আমাদের নানা অভিযোগের অনেকগুলো দিকের একটি হচ্ছে আমাদের পুলিশ বিভাগ।দূর্নীতি-প্রশাসন অব্যাবস্থাপনা, পক্ষপাতদুষ্টতা অন্তহীন অভিযোগ, অনেকটা ময়লা পড়া আলাদীনের চেরাগের মত, সবাই শুধু ঘৃণা করবে, তুলে পরিস্কার করে দেখবার মত কেউ নেই।এই অভিযোগ-বঞ্চনার বাইরে গিয়ে বাহিনীর একক ধরে একজন তৃণমূল পুলিশের নিত্যকার কাজ আর তার দৃষ্টি তে নিজের কাজকে নিয়ে কথা বলেছেন খোশগল্প এর সাথে।

বাবা অসুস্থ, তখন চাকরী তে ঢুকাটাই সিচুয়েশন ডিমান্ড ছিলো

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 12, 2016 , 10:47 পূর্বাহ্ন

12243046_168652646819231_1046228525201057933_n

খোশগল্প.কম: কোথায় আছেন?

সানোয়ার: ‘প্রটেকশন এন্ড প্রটোকল’ বিভাগে।

 

খোশগল্প.কম: এইখানে কাজ কি ?

সানোয়ার:  ভি.ভি.আই.পি দের যাওয়ার জায়গা গুলোতে সেফটি এনসিউর, বাসার চারপাশের নিরাপত্তা।

যেমন ধর, প্রধানমন্ত্রী যদি ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে কোথাও যান তখন ‘সুধাসদন’ থেকে নিয়ে মানিক মিয়া এভিনিউ, বিজয় সরণী, মিরপুর রোড, পুরান বিমান-বন্দর হ্যালিপ্যাড সহ পুরা এলাকা ফ্রী করা, গাড়িতে গেলে গাড়ির বহরে থাকা অথবা রোড ফ্রী করা।

 

খোশগল্প.কম: এই ডিউটিতে সুবিধা/অসুবিধা কী?

সানোয়ার:  সুবিধা হচ্ছে ডিউটির একটা রেগুলারিটি আছে, মানে ফিক্সড, কবে-কোনদিন আমার ডিউটি সেইটা আমি জানি, তাছাড়া হেডঅফিস থেকে আট কি.মি. দূরে আট ঘন্টার বেশী অবস্থান করলে মানে ডিউটি অন থাকলে সেইটার জন্য একটা বিল আছে, মাসে যে কয়বার ডিউটি হয় ওইটা হিসাব করে মাসে একটা এমাউন্ট একাউন্টে জমা হয়।

 

খোশগল্প.কমঃ আর অসুবিধা ?

সানোয়ার:  অসুবিধা হচ্ছে ডিউটির পুরা সময় খুবই কনসার্ন থাকা লাগে, একটু বেখেয়াল হইলেই অনেক কিছু হয়ে যাইতে পারে আর বড় রকমের পানিশমেন্ট তো আছেই।

 

খোশগল্প.কম: কী ধরনের পানিশমেন্ট আর বেখেয়ালীপনাগুলাই বা কী?

সানোয়ার:  পানিশমেন্ট হচ্ছে বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা ঘুমিয়ে পড়লে সেটা উপরের কেউ দেখে ফেললে তো পুরা ডিমোশন কিংবা বেতন ছাড়া ১ বছর চাকরী এই রকম।

 

খোশগল্প.কম: ঘুমিয়ে পড়ে ?

সানোয়ার:  ঘুমায় না আবার ! কেউ ক্লান্তিতে ঘুমায়, কেউ ফাক পাইলে ঘুমায়।তুমি বেখেয়ালীপনার কথা বললা না, এইটাই সেই বেখেয়ালীপনা।যেমন ধর, অনেক দিন আগে এক কনস্টেবল ২৪ রাউন্ড গুলি হারাই ফেলছিলো, আর সেই গুলি নিয়ে আরেক চাকমা বান্দরবান বিক্রি করে দেয়, আর সেই কনস্টেবল ঘটনা লুকানোর জন্য গোপনে গুলি ম্যানেজ করার চেষ্টা করলে জানাজানি হয়ে যায় , পরে তদন্তে প্রমাণ হওয়ায় ওই দুই কনস্টেবল এর বিরুদ্ধে মামলা হয়, আর দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়িত্ব থাকা ইন্সপেক্টরকে বাধ্যতামুলক অবসরে পাঠানো হয়।কিছুদিন আগেও এক কনস্টেবল ঘুমিয়ে পড়ছিলো, পরে তার গুলি ঘাসের উপর পাওয়া যায়, সেটার জন্যও কনস্টেবলকে শো-কজ করছে।

 

খোশগল্প.কম: আপনার কখনো এমন হইছিলো?

সানোয়ার:  একবার গুলি চুরি হইছিলো।

 

খোশগল্প.কম: তারপর কি হইলো?

সানোয়ার:  অনেকদিন আগে, তখন নরমাল ডিউটি করতাম, মানে যখন যেখানে পাঠাইতো।সন্ধ্যা সাতটায় ডিউটি শেষ হয়, পিস্তল আর ৬ রাউন্ড গুলি গাড়িতে রেখে নামাজ পড়তে গেছিলাম, কয়েকদিন পরে খুঁজে পাই, পরে জমা দেই ঠিকই কিন্তু দেরী হওয়ায় সতর্ক করে দেয়।

 

খোশগল্প.কম: ছোটবেলা থেকে কি এই পেশার কথা ভাবছিলেন?

সানোয়ার:  না, তখন কোন পেশার কথা ভাবি নাই।বাবা অসুস্থ, তখন চাকরী তে ঢুকাটাই সিচুয়েশন ডিমান্ড ছিলো, কিন্তু বাবা পছন্দ করেন নাই, বাবার পুলিশ পছন্দ ছিলো না।কেবল তখন এস.এস.সি দিছি, শুনলাম পুলিশে লোক নিতেছে তখন ফিজিক্যাল ফিটনেস আগে দেখতো, ফিটনেস টেস্টে টিকে যাই পরে হয়ে যায়, পরে এইচ.এস.সি দিছি, বাবাও মারা যান, পরে চাকরীও আর ছাড়ি নাই।

 

খোশগল্প.কম: বড় ভাই তো ছিলো?

সানোয়ার:  ভাই ছিলো, কিন্তু উনিও কেবল বিয়ে করছেন তো নিজের ভার আরেকজনের উপরে দিয়ে খুব একটা স্বস্তি নাই, তাই নিজেই নিজের ভরসা হওয়া জরূরী ছিলো।

 

খোশগল্প.কম: পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে কিছু বলবেন?

সানোয়ার:  পুলিশের দুর্নীতি নিয়ে কি বলবো, এইটা সত্যি যে পুলিশ দুর্নীতি করে।

 

খোশগল্প.কম: বিরোধিতা করে কিছু বলবেন না?

সানোয়ার:  কি বলবো, চাকরীতে থেকে এইসব কথা বলা বিরুদ্ধাচরণ, কিন্তু তুমি দেখো, সরকারী কোন মন্ত্রণালয়ে এখন দুর্নীতি নাই, সমাজকল্যাণ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংক, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্রেস্ট পর্যন্ত, রাষ্ট্রায়ত্ত সব গুলা ব্যাংকের টাল-মাটাল অবস্থা, আমি যদি এখন আমার প্রভিডেন্ট ফান্ডের হিসাবটা নিতে যাই, আমার টাকা, আমি হিসাব নিবো, উনি শুধু কম্পিউটারে থাকা হিসাবটা আমাকে দিবে, এইটার জন্যই ঊনারে বেতন দেয়া হয় তবু উনাকে টাকা না দিলে আমার হিসাব আমাকে দিবে না।সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা তুলতে গেলে আরেক হেনস্থা, প্রতি লাখে হাজার টাকা আমার ঊনাদের কেই দিতে হয়, তার পরও অনেকেই টাকা তুলতে পারে না, বিশেষ করে শিক্ষকদের এই ঝামেলায় বেশি হয়।এই গুলা কি দুর্নীতি না ?

পার্থক্য শুধু এইখানে অন্য দপ্তরগুলা তে ঘুষের টাকা সবাই পায় না উচু পদে ছাড়া, কিন্তু পুলিশে এইটা কনস্টেবল পর্যন্ত পায়।

পুলিশ যদি শুধু বলে যে এক ঘন্টা কোন পুলিশ ডিউটি করবো না, তাহলে দেশের কি অবস্থা হবে চিন্তা করো, সেনা-বাহিনী আছে কিন্তু বিশেষ অপারেশন ছাড়া সেনাবাহিনী কে কি আমরা দেখতে পাই? ঈদ নাই, পূজা নাই, নববর্ষ নাই, হোলি নাই, রাত নাই, নিশি নাই, ঝড় নাই, বাদল নাই, কোন উৎসবেই কোন ছুটি নাই, বরং ওই সময় আরো ডিউটি বেশী থাকে।বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক, সোনার দোকান, অফিস কোথায় পুলিশ নাই।হ্যা, দুর্নীতি আছে, সেটা হয়তো একসময় কমে আসবে এইটুকুই বলতে পারি।

 

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত