টিম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ রাজশাহী  প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ অদম্য তরুণের গল্প। যারা ইতিমধ্যে  নিজেদের তৈরী গাড়ি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছে। তাঁদের সামনের প্রতিযোগীতা ‘স্টুডেন্ট ফর্মূলা জাপান’ যেখানে তারা সম্পূর্ণ  নিজেদের আইডিয়া তৈরী ফর্মুলা স্টুডেন্ট কার নিয়ে প্রতিনিধিত্ব করবে।

“আমাদের প্ল্যান হচ্ছে আমাদের দেশের জন্য গাড়ি নিয়ে কিছু করা, বাংলাদেশ যেন প্রোডাকশনে আসে, আমাদের দেশ থেকে যেন বলতে পারে আমরা পুরো একটা গাড়ি বানাইছি আমাদের নিজেদের কনসেপ্ট নিয়ে”- তাঁদের মুখেই শুনি তাঁদের গল্প….

‘একটা স্টুডেন্ট কিসে ভালো করবে সেটা যতক্ষণ সে না বোঝে তাঁকে দিয়ে কোনভাবেই বেস্ট আউটকাম পাওয়া যাবে না’

লিখেছেন...admin...মে 19, 2017 , 4:32 অপরাহ্ন

18120215_1511789618871967_1671119787_o

খোশগল্প.কম: আপনার ও আপনার টিমের পরিচিতি শুনি আগে।
সুমিত: আমি সুমিত কর্মকার, রুয়েটে পড়ছি, এখন আছি যন্ত্রকৌশল বিভাগে, চতুর্থ বর্ষে, অষ্টম সেমিস্টার। আমি এবং আমাদের টিম ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ কাজ করছি গাড়ি নিয়ে। আমি টিমের ক্যাপ্টেন আর শুরুতে আমরা ছিলাম আমি, রানা, অনিক, ফারহান, মামুন, শাফিন, মমিন , তাহমিদ ভাই মোট আটজন মেম্বার। এখন বেড়ে ২৫ জন হয়েছে। এখন আমাদের যে প্রজেক্টটা চলছে ‘ফর্মুলা স্টুডেন্ট জাপান’ এখানে আমরা একটা ফর্মূলা কার নিয়ে যাচ্ছি। এর আগে আমরা কম্পিট করেছি অফরোড ক্যাটাগরির ভেইকেল নিয়ে, যেটা ইন্ডিয়াতে হয়েছিল কোয়াড বাইক ডিজাইন চ্যালেঞ্জ-২০১৬। সেখানে বাংলাদেশ থেকে আমরাই একমাত্র টিম ছিলাম, সেখানে আমরা বেস্ট প্যাশনেট টিম এওয়ার্ড পাই। ওভার অল আমাদের র‍্যাংকিং আসছে ছয় নাম্বার।

 

স্কুল কলেজ সব জায়গায়ই আমার ব্যক্তিগতভাবে ইচ্ছা ছিল গাড়ি নিয়ে কিছু করার। এর পরে যখন ইউনিভার্সিটিতে আসি তখনো এরকম কাজ করার মত পরিবেশ পাই না। আর গাড়ি নিয়ে আমাদের দেশে খুবই কম কাজ হয়, বিশেষ করে স্টুডেন্ট লেভেলে… প্যাশন তো ছিলই আর ব্যাপারটা যখন রেসিং কার নিয়ে তখন অন্যরকম একটা ভালোবাসা কাজ করে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের অনেকেরই রেসিং কার নিয়ে ফ্যাসিনেশন ছিল, তো এরকম কিছু পাগল নিয়ে আমাদের কাজ যারা রিস্ক নিতে ভালবাসে।

একটা স্টুডেন্ট কিসে ভালো করবে সেটা নিজেই ভালো বোঝে, যতক্ষণ সে না বোঝে তাঁকে দিয়ে কোনভাবেই বেস্ট আউটকাম পাওয়া যাবে না। সে যখন ট্রায়াল দিতে দিতে টেস্টে পাশ করবে, নিজের প্রতি স্যাটিসফ্যাকশন ফিল করবে তখনই সে বেস্ট হবে।

 

খোশগল্প.কম: গাড়ি নিয়ে বলতে গাড়ির স্পেসিফিক কী নিয়ে আপনাদের কাজ -সহজ ভাবে শুনি
সুমিত: এটা হচ্ছে গাড়ির ডিজাইন নিয়ে। আমরা যে কাজটা করি নতুন ডিজাইন করি। আমাদের স্পেসিফিক ক্যাটাগরি দেয়া হয়, টুল দেয়া হয়, কিছু ক্রাইটেরিয়া দেয়া হয় সেইটার মধ্যে কাজ করে আমাদের প্রুফ করতে হয় যে আমাদের ডিজাইনটা পারফেক্ট বা ডিজাইনে কোন এরর থাকলে সেগুলা দেখাইতে হয়। আফটার অল আমাদের গাড়িটা ট্র্যাকে চালায় দেখাইতে হবে গাড়িটা কেমন চলতেছে।

 

আমাদের দেশে বলতে গেলে একটা মাত্র এমন কম্পিটিশন হয় যেখানে ফুয়েল এফিশিয়েন্ট কার নিয়ে কাজ করা হয়। অন্যান্য দেশে দেখা যাচ্ছে অফরোড ক্যাটাগরি ভেইকেল আছে, ফর্মূলা ওয়ানের স্টুডেন্ট ভার্শন যেটা ফর্মুলা স্টুডেন্ট কার। অফরোড বলতে আমি একটু ভেঙে বলি যেখানে কোন তৈরী রাস্তা নেই এসব রাস্তা; যেমন সী বীচে কিছু ভেইকেল চলে যেগুলাকে কোয়াড বাইক বলে। যেটার কথা বললাম যে কোয়াড বাইক ডিজাইন চ্যালেঞ্জ-২০১৬ পার্টিসিপেট করেছি। যেটা হয়েছে তামিলনাড়ুতে, চেন্নাই থেকে আরো ৭০০ কি. মি. দূরে কেসিটি কলেজ, যেখানে ওদের এই গাড়ির ট্র্যাক আছে, যেখানে শুধু এই ধরণের গাড়িরই কম্পিটিশন হয়। আমাদের ঐরকম একটা দুর্গম রাস্তা তৈরী করে দেয়া হয়েছিল যেখানে আমাদের গাড়িটা পারফরম্যান্স করে দেখাবে, ব্যাকগ্রাউন্ডে আরো অনেক কিছু মেইন্টেইন করতে হয়।

 

সবশেষে গিয়ে বিজনেস, আমি যে গাড়িটা মার্কেটে আনতে চাই আমার কাছে প্রুফ অব কনসেপ্টটা কি, আমার ইনভেস্টের বিপরীতে প্রফিট কত হবে এরকম একটা বিজনেস প্রেজেন্টেশন দিতে হয়। এইটা সব কম্পিটিশনের কমন ব্যাপার, আমাকে শুধু গাড়ি বানালেই হবে না, গাড়িটা মার্কেটে কেমন চলবে, পারফর্ম করবে সেটাও আমাকে পারফর্ম করে দেখাতে হবে। সো এটাও একটা বড় দিক আমাদের শুধু ইঞ্জিনিয়ারিংই না, ম্যানেজমেন্ট, বিজনেস আরো অনেক কিছু হ্যান্ডেল করে প্রেজেন্টেশন দিতে হয়।

 

খোশগল্প.কম: কম্পিটিশন এটেন্ড করা বা গাড়ি তৈরির কস্ট কিংবা স্পনসর এগুলা কীভাবে ম্যানেজ করতেন যেহেতু সবাই স্টুডেন্ট?
সুমিত: আমাদের দেশে স্পনসর পাওয়া একটা বড় সমস্যা, গাড়ি বানানো আসলেও কস্টলি ম্যাটার। আমরা যখন স্পনসর পাওয়ার জন্য কারো কাছে যাই তাঁদেরকে কনভিন্স করা একটা বড় সমস্যা যেহেতু এইটার ইমিডিয়েট কোন প্রফিট নাই। আমরা নিজেরা টাকা দিয়েছি, কিংবা লোনের উপর দিয়ে গেছে, টিউশনির টাকা দিয়ে করছি, ক্যাম্পাসে সিনিয়র বড় ভাইরা ছিলেন এভাবেই এই পর্যন্ত আসা।

 

খোশগল্প.কম: স্পনসরশিপ কেন পাওয়া যায় না- আপনার অভিজ্ঞতা কী বলে?
সুমিত: প্রথম কারণ, আমরা কাজটা শুরু করছি মাত্র, অটোমোবাইল ডিজাইনে আমাদের দেশে রিস্ক নিতে চায় না, এখানে কেউ নতুন ডিজাইন করতে চায় না, রিম্যানুফ্যাকচার করবো অথবা ইমপোর্ট করবো এইটাতে প্রফিট বেশী, রিস্ক কম। সো এই মেন্টালিটির কারণে আমাদের দেশে বাংলাদেশী কোন গাড়ি আমরা দেখতে পাই না। এই যে আমরা রাজশাহী থাকি, মিটিং বা স্পনশরশিপ ম্যানেজের জন্য ঢাকায় আসতে হচ্ছে। তারপরও আমরা ফিরে যাই না, লেগে আছি, কাজটা আমাদের করতে হবে।

 

চেন্নাইতে যখন আমরা যাই তখন আমরা সবাই ভিসা পাই না, ১২ জন যেতে পারি, ইভেন আমাদের গাড়িটা বর্ডারে আটকে দেয়া হয়, বাংলাদেশ থেকে ক্লিয়ারেন্স পাই কিন্তু ইন্ডিয়ান কাস্টমস সেটা এক্সেপ্ট করে না। পরে অনেক রিকোয়েস্ট করে গাড়ি নিয়ে যেতে দিলেও সেফটি ইস্যুতে আমাদের টুলস আটকে দেয়, যেগুলা আমাদের বাংলাদেশে রেখে যেতে হয়। পরে যখন আমরা কম্পিটিশনে এটেন্ড করি তখন দেখি যে সব টিমের পর্যাপ্ত মেম্বার, আলাদা আলাদা টুলস সেট, নাটস, এভ্রিথিং নিয়ে তারা কাজ করছে, কিন্তু আমাদের পিট(গাড়ি ও যন্ত্রাংশ রাখতে প্রতি দলের জন্য বরাদ্দ জায়গা) খালি! পরবর্তীতে ওরা যখন দেখলো ওরা যেচে এসে আমাদের যথেষ্ট কনসিডার করে, টুলস দিয়ে হেলপ করে, আমাদের আলাদা সময় দেয়। এই ব্যাপারগুলাই পরে কাজগুলো করার জন্য অনেক উৎসাহ দেয়।

 

খোশগল্প.কম: আপনাদের সামনে আরেকটা কম্পিটিশনের কথা বলছিলেন…
সুমিত: সামনে ‘ফর্মূলা ওয়ার্ল্ড জাপান’ । এইটাকে বলা হয় স্টুডেন্ট লেভেলের সবচেয়ে বড় রেসিং কার কম্পিটিশন। এইটা এক সিটের একটা গাড়ি, এইখানে কিছু টেস্ট থাকে যেমন কত দ্রুত সে স্পীড তুলতে পারে, ব্রেকিং এর জন্য তার কতটা পারফরম্যান্স আছে, রোড কন্ডিশন খারাপ হলে গাড়িটা কীভাবে হ্যান্ডেল করতেছে। আফটার অল বিজনেস তো আছেই, কস্ট কত, পার্টসগুলো কোথা থেকে কিনছি, কেন নিয়েছি এরকম অনেক কিছু আমাদের প্রুফ করতে হয়।

 

খোশগল্প.কম: গাড়ির বানাবো এই আইডিয়ার সাথে কাজ শুরু করলেন কখন থেকে? অটোমোবাইল বেসিক নলেজ এইগুলায় নিজেদের এক্সপার্ট করে তুললেন কীভাবে?
সুমিত: সত্যি বলতে অটোমোবাইল নিয়ে আমাদের একটা মাত্র কোর্স আছে, সেটা সামনের সেমিস্টারে। আমরা প্রথম একসাথে হই সেকেন্ড ইয়ারে। প্রথমে, ‘ভ্যালু ইনোভেশন’ নামে একটা চ্যালেঞ্জ যেটা ফ্রান্সে হয়, সেখানে আমরা আমাদের আইডিয়া দিয়ে অনলাইনে পার্টিসিপেট করি যেখানে আমাদের আইডিয়া শর্ট লিস্টেড হয়। এর পরে আমাদের মনে হয় আমাদের আইডিয়া দিয়েই আমরা একটা গাড়ি কেন না বানাই? তারপরে আমরা একটা এটেম্পট নিই।

 

তখন আমাদের আইডিয়াটা ছিল ভেইকেল সিকিউরিটি নিয়ে , ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে ফোনের সাথে ইন্ট্রিগ্রেট করে। তারপরে ইয়ুথ ফেস্টে আমরা চ্যাম্পিয়ন হই রাজশাহী জোনে। আমাদের কাজ ছিল ফার্স্টে অটোমোবাইল আইডিয়া নিয়ে। তারপরে আমরা চিন্তা করি আমরা আমাদের আইডিয়ায় আমাদেরই গাড়ি নিয়ে কম্পিটিশনে পার্টিসিপেট করবো।

 

আমাদের টিম ছিল প্রথমে আটজনের, এখন আমাদের মেম্বার ২৫ জন। শুরুতে আমরা ক্লাসমেট আর একজন সিনিয়র ছিলেন। এখন আমাদের টিমে সব ইয়ারের, ইভেন অন্য ডিপার্টমেন্টেরও স্টুডেন্ট আছে।

 

খোশগল্প.কম: আরেকটা ব্যাপার আপনারা কাজ করছেন দেশে কিন্তু এক্সপোজারগুলো সব বাইরে-কারণ কী?
সুমিত: কারণ আমাদের এইরকম কোন কম্পিটিশন হয় না। আর আমাদের দেশে ক্রয়ক্ষমতা আর ক্রয় করতে ইচ্ছুক এই দুটো মিলিয়ে আমাদের দেশে মানুষ ইম্পোর্টেড কার অথবা রিকন্ডিশন্ড কার ইউজ করে। এই কনসেপ্ট থেকে বের করে আনতে হইলে আমাদের ওয়ার্ল্ড ক্লাস প্রোডাক্ট বানাইতে হবে, ওয়ার্ল্ডে পরিচিত পাইতে হবে; তখন আমাদের দেশে বলবে হ্যাঁ এইটা ওইয়ার্ল্ড রিকগনাইজড একটা ব্র্যান্ড সো আমরা কিনতে পারি!

 

এইখানে সবার জন্য বলে রাখি, আমরা রেসিং কার নিয়ে কাজ করছি তবে রেসিং কার কিন্তু কেউ কিনবে না, রেসিং কারের মূল্য কয়েক মিলিয়ন ডলার। আসলে রেসিং কার মানেই হচ্ছে রিসার্চ, গাড়ির উপর প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কনসেপ্ট নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করা, তারপর সেটা ট্র্যাকে রান করে। ওখানে গাড়ির বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো থেকে জাজ হিসেবে আসেন তারা ঐ কনসেপ্টটাকে প্রোডাকশন কারে নেয়ার প্ল্যান থাকে তাঁদের। কনসেপ্টটা হইতে পারে কত লাইট ওয়েটের গাড়ি আমি বানাতে পারতেছি, কত তাড়াতাড়ি এক্সিলারেশন হচ্ছে, বডির ডিজাইন। আরো একটা ব্যাপার যেমন এরো-ডায়নামিক (বাতাসের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে গাড়িকে ট্র্যাকের সাথে ধরে রাখে) এইটা প্লেনে টেক-অফ করে তখন এই জিনিসটা কাজে আসে। আমাদের এই রেসিং কারে বাতাসের এই এফিশিয়েন্সিটাকে আমরা ব্যাবহার করবো।

 

সো বাইরে এইরকম একটা বিষয়কে নিয়ে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করার যে সুযোগ এটাও আমাদের অনেক বড় পাওয়া। আরেকটা ব্যাপার আমরা ৬ জন শুধু ড্রাইভার থাকবো, যার মধ্যে একজন জুনিয়র মেয়ে আছে সেও ড্রাইভ করবে। বলতে গেলে সেই বাংলাদেশের প্রথম নারী ফর্মুলা ড্রাইভার।

 

আমাদের অনেক দূরের প্ল্যান হচ্ছে আমাদের দেশের জন্য গাড়ি নিয়ে কিছু করা, বাংলাদেশ যেন প্রোডাকশনে আসে, আমাদের দেশ থেকে যেন বলতে পারে আমরা পুরো একটা গাড়ি বানাইছি আমাদের নিজেদের কনসেপ্ট নিয়ে। আমরা জানি এই স্বপ্ন অনেক দিনের ব্যাপার, অনেক সময়ের ব্যাপার, অনেক টাকার ব্যাপার, আমরা চেষ্টা করবো আমাদের স্বপ্ন পূরণ করতে।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত