‘আন্না কারেনিনা’ রুশ সাহিত্যের তো বটেই, বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম সেরা ক্ল্যাসিক  উপন্যাস। যা থেকে ১৯৯৭ এবং ২০১২ সালে দুটি চলচ্চিত্র চিত্রায়িত হয়।

‘অন্তঃস্থল থেকে মানবিক আর সামাজিক সম্পর্কের পার্থক্যকে আমি বুঝতে পারছিলাম’

লিখেছেন...admin...সেপ্টেম্বর 12, 2017 , 2:28 অপরাহ্ন

আন্না একজন অসুখী নারী, যার স্বামী কারেনিন মন্ত্রীদপ্তরের কর্মকর্তা,  সন্তান সেরিওজা। মস্কো শহরের এক অনুষ্ঠানে আন্নার সাথে পরিচয় হয় তরুণ সামরিক কর্মকর্তা ভ্রনস্কির সাথে। ভ্রনস্কির ভালোবাসার তীব্রতায় আন্না স্বামীকে ছেড়ে আসে প্রকাশ্যে। একসাথে থাকার বহুদিন পরও সমাজ তাকে স্বাভাবিকভাবে না নেওয়া এবং মা ও প্রেমিকা এই দুই সত্তার দ্বন্দ্ব আত্মসম্ভ্রমী আন্নাকে আত্মহত্যায় পরিণতি দেয়।  উপন্যাসটিতে আরো একটি দম্পতি আছে; কিটি ও লেভিন। আজ নেবো আন্না কারেনিনার সাক্ষাৎকার…

 

খোশগল্প.কম: ওয়াগনের চাকার নীচে ঝাপ দেবার আগ পর্যন্ত কোনটিকে পরিবার বলে মনে হতো?

আন্না: রেলস্টেশনে যাবার আগ পর্যন্ত নিজের একটা জায়গা ছিল; ভ্রনস্কির ডেরা। আর তার আগে কারেনিনের বাড়ি, যেখানে ন’বছর থেকেছি, আমার সন্তান যেখানে আছে, যেখানে ভৃত্যরা এখনো আমাকেই ল্যান্ডলেডি ভাবে।

 

খোশগল্প.কম: ভ্রনস্কির আপনাকে বিয়ে করতে চাইছিল, সবকিছু অনুকূলে থাকা সত্বেও কেন সংঘাত?

আন্না: মারা যাওয়ার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত আমার সবচেয়ে কাতর করেছে সেরিওজার’র স্মৃতি। যে মায়ের স্মৃতি ছাড়া অভস্ত্য হতে চাইছে।

 

খোশগল্প.কম: আপনার আরেকটি কন্যা সন্তানও আছে!

আন্না: হ্যাঁ, ও এসেছিল আমার আর ভ্রনস্কির ভালোবাসা থেকেই। তবু আমি পরিষ্কার বুঝতে পারি সেরিওজার জন্য আমার যে টান, সেই তুলনায় মেয়েটির প্রতি আমার স্নেহ কোন স্নেহই নয়।

 

কারেনিনকে আমি ভালোবাসতে পারি নি, সেই অপরিতৃপ্ত ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম সেরিওজা, আমার সন্তানের উপর। মেয়েটার ভবিষ্যৎ আমার করায়ত্ত, অথচ সেরিওজা মানুষ হয়ে উঠছে আমাকে ছাড়াই!

 

 

anna-karenina-image07-1

‘Anna karenina’ ছবি অবলম্বনে 

 

খোশগল্প.কম: তখনকার রাশিয়ায় উচ্চপদস্থ পরিবর্গে আপনার রুচি, ব্যাবহার, সবকিছুতেই আপনাকে আলাদা সম্ভ্রমে দেখতো লোকে; লেখকের পক্ষপাতিত্বই কি আপনার মর্যাদাকে বাড়িয়ে তুলেছিল না অন্য কিছু?

আন্না: তুমি চাইলে বলতে পারো সেভাবে। তবে আমি বলতে চাই আমার পারিবারিক আবহ, কিংবা কারেনিনের পদমর্যাদাও আমাকে অন্যদের উপর প্রভাব বিস্তারে সাহায্য করতো না। আমি ছিলামই সম্ভম জাগানিয়া। লোকে বলতো আমার আচরণে এমন একটা উচ্চতা আছে যেটা খুবই বিরল।

 

খোশগল্প.কম: ভ্রনস্কি, কারেনিনের সাথে আপনার বিবাহ বিচ্ছেদ এর তাগিদ দিচ্ছিলো, আর আপনার সাথে বিয়ের, তবু কেন এই আত্মহত্যা?

আন্না: দেখো, মুল আঘাতটা কিন্তু আমি ভ্রনস্কির কাছে থেকে পাই নি। সন্তানের সাথে চিরতরে বিচ্ছেদ, আমার প্রতি কারেনিনের ঘৃণা; সর্বোপরি আমাকে নিয়ে সমাজের গোপন ঘৃণা, আমি জানি আমার তখনকার অবস্থায় কোন সুশীলা নারী আমার সাথে দেখা করতে চায় না, আমার সঙ্গ চায় না। এটা শুধু অনুমান নয়, অন্তঃস্থল থেকে মানবিক আর সামাজিক সম্পর্কের পার্থক্যকে আমি বুঝতে পারছিলাম, কিন্তু ঝুঝতে পারছিলাম না।

 

খোশগল্প.কম: কিন্তু ভ্রনস্কির সাথে জড়াবার প্রথম মূহুর্ত থেকেই আপনি জানতেন এবং সব কিছু ত্যাগ করতে মরিয়া ছিলেন।  

আন্না: হ্যাঁ, কিন্তু এখন ওঁর উৎসাহ নিবে গেছে।

 

খোশগল্প.কম: হ্যাঁ, সেটা তো আপনার ধারণা মাত্র!  

আন্না: না, এখানে আর সাহায্য করবার মত কিছু নেই। সব ছেড়ে, নিজেকে হারিয়ে আমার ভালোবাসা ক্রমেই হয়ে উঠবে আর প্রজ্বলিত, আর ওঁর নিভে যাচ্ছে ক্রমেই। তাই বিশ্বাসেও ফাঁক হতে থাকতো।

 

খোশগল্প.কম: সম্পর্কের ব্যবহার ক্রমশ সম্পর্ককে ফিকে করে দেয়, তা বলে সেটা বিশ্বাসঘাতকতা কি?

আন্না: হ্যাঁ, আমি জানি বিশ্বাসঘাতকতা সে করবে না, কিন্তু তাতে আমার অবস্থা সহনীয় হচ্ছে না। যদি সে  ভালো না বেসে সদয় আর কোমল থাকে তাহলে তা বিশ্বাসঘাতকতার চেয়েও হাজার গুণ খারাপ!  আর যেখান থেকে ভালোবাসা শেষ, সেখানে ঘৃণা শুরু। এখানে সুখ নেই, যন্ত্রণার অবসানও নেই।

 

খোশগল্প.কম: কারেনিন চাইছিল না, আপনাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হোক; তাহলে কেন সব ছাড়তে মরিয়া হলেন, যদি জানতেনই এই দুঃসহ পরিণতি?

আন্না: ভ্রনস্কির বেপরোয়া কৌতুহল, নিজের আকর্ষণশক্তি পরীক্ষা করতে করতেই সীমানায় পৌছে গিয়েছিলাম, যেখানে হয় স্বামীকে ছাড়তে হতো নয়তো প্রেমিককে। যেখানে আমার ত্রুটি সত্বেও সব ত্রুটি ভেসে যাচ্ছে  সৌন্দর্যে, বুদ্ধিতে, সরলতায়, আত্মসম্ভ্রম জ্ঞানে। নিজেকে জয় করতে করতে ভুলে বসেছিলাম সামাজিক গন্ডি।

 

বইটি সংগ্রহে রাখতে চাইলে- rokomari.com/book/18310/আন্না-কারেনিনা

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত