কুমারের বয়স সতেরো বৎসর। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। জীবনে কখনো কলাকাতার বাইরে যায়নি। একদিন হুট করে সে বুকে সাহস বেধে বেড়িয়ে পড়লো ‘রূপনাথের গুহা’ খুঁজতে! সেই গভীর জঙ্গল, সেখানে দিন-রাত বাঘ-ভাল্লুক-হাতিরা হানা দিচ্ছে। সেখানে কি না সেকেলে এক বৌদ্ধমঠ, তার ভিতরে যকের ধন!  সে-ও এক ভুতূড়ে কাণ্ড!

 

হেমেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা বিখ্যাত কিশোর উপন্যাস ‘যকের ধন’-এর অন্যতম প্রধান চরিত্র কুমারের সাথে কথোপকথনে স্বাগতম-

 

রাজা সে-সমস্ত ধন-রত্ন এক জায়গায় লুকিয়ে এক যককে পাহারায় রেখে পালিয়ে যান’

লিখেছেন...admin...জুলাই 13, 2017 , 3:42 অপরাহ্ন

 

খোশগল্প.কম:  ঘটনাটা শুরু হয়েছিলো কিভাবে? ধনরত্নের ব্যাপারটি তোমাদের বংশের কে প্রথম জানতে পেরেছিলেন?

কুমার: আসাম থেকে ফেরার পথে আমার দাদু একবার এক সন্ন্যাসীর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। সেই সন্ন্যাসী তাঁকে খাসিয়া পাহাড়ের রূপনাথ গুহার কথা বলেছিলেন। রূপনাথ গুহা থেকে পঁচিশ ক্রোশ পশ্চিমে গেলে, উপত্যকার মাঝখানে একটা সেকেলে মন্দির রয়েছে। একসময় এখানে মস্ত এক মঠ ছিল, তাতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা থাকতেন। সেকালের এক রাজা বিদেশী শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা করবার আগে এই মঠে নিজের সমস্ত ধনরত্ন গচ্ছিত রেখে যান। কিন্তু যুদ্ধে তাঁর হার হয়। পাছে নিজের ধনরত্ন শত্রুর হাতে পড়ে, সেই ভয়ে রাজা সে-সমস্ত এক জায়গায় লুকিয়ে এক যককে পাহারায় রেখে পালিয়ে যান। তারপর তিনি আর ফিরে আসেননি।

 

যে যক সেই ধনরত্নের পাহারায় ছিল, তার মাথার খুলি সন্ন্যাসীর কাছে ছিল। খুলিতে তিনি মন্ত্র পড়ে দিয়েছিলেন, এ খুলি যার কাছে থাকবে, যক তাকে আর কিছুই বলবে না। খুলিতে যে অঙ্কের মত রেখা রয়েছে, এ হচ্ছে সাংকেতিক ভাষা। এই সংকেত বুঝতে পারলেই জানা যাবে ধনরত্ন কোথায় আছে।

 

খোশগল্প.কম: তুমি তো বেশ সাহসী! জীবনে কখনো কলকাতার বাইরে যাওনি কিন্তু যকের ধন খুঁজতে খাসিয়া পাহাড়ে রওনা হলে?

কুমার: বিমল না থাকলে এ কাজের কথা একা একা কখনো ভেবে দেখতুম বলেও মনে হয় না।বিমল আমার প্রাণের বন্ধু, আমাদের পাড়ার ছেলে। আমার চেয়ে সে বয়সে বছর-তিনেকের বড়, এ-বৎসরে বি.এ. দেবে। বিমলের মতো চালাক ছেলে আমি আর দুটি দেখিনি। তার গায়েও অসুরের মত জোর, রোজ সে কুস্তি লড়ে-দুশো ডন, তিনশো বৈঠক দেয়। তার উপরে এই বয়সে সে অনেক দেশ বেড়িয়ে এসেছে- এই গেল বছরেই তো আসামে বেড়াতে গিয়েছিল। তার কাছে আমি কোনো কথা লুকোতুম না। ঠিক করলুম, যাওয়া হোক আর না-ই হোক একবার বিমলকে এই মড়ার মাথাটা দেখিয়ে আসা যাক। সব জেনে নিয়ে বিমল আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো না। আমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো অভিযানে।

 

খোশগল্প.কম:  কোন পথে যাবে বলে ঠিক করলে?

কুমার: কামরূপ পার হয়ে খাসিয়া পাহাড়ে উঠবো বলে ঠিক করলুম। খাসিয়া পাহাড়ের ঠিক পাশেই যমজ ভাইয়ের মতো আর একটি পাহাড় আছে-তার নাম জয়ন্তী। এদের উত্তরে আছে কামরূপ আর নবগ্রাম। পূর্বে আছে উত্তর-কাছাড়, নাগা পর্বত আর কপিলী নদী। দক্ষিণে আছে শ্রীহট্ট, আর পশ্চিমে গারো পাহাড়। খাসিয়া পাহাড় বেশ উঁচু। কোথাও চার হাজার, কোথাও পাঁচ হাজার, আবার কোথাও বা সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচু। পাহাড়ের ভেতর অনেক জলপ্রপাত আছে- তাদের মধ্যে চেরাপুঞ্জি নামে জায়গার কাছে ‘মুসমাই’ আর শিলং শহরের কাছে ‘বীডনস’ প্রপাত দুইটিই বড়। পাহাড়ের মধ্যে উষ্ণ প্রস্রবণও আছে- তার জল গরম।

 

খোশগল্প.কম: সবকিছু ঠিকঠাক? এরপরেই বের হলে অভিযানে?

কুমার: নাহ! সেই সৌভাগ্য আর হলো কই! পরদিন সকালে বিমল হঠাৎ করে আমাদের বাড়ি এসে হাজির। তারপর জানা গেলো গতরাতে মড়ার মাথাটা তার বাড়ি থেকে চুরি গেছে।

 

খোশগল্প.কম:  হায় হায়! এরপরেও হাল ছাড়োনি?

কুমার: হ্যাঁ, মড়ার মাথার খুলি আর দাদুর পকেট বইটা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন দিক নিশানা ছিলো না। কিন্তু বিমলের মাথায় যা বুদ্ধি! এরপর বহু কাহিনীর পরে আমরা রওনা হলাম আসামের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম যে, করালী ও তার দলবল আমাদের সাথে ট্রেনে উঠে বসেছে। এরপর বিমলের বুদ্ধিতে আমরা আসাম না গিয়ে আমার মামাবাড়ি শান্তিপুরে রওনা করলাম।

 

খোশগল্প.কম:  তারপর?

কুমার: এরপর কিছুদিন মামাবাড়িতে কাটিয়ে আবার রওনা করে শ্রীহট্টে পৌঁছার পরে প্রথমবারের মত আমাদের গন্তব্যস্থান খাসিয়া পাহাড়কে দেখতে পেলুম। তারপর মাঝরাতে স্টীমারে চড়ে, সুরমা নদী দিয়ে পরদিন সকালে ছাতকে গিয়ে পৌঁছলুম। বিমলের মুখে শুনলুম, এখানে পিয়াইন নামে একটি নদী আছে, সেই নদী দিয়েই আমাদের নৌকায় চড়ে ভোলাগঞ্জ পর্যন্ত যেতে হবে- এ সময়ে নদীর জল কম বলে নৌকো তার বেশি আর চলবে না। কাজেই ভোলাগঞ্জ থেকে মাইল-দেড়েক হেঁটে আমরা থারিয়াঘাটে যাব, তারপর পাথর-বাঁধানো রাস্তা ধরে খাসিয়া পাহাড়ে উঠব।

 

খোশগল্প.কম: তোমাদের অভিযানে ভূত প্রেত দত্যি দানো ছাড়াও বাঘ ভল্লুকের ভয়ও ছিলো বলছিলে। একটি ঘটনা বলো তো….

কুমার: খাসিয়া পাহাড়ে গিয়ে এক রাতে গুহার বাইরে খেয়াল করলাম, অন্ধকারের ভিতরে দু-দুটো জ্বলন্ত কয়লার মতন চোখ, একদৃষ্টিতে আমার পানে তাকিয়ে আছে। পরে জানতে পেরেছিলেম ও দুটো বাঘের চোখ ছিল।

 

যখের ধন

 

খোশগল্প.কম: করালীর সাথে আর দেখা হয়েছিলো?

কুমার: পাহাড়ের পথ ধরে চলতে চলতে আমরা আবার করালীর খপ্পরে পড়লাম। এবার আর কোন বুদ্ধি খাটলো না। আমাদের মৃত্যুমুখে ফেলে দিয়ে করালী ঠিকই ঠাকুরদার পকেট বইটা কেড়ে নিলো। এরপরই আসল ঘটনা শুরু…….

 

 

বই পড়তে চাইলে ক্লিক করুন-  www.rokomari.com/book/65948/যকের-ধন

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত