মাহফুজা পারভিন ইভু । বাংলাদেশ স্কাউটসে আছেন । প্রেসিডেন্ট রোভার স্কাউট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন । কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, সুখ না সফলতা? এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে ভিন্ন, তার মতে”দুটোই সমান। অফিসে, পরিবারে থাকতে হলে। পৃথিবীতে মানুষ সুখের পিছনেই ছুটছে, ছুটবে। আমি আমার কাজটা যদি সবসময় ভালো ভাবে করি, তাহলে সফলতা চলে আসবে। আর সুখের সাথে সফলতার সম্পর্ক ঐভাবে দেখতে পাই না আমি। আমি সফল হলেই আমার সুখটা বেড়ে যায়”। এমন ভাবনা যার আজ গল্প করছি তার সাথে।

স্কাউটে কেউই পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া চাকরি করতে পারে না

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 27, 2016 , 2:46 অপরাহ্ন

iv

খোশগল্প.কম: কেমন আছেন?

ইভু: ভালো আছি।

খোশগল্প.কম: আপনি কত বছর যাবৎ স্কাউটে চাকরি করছেন?

ইভু: প্রায় ১২ বছর ধরে।

খোশগল্প.কম: কর্মক্ষেত্র অনেক সময় ঢাকার বাইরেও থাকতে হয়েছে, সে সময়গুলো কিভাবে ম্যানেজ করেছেন?

ইভু: না, কোন সমস্যা হয় নাই। আমি স্কুল লাইফ থেকেই স্কাউটিং করতাম, তারফলে সবাই জানত পরিবারের। যার কারণে কোন সমস্যা হয়নি।

খোশগল্প.কম: আপনার কি আগের থেকেই স্কাউটিং এ চাকরি করার ইচ্ছা ছিল?

ইভু: না ইচ্ছা ছিল না। আমি আসলে মজা করে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, পরীক্ষায় টিকে গেলাম তারপর চাকরি করতে শুরু করলাম।

খোশগল্প.কম: অনেক সময় তো পরিবার রেখে ঢাকার বাইরে থাকতে হয়, এ বিষয়টাতে পরিবার থেকে কতটা সাপোর্ট পান?

ইভু: পুরোপুরি সাপোর্ট পেয়েছি। যদিও নিজের একটু কষ্ট হয়। ছুটির দিনগুলোতে ও বাইরে থাকতে হয়। বাচ্চাদের পরীক্ষা থাকলে যেতে না পারলে খারাপ লাগে। কিন্তু তারপরও আমার কাছে খারাপ লাগছে না। সমাজের কিছু অংশের জন্য কিছু করছি এটা ভেবে খারাপ লাগে না।

খোশগল্প.কম: পরিবারকে এমনিতেই কতটা সময় দিতে পারছেন? 

ইভু: খুব একটা সময় দিতে পারছি না। বাসা থেকে আমার অফিস খানিকটা দূরে, যার ফলে আসা যাওয়াতে বেশ খানিকটা সময় লাগে। যতটুকু ফ্রি থাকি পুরোটুকুই তাদের দেই।

খোশগল্প.কম: আপনার পরিবারের সদস্যদের কোন অভিযোগ নেই এতে?

ইভু: অভিযোগ হয়তো আছে, কিন্তু আমি সামনাসামনি কখনও শুনিনি বা আমাকে কখনও কৈফিয়ত দেওয়া লাগে নি। যার ফলে আমি ভাবি কোন অভিযোগই নেই।

খোশগল্প.কম: স্কাউটে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?

ইভু: বেশ ভালোই। এখানে সবসময় এক কাজ করা লাগে না,এক এক সময় ভিন্ন ভিন্ন কাজ । এখানে আমি কখনও পিয়নের কাজ করি, কখনও টিচার হিসাবে কাজ করি, কখনও মাঠে দৌড়াই, কখনও বাচ্চাদের দেখাশোনা করার জন্য মায়ের ভূমিকায় কাজ করি। সে ক্ষেত্রে কাজের অনেক ভেরিয়েশন আছে।

খোশগল্প.কম: অনেক সময় জাম্পুরি বা ক্যাম্পুরির সময় আপনি আপনার মেয়েদের সাথে করে নিয়ে আসেন, এতে করে কোন সমস্যা হয় না?

ইভু: এ ক্ষেত্রে প্রথম দিকে একটু সমস্যা হয়, ওদের থাকাটা নিয়ে, কিন্তু প্রোগাম রানিং হয়ে গেলে ওরা খুব ইনজয় করে। ওদের সাথে ক্যাম্পুরিতেও মাঝেমধ্যে দেখাও হয় না ব্যস্ততার জন্য।  এবছরই একটানা ৩ দিন দেখা হয়নি, কিন্তু আমরা পাশাপাশি ক্যাম্পে ছিলাম।

খোশগল্প.কম: কাজের ক্ষেত্রে আপনার ছেলেমেয়েদের স্কাউটে নিয়ে আসার ইচ্ছা আছে?

ইভু: আমার বড় মেয়ে অলরেডি কাবিং করছে, এ বছর শাপলা কাব এওয়ার্ড পরীক্ষা দিবে। ছোটমেয়ের বয়স ফাইভ প্লাস। ওর যে দিকে ইচ্ছা যাবে, আমি কখনোই প্রেশার দিব না।

খোশগল্প.কম: আঙ্কেল এ ক্ষেত্রে কতটা হেল্প করে?

ইভু: উনি তো ব্যাংকে চাকরি করেন, ক্যাম্পে বাচ্চাদের পৌঁছে দিয়ে যায়, নিয়ে যায়।  সে চাকরি করার জন্য থাকতে পারেন না, কিন্তু তার কাছ থেকে সম্পূর্ণ সাপোর্ট পাই।

খোশগল্প.কম: পরিবারের সাপোর্ট না পেলে কি এত কিছু করতে পারতেন?

ইভু: মোটেও পারতাম না। স্কাউটে কেউই পরিবারের সাপোর্ট ছাড়া চাকরি করতে পারে না।

খোশগল্প.কম: আপনার এই কাজের ক্ষেত্রে আপনি একজন পুরুষ সহকর্মীদের থেকে কতটা বাধাবিপত্তি অতিক্রম করা লাগতেছে?

ইভু: একজন পুরুষ সহকর্মী বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম করবে বা নিজের অফিসের কাজ করবে। আমাদের ক্ষেএে বাসায় এসে বাচ্চা সামলানো। নিজের ফ্রেশ হওয়া, এমনকি অনেক সময় খাওয়ার সময় থাকে না। বাসায় ছুটির দিনে একটু রান্না করা লাগে, এটা পুরুষদের থেকে আমাদের বেশি করতে হয়। অফিসে পুরুষরা যতটুকু কাজ করে আমরাও ততটুকুই কাজ করি। কিন্তু বাসায় এসে আমাদের এর থেকে কিছু কাজ বেশি করা লাগে। এটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার জন্য এমন হয়েছে।

খোশগল্প.কম: আমার এখন তথ্য প্রযুক্তির যুগে বাস করছি, অনেকটা অগ্রসর হয়ে আছি, তবুও কেন আমরা এই সমাজ ব্যবস্থা থেকে বের হতে পারছি না বলে আপনি মনে করেন?

ইভু: এটা আসলে ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়, আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে অভ্যস্ত যে বাবা অফিসের কাজ করছে আর মা আমাদের দেখাশোনা করছে আর রান্না করছেন । অনেকেই বের হয়ে আসার চেষ্টা করছে, আর  এর জন্য পুরুষের সাপোর্ট দরকার। সে যখনই সাপোর্ট দিবে, তখন তাকে হেল্প করবে। এখন পুরুষদের মধ্যে ইগো প্রবলেম আছে, তারা ভাবে ঘরের কাজ তাদের জন্য না। তবে আমরা অচিরেই বের হব। আমরা এখন যারা মায়েরা-মেয়েরা আছি তারা যদি এখন থেকেই পুরুষদের সাথে একসাথে কাজগুলো ভাগ করে করি। তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েরা এইসব শিখবে। তখন হয়তো একটা সময় পরিবর্তন আসবে।

খোশগল্প.কম: স্কাউটিং এর মাধ্যমে সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন, বিভিন্ন অঞ্চলে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ইভু: বেশ ভালোই ছিল, আমি জেলা উপজেলায় যখন কাজ করেছি তখন বেশ ভালো লেগেছিল। গ্রামের মানুষদের সাথে মিশা, ইউনিট গুলোকে সামনে থেকে দেখা এবং ঐ জায়গাগুলো বেশ সুন্দর ছিল, জ্যাম, ধুলাবালি কম ছিল। ঐখানের মানুষগুলো একজন চাকুরিজীবী বা একজন স্কাউটারকে বেশ সম্মান করে। সব অফিসগুলোই হাতের কাছেই ছিল, খুব অল্প সময়েই মিশা যায় কারণ খুব অল্পসরে বলেই ।প্রতিদিনই তাদের সাথে দেখা হত, কথা হত। স্কাউটিং এর বাইরে সবকাজে নিজকে সংযুক্ত করা যেত ।

খোশগল্প.কম: এখন দেশের যা অবস্থা কখনও নিরাপত্তা সংকটে ভুগেননি?

ইভু: আমি অবশ্য নিজে থেকে খুব স্ট্রং, আমি নিজে কখনও এমন ফিল করিনি। ইভেন আমি একজেলা থেকে আরেক জেলায় রাত ১০/১১ টায়  মুভ করেছি। আমাকে তখন বলা হত আপনার সমস্যা হয় নি?  আমি বলতাম, আপনি আমাকে সাপোর্ট করলেই এবং সমস্যা না করলে কোন সমস্যা নেই। আমি কখনও এরকম সমস্যায় পড়িনি, পড়লে হয়তো দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন থাকত।

খোশগল্প.কম: মেয়েরা যারা এই পেশায় আসতে ভয় পায় তাদের আপনি কি বলবেন?

আমি বলব, কোন কাজই আসলে সহজে করা যায় না। সব কাজই করতে হলে পরিশ্রম ও সাহস লাগে। আমি যদি কাজ করতে পারি তাহলে সব জায়গায়ই করতে পারব। তবে এখানে অনেক মেন্টাল সাপোর্ট পাব। সারা বাংলাদেশের চেনা জানা অনেক লোকের সাথে পরিচয় হয়। সে কয়দিন মনটা অনেক ভালো থাকে। একটা জায়গা থেকে বের হয়ে সারা বাংলাদেশকে একবারে দেখতে পারি এবং পৃথিবীকেও দেখতে পারি। বেশি যতটা দেই মাঝেমধ্যে মনে হয় এই জায়গা থেকে তা পুষিয়ে গেছে অনেকটা।

খোশগল্প.কম: চাকরি ক্ষেত্রে আপনি কতটা সফল হয়েছেন?

ইভু: এ ক্ষেত্রে আমি আমার নিজের যোগ্যতার অনুযায়ী সফল হয়েছি। প্রতিটা চাকরিতে ভালো মন্দ থাকে, আমি মনে করি আমাদের সবদিক গুলো ভালো। আমি মনে করি আমি সফল।

খোশগল্প.কম: কোনটা গুরুত্বপূর্ণ, সুখ না সফলতা?

ইভু: দুটোই সমান। অফিসে, পরিবারে থাকতে হলে। পৃথিবীতে মানুষ সুখের পিছনেই ছুটছে। আমি আমার কাজটা যদি সবসময় ভালো ভাবে করি, তাহলে সফলতা চলে আসবে। আর সুখের সাথে সফলতার সম্পর্ক ঐভাবে দেখতে পাই না আমি। আমি সফল হলেই আমার সুখটা বেড়ে যায়।

খোশগল্প.কম: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

ইভু: এখন আমি বাংলাদেশে স্কাউটে কাজ করছি, এক্ষেএে আমার টপ পোস্টে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, আমি সেভাবেই কাজ করে যাচ্ছি। আমি আমার বাচ্চাদের,  তাদের মতামত অনুযায়ী, পছন্দ অনুযায়ী তাদের পড়ালেখা করতে দিব এবং তাদের পছন্দ অনুযায়ী পেশায় যেতে দিব।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত