মাসুম আহমেদ আদি, বই নিয়ে আলোচনা-গপ্পোর সব চেয়ে বড় ভার্চুয়াল গ্রুপ ‘বইপোকাদের আড্ডাখানা’ গ্রুপের এডমিন। “আমি বইয়ের জন্য পিপাসার্ত, আমার স্বপ্ন এই অনুভূতিটা যেন আমাদের প্রতিটা তরুণের হয়, বইই যেন তাঁদের প্রধান ধ্যান হয়” কথা বললেন পুরোটাই বই নিয়ে। আজকে কথা বলি তাঁর সাথে…

‘আমি মনে প্রাণে মানি, একজন সাধারণ মানুষের মন মানসিকতা থেকে একজন বই পোকার মন মানসিকতা হাজার গুণ উন্নত’

লিখেছেন...admin...মে 15, 2017 , 3:46 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: মাসুম আহমেদ আদি, বইপোকা গ্রুপের এডমিন, সাপোর্ট সফটওয়্যার ইঞ্জিনয়ার, কিংবা পরিচিত সব পরিচয় বাদ দিয়ে একদম অপরিচিত মানুষদের জন্য কি পরিচয় দিবেন?

আদি: আমি সেক্ষেত্রে শুধু একটা পরিচয়ই দিবো, আমি প্রচুর পরিমাণে বই পড়ি। আমি টুক টাক লিখি। তবে লিখালিখির পরিচয়টা এখুনি দিতে চাচ্ছি না। কিছু গল্প করেছি, কিছু অনুবাদ করেছি। তবে আমি বই পোকা পরিচয়টাই দিতে চাই, আমি বই পড়ি, রিভিউ লিখি।

 

খোশগল্প.কম: মানবীয় দিক নিয়ে একজন মানুষ তৈরী হয়। আপনার মানবীয় পরিচয় কি বলবেন?

আদি: জন্ম এবং বেড়ে ওঠা নরসিংদীতে। জন্ম ১৯৮৮ তে, অনেকেই ক্ষ্যাপায় এটা নিয়ে আমাকে যে বন্যার পানিতে ভেসে আসছি হাঁ হাঁ হাঁ। আমার ফ্যামিলিতে এটাকে ব্লেসিং হিসেবে নেয় যে আমি আসার পর বন্যার পানি নেমে গেছে। ইন্টার পর্যন্ত করেছি নরসিংদী থেকে। বইয়ের সঙ্গে আমার সখ্য ক্লাস টু থেকে। আমি যখন বাড়ি ছিলাম, আমার দাদার কাছে থাকতাম। বাবা-মা, বোন ঢাকায় থাকতো। প্রতি বছর ফাইনাল পরীক্ষা শেষে যে লম্বা ছুটি পেতাম তখন একা একা ঢাকায় চলে আসতাম। আমার মা আমার জন্য পাঁচ টাকার কয়েন জমাতো, আমি আসার সময় আমাকে দিতো। তখন পাঁচ টাকার কয়েন নতুন বের হইছে। ক্লাস টু’তে একবার ফিরে যাওয়ার সময় কমলাপুরে যে বুক স্টল থাকে ওখানে অনেক রকমের বই। আমি তো বাইরের বই তখনো পড়ি নি, আর পড়ার বই অতো সুন্দর হয় না তখন একটা ছোট বইয়ের প্রছদ দেখে খুব ভাল লাগলো। তখন সেটা নিলাম। সেটা তিন গোয়েন্দার একটা ভলিউম ছিল, আট না নয় যেন। আমি ঐটা পড়া শুরু করেছি ট্রেনে বসেই, পড়তে পড়তে আমার বাড়ির পর আরো দুই স্টেশন পার হয়ে গেছি! খেয়ালও করি নি! খেয়াল করার পর নামলাম। ঊঠার সময় তো মা তুলে গিয়েছে। কি করবো এখন? তারপরও আমি সাহস করলাম আমি আবার ঢাকায় যাবো, আমার সব টাকায় যে কয়টা বই পাবো সবগুলা নিয়ে তারপর আবার আগের মত ফিরবো।  ক্লাস টু এর একটা বাচ্চার জন্য এটা কিন্তু রীতিমত একটা চ্যালেঞ্জ! তারপরও আমি চ্যালেঞ্জটা নিলাম। যখন ট্রেনে উঠবো ঢাকায় আসার জন্য তখন খেয়াল করলাম ওখানেও ওরকম দুইটা বুক স্টল আছে এবং ঐ সাইজের বই আছে হাঁ হাঁ হাঁ।  আমাকে আর পায় কে! তারপর তো সেবা প্রকাশনীর তিন গোয়েন্দা সিরিজ পড়া শুরু করলাম, এভাবেই আমার পড়া শুরু। এভাবেই চলতো, আমার মা টাকা দিতেন, সব টাকা দিয়ে আমি বই কিনে ফিরতাম। তারপর শার্লক হোমস ধরলাম। ক্লাস ফাইভে থাকতে শার্লক হোমস শেষ করেছি। তারপর থেকে বই এর সাথেই আছি। এখন চাকরিতে ঢোকার পর থেকে সময় একটু কম পাই। চাকরিতে ঢোকার আগে মোবাইল প্যান্ট পড়তাম, ঐ পকেটে সেবে প্রকাশনীর বই অনায়াসে থাকতে পারতো, সো যেখানে যেতাম বই থাকতো সঙ্গে।

 

খোশগল্প.কম: বইপোকা গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে হলো?

আদি: আমাদের একটা গ্রুপ আছে ফেসবুকে, ‘বইপোকারদের আড্ডাখানা’ । তখন পর্যন্ত আমি মনে করতাম, আমি অনেক জানি, আমি অনেক বই পড়ছি। ঐ গ্রুপে জয়েন করার পর দেখলাম যে আমি যত বই পড়েছি সেগুলো আসলে বিশাআআআল একটা বইয়ের সূচিপত্র মাত্র। এরকম পড়তে পড়তে একদিন আমার মনে হলো আমি যে বই পড়ছি এতে আমার একার লাভ হচ্ছে, অন্যদের তো এনকারেজ করতে পারছি না! বলতে খারাপ লাগলেও ফেসবুক, ক্ল্যাশ অব ক্ল্যান, হ্যাং আউটে আমরা এত ব্যস্ত যে বই ততখানি সময় পায় না। হুমায়ুন আহমেদের পরে তারা অনেকেই বই থেকে ডিসট্র্যাক হয়ে গেছে। আমি তখনো রিভিউ কি জিনিস বুঝতাম না। তারপর রিভিউ দেয়া শুরু করলাম নিজের মত করে। কাহিনী সংক্ষেপটা আমি আমার নিজের ঢঙে লিখি, কাহিনীতে টুইস্ট রাখি যেকারণে রিভিউটা ফ্রুটফুল হয়,  অনেকের উৎসাহ পেয়েছি। এখন মাসুম আহমেদ আদি নামে আমাকে যারা চিনে তারা রিভিউ রাইটার হিসেবেই চেনে। আমি গল্প লিখেছি, অনুবাদ করেছি সেগুলা পরে তবে রিভিউ আগে করেছি।

..18516072_641634779373119_129542625_n

খোশগল্প.কম: দুইটা প্রশ্ন, এখন আপনি কি ধরণের বই পছন্দ করছেন? আর আপনি বলছিলেন, আমি বই পড়ে আমি যে লাভটা পাচ্ছি তরুণরা পাচ্ছে না-আপনার কাছে লাভটা কি?

আদি: তিন গোয়ান্দা, হুমায়ুন, শরৎ পড়া শেষ। এর মধ্যে শ্রীকান্ত আমি ২৯ বার পড়েছি। বইটা আমার এত পছন্দের! আমি ৩য় খন্ড অর্ধেক পড়ে আর পড়ি না, পড়লেই শ্যাষ! প্রতিবার যেটা করি আগের বারের চেয়ে দুইটা পাতা বেশী পড়ি, ঐ পর্যন্ত মার্ক করে রাখি, আবার নতুন করে শুরু করে যখন পড়ি তারপরে আরও দুইটা পাতা বেশী পড়ি। 

 

খোশগল্প.কম: আচ্ছা আচ্ছা। এখন পর্যন্ত কি বই কভার করতে পারছেন?

আদি: না, এখনো এন্ডিং এ যেতে পারি নাই।

 

আগে কোন জনরা মেইন্টেইন করতাম না, যেটা পেতাম পড়তাম। একটা সময় দেখলাম যে রহস্য গল্প ছাড়া আমাকে অন্য কিছু টানে না, সো থ্রিলারই পড়ি। এই মূহুর্তে আমি ড. নীহাররঞ্জন গুপ্তের কালো ভ্রমর বইটা পড়ছি।

 

খোশগল্প.কম: আরেকটা প্রশ্ন, আমি বই পড়ে আমি যে লাভটা পাচ্ছি তরুণরা পাচ্ছে না-আপনার কাছে লাভটা কী?

আদি: আমার কাছে বই মনের খোরাক। আমি মনে প্রাণে মানি, একজন সাধারণ মানুষের মন মানসিকতা থেকে একজন বই পোকার মন মানসিকতা হাজার গুণ উন্নত। বই পড়ে আমার চিন্তা-ভাবনা চেইঞ্জ হইছে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ চেঞ্জ হইছে, কথা বলার ঢঙ চেইঞ্জ হইছে। বই পড়লে তরুণরা আদারস অকাজে সময় নষ্ট করার সময় তারা পাবে না, এজন্যই আমার রিভিউ লিখা।

..

খোশগল্প.কম: এই যে চাকরির ফাঁকেও গ্রুপে সময় দিচ্ছেন, রিভিউ লিখছেন, এগুলোর লং টার্ম গোল কি আপনার কাছে?

আদি: আমি যখন গ্রুপে জয়েন করি গ্রুপে মেম্বার ৬০ হাজার প্রায়,  প্রকৃত বই পোকা হয়তো ১০ হাজার। আমার চিন্তা ছিল মেম্বার না বাড়ুক,  পাঠক বাড়ুক। মেম্বার দিয়ে কি হবে, পাঠক বাড়ালেই আমাদের গোল ফিল আপ হবে। এখন আমাদের গ্রুপ মেম্বার প্রায় দেড় লাখ, এর মধ্যে আমার বিশ্বাস অন্তত ১ লাখ পাঠক আছেন। আড়ষ্টতার জন্য অনেকেই রিভিউ দেয় না, বাট একটিভ থাকে। এজন্য ধন্যবাদ দিতে হয় রকমারিকে, তারা আমাদের জন্য সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তারা একজন বেস্ট রিভিউ রাইটারকে ৫০০ টাকার বই উপহার দেয় এবং মাসে বেস্ট রিভিউ রাইটারকে ১ হাজার টাকার বই উপহার দে‍য়, এই যে বই দিয়েই বইকে উৎসাহিত করা এর আনন্দটা অনেক।

 

খোশগল্প.কম: আর ব্যক্তিগত স্বপ্ন?

আদি:আমি বইয়ের জন্য পিপাসার্ত, আমার স্বপ্ন এই অনুভূতিটা যেন আমাদের প্রতিটা তরুণের হয়, বইই যেন তাঁদের প্রধান ধ্যান হয়।

 

আরেকটা ব্যক্তিগত স্বপ্ন, ইংরেজী বইগুলোর পেছনে দুই লাইনের ছোট ছোট রিভিউ থাকে, যে বইটা এরকম প্লটের। আমার স্বপ্ন বাংলাদেশ থেকে ভবিষ্যতে যে মৌলিক থ্রিলারগুলো বের হবে সেগুলোর পেছনে আমার দু’লাইনের রিভিউ যাবে।

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত