মাজেদুল হক তানভীর।পড়াশুনা করছেন একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে। পড়াশুনা পাশাপাশি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালেও কাজ করছেন সমান দাপটে। কথায় কথায় জানা গেলো তার পেশা ও নেশা সাংবাদিকতা এবং ভবিষ্যতে দেশ,জাতি ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে এই পেশাতেই থিতু হতে চান সম্পাদক বা দেড অব নিউজ হিসেবে  অবসরে কলাম লিখে,গান শুনেন। তার একটু স্বপ্নের কথা বলছিলেন ” আমি যখন মৃত্যু বরন করবো তখন পরিচিতদের বাইরে তারাও যেনো কাঁদে যারা আমার নাম কিংবা চেহারা শুধু চেনে।”

হলুদ সাংবাদিকতা বলতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন সংবাদকে রোমাঞ্চকরভাবে পরিবেশন করাকে বোঝায়

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 25, 2016 , 11:17 পূর্বাহ্ন

tnr

খোশগল্প.কম: যতদূর জানি আপনি একজন জার্নালিষ্ট। কাজ করছেন কোথায়?

তানভীর: বর্তমানে আছি দেশের অন্যতম অনালাইন নিউজপোর্টাল “বাংলা ট্রিবিউন”-এ।

খোশগল্প.কম: আপনাদের কাজগুলো কিভাবে হয় একটু কি ডিটেইলসে বলা যাবে?

তানভীর: আমাদের চীফ রিপোর্টার/ প্রধান প্রতিবেদক যিনি তিনি কাজ ভাগ করে দেন। যেমন: আগামীকাল আওয়ামীলীগের কোন অনুষ্ঠান কিংবা সংবাদ সম্মেলন থাকলে তিনি রিপোর্টারকে কাজ দিয়ে দেন। রিপোর্টার/ প্রতিবেদক তখন সেই ইভেন্টের রিপোর্ট করে সাবমিট করে। তারপর সেই রিপোর্ট সাব-এডিটর এর কাছে যায়। তিনি রিপোর্টটি এডিট করে পাবলিশ করেন। এটা মোটামুটি প্রসেস। টুকটাক পরিবর্তন হয় প্রয়োজন সাপেক্ষে

খোশগল্প.কম: এছাড়াও এটা তো বেশ দৌড়াদৌড়ির কাজ..

তানভীর: হ্যা। আমাদের নির্দিষ্ট কোন সময় নেই। যে কোন সময় কাজ আসতে পারে। এই ধরুন আপনার সাথে কথা বলার মাঝেই এখন যদি কোথাও কিছু হয়, আর আমাকে যদি সেই কাজ দেয়া হয়- তাহলে আমাকে এখনই যেতে হবে। অনলাইন সাংবাদিকতা আবার একটু ব্যতিক্রম। অনেক বেশি আপডেট থাকতে হয়।

খোশগল্প.কম: ঢাকায় যাওয়া আসায় তো বেশ সময় লাগে।জ্যাম,রাস্তা কাটা আরো অনেক সমস্যা তো টাইম মেইন্টেইন করতে সমস্যা হয় না?

তানভীর: হয়। আগে যেতে হয় সব সময়। তবে কোন কারণে যদি মিস করি সেক্ষত্রে পরিচিত সাংবাদিক বন্ধুরা, যারা সেখানে ছিল তাদের কাছ থেকে সাহায্য নেই। কিংবা অনেক সময় উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রেস রিলিজ দেয়। তবে প্রোগ্রাম মিস হলে- আশানুরূপ রিপোর্ট করা যায় না, তাই সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল সময়ের প্রতি খেয়াল রাখা।

খোশগল্প.কম: হলুদ সাংবাদিকতা ব্যাপারটি নিয়ে কিছু বলুন।

তানভীর: হলুদ সাংবাদিকতা বলতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ভিত্তিহীন সংবাদকে রোমাঞ্চকরভাবে পরিবেশন করাকে বোঝায়। এ ধরনের সাংবাদিকতায় ভালমত গবেষণা বা খোঁজ-খবর না করেই দৃষ্টিগ্রাহী ও নজরকাড়া শিরোনাম দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা হয়। হলুদ সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য হল সাংবাদিকতার রীতিনীতি না মেনে পত্রিকা কিংবা টেলিভিশন চ্যানেলের দর্শকসংখ্যা বাড়ানো। হলুদ সাংবাদিকতা মানেই ভিত্তিহীন সংবাদ পরিবেশন, দৃষ্টি আকৰ্ষণকারী শিরোনাম ব্যবহার করা, সাধারণ ঘটনাকে একটি সাংঘাতিক ঘটনা বলে প্ৰতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা, কেলেংকারির খবর গুরুত্ব সহকারে প্ৰচার করা, অহেতুক চমক সৃষ্টি ইত্যাদি। এক কথায় টিআরপি বাড়ানোর জঘন্য কৌশল। যা প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতা নয়। কারণ এই হলুদ সাংবাদিকদের কারণেই – প্রিন্সেস ডায়না সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। তাই হলুদ সাংবাদিকতা দেশ, জাতি ও জনগণের জন্য অভিশাপ।

খোশগল্প.কম: এটার খুব বাজে প্রভাব পড়ার পরও এটা কিন্তু কমছে না…

তানভীর: না কমার কারণ হচ্ছে সরকার ও দেশের সিনিয়র সাংবাদিকদের সৎইচ্ছার অভাব। সরকার হলুদ সাংবাদিকতা রোধে আজ পর্যন্ত কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয় নি। আর অনেক মিডিয়া হাউজ টিআরপি বাড়াতে হলুদ সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করছে। তাই সব মিলে এটি বন্ধ হচ্ছে না।

খোশগল্প.কম: টিআরপি টার্মটির সাথে পরিচিত নই আসলে….

তানভীর: টিআরপি এর মানে হল- টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট। কোনো চ্যানেল বা অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা নির্দেশ করে এটি দ্বারা।

খোশগল্প.কম: অহ আচ্ছা।যাই হোক আপনি কোন ধরনের নিউজ গুলো কাভার করেন?স্পেসিফিক কিছু রয়েছে না  রেন্ডম?

তানভীর: আমি শিক্ষা, নারী ও শিশু এগুলো নিয়েই সাধারণ কাজ করি। মাঝে মাঝে ব্যতিক্রম ঘটে।

খোশগল্প.কম: স্পটে যেয়ে কাজ করার কিছু রিস্কও তো রয়েছে তবে……

তানভীর: সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সোর্স  তৈরি করা। সোর্স হল যার মাধ্যমে সংবাদ পাওয়া যায়। আর সোর্স তৈরী হয় সুসম্পর্ক তৈরীর মধ্য দিয়ে। তাই কোন সমস্যায় পড়লে তারাই অনেক সময় সাহায্য করে। এছাড়াও কোন অনাকাঙ্ক্ষিত কোন সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা থাকলে আগে থেকে তার উত্তরণের উপায় সাংবাদিককে বের করে রাখতে হয়। তারপরও নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েই যায়, যা মেনে নিতে হয় একজন সাংবাদিককে। কেননা সাংবাদিকতার আরেক নাম ঝুকি।

খোশগল্প.কম: সব কিছু বাদ দিয়ে এই “ঝুঁকি” কে কেনো বেছে নেয়া?

তানভীর: শিশু থেকে ভার্সিটির শিক্ষার্থী সকলেই বলে- তারা কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা শিক্ষক হবেন। কেউ বলে হবে ব্যাংকার। সাংবাদিক হতে চায় কম  মানুষ। অথচ সাংবাদিকতা একটি দেশের অন্যতম হাতিয়ার। এ পেশার মাধম্যেই অনেক অন্যায় রোধ করা যেমন সম্ভব, তেমনি অনেক কিছু পরিবর্তন করাও সম্ভব। কিন্তু নানা কারণে সাংবাদিকদের আজও খারাপ চোখে দেখে অনেকেই। আমি এর পরিবর্তন আনতে চাই। দেশ থেকে হলুদ সাংবাদিকতার মত বিষফোড়াকে স্বমূলে উৎপাটিত করতে চাই।

খোশগল্প.কম: শুরুটা কিভাবে?

তানভীর: ছোট ছোট কলাম লিখতাম। সমাজের নানা বিষয় নিয়ে। যদিও সেগুলো কোথাও ছাপা হত না। এভাবে লিখতে লিখতে একদিন আমাদের সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষক, সজীব সরকার, তিনি আমার লেখা দেখে খুশি হয়ে আমাকে একটি পত্রিকায় কাজ দেন। সেখান থেকেই মূলত আমার সাংবাদিকতার শুরু।

খোশগল্প.কম: কতদিন হচ্ছে এই কাজে?

তানভীর: ২.৫ বছর।

খোশগল্প.কম: কোন মনে রাখের মতো ঘটনা এই আড়াই বছরে?

তানভীর: হ্যাঁ আছে। সম্প্রতি সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আরোপিত ৭.৫% ভ্যাট আরোপ করেছিল সরকার। সারাদেশের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে পড়েছিল। প্রায় ৩ মাস ধরে চলে এই আন্দোলন। আমি সে সময় ৩ জন ফটোসাংবাদিকের মধ্যে একজন ছিলাম যারা এই আন্দোলনের ছবি তুলেছে। আমার তোলা ছবি অনেকে গণমাধ্যমে ব্যবহার করা হয়েছে। পরে সবাই এসেছে। কিন্তু শুরুর দিকে আমি ছিলাম এত বড় আন্দোলনের ক্যামেরা হাতে ৩জন সাংবাদিকের ভেতর একজন। আমার এই অর্জন নিয়ে একটি বইয়ে আমার একটি লেখা আসছে। বইটি দেশের অনেক বড় বড় মানুষ মিলে বের করছে। এটিও খুব গর্বের বিষয়।

খোশগল্প.কম: এরকম অর্জন নিশ্চই আরো আছে।এগুলোকে কিভাবে দেখা হয়?

তানভীর: আমি আসলে নিজের অর্জনের চেয়ে বড় করে দেখি দেশের স্বার্থ। আমার কাজের মধ্য দিয়ে দেশ, জাতি কিংবা কোন অসহায় মানুষ এর যদি উপকার হয় সেটাই আমার সাফল্য।

খোশগল্প.কম: বাহ।প্রফেশন এটাকেই কি পার্মামেন্ট করার ইচ্ছা?

তানভীর: হা। আমার পেশা ও নেশা হল সাংবাদিকতা।

খোশগল্প.কম: পড়াশুনা কি শেষ?

তানভীর: না। মাঝে অসুস্থ ছিলাম দীর্ঘদিন। তাই মাঝে পড়াশুনা থেকে একটু দূরে ছিলাম। আমার আর ১ বছর লাগবে।

খোশগল্প.কম: কোথায় পড়াশুনা করছেন?কিসে পড়াশুনা করছেন?

তানভীর: স্টেট ইউনির্ভাসিটি, বিভাগ: জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ।

খোশগল্প.কম: পুঁথিগত পড়াশুনা কি তবে অনেক বেশি দরকার সাংবাদিকতায়?

তানভীর: সাংবাদিকতা একটি বাস্তবধর্মী পেশা। এই বিষয় নিয়ে না পড়লে সাংবাদিক হতে পারবে না এ ধারণা ভ্রান্ত। তবে অপসাংবাদিকতা রোধে এবং সাংবাদিকতার নানাদিক জানতে এ বিষয়ে পড়লে সে ভাল করবে।

খোশগল্প.কম: আপনাদের নিউজ পোর্টাল টি নিয়ে কিছু বলেন।

তানভীর: সাধারণ যেকোন নিউজ পোর্টালে দেশ-বিদেশ, খেলা, বিনোদন, কলামসহ যাবতীয় নিউজ যায়। আমাদের “বাংলা ট্রিবিউন” নিউজ পোর্টালটিতে দেশের প্রতিটি বিভাগ, দেশের প্রতিটি বেসরকারি, সরকারি, জাতীয় ভার্সিটির নাম দিয়ে পৃথক ক্যাটাগরি থাকে। যাতে এসব জায়গার নিউজো পাবলিশ হয়। এছাড়াও গতানুগতিক নিউজের বাইরে সাধারণ মানুষ এর কথা অধিক গুরুত্ব পায় এখানে।

খোশগল্প.কম: অনলাইন নিউজ পোর্টালে তো এখন সামাজিক মাধ্যম গুলো সয়লাব, তো সেখানে একটি বিশ্বাসযোগ্য অবস্থানে পৌছাতে বেগ পেতে হয়নি আপনাদের?

তানভীর: অবশ্যই পেতে হয়েছে। সেক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, সততার কারণে আজকের এই অবস্থান।

খোশগল্প.কম: বিভিন্ন নিউজের কারনে সাংবাদিকদের হরহামেশা জনগণের তোপের মুখে পড়তে হয়,এমন কোন অভিজ্ঞতা কি রয়েছে?

তানভীর: তোপের মুখে একবার পড়েছিলাম: তবে জনগনের নয়। গোয়ন্দাদের। ভ্যাট আন্দোলনের সময় তারা অনেক হুমকি দিয়েছিল যাতে নিউজ না করি।

খোশগল্প.কম: ব্যাপারটা থেকে বেরুতে পেরেছিলেন?

তানভীর: হুমম। পেরেছিলাম। কারণ সাংবাদিকেরা হুমকি পাবে এটাই নরমাল। তাই বলে পিছপা হলে চলবে না।

খোশগল্প.কম: অনেকেই হয়তো সাংবাদিকতায় আগ্রহী কিন্তু আন্সার্টেইনিটির কারনে আগাতে চায় না।তাদের জন্য কিছু বলুন……

তানভীর: প্রথমে মনে রাখতে হবে- সাংবাদিকতা খুব ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা। আর শুরুতে এ পেশায় বেতন অনেক সীমিত। কিন্তু কেউ যদি অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করে, ঝুঁকি ও চাপ নিয়ে কাজ তাহলে সে এই পেশায় আসতে পারে। নতুন কেউ যদি ২-৩ বছর কাজ করে সাংবাদিক হিসেবে তাহলে তার বেতন খুব ভাল হবে। এখন সাংবাদিকদের বেতন অনেক ভাল। সম্মান তার চেয়ে বেশি।

খোশগল্প.কম: আপনাদের অনেক ব্যস্ততা।তাও নিজের কিছু সময় পাওয়া হয় নিশ্চই।সে সময় কি করেন?

তানভীর: আমি অবসর সময়ে কলাম লিখি ও গান শুনি।

খোশগল্প.কম: নিজের কাজ নিয়ে সেটিসফাইড?

তানভীর: পুরোপুরি না। কারণ আমাদের দেশে সাংবাদিকতা এখন পরাধীন। যেদিন পুরোপুরি  স্বাধীন হয়ে কাজ করতে পারবো সেদিন সেটিসফাইড থাকবো।

খোশগল্প.কম: নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চান নিজের প্রফেশনে?

তানভীর: আমি নিজেকে সম্পাদক (পত্রিকার ক্ষেত্রে) কিংবা হেড অব নিউজ(টেলিভিশনের ক্ষেত্রে) হিসেবে দেখতে চাই।

খোশগল্প.কম: নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন।

তানভীর: আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। যে অন্যকে খুশী করে নিজে খুশি হয়। আমি মনে করি আমার আচরণে কিংবা কাজে কেউ উপকৃত হলে আমি খুশি। আমার একটি স্বপ্ন আছে, আমি যখন মৃত্যু বরণ করবো তখন পরিচিতদের বাইরে, তারাও যেন কাদে যারা আমার নাম কিংবা চেহারা শুধু চিনে। এর বেশি নয়। আমি আমার ভাল আচরণ ও কাজ নিয়ে সকলের অন্তরে ও দোয়ায় থাকতে চাই।

খোশগল্প.কম: খোশগল্প নিয়ে কিছু বলবেন সর্বশেষে?

তানভীর: আমার খুব ভাল লেগেছে এমন উদ্যোগকে। কারণ এখন সময়টা অনলাইনের ও যোগাযোগের। তাই এই যুগে এমন একটি কাজ, যেখানে গল্পের ছলে যোগাযোগ করা যাচ্ছে- এটা ব্যতিক্রমী কিন্তু যথাযথ উদ্যোগ। আমি আশা করবো খোশগল্প এর এই যাত্রা অব্যাহত থাকবে। আমি এর দীর্ঘযাত্রা কামনা করছি।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত