেও সবকিছু কিভাবে ম্যানেজ করেন? আপনার দিনকার রুটিনটা শুনতে চাই।

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি: (হাসতে হাসতে) সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে পত্রিকার জন্য ফিচার তৈরি করি। তারপর নাস্তা করে আরো কিছু টুকটাক কাজ করে অফিসে চলে আসি। তারপর দুপুরর দিকে বই মেলায় আসি। তারপর সন্ধ্যার পর থেকে আরেকটা অফিসে কাজ করতে হয়,ওখানেই থাকি। ওখান থেকে বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ,রাতের খাবার সেরে আবার ল্যাপটপ নিয়ে বসে পত্রিকার জন্য কিছু কাজ করি। তারপর ঘুমের রাজ্যে পাড়ি দেই।

খোশগল্প.কম: ধন্যবাদ আপানকে।আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।

সাদিয়া ইসলাম বৃষ্টি:  আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0