তারাশঙ্করের জনপ্রিয় চরিত্রের একটি ‘কবি’ উপন্যাসের কবি। ডাকাত কিংবা খুনী বংশে জন্মেও নিতাইচরণ মুখে মুখে কবিগান করতে ভালবাসে, কবিয়াল হতে চায়। তাঁর স্বপ্ন তাঁর লেখা গানকে মানুষ পড়বে, তাঁকে মনে রাখবে। কবিয়াল হবার পেছনে তাঁকে উৎসাহ জোগায় স্টেশনম্যান রাজা, ঠাকুরঝি। ঠাকুরঝিকে কবি ভালোবাসে। কিন্তু ঠাকুরঝি বিবাহিত! গল্পের প্রবাহে এক পর্যায়ে নিতাই স্টেশনের পাশের বসতি ছেড়ে যোগ দেয় ঝুমুর দলে।সেখানে তাঁর ভালবাসার মানুষ হয়ে যায় বসন্ত, সেও একদিন মরে যায়। পুরো গল্পে আসলে চরিত্রটি খুঁজে ফিরেছে তার কবি সত্ত্বার পিছনে, কবিতার পিছনে।

‘বিনয়কে কবিয়ালরা হার মনে করে’

লিখেছেন...admin...অক্টোবর 10, 2017 , 2:20 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: সমাজের পতিততম স্তর ‘ডোম কিংবা ডাকাত’ বংশে জন্মে আসলেই কি ‘কবি’ হতে পেরেছিলেন?

নিতাইচরণ: যখন প্রথম মাঘী পূর্নিমার পূজায় মহাদেবের দোয়ারকি করেছি, ছড়া কেটেছি, চাকুরে বাবু পোয়েট বলেছেন; ঝুমুর দলে আচমকা সুযোগ পেয়ে গেয়েছি; মদ খেয়েছি, খেউড় করেছি, কাশী থেকেও ফেরত এসেছিআলো ঝলমলে আসরের টানে।  মৃত্যুকে কাছে থেকে দেখেছি, জীবনকেও; এ সব কিছুর মধ্যে থেকেই কবিগান করেছি, কবিয়াল হয়েই বেচেঁছি।

খোশগল্প.কম: তারণকবিও তো প্রচুর মদ খেতেন, তাকে আপনি গুরু মানতেন…

নিতাইচরণ:  হ্যাঁ, তারণকবির এই দোষটি ছিল। সে আসরেই প্রচুর মদ খেতে। তবে তিনি শাস্ত্র জানতেন, যুক্তি দিয়ে সেসব বলতে পারতেন।

আর কবিগানের পালায় লোকে বিনীত মিষ্টি রস উপভোগ করে না; বরং মাতাল আসরে তা নিভে যাওয়া প্রদীপের মত; বিনয়কে কবিয়ালরা হার মনে করে। ঝুমুর দলের মাসি নিচু স্বরে বলতেন ‘রঙ চড়াও বাবা, রঙ চড়াও’।

খোশগল্প.কম: ঠাকুরঝি তাঁর অসুখের সময় আপনার নাম করলো-কারণ কী?

নিতাইচরণ: সে সচেতনে আমার নাম করে নি। আমি তাকে বলেছিলাম আমার ঘরে না আসতে, সে অভিমান করেছে। অভিমান ভেঙে এসে দেখেছে বসন আমার ঘরে, আমারই বিছানায়!

শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, ননদ-মরদ সবার সঙ্গে ঝগড়া করেছে, উপবাসী হয়ে অচেতন অবস্থায় ওঝার প্রহারের মুখে সে আমার নাম করেছে। তাকে আমি দোষ দিই না।

খোশগল্প.কম:এই ঘটনার কিছুকাল পরই ঝুমুর দল থেকে প্রস্তাব পেলেন এবং গ্রাম ত্যাগ করলেন-এটাকে কী বলবেন অলৌকিকতা নাকি অন্য কিছু?

নিতাইচরণ: অলৌকিকতা নয়, আমিই তো সেই জীবন বেছে নিয়েছি। আমি কবিয়াল হতে চেয়েছি, কবি গান লিখতে চেয়েছি, গান গেয়েই জীবন কাটাতে চেয়েছি। ঠাকুরঝি ভুল বুঝলো, আমিও তাকে দূরে থেকে আশীর্বাদ করতে চাই। তখন ঝুমুর দলের প্রস্তাব সেটা আমার কাছে সুযোগ হয়ে গিয়েছে।

খোশগল্প.কম:কিন্তু এর পর পরই বসনকে আপনার জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছেন, এটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

নিতাইচরণ: বসন ছিল আমার কবি গানের মতই, যাকে বাঁধ দিয়ে আটকানো চলে না, রহস্যময়ী, ক্ষুরধারিণী; যাকে এড়ানো যায় না। আমি তো পালিয়ে যেতেই চেয়েছিলাম; পারলাম কই! গাঁটছড়া বেঁধে ফিরে এসেছি। যেই বসন আমাকে ‘ওস্তাদ না ফোস্তাদ’ বলে গাল দিয়েছে, অকারণে চড় দিয়েছে সেই বসনই আমার কাছে পরিপূর্ণভাবে ধরা দিয়েছে। সে আমার স্বীকৃতি পেয়ে কাছে এসেছে, নত হয়েছে, ভালবেসেছে, তার আগে না। আমারও ফেরার পথ বন্ধ হলো। মাদকতার মত, লতানো গুল্মের মত একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছি। তাকে আমি অসম্মান করতে পারি নি, আবার দূরে ঠেলতে পারি নি।

খোশগল্প.কম: ঠাকুরঝিকে ছেড়ে ঝুমুর দল, বসন; আবার বসনের মৃত্যুর পর সেই গ্রামেই ফিরে আসা-এর মধ্যে কোথাও তো ‘আপনি’ নেই। ঘটনার প্রবাহ, বসন, ঠাকুরঝি আপনাকে নিয়ে ফিরেছে

নিতাইচরণ: তোমরা ঠাকুরঝি আর বসনকে আলাদা করছো। ঠাকুরঝি আর বসন একে অপরের ছায়া। ঠাকুরঝি বলেছে ‘আমার মন’ আর বসন ‘কেনে তুমি এসেছিলে, আমার তো মরতে ভয় ছিল না, কিন্তু আর যে মরতে মন চাইছে না’ । এঁরা তো একই দেশের, একই সময়ের একই মায়ের সন্তান। আত্মভিমানী, চিরদুঃখী; আমার থেকে দুঃখ পেয়ে মাথা ঠুকেছে,  ঠাকুরঝিকে হারিয়ে বসনকে পেয়েছিলাম। আর যখন হারালাম দু’জনকেই হারালাম।

খোশগল্প.কম: জীবনকে কে শিখিয়ে দিল, বসন না ঠাকুরঝি?

নিতাইচরণ: বসন!

kobir chobi

 

খোশগল্প.কম:কীভাবে?

“তারে ভুলিব কেমনে।

প্রাণ সঁপিয়াছি যারে আপন জেনে।

ভালবাসি বলে ভালবাসি নে।

আমার স্বভাব এই, তোমা বৈ আর জানি নে”।

আমার কোলের উপরই বসন্ত দেহত্যাগ করলো, যে দেহের উপর বসনের এত মায়া, যে গহনার উপর বসনের এত মায়া, কেউ কটু কথা বললে বসন তাকে মুখের কথায় এফোঁড়ওফোঁড় করে দিত সেই বসনকে আমি আগুনে তুলে দিয়েছি, সে প্রতিবাদ পর্যন্ত করলো না! তাঁর স্বামী-সন্তান, সংসার না হবার দুঃখ সে গোবিন্দ কে দিলো, এত কিছু পর সে মৃত্যুর পূর্বে বলে গেলো ‘গোবিন্দ, রাধানাথ, দয়া করো। আসছে জন্মে দয়া করো’

আর আমার মনে হলো ধর্মরাজের বিচারে যদি বসন নরকে যায়, সেই নরকে যেতে আমিও কুন্ঠিত হবো না।

অথচ, আমি পুণ্য ধাম, স্বর্গের দরজা কাশী গিয়ে ফিরে এলাম!

কবিগানের আসর, ঝলমলে আলো, হাজারো লোক সেই লোভ আমাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো। ( মুচকি হেঁসে) মাসি বলেছিল না-

“বুকের নিধি চলে যায় বাবা, মনে হয় দুনিয়া অন্ধকার, খাদ্য বিষ আর কিছু ছোঁব না। কখনো কিছু খাবো না! এক বেলা যেতে না যেতে চোখ মেলে চাইতে হয়, উঠতে হয়, পোড়া পেটে দুটো দিতেও হয়” 

খোশগল্প.কম: সব হারিয়ে কাশীতে ফিরে এলেন, তবুও শান্তি পেলেন না; ফিরে গেলেন গ্রামে…

নিতাইচরণ: যেখান থেকে সব শুরু হয়েছিল, ঠাকুরঝি স্বর্ণাভ পিতলের ঘটি মাথায় গ্রামে ফিরতো, ঝুমুরের দল এসে গাছতলায় সংসার পেতেছিল, সেখান থেকেই সব শেষ হলো, আবার ফিরে এলাম…

বইটি কিনতে চাইলে https://www.rokomari.com/book/2427/

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত