রবিউল কমল, সপ্তম শ্রেণী থেকেই লিখে যাচ্ছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। ২০১০ সাল থেকে সাংবাদিকতার পেশার সাথে জড়িত। বর্তমানে বাংলা ইনসাইডারে সাব-এডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন। পড়া-লেখা করছেন ব্রাক ইউনিভার্সিটিতে। তার প্রকাশিত ছড়ার বই “রবির পাখি”

‘বাবা খুশিতে আমাকে একটা প্যান্ট আর গেঞ্জি কিনে দিয়েছিলেন’

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 12, 2017 , 3:32 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: শুভেচ্ছা নিবেন, প্রথমে আপনার পরিচয় জানতে চাইবো।

রবিউল কমল: আমি রবিউল কমল। আমি নিজেকে একজন ছড়াকার হিসাবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসি। আর আমি মূলত বড় হয়েছি  সাতক্ষীরায় কিন্তু আমার জম্ম বান্দরবান জেলায়।

 

খোশগল্প.কম: আপনার শৈশব নিয়ে শুনি।

রবিউল কমল: আমি শৈশব থেকে অন্য অনেকের মতো আমি ডানপিটে ছিলাম না, একা একা থাকতেই আমার ভালো লাগতো। আট বছর বয়স পর্যন্ত আমরা ছিলাম বান্দরবানে, তারপরে আমরা চলে আসি সাতক্ষীরায়। তো, বান্দরবানে থাকার সময়ের  স্মৃতিগুলো আমার মনে নেই। আমার পুরনো স্মৃতি কেন জানি মনে থাকে না। আর সেটাতো আবার ছোটবেলার। যাই হোক, সাতক্ষীরায় একটা স্কুলে বাবা আমাকে  ভর্তি করে দেয়। সেখানে  আমি নিয়মিত পড়তে থাকি, সেখানেও আমার বন্ধুদের সাথে মেশা হতো না তেমন একটা। সব সময় পড়া লেখা নিয়ে থাকতাম। আমাদের ফ্যামিলিটা ছিলো টানা-পোড়নে বেঁচে থাকা একটা ফ্যামিলি। আর আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন এসব ফ্যামিলিগুলো চায় তাদের সন্তানেরা শুধু পড়ালেখা নিয়েই থাকুক অর্থাৎ সন্তানদের প্রতি এক অন্য রকম আশা থাকে। আমার বেলায়ও তার  ব্যাতিক্রম ঘটেনি। তার জন্যই আমি সব সময় পড়ালেখা নিয়ে থাকতাম, বন্ধুদের সাথে কম মিশতাম। ছোটবেলার একটা স্মৃতি এখনো ভীষণ মনে পড়ে, সাতক্ষীরায় এসে আমি স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হলাম।বাবা খুশিতে আমাকে একটা প্যান্ট আর গেঞ্জি কিনে দিয়েছিলেন সে সময়। আনন্দ হয়েছিলো এই ভেবে যে নতুন প্যান্ট আর গেঞ্জি পেলাম! কিন্তু এখন মনে পড়ছে বাবা কত টানা-পোড়নে সংসারকে বাঁচিয়ে রাখতো তারপরেও আমায় খুশিতে উপহার দিতে ভোলে নি।

 

খোশগল্প.কম: এক সময় না হয় বন্ধুদের সাথে মেশা হতো না, এখনও কি এমন হয়?

রবিউল কমল: আসলে সত্যি বলতে কি এখনো আমার বন্ধু-বান্ধব অনেক কম। অপরিচিত কারো সাথে আগ্রহ নিয়ে আলাপ করবো এমন আমার মাঝে নেই। আমার জীবনে বন্ধুত্ব সৃষ্টির ব্যাপারটা ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম ছিলো আমার জন্য। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন পড়ালেখার প্রতিদ্বন্দ্বীতায় বন্ধুদের শত্রুই মনে হতো। যদি আমাকে খেলার জন্য ডাকতো ভাবতাম আমি যে ভালো পড়ালেখা করি তারা ওটা চায়না তাই আমাকে ডাকছে, আমার সময় নষ্ট করার জন্য। আবার ছোটবেলা থেকেই আমার মাঝে আরেকটা বিষয় কাজ করছে সেটা হলো আমার সাথে যদি কারো সাথে রাগ হয় বা মনোমালিন্য হয় তার সাথে আমি কখনোই আর কথা বলিনা যার ফলে অনেককে আমি আপন করে নিতে পারিনা। আর এই কারণে আমার বন্ধুর সংখ্যাও কম। আবার অপর দিকে অনেকের মতোই আমি মেয়ে ফ্রেন্ডদের সাথে মিশতে আনইজি ফিল করি যার ফলে আমার বন্ধুত্বের কাতারে মেয়ে বন্ধুদের তালিকাটা একেবারে নগণ্য।

 

খোশগল্প.কম: এখন পরিণত বয়সে এই বিষয়টা কি মনে হয়? এটা কি ভালো প্র্যাকটিস?

রবিউল কমল: না, আমি এটাকে ভালো একটা অংশ হিসাবে দেখছিনা। আমি এখনো ক্রমে ক্রমে এই খোলস থেকে বের হতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই বন্ধুত্বের প্রযোজনয়ীতা অনেক বেশি। একবার আমার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলো, তখন অনেক টাকার প্রয়োজন হয়ে পড়লো, কি  করবো কিভাবে টাকা ম্যানেজ করবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অনেকেরই বন্ধু আছে, বিপদে তার ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু আমার তো বন্ধুর সংখ্যাই ছোট আমি কীভাবে হেল্প পাব! সেদিনই বুঝতে পারছিলাম আসলে বন্ধুত্বটা কিভাবে মানুষের জীবনে প্রভাব রাখে। তারপর আমি আমার ফেসবুকের কিছু বন্ধুদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করি তারা সবাই আমাকে সাধ্যমত সেদিন হেল্প করেছে যা আমি সারা জীবনেও ভুলতে পারবোনা।

 

খোশগল্প.কম: লেখালেখিতে এলেন কীভাবে?

রবিউল কমল: লেখালেখির শুরুটা হয়েছিলো আমার সপ্তম শ্রেণীতে। ঐ সময় সারাদেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় থেকে একটা রচনা প্রতিযোগিতা নেয়। তখন আমি সেটাতে অংশগ্রহণ করি এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। তো, এটার পুরষ্কার গ্রহণ করতে আমি ঢাকায় আসলে আমার সাথে তখনকার যুগান্তর পত্রিকার “আলোর নাচন” বিভাগের সম্পাদক আশরাফুল আলম পিন্টু ভাইয়ের সাথে পরিচয় হয়। ভাই আমাকে বলেন তুমি তো অনেক ভালো করেছো তুমি ইচ্ছে করলে পত্রিকার এই বিভাগটিতে লিখতে পারো, আমার মনে হয় তুমি ভালো করবে। তারপর আমি বাড়িতে এসে একটা গল্প লিখে পত্রিকায় পাঠাই। ভালো লাগে পরের সপ্তাহেই পত্রিকার পাতায় নিজের লেখাটা দেখি। এক অন্যরকম অনুপ্রেরণা কাজ করে তখন। তারপর থেকে লেখালেখি শুরু। আস্তে আস্তে এই লেখার জগৎটা আমার কাছে আপন হয়ে যায়। আস্তে আস্তে ছড়া, কবিতা, শিল্প, ফিচার লিখি বিভিন্ন পত্রিকায়। এখনও লিখে যাচ্ছি।

 

খোশগল্প.কম: দীর্ঘ দিন বিভিন্ন পত্রিকায় লিখে একটা পোক্ত অবস্থান তৈরী করেছেন। এই সময়ে এসে লেখালেখিতে একটা অবস্থান তৈরী করার জন্য একজন তরুণ লেখককে কোন দিকটি সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে বলে আপনি মনে করেন?

রবিউল কমল: আমার অবস্থান অনেক পোক্ত কিনা সেটা আমি বলতে চাইনা, তবে লেখালেখির এই সময়ে আমি একটা বিষয় দারুণভাবে ফিল করেছি সেটা হলো লেখালেখিতে শক্ত অবস্থান তৈরী করতে হলে অবশ্যই তার মাঝে দুটি গুণ লালন করতে হবে। একটা হলো নিয়মিত লেখার একটা ফ্লো তৈরী করতে হবে আর অন্যটি হলো নিয়মিত বই পড়ার অভ্যেস তৈরী করা। এই দুটি গুণ একজন লেখককে সবার কাছে লেখক করে তুললেও আমার দৃষ্টিতে সে একজন প্রকৃত মানুষ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে সুযোগ পায়।

 

17506022_1172844132838157_1863240320_n

 

আমার বই পড়ার নেশাটা প্রবল ছিলো। এক সময় স্বপ্ন দেখতাম একটা লাইব্রেরী তৈরী করবো। সেই ভাবনা থেকেই বাড়িতে নিজে একটা লাইব্রেরী তৈরী করি যেখানে আমার প্রিয় বইগুলো পাশাপাশি অবস্থান করছে।

 

খোশগল্প.কম: আপনার লেখালেখি অনেক ফরমেটেই, তার মধ্যেও শিশুদের নিয়ে আপনার লেখা চোখে পড়ার মতো। এমনটা কেন?

রবিউল কমল: আমি যেখানেই লিখি না কেন শিশুদের নিয়ে লিখতে সবচেয়ে বেশি কমফোর্ট ফিল করি। বর্তমানে শিশুদের নিয়ে লিখছে এমন লেখক একবারে নগণ্য, এই বিষয়টিও আমাকে বেশ ভাবিয়েছে। আবার আরেকটা কথা  প্রচিলিত আছে যে শিশুরা বই পড়তে কম আগ্রহী , সে বিষয়টিও আমাকে ভীষণ ভাবিয়েছে। তখন ভাবলাম আমার যেহেতু ভালো লাগে এবং যেহেতু সাহিত্যের এই স্থানটা বলতে গেলে একবারে ফাঁকা তবে এই বিভাগেই লিখাটাই বেটার হবে। দেন, সেই চিন্তা ভাবনা থেকেই এখনও লিখে যাচ্ছি।

 

খোশগল্প.কম: লেখালেখি বলি আর, বেড়ে ওঠা বলি, সত্যিকার অর্থে অসহায়- এরকম কখনো মনে হয়েছে?

রবিউল কমল: আমার জীবনটা ছোটবেলা থেকেই স্ট্রাগলের। জীবনের অনেক পর্যায়েই নিজেকে অসহায় মনে হয়েছে, তবে আমি যখন ঢাকায় এসে কয়েকটা পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখি করি, কন্ট্রিবিউট করি এবং এ থেকে পাওয়া টাকা দিয়েই কোনমতে পড়া-লেখা আর নিজেকে চালিয়ে নিই তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে হতো। কিন্তু আমার আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকাতে ইচ্ছে মত মতো চলতে পারতামনা, ড্রেস আপ মেইন্টেইন করতে পারতাম না; যার জন্য অনেকেই আমাকে ভিন্ন চোখে দেখতে। আবার আমার নিজের কাছেও খুব খারাপ লাগত এই ভেবে যে সবাই খুব ফরমাল লুকে এসছে এখানে আর আমি!  সে সময়টাতে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়েছে।

 

খোশগল্প.কম: সামনের সময় গুলো পাড়ি দেওয়া নিয়ে কেমন স্বপ্ন দেখছেন?

রবিউল কমল: সামনের সময় গুলোতে আরো ভালো লিখে যাবো, বিশেষ করে শিশুদের নিয়েই লিখে যেতে চাই।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত