ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ব্যতিক্রম কিছু করার, উদ্যোক্তা হবার।  সেই স্বপ্নে বিভোর থাকলেও একসময় চাকরি করলেও ছেড়ে দিয়ে শুরু করেছেন।নিজের প্রতিষ্ঠান

আমরা যখন পড়তে থাকি তখন আমাদের মনের মধ্যে ছোট ছোট জগত তৈরি হয়

লিখেছেন...admin...নভেম্বর 29, 2016 , 12:03 অপরাহ্ন

shonon

খোশগল্পঃ-প্রথমে আপনার পুরো নামটা ও বর্তমান  পরিচয় দিয়ে  দিয়ে শুরু করি।

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আমি খন্দকার স্বনন শাহরিয়ার।আমার একটা কনসাল্টিং ফার্ম আছে সেখানে আমি নিজেই নিজেকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বানিয়েছি। এটার নাম হচ্ছে ‘কি-মেকারস কন্সাল্টিং লিমিটেড’ । আমরা সোশ্যাল এবং মার্কেটিং বিষয়ক স্ট্র্যাটেজিক পরামর্শ দিই বা দেয়ার চেষ্টা করি।

খোশগল্পঃ-ছোটবেলার গল্প যদি একটু বলেন।

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আমার বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরীজীবী পাশাপাশি লেখক খন্দকার মাজাহারুল করিম। বাবার বদলীর চাকরী হওয়ায় আমার ছোটবেলাটা ঘুরে ঘুরে কেটেছে।আমি জন্মেছি খুলনায়। আমি থেকেছি রাজশাহীতে, চট্টগ্রামে, ঢাকায় এবং আমার মনে হয় আমার জীবনের প্রথম ১২ বছরে ৭ টা স্কুল পরিবর্তন করেছি। এটা হল আমার ছোটবেলার গল্প। যখনই আমার কিছু বন্ধু-বান্ধব হত আমাকে উঠিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত। আমার সবচেয়ে বেশি ছিলাম ক্লাশ এইট থেকে ক্লাশ টেন পর্যন্ত এক স্কুলে। এটা আমার জন্য সবচেয়ে লম্বা সময় এক স্কুলে থাকা।

খোশগল্পঃ-আপনার পড়াশোনা সম্পর্কে কিছু বলেন।

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আমি ন্যাশনাল ব্যাংক পাবলিক স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করলাম। আমার মা মিলা মাহফুজের খুব ইচ্ছা ছিল যে আমি নটরডেম কলেজে পড়ি। নটরডেম কলেজে ভর্তি হলাম যদিও সাইন্স আমার প্রিয় বিষয় ছিল না। আমি ইতিহাস এবং সমাজবিদ্যা একটু আগ্রহ নিয়ে পড়ি। ওগুলো আমার এমনিতেও পড়া হতো কিন্তু আমার অংকের প্রতি অনেক অনীহা ছিল। সে জন্য বাড়ির সবাই মিলে ঠিক করলো যে আমাকে বিজ্ঞানই পড়তে হবে। ফলে বিজ্ঞান এবং অংকটা পড়তে বাধ্য হলাম। এটা খুব ভাল সিদ্ধান্ত ছিল, আমার জীবনে অনেক কাজে দিয়েছে। এইভাবে আমি নটরডেম থেকে পাশ করলাম। আমি অন্য কোথাও ভর্তি পরীক্ষা দেইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার অর্থনীতি পড়ার ইচ্ছা ছিল। ঐ একটায় পরীক্ষা দিয়েছিলাম ভাগ্যক্রমে চান্স হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই আমি অনার্স মাস্টার্স করেছি।

খোশগল্পঃ-তারপর?

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- তারপর আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা করা হয়নি। আমি মাস্টার্স করার সময় আমার বাবা মারা যান মধ্যবিত্ত পরিবারে যা হয় যে তখন রুজি-রোজগারের একটা প্রশ্ন সামনে চলে আসে। তো আমি নানান জায়গায় চাকরির ইন্টারভিউ বা দরখাস্ত পাঠাই। মনে হয় কমপক্ষে ১০০ দরখাস্ত আমি পাঠিয়েছি এর মধ্যে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ছাড়া আর কোথাও ডাক পাইনি। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো এর চাকরিটা আমার প্রায় হয়েই যাচ্ছিল কিন্তু উনারা প্রথমেই বললেন যে ঢাকার বাইরে ৪-৫ বছর একটা পোস্টিং আছে।তখন আমার বাসার এমন একটা অবস্থা যদি আমি ৪-৫ বছরের জন্য ঢাকার বাইরে যায় তাহলে আমার মা এবং আমার ছোট ভাইয়ের খুব অসুবিধা হয়। তাই ওটা আমি নিতে পারিনি। যখন এমন প্রায় সময় কাটানোর জন্য নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে খন্ডকালীন কাজ করছিলাম তখন বাংলাদেশে কোয়ান্টাম মার্কেট রিসার্চ একটা প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটা ভারতীয় গবেষণা সংস্থা তাদের একটা অফিস খুললো। উনারা আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেন যে, তোমার কি কোয়ালিটিভ মার্কেট রিসার্চ করের ইচ্ছা আছে কিনা। তখন আমি জানতামই না এই জিনিসটা আ্সলে কি? আমি গবেষণা হলে রাজি আছি কারণ এটা করতে আমার খুব ভাল লাগে কিন্তু আমি মানে আমি না জেনেই এটার মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়লাম। তারপর থেকে আমি ওখানেই কাজ করেছি। কিছুদিন ঢাকায় কাজ করার পর কোম্পানির মনে হল যে কিছুদিন আমাকে ঢাকার বাইরে কাজ করতে হবে। তারপর আমার সিঙ্গাপুরে পোস্টিং হল। সেখানে গিয়ে আমি টের পেলাম যে আসলে উনারা এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের ব্যাবসার গুরুদায়িত্ব আমার কাঁধে দিতে চান। এইটার জন্য ৬ মাস সিঙ্গাপুরে কাজ করেছি। তারপর মধ্যে কিছুদিনের জন্য ঢাকায় এসেছিলাম তারপর বোম্বেতে গিয়ে কাজ করেছি, কিছুদিন জাকার্তায় গিয়ে কাজ করেছি। অল্প কিছুদিন কলম্বতেও কাজ করেছি।এভাবে ঘুরে ঘুরে কাজ করার পর এই বছরের জুন-জুলাই নাগাদ আমি সিদ্ধান্ত নিই যে দেশে ফিরে আসব এবং নিজেই একটা গবেষণা প্রতিষ্ঠান দেব।

খোশগল্পঃ- কত বছর এখানে ছিলেন আপনি?

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আমি ২০০৪ এ কোয়ান্টামে কাজ শুরু করেছি, এখন ২০১৬ সাল।প্রায় ১২ বছর আমি এটাতে কাজ করেছি। এর মধ্যে আমি অবশ্য প্রায় দুই বছর এপেক্স ফুট ওয়্যার লিমিটেডে হেড অফ মার্কেটিং হিসেবে কাজ করেছি। এপেক্স আসলে কোয়ান্টামের সাথে এক ধরণের পার্টনারশিপে আছে তাই নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমেই ঠিক করা হয়েছিল।

খোশগল্পঃ-কোয়ালিটিটিভ মার্কেট রিসার্চ যখন কাজ শুরু করেন একটা নতুন কাজে নতুন সিচুয়েশনে নিজেকে কেমন করে দক্ষ করে নিলেন সেটা সম্পর্কে কিছু যদি বলেন

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আসলে কৃতিত্ব আমার না এটা আমি স্বীকার করি। আমি আসলে একাদশ শ্রেণীর বই পড়ার সময় অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এর খুব সহযোগিতা পেয়েছিলাম। উনি আমাকে অনেক সময় দিয়েছিলেন, বারবার বলতেন এই যে কেরাণি-র জীবন, এই যে বাঁধা ধরা ডাক্তার হব-ইঞ্জিনিয়ার হব-সরকারি কর্মকর্তা হব বাঙ্গালী ছেলেদের এর বাইরে ভাবার সাহসও নেই, সে যোগ্যতাও নেই। আমার মনে কথা গুলো বিঁধতো। আমার মনে হত আসলে আমরা তো এত ছোট হতে পারিনা। তারপর যখনই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়তে গেলাম তখন আমি ভাল ভাল শিক্ষকের গাইডেন্স পেয়েছি। আবুল বরকত স্যার ছিলেন, নাজমুন্নাহার রত্না ম্যাডাম ছিলেন, এম এ তসলিম স্যার ছিলেন, আকাশ স্যার ছিলেন। উনারা সবসময় পড়ানোর সময় আমাদের বিভিন্ন পজিটিভ কথা বলতেন। তারা বলতেন কিছু রাস্তা অনেক ডিফিকাল্ট থাকে, যেখানে একটু ঝুঁকি নিয়ে যেতে হয়;সেখানে যদি যোগ্য মানুষ যায় তাহলে তার ফলাফল ভাল হয় কারণ সেই রাস্তায় ভীড় কম। যার গতি আছে সে অনেকদূর পর্যন্ত যেতে পারে। আমি এরকমই মনে করলাম যে আসলে শুরু করলে বোধ হয় হয়ে যাবে। যখন শুরুতে চাকরীর আবেদন করে দেখলাম যে প্রথাগত চাকরিতে আসলেই ভীড় বেশি। তখন আমার মনে হল যে আসলেই এরকম একটা কাজ করা ভাল। যে জিনিস গুলো নতুন শুরু হচ্ছে এর ফলে এখান থেকে খুব দ্রুত অনেক দূর পর্যন্ত যাওয়া যাবে।

খোশগল্পঃ-আপনার অনেকগুলো আবেদন থেকে মাত্র একটা জায়গা থেকে ডাক আসলো, এই ক্রাইসিসের সময়টাকে কিভাবে মোকাবেলা করলেন?

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- মাস্টার্স শেষ করার ৬ মাস পর্যন্ত কোন কাজ পাইনি তা নিয়ে অসম্ভব ভীত ছিলাম আমি। আমার প্রত্যেকদিন মনে হত একটা আপোস-টাপোস করে ফেলি।যে ধরনের প্রথাগত কাজ পাওয়া যায় নিয়ে নিই। আমি খুব অল্প বয়সে একজন মানুষকে ভালবেসেছিলাম এবং সেও খুব অপেক্ষায় ছিল যে কবে আমি কিছু একটা করতে পারব। আমাদের সুন্দর একটা সংসার হবে। সুতরাং সেটা আরেকটা উৎকণ্ঠার ব্যাপার ছিল। কিন্তু একটা জিনিস ঠিক যে আমরা যখন ভীত থাকি আমরা কিন্তু চারপাশে তাকাই। আর এই তাকানোর সময়টা কেউ যদি একটু দূরে তাকাতে পারে তাহলে জিনিসগুলি একটূ সহজ হয়ে যায়। আমরা যদি খুব কাছের দুঃশ্চিন্তা এবং উৎকণ্ঠার দিকে লক্ষ করি তখন এটা আমাদের সামনে পাহাড়ের মত বড় হয়ে উঠবে। কিন্তু যদি দূরে তাকায় যেমন এখান থেকে ৫ বছর বা ১০ বছর বা ২৫ বছর পড়ে আমি কোথায় যেতে পারব তখন কিন্তু আজকের সমস্যাকে সমস্যা মনে হবে না।মনে হয় এইদিনটা পার হয়ে যাবে সামনে আরেকটা দিন আসবে। সেইদিনকার আমি বলতে চাই না যে তখনকার আমি যদি সাহস দেখতাম তাহলে আজকে এই অবস্থা হত না। আমি প্রত্যেক ব্যর্থতার পর নিজেকে বলতাম যে এটা একটা ব্যর্থতা কিন্তু এখানেই পৃথিবী শেষ হয়ে যাচ্ছে না।কালকে আরেকটা নতুন সুযোগ আসবে যদি যোগ্যতার উপর আস্থা থাকে অবশ্যই কাল কিছু করতে পারবে। ঐ সময়টা পার হয়ে যখন আমার সামনে সুযোগ এসেছে তখন আমি সেটা নিতে পেরেছি। এখন হয়তো বলা সহজ হচ্ছে কিন্তু ঐসময় আমি দ্বিধার মুখে পড়তাম যে আমি আরেকদিন দেখব কি না? নাকি আজকে আমি আত্মসমর্পণ করব?

খোশগল্পঃ-অনেক লম্বা সময় ধরে একটা জায়গাতে থাকা এটাও কি রিস্কের ব্যাপার না?দেখা গেছে আজকাল ছেলে মেয়েরা একটা জব করার পাশাপাশি বেটার কিছুর জন্য সিভি ড্রপ করে বা চেষ্টা করে কিন্তু আপনার যে একটা জায়গা থেকে ঐ যে  ২৫ বছর পর নিজেকে অন্য জায়গায় দেখা এটার মধ্যে কি পার্থক্য?

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- একেক জনের একেক দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম। কেউ কেউ স্বল্পকালীন বা কাছাকাছি সময়ে কি পাবে এটা নিয়ে চিন্তিত থাকে। আমার একটা ভয় সবসময় ছিল যে আমি যে একটা কাজ করব সেই কাজে কি নিজেকে অপরিহার্য করে তুলতে পারব কি না? অর্থাৎ ব্যাপারটা একসময় এমন হবে কিনা যে আমি নিজে এমন দক্ষতা অর্জন করেছি যে এমন একটা প্রতিষ্ঠান আমার পক্ষে চালানো সম্ভব এটা বলতে পারি যেন। তো আমি যখন কাজ করতে গেলাম তখন দেখলাম যে আমার চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ অনেক দক্ষ গবেষক আছে এমন কি কোয়ালিটিটিভ বাজার গবেষণার ক্ষেত্রেও আমার অনেক দক্ষ গবেষক আছে। তখন আমি শিখতে শুরু করলাম এবং যতোই আমি শিখলাম ততই বুঝলাম যে শেখার অনেক বাকি আছে। তখন আমি ১০ বছর মেয়াদী একটা পরিকল্পনা করেছি যে এই ১০ বছর আমাকে এই এই জিনিস শিখতে হবে এবং পেশাগত জীবনে সবার হয় কিনা জানিনা কিন্তু আমাদের পেশায় এটা হয় যে একটা পর্যায় সব শেখা যায় তারপরে শিখতে একটু কষ্টও হয়। যারা এই জ্ঞান নিয়ে বসে আছেন তারা সবাই যে এটা উদারভাবে বিলিয়ে দিতেন তা নয়। পাশাপাশি কাজ করে, দেখে অনেকটা শিখতে হয়। তখন আমি ধরে নিয়েছিলাম যে একটা নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যদি আমি ১০ বছর পর্যন্ত থাকি তাহলে আমি এমন কিছু শিখব যা ভবিষ্যতে আমাকে একটা ছোটখাট ব্র্যান্ড হিসেবে ধার করিয়ে দিবে। আমি যথেষ্ট স্পর্ধার সাথে বলছি যে লেগে থেকে দেখেছি যে এটা সম্ভব।

খোশগল্পঃ-ব্যাক্তিগত সম্পর্কটা আসলে পেশাগত দিকে কিভাবে সুবিধা বা অসুবিধা সৃষ্টি করে?

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আমি মনে করি যে মানুষ ব্যাক্তিগত সম্পর্কের দিক থেকে সুখী না বা নিশ্চিত না তার পক্ষে পেশাগত জীবনে সম্পূর্ণ মনোযোগ দেয়া বা আনন্দের সাথে কাজ করা খুব মুশকিল। আমি মনে করি যে এটা একধরণের আবেগ, যা  ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের একটা জিনিস মনে রাখতে হবে যে ব্যাক্তিগত সম্পর্কের জায়গাটা পৃথিবীতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এটা বাবা-মা,ভাই-বোন বা স্বামী-স্ত্রী প্রেমিক-প্রেমিকার যেই সম্পর্ক হোক না কেন এটা আসলে আমাদের জীবনের মূল অংশ। যদিও আমরা কর্মস্থলে অনেক বেশি সময় কাঁটাই কিন্তু জীবনের সবচেয়ে মধুর সময়গুলো কিন্তু পরিবারের সাথে কাটে। আমি কিন্তু আমার মা এবং ভাইয়া আর বাবা যখন বেঁচে ছিলেন- তারা কিন্তু আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। জীবনে এমন কোন বিষয় নেই যা আমি তাদের সাথে আলাপ করিনি। আমার জীবনে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার ৬০ ভাগই তাদের মুল্যবান মতামত আমার কাজে এসেছে। আমার তখনকার প্রেমিকা এবং এখনকার স্ত্রী সম্পর্কে যেটা বলতে পারি যে, আমরা দুজনেই বুঝতাম ভালবাসার মাঝে যেমন বাঁধন লাগে তেমন একটু স্বাধীনতাও লাগে। তো কিছু কিছু জিনিসে যেমন আমরা অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িত ঠিক তেমন কিছু জিনিসে আমরা দুজন দুজনকে একটু জায়গা দিই। এটা খুবই সূক্ষ্ণ। মাঝে মাঝে এটা নিয়ে একটু মান অভিমান হয়না তা না তবে আমি আমার স্ত্রীর কাছে অনেক কৃতজ্ঞ সে আসলে বুঝে যে ঠিক কতদুর আসলে আমার ছাড় দরকার আবার এটাও বুঝেন যে কতটুকু আমার উপর জোর খাটাতে হবে।এই বিষয়গুলোতে তার বুদ্ধি অনেক বেশি যার ফলে আমি নিরাপদে আছি(হাসি)।

 

খোশগল্পঃ-বর্তমানে আপনার কনসাল্টিং ফার্ম নিয়ে কিছু বলেন

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আমি আসলে যেহেতু একটা বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম একটা পর্যায়ে আমি দেখলাম যে যেটা আমার জরুরি জিনিসগুলো শেখা দরকার ছিল সেগুলো আমি শিখে ফেলেছি এবং আমি পেশাগত জীবনে এমন একটা জায়গায় আছি যে এখন আমার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা আমাকে নতুন নতুন বাজারে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে ব্যাবসাগুলো আমাকে দিয়ে শুরু করা। এটা খুবই আনন্দদায়ক যে অনেক নতুন জায়গা দেখা হয়,নতুন লোকের সাথে পরিচয় হয়। বিভিন্ন সংস্কৃতি মন্ডলে কাজ করাও কিন্তু আমার মত লোকের জন্য অনেক আনন্দদায়ক। কিন্তু একটা সমস্যা হচ্ছে যে আমি সবসময় ঐ ২৫ বছরে ভূতটা মাথা থেকে যায়না। আমি ভাবতে থাকি যে এগুলো যদি আমি করতে থাকি তাহলে ২৫ বছর পড়ে কি হবে? আমার ধারণা হল যে আমি নতুন অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ হব।অ নেক নতুন নতুন মানুষের সাথে আমার পরিচয় হবে এবং বেশ টাকা পয়সা মিলিয়ে জীবন ভালই কাটবে। আর যা হবে না তা হচ্ছে চিরস্থায়ী মূল্যের কোন কিছু তৈরি হওয়া। আর সেই জন্যেই আমি ভাবলাম আসলে নিজের সার্থকতার জন্য আসলে কি করা উচিত এবং কোম্পানীর সবাই বলতো যে নেতৃত্বের অনেক গুণাবলীই আমার মাধ্যে দেখেছেন। এইটা থেকেই চিন্তা আসল যে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমরা যে ধরনের কাজ করি এটা যদি বাংলাদেশের পরিমন্ডলে কাজে লাগাতে পারি তাহলে বাংলাদেশের এখন যে উঠতি অবস্থা তাহলে সেইটার সাথে আমার কাজটা সাযুজ্যপূর্ণ হবে। আমি খুব আশাবাদী মানুষ, আমি বিশ্বাস করি যে বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের সামাজিক সংগঠন গুলো অনেক বড় হবে এবং বৈশ্বিক স্তরের প্রতিনিধিত্ব করবে। আমরা যারা বৈশ্বিক স্তরে কাজ করেছি আসলে এই সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান গুলোর পাশে থাকা উচিৎ। আমাদের যেটুকু সামান্য দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা আছে এটা পুরোটায় এখানে কাজে লাগানো দরকার। আমরা জানি যে নতুন অবস্থায় আমরা যারা কৌশলগত পরামর্শ দিই এটার ভোক্তাশ্রেণী এখানে এখনও তৈরি হয়নি। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হয়তো জানেই না যে আমাদের কিভাবে কাজে লাগাতে হয়। আমি দেখেছি ভারতীয় কোম্পানি যেই নতুন মার্কেটে গেছে তারাই এটা মানুষকে কনভিন্স করেছে এবং বলেছে কিভাবে কাজে লাগানো যায়। এই জিনিসটা আমরাও আশাবাদী যে এটা আমরাও বাংলাদেশে করতে পারব। আমার প্রতষ্ঠানে আমি ছাড়াও আরও চারজন অভিজ্ঞ পরামর্শদাতা আছেন। এরা কেউ কেউ বহুজাতিক কর্পোরেশনে কাজ করেছেন। কেউ আবার গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ছিলেন, তারাও জানেন কিভাবে কাজগুলো করতে হবে এবং আমরাও সাড়া পাচ্ছি। যারা এরই মধ্যে কিছু বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে কাজ করতে নেমেছেন বা স্থানীয় পরিমন্ডলে অনেক বড় হতে চান এরা আমাদের পরামর্শ এবং সাহায্য চাচ্ছেন। আমরা জানি যে এটা সময় লাগবে বিভিন্ন ঝামেলা ফেস করতে হবে।আমরা এটাতে রাজি আছি। আগামী পাঁচ বছর যদি আমরা আমদের কাজটা আন্তরিকতার সাথে করে যেতে পারি তাহলে পরের দশ বছর বিপুল কলেবরে আমরা কাজটা করতে পারব এটা আমাদের আশা।

খোশগল্পঃ-আবার পারসোনাল লাইফে আসি।বই পড়া ব্যাপারটা কিভাবে আপনার জীবনে প্রভাব ফেলেছে?

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ-  প্রথমেই বলি আমার মা আমাকে বলেছেন আমি অস্বাভাবিক অল্প বয়সে বই পড়তে শুরু করেছি। আমার পারিবারিক অ্যালবামে দেখি আমার বয়স চার বছর এবং আমি বই পড়ছি। বাচ্চারা যেভাবে ছবির পাতা উল্টায় তা না মানে অক্ষর পড়ে পড়ে বই পড়ছি। আমার কাছে মনে হয় আমি যেন জন্ম থেকেই বই পড়ছি। আমি ব্যাপক উৎসাহ পেয়েছি যেহেতু বাবা লেখক, মা সাংবাদিক-লেখক, দুজনেই আমার বই পড়ার ব্যাপারটা দুই হাতে আনুকূল্য দিয়েছে। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ কিন্তু আমার বইয়ের সরবরাহের কোন ঘাটতি ছিল না। এছাড়াও মজার ঘটনা ছিল আমার আত্মীয়রা আমার বই পড়া দেখে অন্য কিছুর বদলে শুধু বই উপহার দিত ।এছাড়াও রাজশাহীতে যখন ছিলাম রাজশাহী শিশু একাডেমীর সকল সেকশনের বই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলাম। পরে আমাকে বড়দের সেকশন থেকে বই নিয়ে পড়তে হত। এই নিয়ে লাইব্রেরিয়ান ফোন করে মাকে কমপ্লেনও করেছিলেন। আমরা যখন পড়তে থাকি তখন আমাদের মনের মধ্যে ছোট ছোট জগত তৈরি হয়। যখন অনেক পড়তে থাকি তখন জগতগুলোর মাঝে একটা যোগসূত্র তৈরি হয়। এটা মিলিত ভাবে আমাদের ফিজিকাল জগতের চেয়ে বড় হয়ে যায়। আমি মনে করি শিশু-কিশোরদের জন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। কারণ ওই সময় যদি ইমাজিনেশন অনেক বড় হয় তাহলে কিন্তু মানুষ ক্ষুদ্রতার মধ্যে আটকে থাকেনা। সে বিশ্বাস করে সব সম্ভব তার জানতে ইচ্ছা হয় মানুষের সাথে মিশতে ইচ্ছা হয়। আমি জীবনে যা কিছু শিখেছি তার ৯০ ভাগ আমি বই থেকে শিখেছি।এখন বড় হয়ে আমি যে সব জায়গা ঘুরেছি বেশির ভাগই আমি বই পড়েছিলাম সেই সব স্বপ্ন থেকে এসেছে। অনেক জায়গা গিয়ে জায়গাটাকে ফ্যামিলিয়ার মনে হয়েছে মানুষগুলো খুব ফ্যামিলিয়ার মনে হয়েছে কারণ পড়েছি আমি।একটা বই তার সাথে সেতু তৈরি করে দিয়েছে যদিও আসলে অনেক পড়া উচিৎ ছিল। আমি আসলে খুব কৃতজ্ঞ যে ঢাকা পাবলিক লাইব্রেরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র- এগুলো উদারভাবে আমাকে বই পড়তে সাহায্য করেছে।

খোশগল্পঃ-আপনার নিজস্ব কোন জীবনবোধ বা মূল্যবোধ আছে?

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ-আমি আসলে অনেক বই পড়ার ফলে অনেকের চিন্তায় প্রভাব আমার উপর পড়েছে।আমি বিশ্বাসপ্রবণ মানুষ, আমার ধারণা আমার বুদ্ধিও একটু কম কারণ বুদ্ধিমান মানুষ সবসময় সংশয়ের সাথে অন্যকে দেখে। আমার আসলে এই সংশয়টা আসেনা। যেটা আমি বুঝতে শিখেছি যে, ৩-৪টা বিষয় আমাকে প্রভাবিত করেছে, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এর একটা কথা যে মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়- এই কথাটা আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে তখন আমার ১৭ বছর বয়স, যখন আমি এই কথাটা শুনি। কথাটা আমার বুকের ভেতর গেঁথে গিয়েছে। এটা এখন পর্যন্ত আমার একটা অপরিবর্তনীয় ধারণা। আমার বাবা আমাকে প্রায়ই বলতেন মানুষ যোগ্যতা এবং অবস্থান নির্বিশেষে সমান এবং একই মানবিক সম্মানের অধিকারী এই জিনিসটাও আমার মধ্যে খুব গেঁথে গেছে।আমি বিশ্বাস করি যে মানুষকে শ্রেণী দিয়ে লিঙ্গ দিয়ে জাতি দিয়ে আলাদা করা যায়না। তাদেরকে এটা দিয়ে বিচার করা ঠিক না। এছাড়াও বড় অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ আমাকে প্রভাবিত করেছেন যেমন জন কেইজ, কিংজিয়ান অর্থনীতির ধারণা আমাকে খুব প্রভাবিত করেছে। কেইজ বলেছিলেন যে মানুষ ইতিবাচক প্রনোদনা আসলে অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক। এইটার আমি প্রবল সমর্থন করি।এ ছাড়াও মার্শাল ম্যাক্লোহানের তত্বও আমাকে খুব নাড়া দিয়েছে। ম্যালথাসকে আমি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিই। গৌতম বৌদ্ধের কিছু কিছু জিনিস আমাকে খুব নাড়া দেয়।

খোশগল্পঃ-এবার কিছু মজার ঘটনা জানতে চাইব।ছোটবেলা থেকেই কিছু মৌলিক চিন্তা হিসেবে ধরে নেয় আসলে কিছুদিন পর দেখা যায় অনেকেই চিন্তা করে ফেলেছে।আপনার এমন যদি কোন ঘটনা থেকে থাকে বলেন।

খন্দকার স্বনন শাহরিয়ারঃ- আমি যখন ইউনিভার্সিটিতে উঠে WTO সম্পর্কে জানলাম তখন আমি রীতিমত মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলাম। আমি অনেকদিন ধরে ভেবেছি যে এই আইডিয়াটা আমার নিজের এবং ভাবে রেখেছিলাম যখন বড় হব তখন আমি এটা করব। আমার মনে হয়েছিলো যে সীমান্ত, বিভেদ এবং বিধি নিষেধের বেড়াজাল না থাকলে আসলে সবারই ভালো হবে। পরে দেখলাম যে মানুষ এটা তিরিশ-চল্লিশ বছর আগেই অংক করে প্রমাণ করে ফেলেছে তখন আমি খুবই হতাশ হয়েছিলাম। এটা একটা। আর দ্বিতীয় আরেকটা হচ্ছে যে আরও অনেক বড় হয়ে আমি যখন প্রথম ইয়ুঙ্গিয়ান আর্কেটাইপ সম্পর্কে জানতে পারলাম। যেহেতু আমি সবসময় রূপকথার বই পড়ি, আর্কেটাইপ এই চরিত্রগুলো আমারও মাথায় ছিলো, আমি যখন দেখি ইয়ুং অনেক আগে থেকেই এই চরিত্রগুলো এত সুন্দর করে শ্রেণীবিভাগ করে সাজিয়ে রেখেছেন, যুক্তি দিয়ে বলেছেন কোনটা কেন হবে, কেন সামগ্রিক অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে। তখন আমার হঠাৎ মনে হলো এই কাজটা তো আমি আর একটু আগে করতে পারতাম, যদি না ইয়ুং সাহেব এটা দুইশ বছর আগে শেষ না করে যেতেন।

খোশগল্পঃ-অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত