কাজী নাবিল নওশাদ। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি জানতে চাইলে তার জবাব ছিল,  “আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে বুয়েটে এসেছি , দেখা যাক দেশের জন্য কতটা করা যায় এখান থেকে!  বুয়েটিয়ানেরা দেশের বাইরে যায় এটা নিয়ে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে দেশের বাইরে বসেও দেশের জন্য কিছু করা যায়। আমি এখন বের হয়ে জব করব মূলত। জব করার পাশাপাশি বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করব ফাঁকে-ফাঁকে। দেশের জন্য কিছু করতে চাই, এবং আজ থেকে ১০/১৫ বছর পর যেন পিছনে ফিরে মনে না হয় সময়টা নষ্ট করছি। যেন আমার মধ্যে কোন আক্ষেপ না থাকে”।

সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমাদের সবকিছুতেই ফোকাস কমে যাচ্ছে

লিখেছেন...admin...জুন 27, 2016 , 7:30 পূর্বাহ্ন

nl

খোশগল্প.কম: তুমি লেখালেখি সংক্রান্ত অনেক কাজে যুক্ত আছ, এটা তোমার নিজর ক্ষেত্রে কনফ্লিক্ট তৈরি করে না?

নাবিল: না, অত একটা না। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া লেখালিখির পর্যায়ে পড়ে কিনা জানি না। যারা এম এম ই এর স্টুডেন্ট তারাও কবিতা পড়বে, গল্প পড়বে। সবকিছু ই করা উচিত। কনফ্লিক্ট করবে বলে মনে হয় না।

খোশগল্প.কম: তুমি তো চট্টগ্রামে ছিলে, চট্টগ্রামের কোন বিষয় গুলো তোমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেছ?

নাবিল: আমি যখন প্রাইমারী স্কুলে পড়তাম বাসার পাশে, তারপর হাইস্কুলে একটা ভিন্ন স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সেখানে একটা চাপ ছিল নতুন পরিবেশের। এটা ওভারকাম করতে আমার  এক/দেড় বছর লাগছে। আমি  একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়তাম। সরকারি স্কুলের মত এত বড় মাঠ পাই নি। তারপর আবার ভর্তি হলাম সরকারি কলেজে, আবার এখানে একটা খোলামেলা পরিবেশ। এই চেঞ্জগুলো আমাকে অনেক হেল্প করছে। এই সময়ে নিজকে অনেক চিনছি।

খোশগল্প.কম: তুমি বললে, নিজকে অনেক চিনছ! নিজের সম্পর্কে তোমার মূল্যায়ন কি?

নাবিল: আমি চেষ্টা করছি কিছু করার, এখনও তেমন কিছু করি নাই। যা চাইছি তা এখনও পুরোপুরি হয় নাই। চেষ্টা করছি।

খোশগল্প.কম: কী হওয়ার ইচ্ছা তোমার?

নাবিল: আমি পরিপূর্ণ একটা মানুষ হতে চাই। পাশ করার পর কি করি বলা যায় না। আমি পাশ করার পর পড়ালেখার লাইনে যেতে পারি, নতুবা চাকরিও করতে পারি। মোটকথা আমার যেন অপরিপূর্ণতা না থাকে।

খোশগল্প.কম: পরিপূর্ণতা মানুষ বলতে কি বোঝ?

নাবিল: যা  করতেছি তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। তার জীবনযাপন, চার পাশের সবকিছু এবং সবাইকে নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাটা।

খোশগল্প.কম: তুমি এখন অনেকগুলো ক্লাবের কার্যক্রম নিয়ে জড়িত, তুমি কি এগুলি নিয়ে স্যাটিসফ্যাইড?

নাবিল: আমি যখন বুয়েট আসলাম, তখন প্রথমে ডিবেট ক্লাবে যুক্ত হলাম।  আমার শুরুতেই ডিবেট করার ইচ্ছা ছিল, নিজকে এক্সপেস করার ইচ্ছা ছিল। পরে দেখলাম এখানে চুপ করে বসে থাকলেও অনেক কিছু শেখার আছে। আমি গিয়েছিলাম ডিবেট করতে,  পরে দেখলাম আমার থেকে অনেক ক্যাপাবল লোক এখানে আছে। বাঁধন এ আমরা যেটা করি মানুষকে হেল্প করার জন্য। মানুষকে হেল্প করলে ভালো লাগে তাই। আমি আসলে বুয়েটে এসে মানুষ জনের সাথে মিশতে চাইছিলাম। আর সেই উদ্দেশ্য সফল হইছে। আমার মূলত এই উদ্দেশ্য ছিল। যেটা সফল হইছে। আমি খুব অলস মানুষ সব এক্টিভিটিতে যাই না, তবুও ভালো লাগে।

খোশগল্প.কম: তুমি বললে তুমি অলস, তাহলে তুমি দিন কিভাবে কাটাও?

নাবিল: বুয়েটে ক্লাস থাকলে ক্লাস করি, এক্সট্রা ক্লাস করি। লেভেল১/ টার্ম-২ এ অনেক মুভি দেখেছি। এখন কম দেখি, খুব কম দেখি তা না। ল্যাব রিপোর্ট লেখা, সিটির পড়া থাকলে পড়তে হয়। দেখা যায় সোশ্যাল মিডিযাতে একটু সময় কাটাই, এভাবে চলে যায়। আগে অনেক বই পড়তাম। এখন আবার মনে হয় বই পড়া উচিৎ । যেই সময়টা সোশ্যাল মিডিয়াতে দেই সেই সময়টাতে বই পড়া উচিৎ।

খোশগল্প.কম: বই পড় যেহেতু, তাহলে সাহিত্য পাঠটা তোমার জীবন গঠনে কতটা সাহায্য করেছে?

নাবিল: এ ক্ষেত্রে বলা যায়, গল্প বলার অভ্যাস আসছে বাবার থেকে। বাসায় অনেক বই ছিল তো তাই, ছোটবেলায় তো আর বুদ্ধি ছিল না চয়েসের। তখন যেটা পাইতাম সেটাই পড়তাম। আমি অনেক কিছু সম্পর্কে জানছি, অর্থনীতি, সমকালীন রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ এসব নিয়ে অনেক জানছি। মাঝখানে এক দেড় বছর বই পড়ার অভ্যাস খুব কমে গেছে, পড়লেও খুব একটা পড়ি নাই। বই পড়ার মাধ্যমে অনেক কিছু সাথে পরিচিত হচ্ছি, এটা অনেক মতামত বুঝতে শিখিয়েছে।

খোশগল্প.কম: সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক কে তুমি কিভাবে দেখ?

নাবিল: আমিও অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘন্টা সময় কাটিয়ে দেই এখানে। এটা সবার কাছে একটা নেশার মত। এটা একদিক থেকে ভালো। অনেক কিছু জানা যায়, সবার খোঁজ-খবর রাখা যায়, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমাদের সবকিছুতেই ফোকাস কমে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া এত পরিবর্তন হয় যে আমরা কিছুই ফোকাস করতে পারি না। একটা গল্পের বই পড়লে আমরা কিছু না কিছু একটা ফোকাস করতে পারি। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে আমাদের মনোযোগ কমে যাচ্ছে। অবশ্যই সোশ্যাল মিডিয়া কখনোই সাহিত্য বা গল্পের বইয়ের বিকল্প হতে পারে না। এটা একটা পার্ট অফ লাইফ হয়ে গেছে।

খোশগল্প.কম: তোমার ক্ষেত্রে এমন কোন মানুষ ছিল, যারা তোমার আইডল হিসাবে কাজ করে?

নাবিল: এটা স্পেশালি বলা কঠিন। ছোটবেলায় ইঞ্জিনিয়ার ফজলুর রহমান খানকে খুব পছন্দ হত। আমি আমার বাবার খুব লুক আপ করতাম। আমরা সন্দীপ থাকতাম, বাবা সেখান থেকে চিটাগাং এসে থিতু  হয়েছেন। তারপর এখানে এসে ফ্যামিলি বড় করেছেন। আমাদের ভ্যালুজ শিক্ষা দিয়েছেন। উনি কিন্তু একজন সাধারণ চাকুরিজীবি। নানা রকম বইপত্র পড়েন। আমি খেয়াল করতাম, একটা সাধারণ পরিবার কেন্দ্রিক মানুষকে আমি লুকআপ করতাম। আমার কাজিন থাকত চিটাগাং ভার্সিটির এলাকায় , সেখানের স্কুল কলেজেই পড়ত। সে সেখান থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে কিন্তু খেই হারায় নাই। সে এখন পড়ালেখা শেষ করে আমেরিকায় আছে। ইলেকট্রনিক্স এর উপর পিএইচডি করে চাকরি করছে সেখানে। আমি ছিলাম চিটাগাং শহরে, সে থাকত শহরের সাইডে। আমি অল-টাইম তারদিকে তাকাইয়া থাকতাম সে ঢাকায় হলে থেকে ফাইট করে পড়ালেখা শেষ করেছে। এগুলো থেকে অনেক শিখছি।  এছাড়া  আরও অনেক মানুষ আছে।

খোশগল্প.কম: তোমার হল লাইফ কেমন কাটছে?

নাবিল: শুরুতে আমরা সহপাঠীরা সবাই একসাথে হলে একটা টিনশেডে থাকতাম। তারপর একবছর পর আমরা মূল হলে পাতা আসলাম। অনেকের সাথে মিশা যায়। স্বীকার করতে হবে বুয়েটের হল গুলো পুরো বাংলাদেশের বেস্ট অবস্থানে আছে। ২৪ ঘণ্টা কারেন্ট, ওয়াই-ফাই , পানি সুবিধা রয়েছে। হলে যে এনভায়রনমেন্ট,  এটা খুব এনরিচড মনে হয়।

খোশগল্প.কম: বাঁধন তো ভলান্টিয়ার কাজ, এখানে কাজ করার তো নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা প্রতিদিন, কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার কর!

নাবিল: আমরা যা করি পুরোপুরি ভলান্টিয়ার, কোন স্পন্সর নাই এটার জন্য। একটা খাতায় নাম লিস্ট করা থাকে সেখান থেকে কল করে ম্যানেজ করে দিতে হয়। আমরা যেমন অন্য ক্লাবে সপ্তাহে একদিন যাই বা প্রোগাম থাকলে নামাই। কিন্তু বাধনে প্রতিদিন যেতে হয়, যে কোন সময় একটা কল আসতে একটা রোগীর রক্তের জন্য। তো এখানে যারা কাজ করতে আসে কমিটমেন্ট নিয়ে আসে কাজ করার। কাজটা ভলান্টিয়ার কিন্তু কমিটমেন্ট লাগে। কিছু মানুষ আছে ক্লাস করে সবকিছু করে আবার বাঁধনে এসে টাইম দেয়। আবার  অনেকেই আছে ১/১ পড়ে কিন্তু বাঁধনে এসে বেশ পটু হয়ে গেছে কীভাবে হেল্প করতে হয়। আমরা আসলে ঢাকা মেডিকেল আর পিজির রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে দেই। এখানে যারা আসে তারা একটু গরীব বা কোনকিছু খুব একটা বুঝে না। তাই তাদের পিছনে ইফোর্ট টা একটু বেশি দেওয়া লাগে।

খোশগল্প.কম: বুয়েটে সিটি আর পরীক্ষার এত চাপের মধ্যে এত এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিকে যথাযথ স্বীকৃতি দেয় বলে তুমি মনে কর?

নাবিল: স্বীকৃত দেয় বা আশা করে কে কতটা এটা বলা কষ্টকর। আমি যদি একটা ক্লাবে কাজ করি তখন বুয়েট আমাকে একটা মেডেল দিবে এটা আশা করা ঠিক না। বুয়েটের কাজ হচ্ছে ক্লাবের কার্যক্রম গুলো কে সহায়তা করা। বিভিন্ন প্রকার লজিস্টিক দিয়ে বুয়েটের যতটুকু সম্ভব বুয়েট করে। তারপর হয়তো আর একটু বাড়াইলে ভালো হত। অনেক সময় দেখা যায় ক্লাবের বিভিন্ন কাজের জন্য ক্লাসে যাওয়া হয় না তখন আমরা একটু কনসিডারেশন আশা করি বুয়েটের কাছ থেকে। ইনস্টিটিশন থেকে এটা যায়। বুয়েট ভালোই হেল্প করে আর একটু করলে ভালো হত। সবকিছুরই তো আর একটু ভালো থাকে।

খোশগল্প.কম: প্রতিষ্ঠান হিসাবে বুয়েটের কি কি ইউনিকনেস আছে?

নাবিল: আমি বলব বুয়েটের স্টুডেন্টরা। এত প্রেশারের মধ্যে থেকেও ছাএরা যেভাবে নিজকে ফুটিয়ে তোলে সেটা। যারা মনে করে টিচার ফাইটাররা শুধু ই পড়ালেখা করে এটা ভুল, এরা অনেক কিছু করছে আবার সিজিও ঠিক রাখছে। আবার যারা বাইরে কাজ করেও সিজি ঠিক আছে। এই ব্যালেন্সিং পাওয়ার টা। এটা আমার খুব ভালো লাগে।

খোশগল্প.কম: যেহেতু তুমি বললে, বুয়েট স্টুডেন্টরা ইউনিক সে ক্ষেত্রে পরীক্ষার সময় পিছানোর জন্য মাঝেমধ্যে আন্দোলন ব্যাপারটা তুমি কিভাবে  দেখ?

নাবিল: বুয়েটে পরীক্ষা সিস্টেমটা একটু ভিন্ন, ৭০%  মার্ক থাকে টার্ম ফাইনালে আর এটার লোড একটু বেশি হয়। তখন তারা খেই হারিয়ে ফেলে। তখন স্টুডেন্টরা সহজ সমাধান খুঁজে। আর সেটা হল পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া। সিস্টেমটা কেউ পাল্টাতে চায় না, সবাইই সহজ সমাধান খুঁজে। এ ক্ষেত্রে বুয়েটেরও একটু সহজ হওয়া উচিৎ যে এক-সপ্তাহ বন্ধ দিয়ে একটা পরীক্ষা আবার দেখা যায় এক-সপ্তাহে ২ টা পরীক্ষা। স্টুডেন্টদের ও উচিৎ এ ক্ষেত্রে মাথা খাটানো। স্টুডেন্টদের উচিৎ বুয়েটের সাথে আলোচনা করে সমাধানে আশা। বুয়েটের স্টুডেন্টরা ফাঁকি দেয় কথাটা ঠিক না। সবাই একটু ইগনোর করতে চায় পড়ালেখাকে। আর এই সেশনজট বন্ধ হওয়া ব্যাপারটা ভালো হইছে। একচুয়লি আমরা এখানে ফ্রি পড়ছি, এখানে একদিন বেশি থাকা মানে সরকারের বেশি খরচ হওয়া। আমরা একদিন এক্সট্রা নিব কেন ? এক্সট্রা থাকা একধরনের প্রতারণা মূলত।

খোশগল্প.কম: অতীত নিয়ে তোমার কোন আফসোস নাই?

নাবিল: না, আমি যতটুকু সময় কাটাইছি ভালো কাটাইছি। নানা জায়গায় গেছি নানা মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি। সবার সাথে মিশছি। আমাকে এটা এনরিচড করছে।

খোশগল্প.কম: তোমার সবকিছু নিয়ে সার্বিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

নাবিল: একসময় ছিল বুয়েটে আসার পর পড়ালেখা করে বাইরে চলে যাব। আমার পয়েন্ট অত ভালো না। দেখা যাক! আমি ইঞ্জিনিয়ার হতে এসেছি এখানে, দেখা যাক দেশের জন্য কতটা করা যায়!  বুয়েটিয়ানেরা দেশের বাইরে যায় এটা নিয়ে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু ইচ্ছা থাকলে দেশের বাইরে বসেও দেশের জন্য কিছু করা যায়। আমি এখন বের হয়ে জব করব মূলত। জব করার পাশাপাশি বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করব ফাঁকে-ফাঁকে। দেশের জন্য কিছু করতে চাই, এবং আজ থেকে ১০/১৫ বছর পর যেন পিছনে ফিরে মনে না হয় সময়টা নষ্ট করছি। যেন আমার মধ্যে কোন আক্ষেপ না থাকে।

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত