ডক্টর হেনরি জেকিল। ১৮২৫ সালে বিত্তশালী এক পরিবারে তাঁর জন্ম। খুব অল্প বয়স থেকেই বিজ্ঞান সাধনার প্রতি ঝোঁক ছিলো তাঁর। মানুষের পরিপূর্ণ ভালো সত্তা ও মন্দ সত্তাকে বিচ্ছিন্ন করার চিন্তা থেকে তৈরি করলেন এক আশ্চর্য ওষুধ। রবার্ট লুইস স্টিভেন্সন রচিত বিখ্যাত রহস্য উপন্যাস “দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস্‌ অব ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড”  (The Strange Case of Dr. Jekyll and Mr. Hyde)এর ড. জেকিলের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা।

‘মানুষ একেবারে আলাদা রকম হয়ে বাঁচতে পারে না, একা বাঁচতে পারে না’

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 9, 2017 , 1:29 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: ড. জেকিল, এই সাইন্স ফিকশনটি আপনার মৃত্যু দিয়ে শেষ হলেও ড. জেকিলের মৃত্যুদৃশ্য কিন্তু রচনা হয়নি, মি. হাইড হয়েই মরতে হলো।  বিষয়টা ইন্টারেস্টিং।

ড. জেকিল: হুমমম…. এই ঘটনাকে কিন্তু দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়।

 

খোশগল্প.কম: যেমন?

ড. জেকিল: দেখো, হাইড মারা গেলো অথচ তাকে কিন্তু সত্ত্বা হিসেবে তাকে পরাজিত করা গেল না।  বরং ক্রমশ পরিণত হতে হতে সে তার স্রষ্টার সর্বস্ব অধিকার করে নিলো।  তার আধিপত্যে আমি আর কিছুতেই জেকিলরূপে ফিরে আসতে পারিনি শেষ পর্যন্ত।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে শেষ পযন্ত জয়ী হলো কে? ড. জেকিল নাকি মি. হাইড? গুড নাকি ইভিল?

ড. জেকিল: এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন।  তুমি যদি ভাবতে চাও যে, মারা যাওয়া এক ধরণের পরাজয়, মারা যাওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া, সে সমাজে বাস কতে পারেনি, অপরিণত অবস্থায় মারা গেছে- তাহলে হাইডের পরাজয় ঘটেছে।  হাইডের মৃত্যুর সাথে সাথে এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে মানুষ একেবারে আলাদা রকম হয়ে বাঁচতে পারে না, একা বাঁচতে পারে না।  তাকে আশেপাশের সবাইকে নিয়ে বাঁচতে হয়।  অনেকেই ড. জেকিলকে পরিপূর্ণ ভালো এবং হাইডকে পরিপূর্ণ খারাপের প্রতীক হিসেবে দেখে।  এই ধারণাও ভুল।  এডওয়ার্ড হাইড নির্ভেজাল মন্দে গড়া হলেও ড. জেকিলের বুদ্ধিমত্তা বা ধূর্ততায় সে কিন্তু কিছুই না।  হাইডের ছদ্মবেশে জেকিল যা যা করতো তা কিন্তু ছদ্মবেশ ছাড়াও সারাজীবনই করে এসেছে।  তবে হাইড বোকার মত অপ্রয়োজনীয় অপরাধ করে বসতো, সমাজের সামনে সম্মান ধরে রাখার ব্যাপারেও তার চিন্তা করতে হতো না- এই যা পার্থক্য।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে ‘হাইড’ চরিত্রটিকে সৃষ্টি করার কারণ শুধুই সমাজের কাছ থেকে লুকিয়ে থাকার ছদ্মবেশ?

ড. জেকিল: পুরোপুরি তা নয়।  জেকিলের মধ্যে যে শুধুই সমাজের কাছে মান সম্মান হারানোর ভয় কাজ করতো তা নয়, এখানে পাওয়ার অব প্র্যাকটিসের ব্যাপার আছে।  জেকিল বয়ষ্ক, জেকিল দুর্বল।  হাইড স্বাধীন, হাইড শক্তিশালী।  সে যা করতে চায়, তা-ই করতে পারে।  সারাজীবনের সিংহভাগ আমি সৎকাজের পেছনে শ্রম দিয়েছি, সদগুণ আর আত্মসংযম অনুশীলন করেছি- আমার দুষ্টসত্তা তাই নেপথ্যে তরুণ সতেজ থেকে গেছে।

 

খোশগল্প.কম: মি. হাইডকে সৃষ্টির পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিলো?

ড. জেকিল: বিত্তশালী পরিবারে জন্ম নিয়েও আমি ছোটবেলা থেকেই যথেষ্ট মেধাবী ও কঠোর পরিশ্রমী ছিলাম।  প্রধান যে ত্রুটি ছিল আমার স্বভাবে তা হচ্ছে, আমোদপ্রমোদ আর ভোগবিলাসের প্রতি প্রবল আসক্তি।  লোকে আমার যে পরিচয় জানবে বলে আমি চাইতাম তার সঙ্গে আমার আসল রুচি ও স্বভাবের তফাত ছিল আকাশ-পাতাল।

আমার মনে হয়েছিলো, নিজের নিজের পথে অবাধে চলবার জন্যে দু’টি সত্তাকে ইচ্ছেমতো স্বাধীনতা দেয়া যায় না? মানবজাতির জন্যে এ কি এক নিষ্ঠুর অভিশাপ নয় যে, দু’টি বিরুদ্ধ সত্তা পরস্পর এভাবে একসঙ্গে চিরকাল বাঁধা পড়ে থাকবে- চৈতন্যের যন্ত্রণাকাতর গর্ভে নিজ নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে অবিরাম লড়াই করে যাবে?

ভালো আর মন্দ যদি আলাদা স্বাধীন অস্তিত্ব আর পরিচয়ে মূর্ত হতে পারে, জীবন অনেক নির্ভার হয়ে যাবে।  তাই এই দুই সত্তাকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা থেকেই হাইডের সৃষ্টি।  বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্য হয়তো সফল হল তবে সেই সময়ে এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি মাথায় আসেনি।

 

খোশগল্প.কম: তবে কি উদ্দেশ্য সফল হয় নি?

ড. জেকিল: আসলে স্যার ড্যানভার্স ক্যারিউকে হত্যা করার পর থেকেই আর উদ্দেশ্য বিফল হতে শুরু করেছে।  কারণ এই হত্যাকাণ্ডের পর এডওয়ার্ড হাইড হয়ে সমাজে বেঁচে থাকার আর কোন উপায় ছিলো না।  এরপর শারীরিক দিক থেকে পরাজয় শুরু হলো।

 

খোশগল্প.কম: হাইডের নামের মধ্যেই একটা লুকিয়ে থাকার ব্যাপার আছে, তার চেহারার বিবরণও যথেষ্ট চমকপ্রদ!

ড. জেকিল: এটি অবশ্যই লেখকের কৃতিত্ব।  অনেকে বলেন হাইডের চেহারার বর্ণনার মাঝে বিবর্তনবাদের কিছুটা প্রভাব আছে।

 

খোশগল্প.কম: হাইডের নিষ্ঠুরতার কথা বোঝাতে গিয়ে লেখক মাত্র দু’টি ঘটনার বর্ণনা দিলেন, সেটাও কিছুটা বিচ্ছিন্ন ধরণের!

ড. জেকিল: হাইডের মধ্যে একটা প্রবণতা নিশ্চয়ই দেখেছো, সে প্রথমবার একটা অপরাধ করার পরে কোনভাবে টাকা পয়সা দিয়ে বিষয়টা মিটমাট করে ফেললো।  আবার দ্বিতীয়বার খুন করার পরে দ্রুত পালিয়ে গেলো।  অর্থাৎ আমার মন্দ সত্তা নির্ভেজাল মন্দ হলেও সামাজিক ঝামেলাগুলো এড়ানোর কথা মাথায় রাখছে।  হুমম… এই ঘটনাগুলোকে লেখক খুব স্বল্প পরিসরে বর্ণনা করেছেন।  কিন্তু দেখো, জেকিলকে যখন পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে, তালাবদ্ধ স্টাডিতে পড়ে রয়েছে ওষুধপত্র, ল্যানিয়নের সাহায্য নিতে হচ্ছে –সেই বিষয়গুলো কিন্তু সূক্ষ্ণভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে।  ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতা’ এবং শতভাগ একাকী- অসামাজিক বাঁচতে চাওয়ার ধারণাগুলো এখানে মাঠে মারা গিয়েছে।

 

খোশগল্প.কম: “ঈশ্বর শয়তানকে সৃষ্টি করেছেন” প্রচলিত ধর্মগুলোতে এই সাধারণ ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়।  এই গল্পেও তা ঘটতে দেখা গেছে!

ড. জেকিল: লেখক চেতনভাবে বা অবচেতনভাবে এই বিষয়টি দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন কি না- তা আমি বলতে পারছি না।

”ডঃ জেকিল ও মিঃ হাইড” অনুবাদ বইটি কিনতে চাইলে-
https://www.rokomari.com/book/8383

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত