জগলুল হায়দার, পেশায় প্রকৌশলী, নেশায় ছড়াকার, সাধনায় সুফিবাদ! বললেন পার্থিব জীবনেও থেকে কীভাবে মানস ভাবনায় সুফিজমকে চর্চা করতে হয়, ভারতীয় উপমহাদেশের সুফিবাদ এবং তাঁর বই ‘সুফিয়ানা’ নিয়ে।

‘ফকির দর্শনটা হচ্ছে- ইউ হ্যাভ এনাফ, বাট ইউ নিড নাথিং!’

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 23, 2017 , 3:05 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: জগলুল হায়দার, ছড়াকার, কবি পরিচয়ের বাইরে একদম অপরিচিত মানুষদের জন্য কি পরিচয় দিবেন?

জগলুল হায়দার: লেখালেখির বাইরে আমার পারিবারিক ও পেশাগত জীবন আছে, তো জীবনের এইসব স্তর মিলায়ে শেষাবধি আমি- ম্যান উইথ এ মিশন।

 

খোশগল্প.কম: এই প্রশ্ন আরো সামনে করতাম আপনাকে, যেহেতু চলে আসলো, আপনি অনেক জায়গায় ‘ম্যান উইথ এ মিশন’ এই কথাটা বলেছেন, ব্যাখা কী এর?

জগলুল হায়দার: এর অনেক রকম ব্যাখ্যা আছে। আসলে এই জগত কিন্তু এমনি এমনি সৃষ্টি হয় নি। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সেটাও একটা বিশেষ কারণেই। প্রতিটা মানুষ জন্মায় একটা কারণ নিয়ে, একটা মিশন নিয়ে। আমি এটাকে গভীরভাবে ফিল করি। আমি মনে করি স্রষ্টার গ্র্যান্ড-ডিজাইনের মধ্যে আমার জন্যও একটা মিশন আছে।

 

খোশগল্প.কম: আপনার মিশন কী তাহলে?

জগলুল হায়দার: আমি যেটা মনে করি, মানুষ হিসেবে আমার মিশন হচ্ছে মানুষের জন্য কিছু করা, মানুষের সঙ্গে, ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা; মোটকথা নিজের কল্যাণের পাশাপাশি সৃষ্টির কল্যাণ সাধন।

 

খোশগল্প.কম: এটা তো মানুষ হিসেবে প্রতিটা হিউম্যান বিয়িং এর কর্তব্য। কিন্তু প্রতিটা মানুষ যদি একটা মিশন নিয়ে জন্মায়, তাহলে সবার মিশন আলাদা আলাদা…

জগলুল হায়দার: হ্যাঁ, প্রতিটা মানুষের  মিশন আলাদা আলাদা তবে তার লক্ষ্য একটাই।

 

খোশগল্প.কম: মানুষ কীভাবে জানবে কী তাঁর মিশন, কি মিশনের জন্য তাঁকে পাঠানো হয়েছে?  

জগলুল হায়দার: এটা বলতে গেলে সক্রেটিসের ঐ কথাটা বলতে হয় ‘নো দাইসেলফ’- নিজেকে জানো। এখন তুমি কি নিজেকে জানো না? জানো তবে এটা হচ্ছে ভাসা ভাসা জানা। একদম নিজের অন্তরকে জানার যে চেষ্টা, আত্ম-অনুসন্ধান, অন্তর্গত আমাকে জানা, এটা যদি আমাদের থাকে তাহলে আমরা জানতে পারবো আমার সৃষ্টি কেন হয়েছে, কী আমার করণীয়।

 

খোশগল্প.কম: নিজেকে জানার প্রক্রিয়া কি আপনার কাছে?

জগলুল হায়দার: জানার প্রক্রিয়াটা হতে পারে এমন…তার আগে দুটো শব্দ নিয়ে একটু বলি। এর একটা হচ্ছে ইন্ডিভিজুয়াল, আরেকটা হচ্ছে সেলফ। এখন ইন্ডিভিজুয়ালিজম হইতেছে একান্তই ব্যক্তি মানুষ। সেই দিক থেকে সেলফ অনেকটা সামষ্টিক মানুষ। মানুষ হিসাবে  আমি যখন সেলফ, তখন সমগ্র মানবসত্তাটাই আমার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হবে। আসলে সমগ্র মানবতার স্বপ্ন, সম্ভাবনা, সংকট, হাসি-কান্না সব কিছু মিলিয়েই আমি মানুষটা। আর নিজেকে বোঝার জন্য যেটা বেশী দরকার সেটা রিডিং! আমি আমার বাবাকে পাঠ করি, আমার সন্তানদের পাঠ করি, রোজ সকালে যে রিকশা করে বাসা থেকে অফিসের দিকে বের হই সে রিকশাওয়ালাকেও আমি রিড করি, যে চাল দোকানদার থেকে চাল কিনি তাকেও আমি রিড করি। অবশ্য এর মধ্যে সবচেয়ে সহজ রিড হলো বই-পুস্তকের মধ্য দিয়ে রিড করা। কারণ বই-পুস্তকের মধ্যে দিয়ে একটা সম্পূর্ণ ইন্ডিভিজুয়াল মানুষের অভিজ্ঞতা, কল্পনা সেগুলো আমরা পড়তে পারি। এগুলো পড়ে আমার কি হবে? জ্ঞান বাড়বে? জ্ঞান না বলে আমরা বলতে পারি উপলব্ধি বাড়তে পারে। উপলব্ধি কি কাজে লাগবে? এই উপলব্ধি দিয়েই আমার ‘আমিকে’ চিনতে হবে। আমার মিশনকে জানতে হবে এবং আমার মিশনের জন্য আমার জগতের সাথে কমিউনিকেশন করতে হবে।  

 

খোশগল্প.কম: এইবারের বই মেলায় আপনার প্রকাশিত দুটো বইয়ের একটা সুফিয়ানা নিয়ে। সুফিয়ানা আপনার কাছে কি অর্থ করে আর এইটাকে সাহিত্যে কীভাবে রিলেট করলেন?

জগলুল হায়দার: সূফিবাদ হচ্ছে স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির প্রেম। এক ধরণের সাধনা তুমি করতে পারো স্রষ্টার কাছে যাবার জন্য। সুফিরা যেখানে স্রষ্টাকে বলছে ‘মাশুক’। আর নিজেকে তথা সৃষ্টিকে বলছে ‘আশেক’।

 

ইব্রাহীম বিন আদম নামে একজন বাদশাহ ছিলেন। তাঁর মধ্যেও স্রষ্টাপ্রেম জাগ্রত হয়। তিনি নামাজ পড়তেছেন, প্রার্থনা করতেছেন, কিন্তু সাড়া পাচ্ছে না। তো এক রাতে তিনি ঘুমাচ্ছিলেন, ঘুমের মধ্যে শুনছেন কে যেন ছাদে প্রচণ্ড শব্দে দৌড়াদৌড়ি করতেছে। দ্রুত তিনি ছাদে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন এখানে কি করছো? তখন সে বললো তার ভেড়া হারিয়ে গেছে, সেটাকে খুঁজছে। বাদশাহ রাগাণ্বিত হয়ে বললেন ‘তুমি রাজবাড়ীর ছাদে তোমার ভেড়া খুঁজছো!!’ তখন সেই লোকটা উত্তর দিলো, তুমি যদি রাজবাড়ির শানশওকতে থেকে ঈশ্বরকে খুঁজতে পারো তাহলে আমার এখানে ভেড়া খুঁজতে দোষ কি? এর মধ্য দিয়ে বাদশাহ একটা মেসেজ পেয়ে গেলেন। ঐ রাতেই তিনি কাউকে কিছু না বলে সর্বস্ব রেখে ফকির হয়ে গেলেন। কিন্তু এইটা সূফী সাধক তথা দরবেশদের ব্রত।

এখন সূফিবাদ নিয়ে কিছু মিসগাইডেন্স বা ভুল ধারণা আছে। এই প্রসংগে রসূল (সঃ) এর একটা হাদিসের কথা বলতে পারি যা বাংলা করলে দাঁড়ায়- ‘ইসলামে বৈরাগ্যের স্থান নাই’। অর্থাৎ স্রষ্টাপ্রেম পার্থিব জীবনকে মেইন্টেইন করেই  হতে হবে।

 

খোশগল্প.কম: পার্থিব জীবন বা সংসারধর্মের মধ্যে থেকেও এই চর্চা কীভাবে চলতে পারে? 

জগলুল হায়দার: একজন মানুষ লোকালয়ে থেকেও বৈরাগ্যকে তাঁর মানস ভাবনায় স্থান দিতে পারে, কিন্তু  ব্যক্তিগত জীবনাচরণে বৈরাগ্যের স্থান নাই-যেমনটা নবীজী বলেছেন। আবার  আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে সুফির যে দর্শন, আমরা এটাকে খূব ম্যাটেরিয়ালি নিয়ে নিয়েছি। তুমি দেখো রাধাকৃষ্ণের চরিত্র। এটা কিন্তু ‘ব্লাড এন্ড ফ্লেশের’ প্রেম না, আমরা কাব্য-মহাকাব্য করেছি, ব্লাড এন্ড ফ্লেশটাই মুখ্য করে ক্যারেক্টারের মধ্যে এনেছি একটা মার্কেট ভ্যালু পাবার জন্য। অথচ এটা হচ্ছে ডিভাইন স্পিরিট এবং হিউম্যান বিংয়ের মধ্যে। অর্থাৎ জীবাত্মা এবং পরমাত্মার সম্পর্ক। ভারত-পাকিস্তানে ইভেন গত এক দশকে ওস্তাদ ফতেহ আলী খান, এ আর রহমান ও আতিফ আসলাম প্রমুখের কারণে সুফি ঘরানার গান আমাদের এখানেও জনপ্রিয় হচ্ছে।  ইসলাম তো বটেই সব ধর্মেই সকল মানুষ ও প্রাণীর প্রতি প্রেমের কথা বলা হয়েছে যেটার আল্টিমেট ডেস্টিনেশনও হচ্ছে স্রষ্টা।সুফীকে এক হিসেবে বলা যায় যে সব কিছু থেকে নিজেকে দূরে রেখে স্রষ্টার প্রেমে মগ্ন হয়েছে। আমরা বাংলায় একটা শব্দ ব্যবহার করি ‘ফকির’। একটা শব্দ অনেক দিন ব্যবহারের ফলে বা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে যেতে শব্দের ওজন কমে যায় বা বেড়ে যায়। ফকির শব্দ দিয়ে আমরা বুঝাই যে ভিক্ষুক তথা সহায় সম্বলহীন। অর্থাৎ আমরা যা বোঝাচ্ছি  ফকির কিন্তু তা না। আসলে ফকির বলতে বোঝায় যারা সর্বত্যাগী।

যাক গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো ভিক্ষুক কিন্তু ফকির না, কারণ তাঁর তো বেসিক্যালি কিছু নাই-ই। ফকির দর্শনটা হচ্ছে- ইউ হ্যাভ এনাফ, বাট ইউ নিড নাথিং! সক্রেটিস বলেছেন ‘দেয়ার আর মেনি থিং ইন দ্য বাজার, বাট আই ক্যান লিভ উইদাউট অল অফ দেম’ বাজারে প্রচুর পণ্য আছে কিন্তু আমার এসব ছাড়াই চলে। কাজেই সক্রেটিসও কিন্তু এক দিক থেকে ফকিরি দর্শনকে বিলং করেন। ধনী তো সে নয় যার অনেক আছে। বরং ধনী সেই যার অল্প হলেও চলে। সেই অর্থে জাত সূফীরাই প্রকৃত ধনী কিংবা প্রকৃত ফকির।

খোশগল্প.কম: ‘সুফিজম নিয়ে সাহিত্য’ এটা কী উদ্দেশ্যে করলেন তাহলে?জগলুল হায়দার: সূফিবাদ হচ্ছে সেটাই যারা ইশ্বরকে প্রাধান্য দিছে, জগতকে হয়তো সেভাবে প্রাধান্য দেয় নাই। সূফীবাদকে জীবনের মধ্যে থেকেই ধরা যায় এই উপলব্ধিটা আমার গোড়াতেই হয় । এবং দ্যাখো বিখ্যাত সুফি কবিদের প্রায় সবাই জীবন-সংসারকে মিট করেই সুফি কবিতার চর্চা করছেন। আমিও সেইভাবেই বাংলায় সুফি কবিতার চর্চা শুরু করি। আর সাহিত্যের ক্ষেত্রে পারস্যের কবিদের কথা বলতে পারি। শেখ সাদী, জামি, রুমী এরা জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে সুফি কবিতার চর্চা করছেন।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত