দ্য অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান  বা উভচর মানুষ  রুশ সাহিত্যিক আলেক্সান্দার বেলায়েভের  জনপ্রিয় ও বিশ্বজুড়ে পঠিত একটি সায়েন্স ফিকশন। বেলায়েভের ইচ্ছা ছিল মানুষ পাখির মত উড়ুক। চেষ্টা করে দেখতে গিয়ে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে মেরুদন্ড ভাঙলেন। ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে ভুগেছেন সারা জীবন। বছরের পর বছর শয্যাশায়ী থেকেও লিখে গেছেন অনেক বই, বৈজ্ঞানিক কল্পোন্যাস।

‘ইকথিয়ান্ডর হলো সেই প্রতিকী বলিদান; যাকে বলি দিতে হয় যুগকে নতুন কিছু পেতে’

লিখেছেন...admin...সেপ্টেম্বর 29, 2017 , 4:07 অপরাহ্ন

ডলফিনের ঝাঁকের সাথে এক সমুদ্র থেকে আরেক সমুদ্রে ঘুরে বেড়ায় জলমানব ইকথিয়ান্ডর। কখনো সমুদ্র তীরের পাথরের উপর বসে শাঁখ বাজায়; সে উভচর; মানুষ হয়েও মাছ, মাছ হয়েও মানুষ। ডাঙ্গায় সে নিঃশ্বাস নেয় মানুষেরই মতো করে, আর নোনা জলে ডুব দেয়ার পর শরীরে জেগে ওঠে মাছের মতো কানকো । স্থলবাসী গুত্তিয়েরাকে ভালবেসে হয়ে উঠে স্থলবাসীদের লোলুপের শিকার। গুত্তিয়েরা, ইকথিয়ান্ডরকে কখনো পাবে না জেনে বন্ধু অলসেনকে বিয়ে করে ইউরপে চলে যায়। আর ইকথিয়ান্ডর লা প্লাতা উপকূল আর চেনা সমুদ্র ছাড়িয়ে বহু দূরে…..

আমরা আজ নেবো অলসেন, যে গুত্তিয়েরা, ইকথিয়েন্ডর দুজনেরই বন্ধু।

খোশগল্প.কম: গুত্তিয়েরা তার বিপদে সব সময়ই তোমাকে কাছে পেয়েছে। পরে অবশ্য তোমরা বিয়েও করেছো, বিয়ের আগ পর্যন্ত তোমার অবস্থান কি ছিল তার কাছে?

অলসেন: বিয়ের আগ পর্যন্তও আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। বর্বর পেদ্রো জুরিতা তাকে সম্মান করতো না, তাকে জোর পূর্বক বিয়ে করেছিল। অন্যদিকে গুত্তিয়েরার বাবা বালতাজারের ব্যবসা পুরোটাই ছিল জুরিতার। তাই সেও গুত্তিয়েরাকে বিয়ে করতে বাধ্য করেছিল।

 

সেই সময় আমরা পৃথক স্বাধীন জীবনের খোঁজে আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চেয়েছিলাম। আর তার সৌন্দর্যের জন্য তার পাণিপ্রার্থী ছিল সবাই শুধু আমি ছাড়া। এভাবেই আমাদের মজবুত বন্ধুত্বের শুরু হয়েছিল। আমি তাকে পছন্দ করতাম তার সৌন্দর্যের জন্য নয়, তার নির্লোভ, দৃঢ় চরিত্রের জন্য।

 

খোশগল্প.কম: ইকথিয়ান্ডর, সমুদ্রের জলজদের সাথে আপনজনের মত পরিচিত ভঙ্গিতে থেকেছে। তার নিঃসঙ্গ জীবনে সমুদ্রের জীবেরাই তার আপন ছিল। গুত্তিয়েরার সাথে দেখা হবার পর থেকে সে মানুষের জীবন যাপন করতে চেয়েছে। আদতে সে কি সমুদ্রের না ডাঙার?

অলসেন: মনে নেই ড. সালভাদর বলেছিলেন সে হয়ে গিয়েছিল এক মানবিক মাছ?  আমাদের দূষিত শহরে সে থাকতে পারতো না, তার ফুলকো ডাঙায় বেশীক্ষণ তাকে থাকতে দিতো না; অথচ সে ছিল মাছেদের চাইতে বুদ্ধিমান, মানুষের মত জ্ঞান আর প্রজ্ঞা। সমুদ্রের তলস্রোত, তাপমাত্রা, স্থানভেদে জলের লবণাক্ততা নিয়ে তার জানা জবাব দিয়েই একটা পুরো গবেষণাগ্রন্থ হয়ে যেত।

 

খোশগল্প.কম: হ্যাঁ, যদি সে শুধু মাছই হবে তাহলে তার দীর্ঘ সমুদ্রভ্রমণে  মানুষকে কাছে থেকে দেখার ইচ্ছা, তাঁদের গল্প শোনার এত আগ্রহ তার থাকতো না।

অলসেন: হ্যাঁ, এই এক জায়গাতেই বিশ্বাসঘাতক ক্রিস্টোর সাথে তার বন্ধুত্ব হয়েছিল। নিঃসঙ্গ উভচর ইকথয়েন্ডর অনুরাগী হয়ে উঠে ক্রিস্টোর। সে ক্রিস্টোর কাছে স্থলবাসীদের গল্প শুনতো। তবে সেটারও গুঢ় কারণ গুত্তিয়েরাকে ভালবেসে ফেলা, তার কারণেই সে ডাঙার মানুষদের জীবন সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল।

 

Image result for the amphibian man movie

দ্য অ্যাম্ফিবিয়ান ম্যান  ছবি থেকে নেয়া একটি দৃশ্য যেখানে ইকথিয়ান্ডর গুত্তিয়েরার প্রাণ বাঁচায়

 

সমুদ্রের তলেও সে মাছেদের মত একঘেয়ে জীবন কাটাতো না। কখনো লিডিঙকে সঙ্গী ভাবতো, কখনো মাছ ভরা জাল কেটে দিয়ে মাছেদের বাঁচিয়ে দিত, সমুদ্রের খাদে মানুষের মত ডেরা সাজাতো। সে হয়েছিল না মানুষ, না মাছ।

 

খোশগল্প.কম: ড. সালভাদর, তাকে আসলে কি প্রতিভাবান অপরাধী নাকি একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানী কোনটি বলবে?

অলসেন: এখানে সংঘর্ষটা বিজ্ঞানের সাথে বিজ্ঞানীর কাজের। তার দুর্ভাগ্য তিনি একই সাথে ডাক্তার এবং জীববিজ্ঞানী ছিলেন। তার ডাক্তারীবিদ্যাই তাকে জীববিজ্ঞানের নানা এক্সপেরিমেন্ট করিয়েছে। এই এক্সপেরিমেন্টে কিছু প্রাণ ঝরে গেছে ঠিকই তবে যে বিপুল প্রাণ সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে এর কাছে ঝরে যাওয়াটা নগণ্য। তবে তার শাস্তি তো সে পেয়েছে।

 

খোশগল্প.কম: দরিয়ার দানো’কে এক সময় না এক সময় জনসম্মুখে আসতে হতো, তখনও ডা. সালভাদর শাস্তি পেতেন; তাহলে বুদ্ধিমান ডা. সালভাদর এই বৃহৎ গবেষণাগুলোকে কেন লুকিয়ে রাখলেন?

অলসেন: আসামীর কাঠগড়ায় অত তাড়াতাড়ি পৌছুবার তাড়া ছিল না তার (মুচকি হাঁসি)। আমাদের পরিপক্ক্বহীন সামাজিক অবস্থায় তার উদ্ভাবন উপকারের চেয়ে অপকারই বেশী করতো। প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেখানে মহত্তম সব আবিষ্কারকে অভিশাপে পরিণত করেছে, মানুষের যন্ত্রণাকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে সেখানে ইকথিয়ান্ডরের মত মানবিক প্রাণকে সাধারণের আওতায় তুলে দেয়া যায় না।

 

খোশগল্প.কম: পাদ্রী সালভাদরকে বলেছেন দুরাত্মা; যে ইশ্বরের সৃষ্টিকে বিকৃত করে কিংবা ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ ঈশ্বরদ্রোহিতা- আপনি কি বলবেন?

অলসেন: সালভাদর চেয়েছিলেন, মানুষ হলেও আমাদেরও সীমাবদ্ধতা আছে, সেগুলো কাটিয়ে উঠতে। মানুষ যদি জলেও অনেকক্ষণ থাকতে পারে তাহলে সমুদ্রের গভীরে আমরা হারিয়ে যাবো না। সমুদ্রগর্ভ ও তার বিপুল সম্পদরাশিকে কাজে লাগিয়ে আমরা আরো ছড়িয়ে উঠবো। ডুবন্তদের জন্য কাঁদবার প্রয়োজন ফুরুবে।

 

খোশগল্প.কম: আচ্ছা, ক্রিস্টোই এত মামলা, সালভাদর এর গোপন গবেষাণাগার এমনকি ইকথিয়ান্ডরকে জনসম্মুখে আনার বড় অপরাধী। তবু সালভাদর তাকে চাকরিতে বহাল রাখলো- তোমার কাছে কি মনে হয়?

অলসেন: ড. সালভাদরের গোপন যা ছিল তা লা প্লাতা উপকূলের সকলেই জানে। আর সালভাদর চলে যাবেন প্রশান্ত মহাসাগরের এক দ্বীপে। সেখানে তিনি ক্রিস্টোকে নেবেন না, তাই এখানকার কাজে ক্রিস্টোর কোন বাঁধা নেই।

 

খোশগল্প.কম: ইকথিয়ান্ডরের এই দীর্ঘ একাকী জীবন তোমাকে ব্যথিত করে না, তার তো মানবিক গুণাবলী ছিল, তার কোন অপরাধ না থাকা সত্ত্বেও তাকে একাকী মাছের জীবন বেছে নিতে হলো……

অলসেন: ইকথিয়ান্ডর হলো সেই প্রতিকী বলিদান; যাকে বলি দিতে হয় যুগকে নতুন কিছু পেতে।  এরকম একক কিংবা হাজারটা  বলিদান থেকেই মানবজাতি এগিয়ে যায়।

 

বইটি পড়তে চাইলে – rokomari.com/book/8382/

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত