‘পোস্টমাস্টার’ রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয় ছোট গল্পগুলোর একটি। কলকাতার শহুরে এক পোস্টমাস্টার এর বদলী হয় নিতান্ত এক অজপাড়া গাঁয়ে। সেখানে তার সঙ্গী হয় ‘রতন’ নামে এক অনাথ ভৃত্য। সেই রতন আর পোস্টমাস্টারের বিদায় এক মর্মস্পর্শী মূহুর্ত……

 

‘ একবার নিতান্ত ইচ্ছা হইল, ফিরিয়া যাই, জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসি’

লিখেছেন...admin...জুলাই 17, 2017 , 4:33 অপরাহ্ন

গল্পের গল্প: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের  শাহজাদপুর জমিদার বাড়িতে একটি কাচারি ঘর ছিল। কাচারি বাড়ির একতলাতে ছিল পোস্ট অফিস। কবিগুরু প্রায় প্রতিদিন দিনের বা রাতের কোন একটা সময় পোস্টমাস্টার সাহেবের সাথে কাটাতেন। মূলত এই পোস্টমাস্টার মহাশয়ের জীবনের নানা কাহিনী অবলম্বনেই তিনি এই গল্পটি লেখেন। 

 

খোশগল্প.কম: চাকরি ছেড়েই দিলেন?

পোস্টমাস্টার: হ্যাঁ। আবহাওয়া, প্রবাস জীবন, সামান্য বেতন এবং সবশেষ অসুস্থতা এ সব কিছুই আমাকে মরিয়া করে তুলেছিল এই গ্রামের পাট চুকিয়ে ফেলতে।

খোশগল্প.কম: কিন্তু আপনার সামান্য বেতন তো ওরকম একটা গ্রামে থাকার জন্য কম নয়…

পোস্টমাস্টার: কম নয় তবে পর্যাপ্ত কোথায়। একেবারে অজ পাড়া গাঁ, যেখানে কিছু পাওয়া যায় না, পড়েছ নিশ্চয়ই এক বেলার বাসি ব্যাঞ্জন দিয়ে অন্য বেলায় কাজ সারি! আর যে পরিবেশ!

 

খোশগল্প.কম: আবহাওয়া বলতে?

পোস্টমাস্টার: নির্জন অন্ধকারাচ্ছন্ন গ্রাম, জঙ্গলাকীর্ণ পরিবেশ, সন্ধ্যে বেলাতেই দিন শেষ হয়ে যায়, আর বর্ষার তো বিরামই নেই, আমার অবস্থা তখন “যদি আরব্য উপন্যাসের কোনো দৈত্য আসিয়া এক রাত্রের মধ্যে এই শাখা পল্লব সমেত সমস্ত গাছগুলো কাটিয়া রাস্তা বানাইয়া দেয় এবং সারি সারি অট্টালিকা আকাশের মেঘকে দৃষ্টি পথ হইতে রুদ্ধ করিয়া রাখে তাহার হইলে এই আধমরা ভদ্রসন্তানটি পুনশ্চ নবজীবন লাভ করিতে পারে”

 

খোশগল্প.কম: রতন যেভাবে আপনাকে স্নেহবন্ধনে আবদ্ধ করতে পারলো, সেখানে আপনার কি অপরাগতা ছিল?

পোস্টমাস্টার: রতন আত্মীয়হীন অনাথা, স্নেহ-মমতা, শাসন তার ইতঃপূর্ব জীবনে অনুপস্থিত। সেখানে আমি তাকে অক্ষরজ্ঞান দেবার চেষ্টা করেছি, স্বাভাবিক মানুষের মত গুরুত্ব দিয়ে তাঁর সাথে গল্প করেছি; এসবই তাকে সুপ্তভাবে আশান্বিত করেছে। অন্যদিকে আমি কিন্তু স্নেহ, যত্ন পেয়ে অভ্যস্ত, তাই যখন চলে যাচ্ছি তখনও এ নিয়ে বিশেষ কিছু অনুভূত হয় নি।  প্রাচুর্যতায় যে আছে, হীনতার মর্ম সে কেন বুঝবে!

 

খোশগল্প.কম: রতন শেষমুহুর্তে উচ্ছসিত হৃদয়ে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল আর বলে গেল “দাদাবাবু তোমার দুটি পায়ে পড়ি, তোমার দুটি পায়ে পড়ি; আমাকে কিছু দিতে হবে না তোমার দুটি পায়ে পড়ি আমার জন্যে কাউকে কিছু ভাবতে হবে না”- যখন বড়িতে ফিরে গেলে কি মনে হয়েছিল? 

পোস্টমাস্টার: তখন তো আরো পরিষ্কার ভাবে বুঝতে পারলাম, রতন আমার কাছে চাকরি কিংবা মাইনে কোনটিই প্রত্যাশা করে নি। সে চাইছিল এই তিরস্কার, আমার জন্য ভোরে পানি তুলে আনা, রুটি সেঁকা, অক্ষরজ্ঞান, আর আমার মা-দিদি এদের ভেতর দিয়ে যদি তার জীবন প্রবাহিত হয়ে যেতে পারত তাহলে বোধ হয় সে আর কিছুই চাইত না।

 

Postmaster-1

-পোস্টমাস্টার ছবি অবলম্বনে।

 

খোশগল্প.কম: হুম, রতন সেই প্রস্তাবও করেছিল, আপনি বলেছিলেন ‘সে হয় নাকি!’

পোস্টমাস্টার: বললামই তো ওর কাছে যা আরাধ্য, আমার কাছে তা স্বাভাবিক জীবন। ওকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে রাখা যায় এ কথা আমার কখনোই মনে হয় নি, বাড়িতে ঝি-চাকর আছে তাহলে সে হিসাবে ও নিষ্প্রয়োজন। আমি চলে যাচ্ছি, ও অন্য কোথাও কাজ করবে এই তো হওয়ার কথা, হয়ে আসছে, এই রূপের অন্যথা আমি ভাবি নি।

 

খোশগল্প.কম: ভেবেছিলেন। যখন পালে বাতাস লেগে, স্রোতের বেগে আপনি বহুদূর……

পোস্টমাস্টার: হ্যাঁ, যে কোন বিদায় যেমন কষ্ট দেয় সেভাবেই, তখন ঠিক এটাই মনে হয়েছিল “জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ কত মৃত্যু আছে, ফিরিয়া ফল কি। পৃথিবীতে কে কাহার?” এমন কত স্নেহ বন্ধনই তো জীবনে ছেড়ে এসেছি, ছেড়ে যাবো।

 

খোশগল্প.কম: গ্রামের সাথে এই যে সে সময় শহরের মানুষের দুরত্ব; ক্রমেই বেড়ে চলছিল, এ থেকে পরিত্রাণ কী?

পোস্টমাস্টার: পরিত্রাণ নেই, গ্রামের মানুষ ছেলেমেয়ে শিক্ষিত করবার আশায় গ্রাম ছাড়ছে, তারপর সেই সহজ জীবন ছেড়ে  কেউ গ্রামের অন্ধকারে ফিরতে চায় না। আর যে ছেলেমেয়ে গুলো বড় হয়, সভ্যতার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নগর পল্লীর ব্যবধান ক্রমেই বেড়ে যাওয়াকে আমরা আর ঘোচাতে পারি না। এ দুইয়ের মধ্যে কোন প্রকারের হৃদয় সেতুবন্ধন আর সম্ভব হয় না।

 

গল্পটি পড়তে চাইলে অর্ডার করুন এই ঠিকানায়- rokomari.com/book/96/গল্পগুচ্ছ-(অখণ্ড)

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত