ম্যানোলিন, এক তরুণ উদ্যমী যুবক জেলে। পাঁচ বছর বয়স থেকে বয়ষ্ক জেলেদের নৌকাতে থেকে যে মাছ ধরা শিখেছে। ছোটবেলা থেকে ম্যানোলিন যার সাথে ছিলো, পুরো জীবনটাই তার সাথে থাকতে চেয়েছিলো। কিন্তু অপয়া ভেবে তার বাবা মা তাকে নৌকো পাল্টাতে বাধ্য করে।

 

এই গল্পের নায়ক সান্তিয়াগো। এক আজব বুড়ো। তার যুদ্ধের, তারুণ্যের, শক্তির সমস্ত গল্পকে ছাপিয়ে কথাসাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে যে অমর উক্তি, “A man can be destroyed but not defeated.” সান্তিয়াগো নাকি হেমিংওয়ে নিজেই নায়ক এই গল্পের? অনেকেই মনে করেন, এই বইটি হেমিংওয়ের একধরণের অটোবায়োগ্রাফি! ১৯৪০ থেকে প্রায় একযুগ হেমিংওয়ের কোন বই প্রকাশিত না হওয়ায় সাহিত্যক্ষেত্রে তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে যখন সবাই অনিশ্চিত, তখন ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হল ‘এ্যাক্রস দি রিভার এ্যাণ্ড ইনটু দি ট্রীজ’। সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ পাঠক হতাশার সঙ্গে ঘোষণা করলেন যে, এবারে সত্যিই শিল্পী হেমিংওয়ের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু তারাই এরপরে ১৯৫২ সালে তাঁর শ্রেষ্ঠতম কীর্তি ‘দি ওল্ড ম্যান এ্যাণ্ড দি সী’র আবির্ভাব লক্ষ্য করলেন। জনৈক সমালোচকের বিবেচনায় ‘হেমিংওয়ের শ্রেষ্ঠ রচনাসমূহের যে বিষয় তার অনেকগুলিই আমরা এই অনবদ্য গ্রন্থটিতে দেখতে পাই ‘।

আমরা কথা বলেছিলাম The Old Man and the Sea –এর দ্বিতীয় প্রধান চরিত্র ম্যানোলিনের সাথে-

সান্তিয়াগোর জন্ম হয়েছে জেলে হবার জন্য, যেমন মাছের জন্ম হয়েছে মাছ হবার জন্য

লিখেছেন...admin...মে 23, 2017 , 4:29 অপরাহ্ন

old mn d sea

খোশগল্প.কম: ম্যানোলিন, পুরো সমুদ্রযাত্রায় বারবারই সান্তিয়াগো তোমাকে মনে করছিলো। প্রত্যেকটা সমস্যায়, কোন একটা বিশেষ ঘটনায় সান্তিয়াগোর বারবার শুধু তোমাকেই মনে পড়েছে। তোমার দৃষ্টিকোণ থেকে, তার জীবনে তোমার জায়গাটা আসলে কি ছিলো?

ম্যানোলিন: এই সমুদ্রযাত্রায় সমুদ্রের সাথে যুদ্ধের গল্পের পাশাপাশি ব্যক্তি সান্তিয়াগো যে কি ভয়াবহ নিঃসঙ্গ সেটাও ফুটে উঠেছে। সে একজন নায়ক, কিন্তু সব হারিয়ে যখন সে বাড়ি ফিরছে সেই মুহূর্তটাতেও পাশে থাকার মত কেউ তার জীবনে নেই, একজন নারী নেই, কোন বংশধর নেই। আমার সাথে তার সম্পর্কটা অনেকটাই পিতা আর সন্তানের। কিংবা আমি হয়তো তার জীবনের একটা আশাবাদ। স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার কোন উপায়। সে কিন্তু পুরো সমুদ্রযাত্রায় কখনোই চুপ করে থাকেনি, কখনও পাখিকে কখনও মাছকে নিজের সঙ্গী ভেবে নিয়েছে। তাদের সাথে আপনজনের মত পরিচিত গলায় আদুরে ভঙ্গিতে কথা বলেছে। হতে পারে তার নিঃসঙ্গ জীবনে প্রকৃতিকে সাথে নিতে চেয়েছে সে।

 

খোশগল্প.কম: প্রকৃতিকে সাথে নিয়ে চলার কথা বলছিলে। সান্তিয়াগোর দেখার চোখটাই একটু অন্যরকম, না?

ম্যানোলিন: সে এক আজব বুড়ো! সে সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে পাখিদের জন্য ভারী কষ্ট পায়। সে ভাবে- পাখিগুলোর জীবন বেশ কষ্টের। সাগর যখন এত নিষ্ঠুর হতে পারে তখন ওই সামুদ্রিক সোয়ালোর মত অত সূক্ষ্ণ কোমল পাখি তৈরি করা কেন? সমুদ্র সুন্দর, কিন্তু সে ভীষণ নিষ্ঠুর হয়ে উঠতে পারে এবং অত্যন্ত আকস্মিকভাবে, আর ওই পাখিগুলো যেগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে, ডুব দিচ্ছে হুট করে, শিকার খুঁজছে, যাদের কন্ঠস্বর ক্ষীণ ও বিষাদমাখা- তাদের ডুবিয়ে মারতে পারে। সমুদ্রের জন্য তারা বড় বেশি হাল্কা ভঙ্গুরভাবে তৈরি। একবার আমরা একটা মার্লিন মাছকে ধরলাম। সান্তিয়াগো কিছুতেই তাকে ‘শুধু একটা মাছ’ হিসেবে ভাবতে পারেনি। সে মাছটিকে আরেকজনের সঙ্গী, ভালোবাসা হিসেবে ভেবে নিলো। সে বললো- পুরুষ মাছ সবসময়ই মেয়ে মাছকে আগে খেতে দেয়। বর্শিতে গাঁথা পড়ে আতঙ্কবিহ্বল মেয়ে মাছটা পাগলের মতো হুটোপুটি করেছিল, এ যুদ্ধে তার জিতবার কোনো আশা নেই বুঝতে পারার অল্পক্ষণের মধ্যে সে নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। আর ওই সময় পুরুষ মাছটা ছিল তার কাছাকাছি। কেটেকুটে খেয়ে ফেলার আগে সে মাছের কাছে ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছিলো।

 

খোশগল্প.কম: একদিন, দু’দিন নয়। নিঃসঙ্গ বিশাল সমুদ্রের মধ্যে দীর্ঘ চুরাশিটি দিন-একা একা- পানি নেই, খাবার নেই, শুধু একটা মাত্র মাছ ধরার জন্য এতো যুদ্ধ!

ম্যানোলিন: এটা শুধু ‘একটা মাছ’ই ছিল না। জেলে সান্তিয়াগোর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন ছিলো এটা। তার অবিচল অপরাজিত দুঃসাহসী শক্তির জয় এটা। মাছটা ছিলো এক যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী, যাকে পরাজিত করতে পারাটা সর্বোচ্চ বীরত্বের এক অবিশ্বাস্য কৃতিত্ব। সান্তিয়াগোর জেলে অস্তিত্বের সর্বোচ্চ সার্থকতা।

 

খোশগল্প.কম: মাছটাকে সান্তিয়াগো একবারও শত্রু বলে ভাবতে পারেনি।

ম্যানোলিন: নাহ! এই মাছটিকে হত্যা করা তার কাছে চাঁদ কিংবা সূযকে হত্যা করার মতই যন্ত্রণাকর ছিলো। সান্তিয়াগোর সাথে তার দ্বৈরথ শুধু এক জায়গাতেই। সান্তিয়াগোর জন্ম হয়েছে জেলে হবার জন্য, যেমন মাছের জন্ম হয়েছে মাছ হবার জন্য। সে বারবারই বলেছে ’মাছ’, ‘আমি তোমাকে ভালবাসি, তোমাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি। তবু আজকের দিন শেষ হবার আগেই আমি তোমাকে মেরে ফেলব’।

 

খোশগল্প.কম: সাধারণত দুই পক্ষের যুদ্ধে, এক পক্ষকে নায়ক আরেক পক্ষকে ভিলেন হিসেবেই আমরা ধরে নেই। এই গল্পে মাছটি যদি ভিলেন না হয়, তাহলে যুদ্ধটা কার সাথে কার?

ম্যানোলিন: এই যুদ্ধ নায়কের সাথে নায়কের। সমুদ্রের সবচেয়ে বড় মাছটির সাথে সমুদ্রের সবচেয়ে দুঃসাহসী জেলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে একে অপরকে ঘৃণা করার কোন বিষয় নেই।

 

খোশগল্প.কম: জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন এভাবে হারিয়ে ফেলাটা খুবই দুঃখজনক!

ম্যানোলিন: সান্তিয়াগো কিন্তু হারেনি। তার যুদ্ধ ছিলো মাছের সাথে, হাঙ্গরের সাথে নয়। মাছটিকে ঠিকভাবে নিয়ে না আসাটা তার একা আসার সিদ্ধান্তের খেসারত হতে পারে, তার ব্যক্তিগত শক্তি হয়তো অর্জনটাকে স্হায়ীত্ব দিতে পারেনি, যা সামষ্টিক শক্তি দিতে পারতো। কিন্তু তার যুদ্ধে সে জয়ী হয়েছিলো। সান্তিয়াগো বলেছিলো, “A man can be destroyed but not defeated.”

 

খোশগল্প.কম: মাছের কঙ্কালটা ভেসে যাওয়ার আগে দুইজন ট্যুরিস্ট তা দেখে হাঙ্গর বলে মন্তব্য করে। এই অপার্থিব বিজয়ের কাহিনীটা জানলো না তারা!

ম্যানোলিন: ট্যুরিস্ট দু’জন হচ্ছে সাধারণ জনতার প্রতিমূর্তি, যে কাজের ফলাফল দেখে কাজটা কত বড় তা দেখে না

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত