ক্যাপ্টেন অলকা ভট্টাচার্য, সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসাবে কাজ করছেন ৫ বছর ধরে । পার করে এসেছেন বেশ একটা কঠিন সময়।

সেনাবাহিনীতে কোন লেডি অফিসার, জেন্টস অফিসার বলে টার্মোলজি নাই, এখানে সবাই অফিসার

লিখেছেন...admin...মে 8, 2016 , 1:20 অপরাহ্ন

unnamed

খোশগল্প.কম: আপনি সেনাবাহিনীতে আছেন কত বছর ধরে?

অলকা: আমি সেনাবাহিনীতে আছি ৫ বছর।

খোশগল্প.কম: বাংলাদেশের মেয়েরা তো একটু কনজারভেটিভ, তো সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীতে আশার ইচ্ছা কি ছোটবেলা থেকেই ছিল?

অলকা: না, আমি যখন এইচ এস সি পর যখন কোচিং করছিলাম, তখন পএিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম কমিশন রেঙ্কে মেয়েদের নিচ্ছে, সেটা দেখেই আবেদন করা। প্রথম থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল একটু ভিন্ন কিছু করা, যেটা মেয়েরা করে না।  সামথিং এক্সেসেপশনাল। আমার মনে হল, এটা একটা প্রফেশন যেখানে মেয়েরা কম আসছে।  সেই ইচ্ছা থেকেই সেনাবাহিনীতে যাওয়া।

খোশগল্প.কম: পরিবারের সহযোগিতা ছিল?

অলকা: হ্যাঁ, আমার পরিবারের সর্বাত্মক সহযোগীতা ছিল। আমি ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সহযোগীতা পেয়ে বড় হয়েছি।আমার বাবা আমাকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করত। আমার ২ টা ভাই আছে, আমি তাদের থেকে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি তখনকার সময়ে । আমি আমাদের বাসা থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে একটা হাইস্কুলে পড়তাম, এবং ক্লাস সিক্স থেকেই আমি ঐখানে বাইসাইকেল চালাইয়া যেতাম। সিলেটের মত কনজারভেটিভ পরিবেশ বাসা থেকে এত দূরে বাইসাইকেল চালিয়ে যাওয়াটা সহজ ছিল না। অনেক ধরনের প্রবলেম ছিল।  আমার বাবা বলত, আমার মেয়ে যদি ঠিক থাকে তাহলে সব ঠিক। আমি ঐ জায়গাটাতে অনেক বড় একটা সাপোর্ট পেয়েছি বাবা-মার কাছ থেকে। যখন সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণের সময় যখন কষ্ট হত, বা বিষয়টা কঠিন সময় ছিল, তখনও বাবা-মায়ের থেকে অনুপ্রেরণার পেয়েছি।

খোশগল্প.কম: সেনাবাহিনীতে ছেলেমেয়েদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা কি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের?

অলকা: না, সেনাবাহিনীতে কখনও ছেলে-মেয়ে আলাদা করে দেখা হয় না। একটা মেয়ে বি এম এর গেট দিয়ে ঢোকে তখনই বলে দেওয়া হয়, ”ফরগেট দ্যাট ইউ আর এ লেডি, ফ্রম নাউ ইউ আর গোয়িং টু বি এ অফিসার”।  সেনাবাহিনীতে কোন লেডি অফিসার, জেন্টস অফিসার বলে টার্মোলজি নাই, এখানে সবাই অফিসার । এখানে সবচেয়ে ইম্পরট্যান্ট জিনিস হচ্ছে, এখানে কাউকে আলাদা করে দেখা হয় না। ট্রেনিং এর সময় কাউকে কোন বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয় না। তবে মেয়েদের বিশেষ সময়ে একটু কনসিডারেশন থাকে, সে সময় দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফিটা একটু কম করা লাগে। এছাড়া আর কোন কনসিডারেশন নাই। যদিও মেয়েদের জন্য একটু কষ্ট হয়, তবুও সবাই পারে। এখন যারা আছে তারাও পারছে, পিছনে যারা এসেছিল তারাও পেরে আসছে।

খোশগল্প.কম: সেনাবাহিনীতে থাকার জন্য দূরে থাকতে হয় মাঝেমধ্যে, তাহলে পরিবারকে কিভাবে সময় দিচ্ছেন?

অলকা: আমার মনে হয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা পরিবারে যতটা সময় দেয়, অন্য চাকরি করে আর এতটা সময় দেওয়া সম্ভব না। সকাল বেলা আমরা পিটি করি, ফিজিক্যাল ট্রেনিংটা আমাদের সবার জন্যই দরকার। যাদের চাকরির একটা অংশ পিটি না, তারাও সকালে দৌড়িয়ে আসে। এসে আমরা ব্রেকফাস্টটা পরিবারের সাথে করতে পারি। তারপর অফিস থেকে এসে লাঞ্চটাও আমরা পরিবারের সাথে করতে পারি। আমার বিকালে গেমসে যাই, গেমস থেকে এসে রাতের খাবারটা পরিবারের সাথে খাই। তবে স্পেশাল কারণে ভিন্ন হতে পারে। সেটা একবছরে ২/১ দিন পরে। যখন আমরা ট্রেনিং গ্রাউন্ডে যাই তখন একমাস বা দুইমাস হতে পারে। একবছরে দুইমাস পরিবারের সাথে থাকতে পারবে না এটা এক্সপেক্টেড হওয়া উচিৎ। আমাদের পোষ্টিং গুলো অনেক দূরে দূরে হয়। আমার আমাদের ইচ্ছামত জায়গায় পোস্টিং  পাব না ব্যাপারটা কিন্তু এমন না। আমার যেদিন কমিশন পাই;  তখন আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হয় ”আমার নিজের জীবন বিপন্ন করেও আমার উপরে নিয়োজিত ঊর্ধ্বতন সকল কর্মকর্তাদের আদেশ পালন ও মান্য করিব এবং জল-স্থল-আকাশ পথে যেখানে যাইবার আদেশ করা হইবে সেখানেই যাইব”। সুতরাং আমাকে যদি বলা হয় নোয়াখালী যাও যেতে হবে, যদি বলে কুড়িগ্রাম যাও যেতে হবে। বাড়তি কোন কথা নাই। পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে পারি, অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে। একজন অফিসারের বাচ্চার জন্য সি এম এইচ এ ট্রিটমেন্ট ফ্রি। তার বাবা-মা, শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির জন্য ৫০%  খরচে চিকিৎসা পাওয়া যায় । স্পেশাল কোন আত্মিয়দের সমস্যা হলে আর্মি সেটা কন্সিডার করে। তাছাড়া বাচ্চাদের পড়ালেখার অনেক সুযোগ-সুবিধা আছে, ভালো একটা লিভিং পাওয়া যায়। আমার মনে হয় আমরা ভালো আছি।

খোশগল্প.কম: সেনাবাহিনীর জীবন তো অনেক এডভেঞ্চার থাকে, সে রকম কিছু গল্প।

অলকা: তা ঠিক, কিন্তু আমরা তো অনেক রেস্ট্রিক্টেড সবাই তাই  সব গল্প তো বলা যায় না। আমার সবচেয়ে এডভেঞ্চার লাগে যখন আমি আমার ব্যাটেলিয়ানের সামনে এসে অনেকগুলো ছেলেকে কমান্ড করি যারা বয়সে আমার বাবার  চেয়ে বড় । তারা যখন আমার কথা শুনেন তখন বেশ এডভেঞ্চারাল লাগে । এইসব মানুষের সুখের কথা শুনা দুঃখের কথা শুনা, ভালো-মন্দ দেখা এইসব ও এডভেঞ্চার। যুদ্ধ যেহেতু চলছে না, বিদেশে বিভিন্ন মিশনে  এবং দেশে গ্রীষ্মকালীন-শীতকালীন ট্রেনিংয়ের সময় ও মনে হয় বেশ এডভেঞ্চার।

খোশগল্প.কম: আপনার স্বামী বা তাদের পরিবারের সদস্যদের থেকে কতটা সহযোগীতা পাচ্ছেন?

অলকা: যতটা পাওয়ার দরকার ঠিক ততটাই পাই। আমার শ্বাশুড়ি আমার বিয়ের পর দেড়-দুই বছর ধরে আমাদের সাথে আছেন। এখনও  আমি অফিসে গেলে বাচ্চাটা উনার কাছে রেখে যাই। আমার বাচ্চা হওয়ায় সময় অসুস্থ হয়ে সি এম এইচ এ ভর্তি ছিলাম তখন উনার কাছ থেকেই সর্বাত্মক সহযোগীতা পেয়েছি। আমি একজন সেনাবাহিনীর অফিসার এটা নিয়ে আমার শ্বশুড়বাড়ীর লোকজন গর্ব বোধ করে।

খোশগল্প.কম: আপনার কি মনে হয় এই কর্মক্ষেত্রে একজন মেয়ে যদি পরিবার থেকে সহয়তা না পায়, তাহলে তার পথচলাটি সুগম হবে?

অলকা: সমাজে যারা আছে সবাই ই কষ্ট করে বড় হয়। যারা ভালো অবস্থানে আছেন তারা কেউ এমনে এমনে চলে আসে নাই। কিন্তু মেয়েদের জন্য ৩ টা জায়গায় স্টাগল করতে হয়। একটা ছেলে যখন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতে চায়, বাবা-মা বলে যাও যাও। কিন্তু একটা মেয়ে যখন ভর্তি হতে চায় তখন তার পরিবারকে, সমাজকে এবং পরে কর্মক্ষেত্র সবাইকে। সর্ব প্রথম বাধাটা দেয় পরিবারে তারা বলে বসে, ”তুমি কোথায় থাকবা, কি খাবা, তুমি মেয়ে মানুষ একা একা পারবা”? এসব ভয় দেখিয়ে পিছিয়ে দেওয়া ৩ ধাপ। যখন বলা হয় তুমি পারবা, তখন তার যদি আত্মবিশ্বাসে ঘাতি থাকে  তাহলে সে এটা ওভার-কাম করতে পারে। কিন্তু প্রথমেই বলে দেওয়া হয় তুমি পারবে না, তখন সে পিছিয়ে যাবে। মেয়েমানুষ বলার সাথে সাথেই সে যে মানুষ ছিল সেখান থেকে একধাপ নামিয়ে দেওয়া হয়। বাইরের ওয়াল্ড তো এখন প্রতিযোগীতা মূলক। ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিতে গেলে তো সবাইকেই পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেতে হয়, কে ছেলে, কে মেয়ে তা খাতায় লেখা থাকে না। আমার কাছে মনে হয় পরিবারের সহযোগীতা অনেক বড়, তারপরে সমাজের। যদিও আমাকে অনেকে বাধাগ্রস্ত করছে আবার অনেকেই ইন্সপায়ার্ড করছে।

খোশগল্প.কম: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

অলকা: আমি সেনাবাহিনীতে আছি। আমি আমার সিনিসিয়ারিটি দিয়ে কাজ করে যাব, ফল দেওয়ার মালিক হচ্ছেন ভগবান। আমি যেভাবে আছি, উপরে থেকে যেভাবে নির্দেশ দেওয়া হয় তাই করব। বাকিটা ঈশ্বরের হাতে।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত