মোহাম্মাদ গোলাম মোস্তফা , কাজ করছেন বাংলাদেশ স্কাউটসে ।ক্যান্সারের সাথে লড়াই করেছেন দীর্ঘদিন, এখনও দিব্যি সংসার সামলাচ্ছেন,অফিস সামলাচ্ছেন । তার মতে সফলতা, “আমি কতটা সফল হব, কি করব এটা চিন্তা করে কাজ করি না। আমি কতটা সফল এটা হিসাব করতে পারবে অন্য কেউ। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজ করে যাওয়া”।

ভালো মানুষ হওয়ার অনেকগুলো পন্থার মধ্যে একটা হল স্কাউটিং করা

লিখেছেন...admin...মার্চ 21, 2016 , 8:46 পূর্বাহ্ন

golam

খোশগল্প.কম: আপনার বতর্মান ব্যস্ততা কী নিয়ে যাচ্ছে?

মোস্তফা: আমার অফিস আর পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন কাজকর্ম নিয়ে।

খোশগল্প.কম: আপনি  নিজের কী পরিচয় দিতে পছন্দ করেন?

মোস্তফা: আমি গোলাম মোস্তফা, বাংলাদেশে স্কাউটে আঞ্চলিক পরিচালক হিসাবে কাজ করছি।

খোশগল্প.কম: আপনি একজন ক্যান্সারের রোগী, এত অসুস্থতা নিয়েও কিভাবে কাজ করছেন?

মোস্তফা: আমি এখন ক্যান্সার রোগী না, আমি একজন সারভাইভাল। আমি ২০০৭ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হই। এরপর আমি ৬ টা সাইকেল কেমোথেরাপি দেই। এবং ২০ দিন রেডিও থেরাপি দিয়ে ফলোআপ এ আছি।

খোশগল্প.কম: ক্যান্সারের মত ভয়াবহ রোগ নিয়ে কিভাবে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন।  এরকম মনোবল আসলে কিভাবে পেলেন?

মোস্তফা: শক্ত মনোবল এক্ষেত্রে প্রধান জিনিস। মৃত্যু আল্লাহর তরফ থেকে আসবে। সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মৃত্যুর ভয়ে ঘরে বসে থাকলে তো হবে না। আল্লাহ হয়তো আমাকে মনোবল একটু বেশিই দিয়েছেন, আমি রেডিওথেরাপি দিয়েও ১৬ ঘন্টা অফিস করেছি মাঝেমধ্যে।

খোশগল্প.কম: অফিসের সহযোগী, পরিবার এবং বন্ধু-মহলের কাছ থেকে কিভাবে সহযোগিতা পাচ্ছেন?

মোস্তফা: বন্ধু মহল থেকে শুরু করে, অফিস ও পরিবারের সবাই আমাকে মানসিকভাবে সহায়তা করেছে।

খোশগল্প.কম: চিকিৎসার জন্য তো অনেক টাকা খরচ হয়েছে, এতটা অর্থ সংকুলান করলেন কিভাবে?

মোস্তফা: পুরো টাকাটাই আমার চাকরি জীবনে জমানো টাকা আর সম্পত্তি বিক্রির টাকা ছিল। কিছু টাকা আমার অফিস থেকে পেয়েছিলাম।

খোশগল্প.কম: পরিবারকে কতটুক সময় দিতে পারেন?

মোস্তফা: আমার কাজের জন্য খুব একটা সময় দিতে পারি না। তবে যতটুকু সময় পাই পুরোটাই পরিবারকেই দেওয়ার চেষ্টা করি।

খোশগল্প.কম: কাজের সুবাদে অনেক জায়গায় ঘুরেছেন, কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

মোস্তফা: আমি দেশের ৬০টা জেলায় ঘুরেছি। কোন কোন জেলায় ৩/৪ বারও গিয়েছি।  এক একটা জায়গা এক একরকমের। মানুষ, সংস্কৃতি ও একরকমের। তাই অভিজ্ঞতা ও একরকমের।

খোশগল্প.কম: আপনার কাজের নেশা কতটুকু আর পেশা কতটুকু?

মোস্তফা: এটা মূলত আমি ৯৪ সালে কাজটাকে নেশায় পরিণত করেছি।আমাদের অফিস ১০ টা থেকে ৬ টা। এমন টাইম মেইন্টেন করে স্কাউটিং এর কাজকর্ম  হয় না। আমাদের অফিসের পরও অনেক কাজকর্ম করতে হয়। মাঝেমধ্যে শুক্রবারেও কাজ করতে হয়। আমি সবসময়ই কাজটাকে ইনজয় করি ।

খোশগল্প.কম: আপনি তো ছাএজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, আপনি কি রাজনীতি করার মানসিকতা নিয়েই রাজনীতিতে ছিলেন?

মোস্তফা: আমি ক্লাস ৯ থেকেই রাজনীতি শুরু করি। মিছিল, মিটিং সবকিছুই করতাম। অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে এসে রাজনীতি ছেড়ে দিলাম। পরিবারের প্রেসারেও অনেকটা। কিছু একটা করতে হবে ভেবে রাজনীতি থেকে সরে আসি। তারপর থেকেই স্কাউটে কাজ করা শুরু করি।

খোশগল্প.কম: আপনি তো স্কাউটে সবোর্চ্চ সম্মননা ” প্রেসিডেন্ট রোভার স্কাউট পুরস্কার”  পেয়েছিলেন, এ ব্যাপারে কিছু বলেন

মোস্তফা: আমি যেদিন রোভার স্কাউটের প্রথম ক্লাসে যাই, তৎকালীন বড় ভাইয়ারা বলত তুমি যদি রোভারের সব নিয়ম কানুন মেনে চলে তাহলে তুমি এটা অর্জন করতে পারবে। বাংলাদেশের বর্তমানে যিনি মুখ্য সচিব, তিনি স্বাধীনতার পর প্রথম প্রেসিডেন্ট রোভার স্কাউট পুরস্কার পেয়েছিলেন। তৎকালীন যে ৫ জন রোভার পুরস্কার পেয়েছিল তাদের ৫ জনই আমার প্রতিষ্ঠানের ছিলেন। ৪ জন জগন্নাথের রোভার ছিল, আর একজন ছাত্র ছিল। সেখান থেকেই আমি উদ্বুদ্ধ হই, এরপর আমি সব নিয়ম মেনে কাজ করতে থাকি। ১৯৯২ সালের ২১ মে প্রেসিডেন্ট এ পুরস্কারে স্বাক্ষর করেন। তারপর ১৯৯৩ সালের জানুয়ারীতে আমাকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান বিশ্বাস পুরুস্কার তুলে দেন।

খোশগল্প.কম: আপনি তো অনেক ছেলেমেয়েকে স্কাউটে উদ্বুদ্ধ করেন, অনুপ্রেরণার দেন। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে আমাদের জন্য কিছু বলুন।

মোস্তফা: এখন তো ভালো মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে । স্কাউটিং করা এইজন্য যে, ভালো মানুষ কমে যাচ্ছে। ভালো ছাএ হলেই ভালো মানুষ হওয়া যায় না। ভালো মানুষ হওয়ার অনেকগুলো পন্থার মধ্যে একটা হল স্কাউটিং করা। স্কাউটে যারা প্রবেশ করবে, নিয়মগুলো মেনে চলবে। আমার পুরোপুরি বিশ্বাস তারা খুব ভালো রেজাল্ট না করলেও একজন ভালো মানুষ হবে।

খোশগল্প.কম: আপনি  তরুণদের সাথে অনেক কাজ করেন, তাদের সাথে আপনার সম্পর্ক বন্ধুর মত। এমন হওয়ার  রহস্য কী?

মোস্তফা: মানুষ মানুষের জন্য। আমি যখন যাদের সাথে কাজ করি তাদের সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করি। তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে আমার কাজের যে উদ্দেশ্য তা হাসিল করা। আমি চেষ্টা করি যাদের সাথে কাজ করেছি তাদের সবার সাথে যোগাযোগ রাখার, নিত্যনতুন যাদের সাথে কাজ করছি তাদের সাথেও যোগাযোগ রাখছি। আমি এদেরকে মোটিভেট করতে চাই স্কাউটের কাজের ব্যাপারে। এরা সবাই নতুন এদের কে আমি না শিখলে কে শিখাবে ?

খোশগল্প.কম: আপনি তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়েছেন, আপনার কর্মের সাথে পড়ালেখার সাবজেক্টের মিল কতখানি?

মোস্তফা: আসলে আমাদের দেশে পড়ালেখার সাথে কর্মের কোন মিল নাই। আমাদের দেশে সাবজেক্টে ওয়ারি জব কম। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে হবে। আমি রাস্ট্রবিজ্ঞান থেকে বের হয়ে ২ টা কাজ করতে পারতাম।  এক একজন প্রফেসর হওয়া, দুই একজন রাজনীতিবিদ হওয়া। কিন্তু সবার তো আর প্রফেসর হওয়ার ইচ্ছা নেই।

খোশগল্প.কম: যেসব ছেলেমেয়েরা স্কাউটিংকে পেশা হিসাবে নিতে চায়, তাদের জন্য আপনার উপদেশ কী?

মোস্তফা: কাজকে ভালোবাসতে হবে, এটার ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল হতে হবে , দায়িত্বশীলতা এবং আন্তরিকতা থাকতে হবে।

খোশগল্প.কম: কর্মক্ষেএে আপনি কতটা সফল?

মোস্তফা: আমি কতটা সফল হব, কী করব এটা চিন্তা করে কাজ করি না। আমি কতটা সফল এটা হিসাব করতে পারবে অন্য কেউ। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে কাজ করে যাওয়া। আমার মনে হয় আমি সফল এই পর্যায়ে ।

খোশগল্প.কম: আপনি স্কাউটে কত বছর ধরে চাকরি করছেন?

মোস্তফা: ২৩ বছর ধরে। স্কাউট যদি এবছর নিয়ম করে  রিটায়ার্ডের বয়স ৫৯ করে তাহলে আমি ২০২৪ এর জানুয়ারি পযর্ন্ত চাকরি করতে পারব। আর যদি ৫৭ বছর ই থাকে তাহলে আগামী ২০২২ এ আমার চাকরির মেয়াদ শেষ।

খোশগল্প.কম: অবসরের পর প্লান কী আপনার?

মোস্তফা: আমি স্কাউটের সাথে কাজ করে যাব। কিছু ক্রিয়েটিভ কিছু করার চিন্তা ভাবনা আছে। এসব কিছু করতে কিছু অর্থের দরকার আছে। আমি  সেটা সংগ্রহ করেই শুরু করব।

খোশগল্প.কম: আপনার শৈশব কি খুব দুরন্তপনা ছিলেন?

মোস্তফা: আমি আমার ভাইবোনদের মধ্যে সবার ছোট ছিলাম। আমি বরাবরই ১ থেকে ১০ পর্যন্ত ভালো রেজাল্ট করেছি। আমি আমার স্কুলে প্রথম দ্বিতীয় বিভাগ পেয়ে পাশ করি। আমি আমার জীবনে কোথাও তৃতীয় শ্রেণী বা প্রথম শ্রেণীও পাই নি।

খোশগল্প.কম: আপনি কখনও ফেল করেন নি?

মোস্তফা: করেছি একবার, তখন অসুস্থ ছিলাম ,তাই হয়তো।

খোশগল্প.কম: আপনার গ্রামে আপনি প্রথম গ্রাজুয়েট ছিলেন?

মোস্তফা: হুম, আমি আমার গ্রামের প্রথম মাস্টার্স ডিগ্রী হোল্ডার ছিলাম তৎকালীন সময়ে। এখন হয়তো অনেক ছেলেমেয়েই আছে। এখন আমি গ্রামের খবর জানি না। গ্রামটা তো আগের মতন নাই, নদীতে ভেঙ্গে গেছে।

খোশগল্প.কম: জীবনের এই পর্যায়ে এসে আপনাকে সুখী মনে হয়?

মোস্তফা: আমি অবশ্যই সুখী। সুখটা তো আপেক্ষিক। এক একজনের কাছে এক একরকমের। তবে আমি আমার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনের নিয়ে সুখে আছি ।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত