রবীন্দ্রনাথের ‘অপরিচিতার’ গল্পটি ‘হৈমন্তী’ গল্পেরই যেন অন্য পিঠ। যেন হৈমন্তীর বিয়েটা না হলে  যেমনটা হতো……

‘জায়গা আছে। নিশ্চয়ই আছে। নইলে দাঁড়াব কোথায়?’

লিখেছেন...admin...জুলাই 31, 2017 , 3:23 অপরাহ্ন

পাত্র অনুপমের মামা  বিয়ের দিন কনে পক্ষের দেওয়া সমস্ত অলংকার পরীক্ষা করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে কনে কল্যাণী’র পিতা মেয়ে’র বিয়ে ভেঙে দেন।

 

বহুবছর পর অনুপম ট্রেনে যখন সিট না পেয়ে  হন্যে তখন অন্ধকার থেকে কল্যাণী জানায় তাঁর কামরায় ‘জায়গা আছে’। কল্যাণী চলে যাবার পর অনুপম বুঝতে পারে এই সেই কল্যাণী। কল্যাণী মাতৃভূমির সেবায় নিজেকে ব্রতী করে; আর অনুপম? -“কেবল সেই একরাত্রির অজানা কণ্ঠের ভরসা — জায়গা আছে।

নিশ্চয়ই আছে। নইলে দাঁড়াব কোথায়? ” 

 

খোশগল্প.কম: ‘অপরিচিতা’ আর ‘হৈমন্তী’; অমিল কোথায়?       

অনুপম: হৈমন্তী বা তাঁর বাবা যদি বিয়েতে ভেঙে দিতেন তাহলে যে অবস্থা দাঁড়াতো সেইটেই অপরিচিতায় হয়েছে। হাঁ হাঁ হাঁ

 

খোশগল্প.কম: বিয়েতে কল্যাণী’র বাবা শম্ভুনাথ যখন আপনার মতামত চাচ্ছিলেন সব ব্যাপারে তখন কেন কিছু বলেন নি, এ কথা অবশ্যই বলবেন না যে তখন আপনার বয়স কেবল তেইশ!

অনুপম: আসলে সেইটাই বলতে যাচ্ছিলাম। সময় যত পেরিয়েছে মানুষ তত দ্রুত পরিপ্বক্ক হতে পারছে। তুমিই বল তোমাদের তেইশ বছরে তোমরা কি মা-মামার বাধ্য নও? আর সার্বিকভাবে বিবাহের মূহুর্তে কন্যার বা বরের সবার বিপক্ষে যাবার সুযোগ থাকে কোথায়। তখনো তো আমি বয়সে তরুণ, অভিজ্ঞতায় তরুণ। আমার মত অবস্থা হয়েছে কারো?

 

খোশগল্প.কম: “মা, গরীবের ঘরের মেয়ে, তাই আমরা যে ধনী এ কথা তিনিও ভোলেন না, আমাকেও ভুলিতেও দেন না” – এ কথা কেন বলেছিলেন? 

অনুপম: এ কথা সকলে জানে, অনিচ্ছাকৃত ভাবে পাওয়া জ্ঞান আর হঠাৎ অর্জিত হওয়া ধন দুটোই মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল নয়। দুটোই ধারণ করতে সময় লাগে, বিশেষত জ্ঞানের জন্য পিপাসা আর ধনের জন্য পরিশ্রম ছাড়া কোনটিই পরিপাচ্য হয় না। আগেই বলেছি আমার মাতুলরা পূর্বে অর্থহীন ছিলেন, আমার বাবার পরিশ্রম অল্প সময়ে সম্পদে পরিণত হয়েছে কিন্তু ভোগ করার পূর্বেই তিনি মারা গেছেন। কাজেই আমার মা যে এরূপ মনোভাব পোষণ করবেন এ তো সহজেই অনুমেয়।

 

খোশগল্প.কম: ট্রেনে যখন কল্যাণীর সাথে আপনার দেখা হয়, যখনও আপনি জানতেন না এই সেই মেয়ে যার সাথে আপনার বিয়ে ঠিক হয়েছিল; অপরিচিতা মেয়েটির শুভ্রতা, নিষ্কলুষ মূর্তি আপনাকে আচ্ছন্ন করছিল। এটাকে তো আপনার দীর্ঘ শোকের ভ্রমও বলা চলে; যে কারণে সহজেই আকৃষ্ট হয়েছেন  ? 

অনুপম: না, না, কল্যাণীর সাথে দেখা হওয়া প্রতিটিবার যেন নতুন করে কল্যাণীকে দেখা। মেয়েটির সমস্ত মন একেবারে প্রাণে ভরা, তার সমস্ত চলায় বলায় স্পর্শে প্রাণ ঠিকরে ওঠে। তাই মেয়েরা যখন তার মুখে গল্প শোনে তখন, গল্প নয়, তাকেই শোনে; তাহাদের হৃদয়ের উপর প্রাণের ঝরনা ঝরে পড়ে। তার সেই উদ্ভাসিত প্রাণ আমার সেদিনকার সমস্ত সূর্যকিরণকে সজীব হয়ে উঠেছিল; তাঁর সুধাকণ্ঠের সোনার কাঠিতে সকল কথা যেন নিজেই এক একটি প্রাণ। আমার মনে হল, আমি যে বিস্তৃত আকাশকে দেখি, সে ঐ তরুণীরই অক্লান্ত অম্লান প্রাণের বিশ্বব্যাপী বিস্তার।

 

oprichita

 

 

খোশগল্প.কম: বাহ, অনেক বিশেষণ দিয়ে ফেললেন যে, তবু কেন তাহলে কল্যাণী রাজি হলো না?

অনুপম: ওঁ যে বিশেষ তারই তো প্রমাণ আমাদের মত সামান্যতে সে প্রভাবিত হয়ে যায় না; নিজেকে সে সম্পূর্ণ জানে তাই বাবার মতও সে নিজেকে ছোট করে নি। ব্রতকে সত্য করে জীবন উৎসর্গ করেছে মেয়েদের শিক্ষায়।

 

খোশগল্প.কম: যদি কল্যাণী বিয়েতে রাজি হতো, তাঁর পরিণতি কী হৈমন্তীর মতই হতো না?

অনুপম: বোধ হয় না। অপুর বোধ জেগেছিল হঠাৎ যখন হৈমন্তী প্রায় মিলিয়ে যেতে বসেছে। আর যেহেতু কল্যাণীকে পাবার আগেই আমি আঘাত পেয়ে শিখেছি তাই সেই পরিণতি আমার হতো না। আমরা ঠেকে যেগুলো শিখি সেগুলোই আমাদের সত্যিকার শিক্ষে দিয়ে যায়; তবে দুঃখের কথা কি জানো সেই মানুষটিকে আর সেই সময়টি জীবনে আর হয়তো ফেরত আসে না।যেমন কল্যাণীকে আমি পাই নি। তাই দুঃখই চিরঅম্লান, সুখকে ভুলে যাই।  

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত