শঙ্কর। একেবারে অজ পাড়াগাঁয়ের ছেলে। এইবার সবে এফ্.এ. পাশ দিয়ে গ্রামে এসেছে। স্কুলে পড়বার সময় সে বরাবর খেলাধূলোতে প্রথম হয়ে এসেছে। সেবার মহকুমার এক্‌জিবিসনের সময় হাইজাম্পে প্রথম স্থান অধিকার করে মেডেল পায়। ফুটবলে অমন সেন্টার ফরওয়ার্ড ও অঞ্চলে তখন কেউ ছিল না। সাঁতার দিতে তার জুড়ি খুঁজে মেলা ভার। গাছে উঠতে, ঘোড়ায় চড়তে, বক্সিং-এ সে অত্যন্ত নিপুণ। কলকাতায় পড়বার সময় ওয়াই, এম, সি,এ’তে সে রীতিমত বক্সিং অভ্যাস করেছে। এই সব কারণে পরীক্ষায় সে তত ভালো করতে পারেনি, দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু তার একটী বিষয়ে অদ্ভূত জ্ঞান ছিল। তার বাতিক ছিল যত রাজ্যের ম্যাপ ঘাঁটা ও বড় বড় ভূগোলের বই পড়া। ভূগোলের অঙ্ক কসতে সে খুব মজবুত। আকাশে যে সব নক্ষত্র মণ্ডল ওঠে, তা সে প্রায় সবই চেনে—ওটা কালপুরুষ, ওটা সপ্তর্ষি, ওটা ক্যাসিওপিয়া, ওটা বৃশ্চিক, কোন মাসে কোনটা ওঠে, কোনদিকে ওঠে—ওর সব নখ- দর্পণে।

১৩৪৪ সালে লেখা চাঁদের পাহাড়ে’র ভূমিকায় বিভূতিভূষণ বলেছেন “চাঁদের পাহাড় কোনও ইংরিজি উপন্যাসের অনুবাদ নয়, বা ঐ শ্রেণীর কোনও বিদেশী গল্পের ছায়াবলম্বনে লিখিত নয় । এই বই-এর গল্প ও চরিত্রগুলি আমার কল্পনা-প্রসূত । তবে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগলিক সংস্থান ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনাকে প্রকৃত অবস্থার অনুযায়ী করবার জন্যে আমি স্যার এইচ্‌. এইচ্‌. জনষ্টন্ (Sir Harry Johnston) Rosita Forbes প্রভৃতি কয়েকটি বিখ্যাত ভ্রমণকারীর পুস্তকের সাহায্য গ্রহণ করেছি।প্রসঙ্গক্রমে বলা যেতে পারে যে, এই গল্পে উল্লিখিত রিখটারস্‌ভেল্ড পর্ব্বতমালা মধ্য-আফ্রিকার অতি প্রসিদ্ধ পর্বতশ্রেণী, এবং ডিঙ্গোনেক (Rhodesian monster) ও বুনিপের প্রবাদ জুলুল্যাণ্ডের বহু আরণ্য-অঞ্চলে আজও প্রচলিত ।”

‘ এরপর দুরুদুরু বুকে তাঁকে চিঠি লিখলাম তিনি কি একটা চাকুরী করে দিতে পারেন তাঁদের রেলের মধ্যে? ‘

লিখেছেন...admin...জুলাই 9, 2017 , 3:29 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম:  বাবার অসুখ। টানাটানির সংসার। সব মিলিয়ে একেবারে বাধ্য হয়ে পাটকলে চাকরিটা করতে যাচ্ছিলেন।

শঙ্কর:  পাটকলে চাকরি করতে হবে, এ কথা ভাবতে গেলেই  সারা দেহ মন বিদ্রোহী হয়ে উঠতো—রেসের ঘোড়া শেষ কালে ছ্যাকড়া গাড়ী টানতে যাবে? আমার মন উড়ে যেতে চাইতো পৃথিবীর দূর, দূর দেশে শত দুঃসাহসিক কাজের মাঝখানে। লিভিংষ্টোন, ষ্ট্যানলির মত, হ্যারি জনষ্টন্, মার্কো পোলো, রবিনসন ক্রুসোর মত। এর জন্যে ছেলেবেলা থেকে নিজেকে তৈরি করছিলাম—যদিও এ কথা ভেবে দেখিনি অন্য দেশের ছেলেদের পক্ষে যা ঘটতে পারে, বাঙালী ছেলেদের পক্ষে তা ঘটা এক রকম অসম্ভব। তারা তৈরি হয়েছে কেরানী, স্কুলমাষ্টার, ডাক্তার বা উকিল হবার জন্যে। অজ্ঞাত অঞ্চলের অজ্ঞাত পথে পাড়ি দেওয়ার আশা তাদের পক্ষে নিতান্তই দুরাশা।

 

খোশগল্প.কম:  হুট করেই দূরদেশে যাওয়ার স্বপ্নপূরণের সুযোগ এলো!

শঙ্কর:  হুমমম….. সেদিন সকালবেলা একটু নদীর ধারে বেড়িয়ে এসে সবে বাড়িতে পা দিয়েছি, এমন সময় ও পাড়ার রামেশ্বর মুখুয্যের স্ত্রী এক টুকরো কাগজ নিয়ে এসে আমার হাতে দিয়ে বললেন—“বাবা শঙ্কর, আমার জামায়ের খোঁজ পাওয়া গেছে অনেকদিন পরে। ভদ্রেশ্বরে ওদের বাড়ীতে চিঠি দিয়েচে, কাল পিণ্টু সেখান থেকে এসেচে এই ঠিকানা তারা লিখে দিয়েচে। পড়তো বাবা?”

কাগজ খুলে দেখলাম লেখা আছে—প্রসাদ দাস বন্দ্যোপাধ্যায়, ইউগাণ্ডা রেলওয়ে হেড্‌ অফিস্‌, কন্‌ষ্ট্রাক্‌সন ডিপার্টমেন্ট, মোম্বাসা, পূর্ব্ব আফ্রিকা। ননীবালা দিদির এই স্বামী অত্যন্ত একরোখা ডানপিটে ও ভবঘুরে ধরণের। লোকটা খুব উদার প্রকৃতির, লেখাপড়া ভালোই জানে, তবে কোনো একটা চাকুরীতে বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না, উড়ে বেড়ানো স্বভাব। আর একবার পালিয়ে বর্ম্মা না চীন কোথায় যেন গিয়েছিল। এবারও বড় দাদার সঙ্গে কি নিয়ে মনোমালিন্য হওয়ার দরুণ বাড়ী থেকে পালিয়েছিল—এ খবর  আগেই শুনেছিলাম। সেই প্রসাদ বাবু পালিয়ে গিয়ে ঠেলে উঠেছে একেবারে পূর্ব্ব আফ্রিকায়! এরপর দুরুদুরু বুকে তাঁকে চিঠি লিখলাম তিনি কি একটা চাকুরী করে দিতে পারেন তাঁদের রেলের মধ্যে? উত্তর এলো।

 

খোশগল্প.কম:  প্রথমদিকে কেমন দিন কাটছিলো?

শঙ্কর:  নতুন দেশ, তরুণ তাজা মন— ইউগান্ডার এই নির্জ্জন মাঠ ও বনে নিজের স্বপ্নের সার্থকতাকে যেন খুঁজে পেলাম। কাজ শেষ হয়ে যেতেই তাঁবু থেকে রোজ বেরিয়ে পড়তাম—যেদিকে দু’চোখ যায় সেদিকে বেড়াতে বের হতাম—পূবে, পশ্চিমে, দক্ষিণে, উত্তরে। সব দিকেই লম্বা লম্বা ঘাস। কোথাও মানুষের মাথা সমান উঁচু, কোথাও তার চেয়েও উঁচু। পরে সিংহের উপদ্রবে সে জায়গায় আর থাকা হলো না।

 

খোশগল্প.কম:  স্টেশন মাস্টারের চাকরিতে সুবিধা করতে পারলেন?

শঙ্কর:  একদমই না। সেদিন বিকেলের ট্রেন রওনা করে দিয়ে নিজের কোয়ার্টারের রান্নাঘরে ঢুকতে যাচ্ছি এমন সময়ে খুঁটির গায়ে কি একটা দেখে তিন হাত লাফ দিয়ে পিছিয়ে এলাম— প্রকান্ড একটা হলদে খড়িশ গোখুরা আমাকে দেখে ফণা উদ্যত করে খুঁটি থেকে প্রায় এক হাত বাইরে মুখ বাড়িয়েছে! কিন্তু সাপটা পরমুহূর্ত্তে খুঁটি বেয়ে ওপোরে খড়ের চালের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। বেশ কান্ড বটে। ঐ ঘরে গিয়ে ভাত রাঁধতে বসতে হবে। এ সিংহ নয় যে দরজা বন্ধ করে আগুন জ্বেলে রাখবো।

 

খোশগল্প.কম:  দুঃসাহসী অভিযাত্রী আলভারেজের সাথে তো দেখা হলো। তার প্রথম হীরে খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা কেমন ছিলো?

শঙ্কর:  একবার এক কাফির সর্দ্দার এক ঘটনার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ একদিন ডুমুর ফলের মতো বড় সাদা পাথর জিম আর আলভারেজের হাতে এনে দিলো। তারপর বললো— “এটা তোমরা নিয়ে যাও । ঐ যে দূরের বড় পাহাড় দেখচো, ধোঁয়া ধোঁয়া— এখান থেকে হেঁটে গেলে একটা চাঁদের মধ্যে ওখানে পৌঁছে যাবে । ঐ পাহাড়ের মধ্যে এ রকম সাদা পাথর অনেক আছে বলে শুনেচি । আমরা কখনো যাই নি, জায়গা ভালো নয়, ওখানে বুনিপ বলে উপদেবতা থাকে। অনেক কাল আগেকার কথা, আমাদের গ্রামের তিনজন সাহসী লোক কারো বারণ না শুনে ঐ পাহাড়ে গিয়েছিল, আর ফেরেনি । আর একবার একজন তোমাদের মতো সাদা মানুষ এসেছিল, সেও অনেক, অনেক কাল আগে । আমরা দেখিনি, আমাদের বাপ-ঠাকুরদাদাদের আমলের কথা । সে গিয়েও আর ফেরেনি ।” কাফির গ্রাম থেকে বার হয়েই পথে তারা ম্যাপ মিলিয়ে দেখলো— দূরের ধোঁয়া ধোঁয়া অস্পষ্ট ব্যাপারটা হচ্চে রিখটারসভেল্ড পর্বতশ্রেণী, দক্ষিণ-আফ্রিকার সর্বাপেক্ষা বন্য, অজ্ঞাত, বিশাল ও বিপদসঙ্কুল অঞ্চল।

 

chader pahar 2

 

খোশগল্প.কম:  অবশেষে যাত্রা শুরু। কোন কোন পথ ধরে রওনা হলেন গন্তব্যস্থানের দিকে?

শঙ্কর:  প্রথমে কিসুমু গিয়ে ভিক্টোরিয়া নায়ানজা হ্রদে স্টিমার চড়ে দক্ষিণ মুখে মোয়ান্‌জার দিকে যাবো ঠিক করলাম।

এরপর ভিক্টোরিয়া হ্রদের যে বন্দরে আমরা নামলাম—তার নাম মোয়ানজা। এখান থেকে তিনশো মাইল দূরে ট্যাবোরা, সেখানে পৌঁছে কয়েক দিন বিশ্রাম করে যাবো টাঙ্গানিয়াকা হ্রদের তীরবর্তী উজিজি বন্দরে।

দিন পনেরো পরে আমি আর আলভারেজ উজিজি বন্দর থেকে ষ্টীমারে টাঙ্গানিয়াকা হ্রদে ভাসলাম। হ্রদ পার হয়ে আলবার্টভিল বলে একটা ছোট শহরে কিছু আবশ্যকীয় জিনিস কিনে নিলাম । এই শহর থেকে কাবালো পর্যন্ত বেলজিয়ান গভর্ণমেন্টের রেলপথ আছে । সেখান থেকে কঙ্গো নদীতে ষ্টীমারে চড়ে তিনদিনের পথ সানকিনি যেতে হবে, সানকিনিতে নেমে কঙ্গো নদীর পথ ছেড়ে, দক্ষিণ মুখে অজ্ঞাত বনজঙ্গল ও মরুভূমির দেশে প্রবেশ করতে হবে । মাস দুই ধরে রোডেসিয়া ও এঙ্গোলার মধ্যবর্ত্তী বিস্তীর্ণ ভেল্ড্‌ অতিক্রম করে, অবশেষে দূরে মেঘের মত পর্ব্বতশ্রেণী দেখা গেল । আল্‌ভারেজ ম্যাপ মিলিয়ে বললো – “ওই হচ্ছে আমাদের গন্তব্যস্থান, রিখটারস্‌ভেল্ড্‌ পর্ব্বত, এখনও এখান থেকে চল্লিশ মাইল হবে । আফ্রিকার এই সব খোলা জায়গায় অনেক দূর থেকে জিনিস দেখা যায় ।”

 

খোশগল্প.কম:  ডেথ সার্কেলের খপ্পরে পড়েছিলেন নাকি?

শঙ্কর:  হ্যাঁ, এটা খুবই হতাশাজনক ছিলো। একদিন পথ চলতে চলতে আলভারেজ আমাকে বললো, “আচ্ছা, এই গাছের গুঁড়ির কাছে সরে এসে দেখো তো ?” এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, গুঁড়ির নরম ছাল ছুরি দিয়ে খুদে কে ‘D.A.’ লিখে রেখেচে – কিন্তু লেখাটা টাটকা নয়, অন্ততঃ মাসখানেকের পুরানো ।

আমি তো ব্যাপারটা কিছু বুঝতে পারলাম না । আলভারেজের মুখের দিকে চেয়ে রইলাম । আলভারেজ বললো- “বুঝতে পারলে না ? এই গাছে আমিই মাসখানেক আগে আমার নামের অক্ষর দুটী খুদে রাখি । আমার মনে একটু সন্দেহ হয় । তুমি তো বুঝতে পারো না, তোমার কাছে সব বনই সমান । এর মানে এখন বুঝেচ ? আমরা চক্রাকারে বনের মধ্যে ঘুরচি । এ সব জায়গায় যখন এ রকম হয়, তখন তা থেকে উদ্ধার পাওয়া বেজায় শক্ত” তখন বুঝলাম বিপদটা । বললাম- “তুমি বলতে চাও মাসখানেক আগে আমরা এখানে এসেছিলাম ? ”আলভারেজ বললো- “ঠিক তাই। বড় অরণ্যে বা মরুভূমিতে এই বিপদ ঘটে । একে বলে death circle, আমার মনে মাসখানেক আগে প্রথম সন্দেহ হয় যে, হয়তো আমরা death circle এ পড়েচি । সেটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্যেই গাছের ছালে ঐ অক্ষর খুদে রাখি । আজ বনের মধ্যে বেড়াতে হঠাৎ চোখে পড়ল ।”

 

বইটি অনলাইনে কিনতে চাইলে-

https://www.rokomari.com/book/32494

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত