গায়ে এপ্রন জড়াবার স্বপ্ন দেখে আসছেন অষ্টম শ্রেণী থেকে।কিন্তু ভাগ্য কিংবা পরিশ্রমের ফাঁক যেটাই হোক স্বপ্ন পূরণ হয় নি, এখন পড়ছেন সিএসই তে।গুগল আর ইউটিউব কে শিক্ষক করে একা একাই শিখছেন ওয়েব ডেভেলপিং, আউটসোর্সিং।পারিবারিক আবহের কারণে পাঠ্য বইয়ের বাইরে অনুপ্রেরণার জায়গা ছিলো অনুপস্থিত, বর্তমানও নানান সীমাবদ্ধতায় বন্দী।তবুও শুধু পরিশ্রম আর আত্নবিশ্বাসকে মূলধন করে সামনে আগাচ্ছেন আর স্বপ্ন দেখছেন স্টেথোস্কোপ এর বদলে আইটি বিশেষজ্ঞ হবার।

সব কিছু ছাপিয়ে একটা কথাই আমি মানি, পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নাই

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 10, 2016 , 1:31 অপরাহ্ন

12189029_1516660571988604_4639064322420225674_n

খোশগল্প.কম: কি নিয়ে ব্যাস্ত আছেন?

লুৎফর: Web design নিয়ে।

খোশগল্প.কম: কেমন লাগছে?

লুৎফর:যেহেতু শিক্ষানবিস লেভেল এ আছি, তাই মজা খুঁজে পাওয়াটা দুষ্কর অনেকটা বলতে গেলে। তবে একটা স্টেপ থেকে আরেকটা স্টেপ এ যাই, তখন সেলিব্রেট করি নিজেকে নিয়ে। বলে রাখা ভালো, আমার শিক্ষকরা হচ্ছে GOOGLE এবং YouTube!

খোশগল্প.কম: মজার মধ্যে কাজ খোঁজেন নাকি উল্টো?

লুৎফর:মজার মধ্যে কাজ খোঁজা, আর কাজের মধ্যে মজা খোঁজার তফাৎ টা আমার কাছে অনেক! কাজ করার আগে যদি কাজের মজা খুঁজি তাহলে খুব দ্রুত সেটা রপ্ত করার প্রবণতা বাড়বে। মনে হবে সব কিছু এখনই শিখে ফেলি। ফলাফল “হতাশা”! তাই আমার মতে কাজ করার মধ্যে মজা খোঁজাটা লাভজনক এবং সেটা দীর্ঘমেয়াদী। কিন্তু পরিসংখ্যানে তাদের পরিমান কম, আমি যেমনটা দেখি। ধৈর্য শক্তির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আমিই মাঝে মধ্যে হতে পারিনা। কি বলবো আর!

খোশগল্প.কম: কাজ আর আনন্দ কি বিপরীত?

লুৎফর:শতভাগ বিপরীত মনে হয় আমার কাছে। কারণ কাজের সময় সব কিছু বিসর্জন দিয়ে এগুতে হয়।

খোশগল্প.কম:  কয়েকটা বইয়ের নাম বলেন যেগুলা লং টার্মে ইন্সপায়ার করেছে?

লুৎফর: কয়েকটা বই বললে আসলে কোনো উত্তর দিয়ে পারবোনা, আমার বই পড়ার সৌভাগ্য পারিবারিক কারণে ঐভাবে হয়ে উঠে নাই, তারা টেক্সটবুকে বিশ্বাসী ছিলো! “পড়ো, কাজে দিবে, ভালো রেজাল্ট হবে!” একটি বইও মানুষের জীবনের জন্য অনেক ইন্সপায়ারেশন হতে পারে,কিন্তু আমার সে সৌভাগ্য হয়নাই! তবে আমি বলবো, ডেল কার্নেগী এর বই পড়ার জন্য। জীবনে সফলতার কিছু মন্ত্র ওখান থেকে পাওয়া যায়। আমি নিজে পড়েছি এটা, এখনো কাজে দিচ্ছে!

খোশগল্প.কম:  শৈশবে কি হবার কথা ভাবতেন বা তীব্র ইচ্ছা ছিলো?

লুৎফর: জীবনে কিছু একটা হতে হবে এই ভাবনাটা সত্যিকার অর্থে আমার মাথায় আসে আমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। আমি ছিলাম মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। যার ফলে ঐ স্কুলটাই মূলত আমাকে ভাবতে শিখিয়েছিলো, আমি জীবনে কি হতে চাই! প্রবল ইচ্ছা ছিলো ডাক্তার হবার। আমি আর কিছু পারি না পারি, জীববিজ্ঞান এ A+ নিশ্চিত পেতাম। আর আমার সবথেকে বেশি অনিহা ছিলো রসায়নে! কিন্তু একটা কথা আছে, ভাগ্য থাকা লাগে, রিজিক থাকা লাগে, তাই দ্বিতীয় বার চেষ্টা করেও পারিনাই!

খোশগল্প.কম:  সামনের জন্য পরিকল্পনা কি?

লুৎফর:সামনের পাঁচ বছরের পরিকল্পনা মাথায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছি একটু একটু করে। পড়ালেখাটা চলছে, কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে। যেহেতু আমার রেজাল্ট নিম্ন মানের এ+ ছিলো, এসএসসি এবং এইচএসসি তে, বলে রাখছি, আমি ২০১১ তে এসএসসি, এবং ২০১৩ তে এইচএসসি, মেনশন করলাম, কারণ পরের ব্যাচের ছেলেপেলেরা কি লেভেলের সুবিধা পেয়েছিলো জাতি জানে! তাই আমি গর্বিত, আমার সার্টিফিটেক টা পিওর! ভেজাল যা ছিলো সেটা আমার মধ্যে। আমার আরেকটা নেশা ছিলো, সেটা হলো আপকামিং মোবাইল ডিভাইস আর ল্যাপটপ কম্পিউটারের খোঁজ রাখা, কত কনফিগারে আসলো, কত টাকায় মার্কেটে ছাড়লো, কি হলে কম্পিউটার বা মোবাইল টা আরো ভালো লাগতো, আর আমি উচ্চ প্রযুক্তির মোবাইল পাই ইণ্টার পরীক্ষা দেয়ার পর! জিনিসটা আরো পেয়ে বসলো। তখন থেকে মনের মধ্যে আরেকটা জিনিস গেথে রাখলাম, ডাক্তারি না হলে, এনি হাউ আমি ইঞ্জিনিয়ারিং টা পড়বো। তাই শত বাঁধা, সকল অপমান সহ্য করে আমি ভর্তি হলাম ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি তে, দেখলাম সেখানে আমার ব্যয় সীমার মধ্যেই পড়াশুনা করানো হচ্ছে, শুধু পড়ালেখা করে ওয়েভার ধরে রাখতে হয়। ৪০% ওয়েভার সুবিধায় আমার সেমেস্টার ফি ৩৭ হাজার টাকা। তো এখানে এসে নতুন একটা দিক খুঁজে পেলাম,আসলে কথা হচ্ছে নিজেকে দিয়ে, কতটা পারি, কতটা শিখছি, কতটা জানতে পারছি, সব কিছু ছাপিয়ে আমার ওয়েভ ডিজাইন টাই বেশি ভালো লাগে। ডিজাইন শিখছি নিজে নিজে, কারণ অর্থ দিয়ে শিখার পরিস্থিতি নাই। HTML5 শেষ করে এনেছি, এখন শিখছি CSS. ইচ্ছা নিজেকে ওয়েভ ডিজাইনার, এবং ধাপে ধাপে নিজেকে একজন প্রফেশনাল ওয়েভ ডেভেলপার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা।

খোশগল্প.কম: কোন কিছু নিয়ে তীব্র আফসোস কাজ করে?

লুৎফর: আগে কাজ করতো খুব, এখন করেনা, তীব্র আফসোস ছিলো ঠিক মতো পড়ালেখা করলে হয়তো এপ্রোন গায়ে থাকতো।

তার বদলে এখন কিছু ক্ষোভ আছে,  প্রাইভেটে পড়ি বলে, অনেক সময় অবহেলার শিকার হতে হয়, অনেক সময় বলতে জীবনের প্রতিটা সময়ে ছোটো করে দেখা হয়, কিছু বলার থাকেনা, যখন বাবা মা ও সুসন্তান হিসেবে দেখে না, সে যাই হোক, আমি একই সাথে টিউশনি করাই, আউটসোর্সিং করি, বাংলাদেশে Google Developer Group Bangla এর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে আছি, একটি World Ranking এ ২২০০তম আইটি ফার্ম এ স্টুডেন্ট এম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত, এবং মজিলা ফায়ারফক্স এর ওয়েভ ডেভেলপার গ্রুপের সাথেও যুক্ত রেখেছি নিজেকে, পাশাপাশি নিজের পড়ালেখা।

খোশগল্প.কম: এতো কিছু মেইন্টেইন করতে পারেন?

লুৎফর:রাত জেগে কাজ করি।তাই বলে আমি আরেক জন কে সাজেশন দিতে পারবোনা, আপনিও রাত জেগে কাজ করেন। কারণ এর জন্যই বলবোনা, কাল সকালের রিফ্রেশমেন্ট টাও জরুরি, সারারাত আউট সোর্সিং করলেন, প্রোগ্রামিং করলেন, টুকটাক কাজ শিখলেন, সকালে আপনি ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারছেন না, সৌভাগ্য বশত আমি পারি, তাই সমস্যা হয়না।

খোশগল্প.কম: জীবনকে যদি এক বাক্যে প্রকাশ করতে হয় কি বলবেন?

লুৎফর:সব কিছু ছাপিয়ে একটা কথাই আমি মানি, পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নাই, আপনি পরিশ্রম করলে কাচ্চি বিরিয়ানি আপনিই খাবেন, নয়তো বন্ধুর ট্রিট এর আশায় থাকতে হবে। আমার কাছে যেমন টা থাকে অনেকেই! আমার এখন দুইটা স্মার্ট ফোন, সব আমিই করেছি, এক সময় আমার এগুলো স্বপ্ন ছিলো,নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের মানুষ তাই পূরণ হয়নাই স্বপ্ন গুলো, আজ করতেছি অল্প অল্প করে, ভবিষ্যৎ এর জন্য দোয়াপ্রার্থী। খুব শখ একটা অ্যাপেল এর ম্যাক বুক কেনার। ভালো লাগে এখন একটাই জিনিস, আগে মানুষ আমাকে আবর্জনার চোখে দেখতো! কেন? প্রাইভেটে পড়ি, এখন তাদের মুখ দিয়ে কিছু তেমন বের হতে চায় না,আর তারপরও যারা বের করতে চায়, আপত জ্ঞান নিয়ে তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য আমি প্রস্তুত।

খোশগল্প.কম: এতো কনফিডেন্ট?

লুৎফর: হ্যা, কারণ আমি পরিশ্রম করতে জানি। যা শিখি নিজে নিজে শিখি, গুগল, ইউটিউব কে শিক্ষক বানিয়ে, আর ধৈর্য শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সামনে আগাই, আমি পারবো।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত