আনামুল হাসান। তার ক্ষেত্রে নাকি একটা কথা খুবই কমন এমনকি তার ফেসবুক ঘেটেও যেটা পাওয়া গেলো তা হলো “never lose hope,never stop expedition”.তার সাথে কথা বলার সময় এই কথাই বললেন আরো বেশ কয়েকবার।এক্সপেডিশন……প্রথম গন্তব্য ছিলো পায়ে পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম। তারপর একে একে বাংলাবান্ধা,সিলেট,ময়­মনসিংহ। একা,শুধু পায়ের ভরসায় এতোদূর যাওয়ার এই মনোবলের ইচ্ছা নাকি প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি। নিজের অনুপ্রেরনার জায়গা মাকে হারিয়েছেন ক্যান্সারে। পড়াশুনা শেষ করেছেন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে। প্রফেশন কি জিজ্ঞাসা করতেই মুখে হাল্কা হাসি ছড়িয়ে বললেন “সাইন্টিস্ট”। কাজ করার ইচ্ছা কনভারসন বায়োলজি নিয়ে।

ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড সিরিজের বিয়ার গ্রাইলসকে দেখে এটা পাকাপোক্ত হয়েছে

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 3, 2016 , 1:26 অপরাহ্ন

ana

খোশগল্প.কম: ছোটবেলা কেটেছে কোথায়?

আনামুল: ঢাকাতেই… আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা সবই ঢাকায়।

খোশগল্প.কম: বিনা নোটিশে নাকি চট্টগ্রামে হেঁটে রওনা দিয়েছিলেন?

আনামুল: হুমম, কারণ আমার ধারণা ছিল নোটিশ দিয়ে গেলে আম্মা আমাকে যেতে দিতেন না। তাই ফোনটাও বাসায় রেখে মহাসড়কে নেমেছিলাম। কিন্তু আম্মার ব্যাপারে আমার এই ধারণা ছিল ভুল…

খোশগল্প.কম: কেন?এপ্রেসিয়েশন কি তার কাছ থেকেই বেশি ছিলো?

আনামুল: ব্যাপারটা সেরকম না… আমি চট্টগ্রাম এক্সপেডিশন শেষ করে আহত পা নিয়ে যখন বাসায় ফিরি তখন ধরেই নিই যে, আমাকে আম্মা আর পথে এভাবে নামতে দেবেন না। কিন্তু এই ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর আমি আবার মহাসড়কে নামার জন্য মনঃস্থির করি। কিন্তু এইবার আম্মাকে এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। আমি ভয়ে ভয়ে আম্মাকে গিয়ে বলি যে, আম্মা, আমি আবার এক্সপেডিশনে যাবো। এইবারের দূরত্ব আগেরবারের চেয়েও বেশি; দ্বিগুণেরও বেশি। আম্মা বলেন, পায়ে হেঁটে আবার? আমি হ্যাঁসূচক মাথা নাড়তেই আম্মার আবার প্রশ্ন, এইবারও একা যাবি? আমি উত্তর দিই। আম্মা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেন, আচ্ছা, যা। পরবর্তীতে আমি আম্মাকে প্রশ্ন করেছিলাম যে, “আমার তো মহাসড়কে অনেক বিপদ হতে পারতো। আমি বেশ কয়েকবার নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফিরেছি। এটা জেনেও তুমি আমাকে যেতে দিলে কেন?” আম্মা আমাকে বলেছিলেন, “আমার বিশ্বাস ছিল, তোর কিছু হবে না। আমার এই বিশ্বাসের কারণেই তোকে আমি যেতে দিই… ”

খোশগল্প.কম: নিশ্চিত মৃত্যু বলতে?

আনামুল: আমি মহাসড়ক ধরে হাঁটতাম। যাকে বলে অ্যাস্ফাল্টের উপর দিয়ে হাঁটা। রোদ, বৃষ্টি, ঝড়-বাদল যাই হতো না কেন আমি সাধারণত তার ভিতর দিয়েই হাঁটতাম। কিভাবে বলি এই ব্যাপারটা? নিশ্চিত গাড়ির ধাক্কা বা গাড়িচাপা থেকে বেঁচে ফিরাকে নিশ্চিত মৃত্যু বলছি আমি। মহাসড়কে এভাবে হাঁটা প্রতি পদক্ষেপে জীবনের ঝুঁকিকে সাথে নিয়ে থাকে।

খোশগল্প.কম: দ্বিতীয় এক্সপেডিশনের গন্তব্য কোথায় ছিলো?

আনামুল: ঢাকা থেকে বাংলাদেশের সর্বউত্তরের বিন্দু বাংলাবান্ধা।

খোশগল্প.কম: প্রথমবার চট্টগ্রামই কেন?

আনামুল: কারণ, তাতে আমার জেলা কুমিল্লা আমি অতিক্রম করতে পারবো।

খোশগল্প.কম: এক্সপেডিশনের সময় অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন শুনেছিলাম!!

আনামুল: চট্টগ্রাম এক্সপেডিশনের সময় আমি অসুস্থ হই নাই… আহত হয়েছিলাম। অসুস্থ হয়েছিলাম অন্য দুইটা এক্সপেডিশনে। চট্টগ্রামে না।

খোশগল্প.কম: কিভাবে আহত হয়েছিলেন?

আনামুল: এইটা নিয়ে আমি এখনো কনফিউজড। তবে আমার যেইটা মনে হয়, প্রথম দিন আমি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজে হাঁটি। বুঝতেই পারতেছেন কি অবস্থা হয়েছিল। খুব সম্ভবত এতে আমার পায়ে পানি জমে যায়। যেটা পরবর্তীতে আমার বা’পায়ের টার্সাল ডিসপ্লেসমেন্ট হবার জন্যে দায়ী থাকতে পারে।

খোশগল্প.কম: কবের ঘটনা এটা?

আনামুল: চট্টগ্রাম এক্সপেডিশনের প্রথম দিনের ঘটনা। ২০১০ সালের ৩১ মে। আমার পায়ে ব্যথা শুরু হয় দ্বিতীয় দিন থেকে মানে ১ জুন সকাল দশটার কিছু পর থেকে।

খোশগল্প.কম: ওভাবেই পরে কন্টিনিউ করেছেন?

আনামুল: হুমম, করেছি।

খোশগল্প.কম: মনের জোর এতো পেলেন কোথায়? আরো একাও তো ছিলেন!

আনামুল: আল্লাহ রহমতে এটা আমার বিল্ট ইন স্বভাব। কোন কাজে দাঁতে দাঁত চেপে জিদ যদি একবার ধরতে পারি তো ইন শা আল্লাহ্ ঐটা আমি হওয়ায় ছাড়ি।

খোশগল্প.কম: আপনার এই পথের মাঝখানে কিছুসময় এক জায়গায় থেকে গিয়েছিলেন।,শুনেছিলাম গিভ আপও করতে চেয়েছিলেন!

আনামুল: হুমম, করতে চেয়েছিলাম। যখন দেখেছি যে সারা রাতের বিশ্রামের পরও আমার পায়ের সেই চিনচিনে ব্যথাটা সারে নাই একটুও… তখন ভেবেছিলাম যে, আমাকে দিয়ে হবে না।

খোশগল্প.কম: পরে আবার আগের চিন্তাতেই স্থির হওয়া!

আনামুল: পদুয়ার বাজারের জামে মসজিদ থেকে যখন বেরিয়ে এলাম প্রকৃতি তখন ভোরের স্নিগ্ধ আকাশ আর হিমেল বাতাসের এক নৈসর্গিক সম্মেলনে সজ্জিত। গতানুগতিক ব্যস্ত মহাসড়ক আজ এমন ভোরে ব্যতিক্রম। ফাঁকা রাস্তা পার হয়ে ট্র্যাকে ফিরলাম। শুরু করলাম তৃতীয় দিনের মতো হাঁটা। পায়ে আর ব্যথা নেই- এই স্বস্তির নিঃশ্বাস যখন ফেলতে যাবো ঠিক তখনই আবার চিনচিন করে উঠলো বা পায়ের নিম্নাংশ। প্রতি পদক্ষেপে যেন সেই আগের মতোই ব্যথা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন ভোঁতা রামদা জাতীয় কিছু দিয়ে আমার পায়ের নিচে একটা আনাড়ি কোপ দিয়েছে। তারপর অসম্পূর্ণভাবে কাটা জায়গাটার হাড়ের ভিতর দিয়ে নকশী কাঁথা সেলাই করার যে চিকন লম্বা সুঁই সেটা আস্তে আস্তে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। একেকটা পা ফেলছি আর যেন সুঁইটা গেঁথে যাচ্ছে আরো গভীরে। কালকের সন্ধ্যাবেলার সেই চিনচিনে চিকন ব্যথাটা আজ শুরু থেকেই শুরু হয়েছে। মাথায় যেন একটা বাজ পড়লো। তার মানে সারারাতেও… একটুও কমেনি!!! কি করবো এখন আমি!!! বুঝতে পারলাম, হবে না… আমি পারবো না… শেষ দেখতে পারবো না আমি এই পথের। বিরস বদনে, ন্যুব্জ শরীরে গিয়ে বসলাম এক মিষ্টির দোকানে। ইচ্ছামতো মিষ্টি, দই যা আছে সব খাবো। তারপর ঢাকার বাস ধরে সোজা বাসায়। গ্রীষ্মের বন্ধের পুরোটা সময় সলজ্জ মুখে এক কোণায় পড়ে থাকবো আমার রুমে। যারা জানে তাদের নানান রকম ঘাই মারা প্রশ্নবাণের বিপরীতে নিশ্চুপ থাকবো অসহায় চাউনিতে…স্পঞ্জ মিষ্টির অর্ডার দিলাম। রসসহ পুরো মিষ্টি মুখে পুরে কিছুক্ষণ চাবিয়ে কুত করে গিলে দই আনতে বললাম। চোখের কোণে ঘুম নিয়ে দই দিয়ে গেলো দোকানের জনৈক ‘মিঠাইওয়ালা’। আরেকটা সাধারণ সাদা মিষ্টিও বোধহয় খেয়েছিলাম, ঠিক মনে নেই। তবে এটা ঠিক ঠিক মনে আছে, ৫৫ টাকার সেই ‘ভোজন’ পর্বের শেষ আইটেম চায়ে যখন চুমুক দিতে যাবো এমন সময় মাথার ভিতরে একটা অনুরণন খেলে গেলো। কে যেন বলছে, “পথ ছেড়ো না, ছেড়ে যেও না। দরকার নেই তোমার চট্টগ্রাম যাবার, তুমি ফেনী পর্যন্ত যাও। ইলিয়টগঞ্জের মসজিদে বসে কাগজে যে পাঁচ জুনের হিসাব করেছিলে, কোন দরকার নেই তার বাস্তবায়নের। লাগলে লাগুক ছয় তারিখ পর্যন্ত সময়, হোক সেটা সাত কিংবা আট… কিংবা দশ। কি সমস্যা তাতে… এই সময় নিয়ে যাও না ফেনী পর্যন্তই, প্রয়োজন নেই চট্টগ্রাম যাবার। আগে ফেনী পৌঁছাও… চট্টগ্রাম ঝেড়ে ফেলো মাথা থেকে। ফেনীই এখন তোমার শেষ গন্তব্য… চট্টগ্রাম বলে কিচ্ছু নেই বাংলাদেশে।” শূন্য থেকে নিয়ে এলাম আশার ভেলা। চড়ে বসলাম তাতে, আহত পায়েই আবার নামলাম মহাসড়কের কঠিন পিচে…এইটা এক কথায় বলতে গেলে অনেকেই আধ্যাত্মিকতার বিষয় নিয়ে আসে। কিন্তু আমি অনেক সাধারণ টাইপ মানুষ…

খোশগল্প.কম: চট্টগ্রাম পৌছানোর পর অনুভূতিটি…..

আনামুল: সেরকম কোন অনুভূতি ছিল না। মনে হচ্ছিলো এইটা হবার কথা ছিল তাই হয়েছে। আমি অনেক চুপচাপই ছিলাম চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্ট টাচ করার সময় ও পরে।

খোশগল্প.কম: পরে আর কয়টি এক্সপেডিশনে যাওয়া হয়েছে?

আনামুল: চারটি। দ্বিতীয়টা তো জানেনই… তৃতীয়টা ঢাকা থেকে সিলেট… চতুর্থ ঢাকা থেকে খুলনা আর শেষেরটা ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ।

খোশগল্প.কম: এর পরেও কি প্রথম বারের মতো কোন ঘটনা রয়েছে?

আনামুল: হুমম হয়েছে। সিলেট এক্সপেডিশনে তৃতীয় দিন ভোরে আমার জ্বর আসে। ১০২ কি ১০৩ ডিগ্রী জ্বর বলতে পারেন। টানা তিনদিন আমার জ্বর থাকে। কিন্তু এই তিনদিনে আমি হাঁটা বন্ধ করিনি। আল্লাহ অশেষ রহমতে এই তিনদিনে আমি ১২০ কিলোমিটার পথ জ্বর নিয়ে হাঁটি। অতএব জ্বর আসাটা আমার জন্যে প্রথমবার ছিল।

খোশগল্প.কম: এক্সপেডিশন কে কি বলবেন?নেশা না ভালোলাগা?

আনামুল: নেশা।

খোশগল্প.কম: এই খেয়াল হঠাৎ কী মনে করে?

আনামুল: এইটা হঠাৎ কিছু না… ছোটকাল থেকেই এরকম চিন্তা মাথায় আসতো… ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড সিরিজের বিয়ার গ্রাইলসকে দেখে এটা পাকাপোক্ত হয়েছে। এই কারণে আমার এক্সপেডিশনে রাতে থাকার জায়গা সাধারণত নির্দিষ্ট থাকতো না।

খোশগল্প.কম: অনুপ্রেরনা তবে ব্রিয়ার গ্রাইলস?

আনামুল: সবার আগে আম্মা, তারপর বিয়ারকে রাখা যায়।

খোশগল্প.কম: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক রকম দূর্ঘটনাই ঘটতে পারতো আপনার সাথে!

আনামুল: পারতো, কিন্তু আমার কেন জানি চট্টগ্রাম এক্সপেডিশনের পরে আর কোন ব্যাপারেই ভয় জিনিসটা কাজ করে নাই।

খোশগল্প.কম: নেক্সট প্ল্যান কোথায়?নাকি প্ল্যান ছাড়াই বেড়িয়ে পড়েন?

আনামুল: নেক্সট প্ল্যান বাংলাদেশের সর্বউত্তর থেকে সর্বদক্ষিণ পায়ে হেঁটে যাওয়ার… আর ড্রিম প্ল্যান যদি বলেন তাহলে… আমেরিকার ৪০০০ কিলোমিটারের প্যাসিফিক ক্রেস্ট ট্রেইল পায়ে হেঁটে অতিক্রম করা।

খোশগল্প.কম: নেক্সট প্ল্যানের জন্য কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে ইতিমধ্যে?

আনামুল: আমার কখনোই কোন বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া লাগে না আল্লাহ্র রহমতে। ইচ্ছাশক্তিটা নিয়েই আমি পথে নামি।

খোশগল্প.কম: এতো ইচ্ছাশক্তির পিছনের কোন গল্প রয়েছে কি?

আনামুল: যখন আড়াই কি তিন বছর বয়স তখন আমার বা পাটা বেঁকে যায়। বেশ ভালো মতো বেঁকে যায় আর আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতাম। টানা তিন মাস ইট দিয়ে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হসপিটালে রেখে আমার পা সোজা করা হয়। আল্লাহ্র রহমতে আমি সম্পূর্ণ ভালো হয়ে বাসায় ফিরি। কিন্তু ডাক্তার আম্মাকে একটা কথা পইপই করে বলে দিয়েছিলেন যে, আমি যেন কখনোই বেশি হাঁটাহাঁটি না করি… দৌড়াদৌড়ি তো নাই…

খোশগল্প.কম: আপনি তো ডাক্তারের পরামর্শের উলটো দিকে যাচ্ছেন!

আনামুল: দেখুন… আপনি পয়েন্ট ব্রেক অথবা মেরু ফিল্মটা দেখেছেন? না দেখলে দেখবেন। ওখানে আপনার এই কথার উত্তর আছে। আর আমি এখন কিছু বলে দিই… মানুষ যখন সত্যিকারের নেশায় পড়ে, ভালোলাগায় পড়ে তখন পারিপার্শ্বিকতাকে সে ভুলে যায়। চিন্তা করে দেখুন, আমাদের স্বাধীনতা লাভের সময়ের কথা। আমাদের বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্বমানের নেতা ছিলেন, যার বজ্রকণ্ঠে নিরীহ বাঙালী বিশ্বের একটা সুপ্রতিষ্ঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাদের পিছনে প্রত্যক্ষভাবে ছিল আমেরিকার মতো এক পরাশক্তি। তখন কি হবে এই চিন্তা করলে কি এই স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম আমরা? আমি ডাক্তারদের বিজ্ঞ মতামতকে শ্রদ্ধা করেই এমন কাজ করছি। বিপদ হতে পারে এই ভয়ে পিছিয়ে যাওয়ার মানুষ আমি না।

খোশগল্প.কম: জ্বি এই উদাহরনের পর আসলেই আর কিছুই বলার থাকেনা যদিও। তবে ড্রিম প্ল্যানের কথা শুনতে চাচ্ছি।এখানে ভৌগলিক ব্যাপারটিও তো যুক্ত হচ্ছে….

আনামুল: আমার ড্রিম প্ল্যান অনেক ব্যাপক। এক্সপেডিশন সেই প্ল্যানের প্রধান অংশ কিন্তু একমাত্র অংশ না। আমি আসলে সারা দুনিয়া ঘুরতে চাই। PCT বা প্যাসিফিক ক্রেস্ট ট্রেইল একটা উদাহরণ হিসেবে দিয়েছিলাম। আর ভৌগোলিক ব্যাপার?এটা আমি মনে করি কোন সমস্যা হবে না ইন শা আল্লাহ্।

খোশগল্প.কম: ইন শা আল্লাহ্। এবার ব্যক্তিগত কিছু কথা। পড়াশুনা করছেন কোথায়?

আনামুল: আমি খিলগাঁও সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর নটরডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ থেকে অনার্স আর মাস্টার্স করি।

খোশগল্প.কম: প্রফেশন হিসেবে কোন কিছুকে বেছে নিয়েছেন?

আনামুল: আমার প্রফেশন সাইন্টিস্ট… অন্য কিছু হবার ইচ্ছা নাই। আমি পৃথিবীর বিপন্নপ্রায় জীব আর জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে চাই। Conservation Biology নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে আমার। এসব করতেই আমি সারা দুনিয়া ঘুরতে চাই। ঘুরবো বলে এইসব করতে চাই না।

খোশগল্প.কম: এক্সপেডিশনে পড়াশুনার ক্ষতি হতো কি কিছু?

আনামুল: না, একেবারেই হতো না। আমি ভ্যাকেশনে এগুলো করতাম।

খোশগল্প.কম: এক্সপেডিশনে একা যেতেন শুনছিলাম কিন্তু একা কেনো? বন্ধুদের সাহায্য কেমন ছিলো?

আনামুল: পাগল উপাধি পেয়েছিলাম আমি আর এখন পেয়েছি হাঁটা বাবা বন্ধুরা অনেক অনেক সাহায্য করেছে। কিন্তু সেটা মহাসড়কে নেমে এসে না অবশ্যই… একমাত্র আমার আম্মাই আমাকে পাগল বলতেন না।

খোশগল্প.কম: আপনার মতো এমন চিন্তা কিন্তু অনেক তরুনই করেন কিন্তু হয়তো সেটা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলবেন?

আনামুল: ইচ্ছাশক্তি অনেক বড় জিনিস। এই ইচ্ছাশক্তি দিয়ে যে মহাসড়ক চষে বেড়াতে হবে এমন না। যে মানুষটি ধূমপান করে নিজের ক্ষতি করছেন তিনিও জাস্ট এই ইচ্ছাশক্তির জোরে এখান থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে পারেন। এইটাও কিন্তু কম বড় এক্সপেডিশন না। এক্সপেডিশন মানে কি? নতুন কিছু খুঁজে পাওয়া। আমি মহাসড়কে গিয়ে যেসব নতুন জিনিসের সন্ধান পেয়েছি; দরকার নেই তো সবাইকে সেইটাই খুঁজে পাওয়ার। আমি ‘ঘুমের মাঝেও একটা জিনিস আওড়াই’ বলতে পারেন…Never lose hope…, Never Stop Expedition..আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ ছিলেন আমার আম্মা। তিনি ২০১১ সালের ২ নভেম্বর ক্যান্সারে মারা যান। তারপরও আমি আল্লাহ্র রহমতে থেমে যাইনি। হয়তো ক্ষণিকের জন্যে থমকে গেছিলাম; কিন্তু থেমে গিয়ে নিঃশেষ তো হয়ে যাইনি। মানুষ নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার জন্য এই বিশ্ব মাঝারে আসে নাই। এইটাই জীবন। আম্মা মারা যাওয়ার ১৪০ দিন পর আমি সিলেট এক্সপেডিশন দিই। ঐ এক্সপেডিশনেই আমার জ্বর আসে। হুমম, আম্মাকে মনে পড়ছে; কিন্তু আল্লাহ্র রহমতে আমি আম্মার শিখানো পথেই সেই বিরুদ্ধ প্রতিবেশকে জয় করেছি। খারাপ লাগা থাকবেই আমাদের জীবনে; কিন্তু সেটাকে নিয়ে পড়ে থাকলে সমস্যা। আবর্তনসংকুল অথচ বিবর্তনহীন জীবন খুব খারাপ। আমাদের এইটা পরিহার করে চলা উচিৎ। আমি এইটা পরিহার করে চলার সর্বাত্মক চেষ্টা করি।

খোশগল্প.কম: সর্বশেষে নিজেকে কোন জায়গাটায় দেখতে চান?

আনামুল: এমন জায়গায় নিজেকে দেখতে চাই যেখান থেকে আমি যেন এই পৃথিবীর সত্যিকারের উপকারে আসতে পারি।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn1Pin on Pinterest0

মতামত