মনোজ। ক্লাস এইটে পড়ে। লেখাপড়ার পাশাপাশি দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলে সে। ক্লাস এইটের ক্যাপটেনও সে।

লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ছোটদের জন্য লেখা প্রথম উপন্যাস ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’। ১৯৭৮ সালে প্রথমবার প্রকাশিত হয় এটি। এই উপন্যাসের শেষ দিকে একটা দৃশ্য আছে , যেখানে ভজবাবু ডাকাতের দল নিয়ে রাজবাড়ি লুট করতে যাচ্ছেন , সেই দৃশ্যে ভজবাবুর মুখে কিছু গান রয়েছে । এই গানগুলি লিখে দিয়েছেন বিখ্যাত কবি শ্রী নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ।

তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শখ হল অবসর সময়ে আপনমনে টাকা গোনা

লিখেছেন...admin...জুলাই 5, 2017 , 3:14 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম:  মনোজ, তোমাদের বাড়িতে কে কে আছেন?

মনোজ: আমাদের বাড়িতে অনেক লোক। ঠাকুমা, বাবার এক বুড়ি পিসি, মা, বাবা, দুই কাকা, দিদি, দাদা, দুটো ডলপুতুলের মতো ছোট ভাইবোন। তা ছাড়া বিস্তর বাইরের লোকজনের রোজ আসা-যাওয়া তো আছেই। যেমন পুরুতমশাই সতীশ ভরদ্বাজ, মাস্টারমশাই দুঃখহরণবাবু, দিদির গানের মাস্টারমশাই গণেশ ঘোষাল, এমনি আরও কত কে!

 

খোশগল্প.কম:  মাস্টারমশাই দুঃখহরণ তোমাদের সব বিষয়ই পড়ান?

মনোজ: তা উনি সব বিষয়েই পাকা তবে একটা মাত্র মুশকিল উবু হয়ে না-বসলে দুঃখহরণবাবু পড়াতে পারেন না। যদি কেউ তাঁকে আসন-পিঁড়ি করে বসিয়ে দেয় বা চেয়ারে পা ঝুলিয়ে বসতে বলেন, তা হলেই দুঃখহরণবাবুর বড় বিপদ।

 

খোশগল্প.কম:  বিপদ! কিসের বিপদ?

মনোজ: তখন তিনি অঙ্ক ভুল করেন, ইতিহাসের সঙ্গে ভূগোল গুলিয়ে ফেলেন, ইংরেজি ট্রানস্লেশন করতে হিমসিম খান। যেই উবু হয়ে বসলেন, অমনি তাঁর আঙুল দিয়ে পেনসিল বেয়ে হড়হড় করে অঙ্ক, ট্রানস্লেশন, জ্যামিতি সব নেমে আসতে থাকে, মুখে খই ফোটে ইতিহাস আর ভূগোলের।

 

সকালবেলাতেই দুঃখহরণবাবুর বিপদ। সেই সময়টায় আমার বাবা পড়ার ঘরে এসে বসে গম্ভীরভাবে খবরের কাগজ পড়েন। তিনি ভীষণ রাশভারী লোক, বাড়ির কুকুরটা বেড়ালটা পর্যন্ত তাকে ভয় খায়, বাড়ির লোকজনের তো কথাই নেই। তিনি খুবই কড়া ধাতের লোক, আদবকায়দার নড়চড় দেখলে খুব রাগ করেন। তাই সে সময়টায় দুঃখহরণবাবুকে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে হয়। আর ওই এক ঘন্টায় দুঃখহরণবাবু রাজ্যের ভুলভাল করতে থাকেন। একদিন তিনি ওই অবস্থায় ট্রানস্লেশন করতে গিয়ে ‘তখন হলঘর ভরিয়ে গিয়াছে’ এই বাক্যটার ইংরেজি করলেন ‘বাই দেন দি হল রুম ওয়াজ ফুলফিলড’। এই ইংরেজি শুনে বাবা তাঁর ইংরেজি খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে বিরক্ত হয়ে তাকালেন। ছেলেমেয়ের সামনে মাস্টারমশাইয়ের ভুল ধরলে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা কমে যেতে পারে, সেই জন্য বললেন, ‘দুঃখবাবু, ইংরিজিটা ঠিকই আছে, তবে একটু কানে কেমন যেন লাগছে। আর একবার অন্যভাবে করুন।’ কিন্তু দুঃখহরণবাবু পা ঝুলিয়ে বসে আছেন যে, তার উপর বাবার কথা শুনে আরও ঘাবড়ে গিয়ে খুব শক্ত ইংরেজিতে বললেন, ‘দি হল’স ফুলফিলমেন্ট ওয়াজ অ্যাচিভড বাই দেন’।

 

খোশগল্প.কম:  বাহ! বেশ মজার ব্যাপার। গানের মাস্টার গণেশবাবুর আবার এমন কোন বাতিক নেই তো !

মনোজ: উনি মোটামুটি ঠিকঠাকই আছেন, সমস্যা একটাই মাসের মধ্যে দু-তিনবার তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করে থাকেন।একবার হলো কি দুঃখহরণবাবু মাস্টারমশাই গণেশ ঘোষালের ঘরে গেলেন দুটো গল্প করতে। গিয়ে দেখেন তিনি আত্মহত্যা করবেন বলে চালের বিমের সঙ্গে একটা মোটা দড়ির ফাঁস ঝুলিয়ে দড়িটা টেনেটুনে দেখছেন।

দুঃখবাবু দড়িটা দেখে বললেন, ‘ভাল বাঁধা হয়নি।’

গণেশবাবু ফাঁসটা ধরে একটু ঝুল খেয়ে বললেন, ‘না, দিব্যি শক্ত হয়েছে।’

দুঃখবাবু মাথা নেড়ে বললেন, ‘দড়িটাও বেশ পুরনো, মাঝখানে ফেঁসো বেরিয়ে আছে। ফাঁস গলায় দিয়ে ঝুলবার সময়ে যদি দড়ি ছিঁড়ে যায় তো পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙবে।’

গণেশবাবু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন,’ভাঙে ভাঙুক। ভারী তো তুচ্ছ হাত-পা। মরতে গেলে হাত-পায়ের চিন্তা করলে চলে না মশাই।’

দুঃখবাবু ভেবে চিন্তে বলেন, ‘সে অবশ্য ঠিক। দড়িটা কি গোয়াল থেকে আনলেন নাকি?’

গণেশবাবু মাথা নেড়ে বললেন,  ‘হ্যাঁ। গোরুর গলা থেকে খুলে এনেছি। বদমাশ গোরুটা ঢুসিয়ে দিতে এসেছিল, কোনওক্রমে বেরিয়ে এসে দরজার ঝাঁপটা টেনে দিয়েছিলাম ভাগ্যিস।’

এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে।

 

ManojderAdvutBari_Page_018_zps794d3a5c

 

খোশগল্প.কম:  গোয়েন্দা বরদাচরণ তো হরিণগরের রাজকুমার কন্দর্পনারায়ণকে খুঁজে বের করার কেস নিয়ে কাজ করছিলেন। পুরো ঘটনাটা খুলে বলতো!

মনোজ: ব্যাপারটা হল, হরিণগরের রাজা গোবিন্দনারায়ণের একমাত্র ছেলে কন্দর্পনারায়ণ খুব অল্প বয়সে হারিয়ে যায়। সন্দেহ করা হয়, কন্দর্পনারায়ণকে কোনও দুষ্ট লোক চুরি করে নিয়ে যায়। সে প্রায় দশ বছর আগেকার কথা। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কন্দর্পনারায়ণের খোঁজে হাজারটা লোক লাগানো হয়েছে। পুলিশ থেকে তো প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়েছেই। কিন্তু ছেলেটার খোঁজ পাওয়া একটু কঠিন হয়েছে, কারণ, কন্দর্পনারায়ণের যে-সব ফটোগ্রাফ তোলা হয়েছিল সেগুলো রাজবাড়ির কয়েকটা অ্যালবামে লাগানো ছিল। কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে সঙ্গে সেই সব অ্যালবামও উধাও। যারা কন্দর্পনারায়ণকে চুরি করেছে তারা খুবই চালাক লোক। তারা জানে, ছবি না-থাকলে কন্দর্পনারায়ণের খোঁজ করা খুবই মুশকিল হবে। কেননা কন্দর্পনারায়ণকে তো আর সবাই দেখেনি। রাজবাড়িতে বা অন্য কোথাও যুবরাজ কন্দর্পনারায়ণের কোনও ছবিই নেই। ফলে যারা হারানো রাজকুমারের খোঁজ করছে তারা যাকে-তাকে রাজকুমার ভেবে ধরে ধরে রাজবাড়িতে নিয়ে এসেছে এতকাল। এ পর্যন্ত প্রায় কয়েক হাজার ছেলেকে এইভাবে রাজবাড়িতে হাজির করা হয়েছে। তাতে খুব গণ্ডগোল হয়। যে-সব ছেলেদের ধরে আনা হয়েছিল তাদের বাপ-মাও এই নিয়ে খুব হইচই করে। এদিকে রাজা গোবিন্দনারায়ণ, রানি অম্বিকা এবং রাজার মা মহারানি হেমময়ী রাজকুমারের জন্য পাগলের মতো হয়ে গেছেন। মজার ব্যাপার হলো, কন্দর্পনারায়ণকে চুরি করা হলেও খুন করা হয়নি। কন্দর্পনারায়ণ যেখানেই থাক, সে বেঁচেই আছে। কারণ, সে চুরি যাওয়ার পর থেকে প্রতি বছর গোবিন্দনারায়নের নামে একটা করে চিঠি আসে। চিঠিগুলো লেখে কন্দর্পনারায়ণ নিজেই। কিংবা ছেলে-চোরেরা তাকে দিয়ে চিঠি লেখায়। তাতে শুধু একটা কথাই লেখা থাকে-বাবা আমার জন্য চিন্তা কোরো না। আমি ভাল আছি। ব্যস, আর কিছু থাকে না।

 

খোশগল্প.কম:  তবে বরদাচরণ যে বললেন, গোবিন্দনারায়ণ তাকে এ কাজের জন্য মাসে পাঁচশো টাকা করে দিচ্ছেন, তা ছাড়া, ছবি যার কাছে পাওয়া যাবে তাকে নগদ এক হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে- এ কথা কিন্তু তোমার বাবা একদম হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, হরিণগরের রাজাদের আর্থিক অবস্থা ভাল না। বছর দুই আগেও তিনি দেখে এসেছেন, রাজমাতা হেমময়ী দরবার-ঘরের বাইরের দেওয়ালে ঘুঁটে দিচ্ছেন। রাজা গোবিন্দনারায়ণ শশা খাচ্ছেন। আর রানি অম্বিকা বাগানের জঙ্গল থেকে কচুর শাক তুলছেন। আসল ঘটনা কী, বলতো দেখি!

মনোজরাজা গোবিন্দনারায়ণ বড় কৃপণ মানুষ। তিনি নিজে কখনও প্রাণে ধরে ভাল-মন্দ খান না, কাউকে খাওয়াতে ভালবাসেন না। রাজা হয়েও তিনি ছেঁড়া জামাকাপড় সেলাই করে পরেন। বাবুগিরি তিনি দুচক্ষে দেখতে পারেন না। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় শখ হল অবসর সময়ে আপনমনে টাকা গোনা। রাজবাড়ির গুপ্ত কুঠুরিতে লোহার সিন্দুক থেকে টাকা বের করে ঘন্টার পর ঘন্টা গোনেন। শোনা যায়, এক টাকার নোটে আর খুচরো পয়সায় দশ বিশ হাজার টাকা কয়েক ঘন্টায় গুনে ফেলতে পারেন। কিন্তু সে সব টাকা কেবল গোনার জন্যই।

 

ওদিকে রাজমাতার ভাল ঘুম হয় না। মাথায় রাজ্যের চিন্তা। সারাদিন ঘুঁটে দেন, সেই ঘুঁটে শুকিয়ে পাহাড়প্রমাণ জমিয়ে রাখেন। রাজমাতা ঘুঁটে বিক্রি করলে নিন্দে হবে, সেইজন্যে নিজে না বিক্রি করে বুড়ি দাসীকে দিয়ে বিক্রি করেন। তাতে বেশ দু পয়সা আয় হয় তাঁর। কিন্তু তিনি যতই গোপন করুন রাজ্যিসুদ্ধ সবাই জানে যে, রাজমাতার ঘুঁটের ব্যবসা আছে। ঘুঁটে অবশ্য তিনি ভালই দেন, সেজন্য লোকে তাঁর প্রশংসাও করে। রাজমাতার দুশ্চিন্তা হল সেই ঘুঁটে নিয়েই। কখন কোন ফাঁকে চোর এসে ঘুঁটে চুরি করে নিয়ে যায়, তা ভেবে রাতে তাঁর ঘুম হয় না।

 

খোশগল্প.কম:  তোমাদের মধ্যে কে প্রথম রাজকুমার কন্দর্পনারায়ণকে চিনতে পারে?

(একথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে মনোজ কেবল সরোজ আর পুতুলের দিকে তাকিয়ে খানিকটা হাসলো। কিছু বললো না।)

 

 

বইটি অনলাইনে কিনতে চাইলে

https://www.rokomari.com/book/42847

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত