শাহনাজ ইয়াসমিন শাইরিন, এম.ফিল করছেন কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কথা বললেন আমাদের সমাজে একজন ছাত্রীর শিক্ষাজীবনে যেসব আচরণের মুখোমুখি হতে হয় কিংবা হালের ক্রেজ বিসিএস স্বপ্ন নিয়ে।

লাইফের হায়েস্ট পিকেও সমস্যা-যন্ত্রণা থাকে, তার ভেতর থেকেই যা করার জন্য এসছিলাম সেটা করতে হবে

লিখেছেন...admin...জুলাই 26, 2017 , 3:02 অপরাহ্ন

20446359_247111929139903_2049781865_o

খোশগল্প.কম:  পরিচয় দিয়ে শুরু করি।

শাইরিন: আমার নাম শাহনাজ ইয়াসমিন শাইরিন, আমার ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে বেশী আনন্দ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্টুডেন্ট হিসেবে পরিচয় দিতে, আর জীবনে পাওয়া না পাওয়া এসব কিছুর ভেতর পাওয়ার পরিচয় গুলো দিতে ভাল লাগে। পাওয়ার মধ্যে আছে আমার লেখা-পড়া, আমার বাবা-মা। আমাকে যদি আবার জন্ম নেয়ার সুযোগ দেয়া হয়, আমি এই বাবা-মা, এই ভাই-বোনের সাথেই আবার জন্মাতে চাই; ভিকারুন্নেসার স্টুডেন্ট হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই আবার পড়তে চাই- এই সব কয়টা পরিচয় নিয়েই আমি।

 

খোশগল্প.কম: আপনি জীবনের প্রাপ্তি ধরছেন কোনগুলোকে বা পাওয়ার লিস্টটা বলেন, শুনি।

শাইরিন: আমার প্রথম পাওয়া আমার বাবা-মা। সবার বাবা-মাই সবার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ, কিন্তু আমার বাবা-মা বোধ হয় তাঁর চাইতেও বেশী। আমি এখন যে সময় পার করছি মাস্টার্স শেষ করে এম.ফিল করছি। আমার পরিচয়? উত্তর হবে বেকার। এই সময়ে এরকম ফ্যামিলি মেম্বারের প্রতি সবার হতাশা কাজ করে, বাট আমার বাবা-মাকে কখনো দেখিনি আমাকে নিয়ে হতাশ হতে। ভাই-বোনের কথা বলতে গেলেও আমি অনেক লাকি। আমার বোনের একটা কথা বলি, ও আর আমি একসাথে এখানে থাকছি, আব্বু-আম্মুকে ছাড়া। তো ও সেদিন বলছিল “শাইরিন, জীবনে বড় হওয়ার জন্য তো পড়া দরকার? তুই পড়তে থাক, তোর সব কাজ আমি করে দিবো”। আমি কিছুই করি না! ওই সব করে তবুও যে ও আমাকে আরো দুই’পা আগাতে পেছন থেকে ব্যাক আপ দেয়, সাহস দেয় আমি তখন খুব লাকি ফিল করি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার এম.ফিল করছেন কি নিয়ে?

শাইরিন: এখন আমি কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার ডিপার্টমেন্টে এম.ফিল করছি। আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে আমি এখানেই ক্যারিয়ার করবো কি? না, মাস্টার্স শেষ করার পর আমি যখন বসে ছিলাম, বাসায় বসে থাকা আমাকে পিছিয়ে দিচ্ছিল। তো বেটার এম.ফিলের জন্য এপ্লাই করলাম, এটা এখন একটা আইডেন্টিটি।

 

গবেষণাটাকে বাংলায় বললে ‘প্রাপ্তবয়স্ক অটিজম বাংলা ভাষী আক্রান্ত রোগীর ভাষা বিশ্লেষণ’ বিষয়ের উপর বলা যায়।  অটিজমে আক্রান্তদের নিয়ে কাজ হয় কিন্তু সেটা প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে খুব কম, আমার কাজ ১৮ বছরের উপরে অটিজম আক্রান্তদের নিয়ে। শুরুটা করেছিলাম হুজুগে, এখন করতে গিয়ে ভাল লাগছে, মনে হচ্ছে ভালভাবে শেষ করা উচিত।

 

খোশগল্প.কম: আপনি বলছিলেন এম.ফিলটা আমার একটা আইডেন্টিটি; আমি যতটুকু জানি আপনি বিসিএস প্রিপারেশন নেয়ার জন্য চাকরির চেষ্টাও করছেন না সিরিয়াস ভাবে। সেখানে গবেষণার সময় কেন দিচ্ছেন বা এম.ফিল আইডেন্টিটির দরকার পড়লো কেন?

শাইরিন: বাংলাদেশে যতটুকু পড়ালেখা করলে চাকরির জন্য এপ্লাই করা যায় আমার ঐ পড়ালেখা শেষ। আমার বাবা-মা আমাকে প্রেশার দিচ্ছে না, কিছু বলছে না; বাট একটা এক্সপেক্টেশন তো থাকে! আমাদের দেশে পড়ালেখা শেষ করা ছেলেদের একটা প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হয় ‘এখনো চাকরি-বাকরি পাইলা না!’ আর মেয়েদের দুইটা ‘এক, এখনো বিয়ে দেন নাই?!! দুই, এত পড়ালেখা করে কি লাভ!! এখনো চাকরি পাও নাই?” । বুঝি তারা ওয়েল উইশার, তবে যখন বলে তাতে মনে হয় উইশিং এর চাইতে এই যে হিউমিলিয়েট করা এতেই তাঁদের বেশী আনন্দ। আমার এতেও সমস্যা নাই, কিন্তু যখন ভালবাসার আতিশায্যে বাবা-মাকেও এসে ‘মেয়েকে এখনো বিয়ে দেন নাই কেন, এখনই দিয়ে দেন’ পরামর্শ দেয় তখন তো বাবা-মাকেও কষ্টটা বিঁধে। আমি লাকি যে আমার বাবা-মা সেসব নিয়ে আমাকে প্রেশার করে না, উনারা এখনো বিশ্বাস করেন যে আমি এটেনটিভলি পড়লে এখনো ভাল করবো।

 

যাই হোক যেটা বলছিলাম, যতদিন চাকরি না করছি ততদিন গবেষণায় সময় দেয়া আমাকে অন্তঃত একটা পরিচয় দেয়।

 

খোশগল্প.কম: আচ্ছা। আমাদের অধিকাংশের বাবা-মাই তাঁদের শৈশবে আমাদের মত সহযোগীতা, ইনভেস্টমেন্ট পান নাই, ঐভাবে এনকারেজমেন্টও পান নাই। তাহলে আমাদের বাবা-মারা এই যে  স্যাক্রিফাইস, কম্প্রোমাইস, ইনভেস্টমেন্ট, তারা এগুলো কেন করেন?

শাইরিন: আমার মনে হয় যে, তাঁদের অপূর্ণতা, না পাওয়া শখগুলো, তারা চান আমরা করি। আবার সেটা সন্তানকে নিয়ে ওয়ান কাইন্ড অব প্রাউড ফিল করতে চাওয়ার ইচ্ছা থেকেও।  আর যেহেতু তারা ডেডিকেট থেকেছে তাই সন্তানদেরও মনে হয়েছে বাবা-মা যেহেতু এতখানি করছে তাই আমরাও সেই তুলনায় কিছুটা করি।

 

খোশগল্প.কম: বিসিএস প্রসঙ্গে ফিরি, ৭-৮ বছর আগ পর্যন্ত বিসিএস দেয়ার হার এত বেশী ছিল না, এখন গড়ে প্রায় সব গ্রাজুয়েটই অন্তঃত একবার বিসিএস দেন। ইভেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারদেরও এখন অনেকের গোল থাকে বিসিএস। আপনার কাছে কি মনে হয় ওনারা কেন দেন?

শাইরিন: আসলে আগের সময়টাতে মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার হার এত বেশী ছিল না, যারা চান্স পেত মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং তাঁদের যোগ্যতার ব্যাপারে কোন প্রশ্ন নেই, দে আর অলরেডি প্রুভেন! বাট এখন তুমি যে কাউকে জিজ্ঞেস করো কি পড়ো? – উত্তর দিবে হয় মেডিক্যাল, সিএসই, সিভিল, ইইই; এগুলোর বাদে বোধ হয় সাবজেক্টই নেই দেশে। অলিতে গলিতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার। এখন সবাই তো সমান যোগ্য না, তো তাঁদের যোগ্যতাকে আরো একবার পরীক্ষা করার জন্য, পরীক্ষা হিসেবে এখনো একটা ভালো অপশন বিসিএস। যদি তুমি পাশ করে যাও, হ্যাঁ তাহলে তুমি মেধাবী। জনসংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে আমাদের প্রতিযোগীতাও বেড়েছে, গোলটাও বড় হয়ে গেছে।

 

আবার অনেক ছেলে-মেয়ে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারিংটা পড়ে বাবা-মার প্যাশনের কারণে। তো তাদের মেন্টালি প্রিপারেশনই থাকে তারা কোনমতে পাশ করে এই লাইনে আর থাকবে না। আবার কিছু ছেলে মেয়ে থাকে যারা পড়ালেখা শেষ করার পর দেখে যে কষ্ট করে তারা পড়েছে সেই মূল্যায়নটা তারা পাচ্ছে না। একটা ডাক্তার জাস্ট এমবিবিএস করলেই তাঁর হয়ে যায় না, একটা ভাল হসপিটালে জয়েন করতে হলে তাঁকে এফসিপিএস পার্ট ওয়ান, পার্ট টু করতে হবে, আবার এগুলো করতে করতে তাঁর এইজ মিনিমাম থার্টি হয়ে যাবে। তাঁর চাইতে বেটার না বিসিএসে মনযোগ দেয়া?

 

খোশগল্প.কম: আমি নাইন-টেন থেকে আপনাকে চিনি, আশেপাশের গার্ডিয়ানরা যেমন একটা বাচ্চাকে আইডল বানিয়ে তাকে ধরে তাদের তুলনা দেয়, আমাদের অবস্থা ছিল সেরকম, আমার নিজের মাও এই কাজ করতেন। তো ছোটবেলা থেকেই আপনি নিজে নিজে এত এম্বিশাস ছিলেন কীভাবে? কোন কিছু ইন্সপায়ার করতো?

শাইরিন: হাঁ হাঁ । আসলে আমার প্রতি এইট-নাইন পর্যন্ত আমার বাবা-মার জিরো এক্সপেকটেশন ছিল। এস.এস.সি তে ভাল করার পর, ভিকারুন্নেসসায় চান্স পাওয়া এসব কিছু আসলে আমার টার্গেট ছিল না, আমার মুল টার্গেট ছিল আমাকে কেউ আরেকটু ভাল বলুক, কেউ আরেকটু প্রশংসা করুক। পড়ালেখা নিয়ে আমার এম্বিশানের চাইতে বড় এম্বিশান ছিল আমাকে নিয়ে প্রশংসার স্তুতিটা আরেকটু বাড়ুক।  ঐ এনকারেজমেন্টেই বাকি অনেক কিছু জয় করা সহজ ছিল।

 

ছোটবেলা থেকেই খুব ভাল স্টুডেন্ট ছিলাম না, ক্লাস নাইনের দিকে এসে আগের রেজাল্টকে ছাড়িয়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা আসে। একটা স্টুডেন্ট মেধাবী হয়ে আসে না, সে মেধাবী হয় পড়তে পড়তে। যে একবার নিজেকে ক্রস করার আনন্দ পাবে তখন সে আর পিছুবে না।

 

খোশগল্প.কম: একটা বাচ্চা আসলে কিসে হার্ড ওয়ার্কিং হয়ে ওঠে, চাপে নাকি এনকারেজমেন্ট? কোনটা তাদের মধ্যে সাস্টেইন করে মনে হয়?

শাইরিন: ডিপেন্ড করে বাচ্চার উপরে। তবে এনকারেজমেন্টই একটা বাচ্চাকে বেশী আগাই দেয়, এবং সেটা সাস্টেইন করে। মাঝে মাঝে হার্ডলাইনে যাওয়া যেতে পারে তবে সেইটা বেশি সময়ের জন্য না হওয়াই ভাল।

 

খোশগল্প.কম: একদম শেষ প্রশ্ন, জীবনের এই সময় পর্যন্ত পার করে এসে, জীবন থেকে কী শিখছেন মনে হয়, উপলব্ধি কি দাঁড়ায়?

শাইরিন: এত দূর বা এত টুকু এসে দেখে শিখছি যেটা সবার জীবনে দুঃখ থাকবে, দুঃখটা চিরন্তন। এক এক জনের দুঃখ এক এক রকম, যার যার কাছে তাঁর দুঃখ তাঁর কাছে বড়। সৃষ্টিকর্তা নিরবিচ্ছিন্ন সুখ ভোগ করার জন্য কাউকেই পাঠায় নাই, আমি যদি প্ল্যান করি যে এটা করলেই আমি সুখী হবো, ভাল থাকবো সেটা আসলে ভুল। দুঃখ-কষ্ট সব সময়ের জন্য, লাইফের হায়েস্ট পিকেও সমস্যা-যন্ত্রণা থাকে, তার ভেতর থেকেই যা করার জন্য এসছিলাম সেটা করতে হবে।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত