গোড়াপত্তন জামালপুরে, কিন্তু সাদা লুঙ্গি আর পাঞ্জাবীতে এখন পুরোদস্তুর ঢাকাইয়া।বাবা-মা আর নানার হাত ধরে জামালপুর থেকে এসছেন ঢাকায়।তারপর সেখানেই পড়ালেখা করেছেন, ব্যাবসা শুরু করে থিতু হয়েছেন।কথা বলেছেন পুরান ঢাকার চাকচিক্যতা, প্রবাস জীবনের প্রবণতা, পরিবেশ বিভিন্ন কিছু নিয়ে।

আমি এইটা চাবো যে আমি যে অসৎ সঙ্গে পড়ছি এইটা আমার ছেলে না পরুক

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 10, 2016 , 1:55 অপরাহ্ন

sumon vai

 

খোশগল্প.কম: কেমন আছেন?

সুমন: ভালো আছি।

খোশগল্প.কম: আপনার জন্ম কি ঢাকায়ই?

সুমন: হ্যাঁ, কিন্তু আমার গ্রাম বা দাদার বাড়ি এইখানে না।

খোশগল্প.কম: তাহলে?

সুমন:আমার দাদার বাড়ি জামালপুর।আমার আব্বুর বিয়ে হয় পুরান ঢাকায়।মানে আমার মা’র পরিবার ঢাকাইয়া।আমার নানাদের আদি বাড়ি হচ্ছে জামালপুরে, সেই ভাবে আমার মা-বাবার বিয়ে হয়।

খোশগল্প.কম: আপনাদের পারিবারিক ইতিহাস যদি আপনি নিজে বলতেন।

সুমন:ইতিহাস তো নাই, পুরান কথা যা জানি বলি।আব্বুর দাদায় ছিলো ঐ সময়কার মাস্টার, জামালপুরে এক পীরের দরগায় যেয়ে তার সাথে আমার নানা’র সাথে পরিচয় হয়।তার পর কোন এক ভাবে আব্বুর সাথে মা’র বিয়ে হয়।বিয়ের সময় আব্বু আরেক দাদার বাড়িতে লজিং থাইকা মনে হয় ইন্টারে পড়তো, আর আম্মু থাকতো দাদার বাড়িতে। ও দাদা কি করতো বলি নাই, আমার দাদা কাপড়ের ব্যাবসা করতো, এই ভাবে এই ভাবে আব্বু বিএ পাশ করে।তারপর আব্বু ঢাকায় আইসা আমার নানার বাসায় কিছুদিন থাইকা একটা চাকরী নেয় গ্লাস বানায় এমন একটা জায়গায়।এর মধ্যে আমরা দুই ভাই-এক বোন হয়া যাই, আমি জামালপুরে প্রায় ৮-৯ বছর পর্যন্ত ছিলাম।তারপর মা আমাদের নিয়া ঢাকায় চইলা আসে।তারপর থিকা এই এলাকায় থাকি।

খোশগল্প.কম: আপনাদের গ্রামে থাকা সময়ের কথা বলেন।

সুমন: গ্রামে থাকা সময় আমার আসলে মনে নাই।যা আছে সব শোনা।ফ্যামিলির নাকি ঐ সময় খুব দাপট ছিলো শিক্ষিত বইলা, গ্রামের মধ্যে একজন মাত্র মাস্টার ছিল, আব্বুর দাদায়।আর আমার অন্য দাদারাও সবাই মাস্টার ছিলো আমার নিজের দাদা বাদে।নিয়ম ছিলো, সৈয়দ বাড়ির মেয়ে/বৌ কখনো বাড়ির বাইরে যাইতে পারতো না।

খোশগল্প.কম: আপনি বলছেন ঐ সময়ে প্রভাব ছিলো, এখন কী নাই?

সুমন:না, এখন তো দাদার বাড়িতে কেউ থাকেই না, তার উপর ভাই বোনের সংখ্যাও ম্যাটার করে, আমরা চাচাতো ভাই-বোন মাত্র কয়েকজন, কেউ তেমন আগাইতেও পারে নাই, গ্রাম কিন্তু ঠিক ই আগাই গেছে।

খোশগল্প.কম: আপনি বা আপনার পরিবার তাহলে মোট কত বছর ধরে এই এলাকায় থাকেন?

সুমন:৩০ বছর মনে হয় হইছে।

খোশগল্প.কম: তাহলে আপনাদের কারো উচ্চারণ বা কথা বলায় ঢাকাইয়া টোন অতটা নাই, এইটা কেন?

সুমন: একেবারে নাই তা না।আমাদের আছে সবারই কিন্তু পুরা না, যেমন ছোটবেলা জামালপুরে কাটানোতে, তারপর আবার আব্বু জামালপুরের হওয়ায় কথা শেখা ঐ খানেই বেশী হইছে, তো জামালপুর-ঢাকাইয়া দুইটাই মিলায়া বলি।তারপরেও খেয়াল কইরেন আমরা নিজেরা কথা বলার সময় ‘অহেনা, খায়া পারুম না, যায়া পারুম না, বইন, চিখার পারা, এইটি-হেইটি’ এই গুলা বলি কিন্তু।কিন্তু এখন আমাদের নিজেদের ছেলেমেয়ে ছোট-ছোট এই জন্যে ওদের সাথে শুদ্ধ কইরা কথা বলি, তারপর আপনে বাইরের মানুষ এই জন্যেও ঐ ভাবে বলতাছি না।

খোশগল্প.কম: হা হা হা।আপনাদের পুরান ঢাকার এই দিকে আপনাদের জীবন-যাপনে খুব চাকচিক্যতা থাকে এইটার কারণ কী বলে আপনার মনে হয়।

সুমন:হ্যাঁ, এইটা আমার কাছে মনে হয় এই এলাকায় তো ধরেন রাজা-বাদশার রাজধানী ছিলো, তখন থিকাই মনে হয় এই রকম জম-জমাট চালু হইছে, আপনে খেয়াল কইরেন চকবাজার এর পর নাজিমুদ্দীন রোড থিকাই ঐ এলাকা কিন্তু এই দিকের মত না।জাস্ট এইদিকে খাবার-দাবার, পোশাক-আশাকে পুরান ঢাকাইয়ারা সব কিছুতে ভারী ভারী জিনিস ইউজ করে কিংবা খায়, আপনি দেইখেন এরা কিছুতেই হালকা জিনিস পরবো না খাইবোও না।

খোশগল্প.কম: রাজা-বাদশা বা রাজধানীর সময় তো অনেক আগেকার কথা, এতদিনে তো পরিবর্তন হইতে পারতো।

সুমন:সেইটা ধইরা রাখছে এই জন্যে হয় নাই।

খোশগল্প.কম: আপনাদের এই দিকে একটা আরেকটা জিনিস হচ্ছে ঢাকাইয়া ফ্যামিলির প্রায় প্রতি পরিবারেই একজন করে সৌদি, ওমান, দুবাই, কাতার মোট কথা মধ্যপ্রাচ্যে থাকে, এইটা খেয়াল করছেন? এইটা কেন হয় আপনার মনে হয়।

সুমন:আগে এই ভাবে খেয়াল করি নাই, এখন মনে হচ্ছে এইটা ঠিক, আমাদের নানীর বাড়ির বংশে প্রত্যেকেই বিদেশ থাকে।এইটা হইতে পারে ধরেন আমাদের এইদিকে পড়ালেখার চলন কম, ওয়ান, টু, থ্রী এইগুলারে বলে ১ক্লাস, ২ক্লাস, ৩ক্লাস।তো অল্প কিছুদিন স্কুলে যাওয়ার পর পরই এরা আর পড়ালেখা করে না।মেয়েদের তো বিয়াই দেয়া দেয়, ছেলেদের কিন্তু কিছু করার থাকে না।এরা চাকরি ও পাইবো না পড়ালেখা দিয়া।তখন এরা যেটা করে কাজ শিখে কিংবা ঐ দেশে গিয়া ব্যাবসা শুরু করে। ঢাকাইয়া কমিউনিটি কিন্তু খুব বড় না, এক জন যাওয়ার পর আরেকজনরে নেয়, বিদেশে টাকা যেহেতু আমাদের দেশে অনেক টাকা তখন এইভাবেই ফ্যামিলির একজন একজন বিদেশেই থাকে।

খোশগল্প.কম: আপনি কেন যান নাই তাহলে?

সুমন: আমার বড় ভাই বিদেশে থাকতো তো আমরা দুই ভাই, এক ভাই যেহেতু থাকতো আমার কখনো মনে হয় নাই আমি বিদেশ যাবো।আর এই খানেই ব্যাবসা শুরু করছি, লাভ ও হয় তাই কখনো হয়তো মনে হয় নাই।

খোশগল্প.কম: আপনি বলছিলেন আপনাদের এই দিকে পড়ালেখার প্রচলন কম, আপনি কতটুকু পড়ালেখা করছেন?

সুমন:আমি ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ছি, মেট্রিক পাশ করছিলাম ৪ বিষয়ে লেটার নিয়া, কলেজে উঠার পর আর পড়ালেখা হয় নাই।

খোশগল্প.কম: আপনি বলছিলেন আপনার আব্বু ঐ সময়ে অনার্স পাশ করছেন, সেই তুলনায় আপনি এত কম এইটা নিয়ে গ্লানিবোধ করেন না?

সুমন:আগে লজ্জা লাগতো  না, এখন চিন্তা করি।আসলে অল্প বয়সে তো কেয়ার করতাম না, কিন্তু এখন মনে হয় ছাত্র তো খারাপ ছিলাম না, কষ্ট কইরা পড়লে হয়তো এইদিক থিকা বাইর হয়া ঢাকায় সরকারী চাকরি করতে পারতাম।আব্বু এই এলাকা থেকে বাইর করার জন্যে বোরহানুদ্দিনে ভর্তি করলো, কিন্তু ক্লাসেই যাইতে পারতাম না।

খোশগল্প.কম: এইদিক থেকে বের হয়ে বলতে কেরানীগঞ্জ?

সুমন:হ্যাঁ।

খোশগল্প.কম: অদ্ভুত বিষয়, আপনি বের হতে চান কেন?

সুমন:এখন আমার ছেলে আছে ছোট, আমি এইটা চাবো যে আমি যে অসৎ সঙ্গে পড়ছি এইটা আমার ছেলে না পরুক, তাই না? ও পড়ালেখা করুক, কিন্তু এইদিকে থাকলে সেইটা সম্ভব না, আমার ওয়াইফ ও মনে করেন ঢাকায় চলে যাইতে চায়।আমার ছেলের বয়স ৪ বছর, ও এখনই পুরা ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলে, ওর সব সময় গান-বাজনা, হই-হুল্লা এইগুলায় থাকতে চায়, এইগুলা দেখলে মনে হয় ঔ বড় হইলে এইদিকের ছেলেদের মত হইয়া যাবে।

খোশগল্প.কম: আপনার স্ত্রী কোন এলাকার?

সুমন:ওরা একটু গ্রামের দিকে, ওদের মধ্যে আমাদের মত এত না, গ্রামের মতই, ভাষাও চেঞ্জ আছে।

খোশগল্প.কম: আপনি কিসের ব্যাবসা করছেন?

সুমন:ক্রোকারিজের।

 

খোশগল্প.কম: এতক্ষণ ধরে কথা বলার জন্য ধন্যবাদ।

সুমন:আপনাকেও থ্যাংক্স।

 

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত