নাজমুস সাকিব, পড়ছেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কিটেকচার বিভাগে, তারও আগের পরিচয় একজন ‘আঁকিয়ে’ হিসেবে । শৈশব থেকে কার্টুন, ক্যারিকেচার, এনিমেট ছবি তৈরী তার প্যাশন। কথা বলছেন শিল্প আর শিল্পীর কাজ নিয়ে……..

“আর পাবলো পিকাসো কুড়িয়ে পাওয়া সাইকেলের যন্ত্রাংশ দিয়ে কালজয়ী আর্ট ওয়ার্ক সৃষ্টি করেন”

লিখেছেন...admin...জানুয়ারী 2, 2017 , 4:42 অপরাহ্ন

15870669_1201339753288884_1587714117_n-1

খোশগল্প.কম: প্রথমে পরিচয় শুনি তোমার।

নাজমুস সাকিব: আমি নাজমুস সাকিব, স্কুল মতিঝিল মডেল, কলেজ নটরডেম আর এখন বুয়েটে আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট, থার্ড ইয়ার। আর আর্কিটেকচার পড়ার আগে যেটা করতে পারি সেটা হলো আঁকাআঁকি; সেই হিসেবে গ্রাফিক্স, এনিমেশন, ডিজিটাল ড্রইং, ইলাস্ট্রেশন আমার শখ বলা যায়। মেইনলি শখ ছিল এনিমেশনের, এজন্যে আর্কিটেকচারে পড়া, আমার মনে হয়েছিল এগুলার সাথে আমার সাবজেক্টের সম্পৃক্ততা আছে।

 

খোশগল্প.কম: ড্রইংটায় কীভাবে আসা, নিজে থেকেই নাকি কোন প্রশিক্ষণ ছিল?

নাজমুস সাকিব: একা একাই।কারো কাছ থেকে কিছু শিখি নাই। কোথাও কোন জায়গায় শেখা হয় নাই। আত্মীয়-স্বজনরা বলতো আমাকে চারুকলায় ভর্তি করিয়ে দিতে, কিন্তু ফ্যামিলি চাইতো না।

 

খোশগল্প.কম: তখন তোমার কি ইচ্ছা ছিল?

নাজমুস সাকিব: ছোটবেলায় তো আসলে অনেক কিছু হতে চাইতাম। রিকশাওয়ালা থেকে রহস্য গল্পের গোয়েন্দা- সব কিছুই হতে চাইতাম। কিন্তু একসময় ইচ্ছা হলো আমি ফিল্ম বানাবো, আমি মুভি মেকিং করবো, ডিরেকশন করবো। সময়ের সাথে সাথে আবিষ্কার করলাম কাজটা অনেক ঝামেলার। এক্টর-এক্ট্রেস জোগাড় করতে হবে, স্পট, এডিট কত কাজ ! যেহেতু আমি আঁকতে পারি, তাই আমি এনিমেটেড মুভি বানানোর দিকে ঝোঁক দেই। ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকে এনিমেশন ট্রাই করা শুরু করি আমি। তখন পিসিতে যেই মাইক্রোসফট পেইন্ট ছিল ঐটাতে ছবি আঁকতাম। একটা স্টিল পিক আঁকতাম তারপর একটু নড়ছে এরকম একটা, তারপর আরেকটু নড়ছে এরকম একটা। তারপর উইন্ডোজ মুভি মেকার দিয়ে সেগুলা জোড়া লাগায়ে লাগায়ে একটা এনিমেশন বানাতাম। তখন খুব খুশি! ইয়েস! বানাইছি!

 

তখন আমার বাসায় ইন্টারনেট ছিল না, আমি জানতাম না যে আসলে এত কষ্ট করে করার কিছুই না, অনেক ইজি সফটওয়্যার আছে এগুলা করার জন্য। পরে জানতে পারলাম কীভাবে কাজ গুলা করে, তখন বুঝলাম এনিমেটররা এগুলো মাউস দিয়ে করে না, গ্রাফিক প্যাড আছে।

 

ফ্যমিলি সাপোর্ট যেহেতু ততটা ছিলো না, তাই নিজে টাকা যোগাড় করলাম গ্রাফিক প্যড কিনবো বলে। তখন থেকে একটা লক্ষ্য স্থির করলাম, এনিমেশন নিয়ে কাজ করার।

 

তারপর আবার ইউনিভার্সিটি ভর্তি কোচিং এর সময় এক ফ্রেন্ড বললো, “তুই তো ছবি আঁকা-আঁকি করিস, আর্কিটেকচারে এপ্লাই কর’’ তার আগ পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল আমি সিএসই পড়বো, সিএসই এর সাথে আঁকা-আঁকির বা গ্রাফিক্স এর একটা সম্পর্ক আছে, পরে মনে হইলো আর্কিটেকচারেও তো আঁকা-আঁকি লাগে পরে অইটাতে এপ্লাই করলাম। তো লক্ষ্য আসলে এক এক সময় এক এক রকম ছিল।

 

খোশগল্প.কম: এখন কি তুমি স্থির?

নাজমুস সাকিব: এখনও আসলে কম্পাসের কাঁটার মত নাড়াচাড়া করছি, কি করবো। এখন আর্কিটেকচারে এত প্রেশার যে এনিমেশনের টাইম পাই না।

 

খোশগল্প.কম: তুমি কখন বুঝতে পারলা যে তুমি ভালো ছবি আঁক?

নাজমুস সাকিব: ওয়ান-টু’তে পড়ার সময়। ওয়ান-টু’তে বাচ্চারা সাধারণত যেমন ছবি আঁকে, আমি সেই বয়সেই ডিটেইলে আঁকতে পারতাম। যারা ছবি আঁকতে পারে আর যারা আঁকতে পারে না তাঁদের মূল পার্থক্যই হলো, যারা পারে তারা কিছু ডিটেইল ধরতে পারে। ছোটবেলায় একটা ছবি একেছিলাম, একটা মোটরবাইকে একটা মানুষ বসে আছে। আমি যেটা করলাম, মানুষটার একটা পা আঁকলাম, আরেকটা আঁকিনাই, মানে অন্য পাশেরটা তো দেখা যাবে না। তো, যারা ছবি আঁকতে পারে তাঁদের সাথে অন্যদের পার্থক্যই হচ্ছে এই ছোট ব্যাপারগুলো তারা অবজার্ভ করে। মানুষ সোজা দেখতে কিরকম আর পাশ থেকে কিরকম, হাঁটে কীভাবে , বসে কীভাবে, এগুলো অবজার্ভের বিষয়। তারপর প্র্যাক্টিস এর মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে ডেভলপমেন্ট হয়।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে কী তোমার কিংবা আর্টিস্টদের অবজার্ভেশন পাওয়ার ভালো থাকতে হয়?

নাজমুস সাকিব: এটা বলাটা কঠিন, কারণ আর্কিটেকচারে ঢোকার পর থেকে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক পাল্টে গেছে। আগে যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতাম খেয়াল করতাম না অনেককিছু, এখন অনেক কিছু খেয়াল করি আশ-পাশটা, ঐ যে অবজার্ভেশনের ব্যাপারটা তখন চলে আসে। রাস্তা থেকে শুরু করে গাছের উচ্চতা খুঁটিনাটি সব! একটা হতে পারে আর্কিটেকচার সাবজেক্টটা ঐ রকমই,  আরেকটা এনিমেশনের প্রতি ঝোঁক থেকে হতে পারে, পাতাটা কীভাবে নড়ছে, মানুষ কীভাবে চা খায়, চায়ের ধোয়াটাই বা কেমন ঘূর্ণিপাক তৈরী করে।

 

খোশগল্প.কম: এটা কি তোমার অবেচেতনে গ্রো করছে নাকি তুমি আঁকাটা আরো সুন্দর করার জন্য সচেতনভাবেই অবজার্ভ করতা?

নাজমুস সাকিব: শুরুটা মনে হয় অবেচেতনভাবেই হয়।

 

খোশগল্প.কম: তোমার ফ্যামিলি বা সারাওন্ডিংসে কেউ ছিল যে ভালো ছবি আঁকত?

নাজমুস সাকিব: না, কেউ ছিল না। আমি আসলে খুবই সাদামাটা মিডলক্লাস ফ্যামিলি থেকে আসছি, ফ্যামিলিতে ছবি আঁকা, গান গাওয়া, অভিনয় বা কো-কারিকুলার একটিভিটিসে কোন রকম আগ্রহ ছিল না, ইভেন ইন্সপায়ারও করে নাই কেউ কখনো। ইভেন ছবি আকাঁর জন্য উল্টা বকা শুনতাম যে “ফাঁকিবাজি হইতেছে!”

 

খোশগল্প.কম: তোমার কাজের প্রসঙ্গে আসি, তুমি প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছো, তো এখন পর্যন্ত কি কি করেছো?

নাজমুস সাকিব: আমি আসলে প্রচ্ছদ ডিজাইনার হিসেবে পরিচয় দিতে চাই না, খুব কম কাজ করেছি। গ্রাফিক্সের কাজ পারি, সেই সুবাদে পরিচিত মানুষ এবং নিজ ব্যচের জন্য কিছু করেছিলাম।

 

খোশগল্প.কম:  আমি যতদূর জানি হিমালয় ভাইয়ের ক্রিকেট নিয়ে লেখা ‘বেনিফিট পব ডাউট’ বইয়ের প্রচ্ছদ তোমার আঁকা এবং ফার্স্ট ড্রাফট নাকি অইটাই ছিল?

নাজমুস সাকিব: ফার্স্ট বলতে, আমি নিজে তিনটা রেডি করেছিলাম, বাট এইটাই ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিল।

 

খোশগল্প.কম:  একটা বল বাউন্ডারি লাইনে পৌঁছেছে, এত সিম্পল বাট সিগনিফিকেন্ট আইডিয়াটা কীভাবে আসলো?

নাজমুস সাকিব: ফার্স্ট অফ অল, গ্রাফিক ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমার কাছে যেটা ভাললাগে বা সবার আগে মাথায় রাখি সেটা হচ্ছে মিনিমাল ডিজাইন। মিনিমালস্টিক বলে একটা কথা আছে, মিনিমালস্টিক দিয়ে বোঝানো হয়, সবচেয়ে কম সংখ্যক দাগে গভীরভাবে অর্থবহ কিছু এক্সপ্রেস করে ফেলা।

 

আমি কয়েকমাস আগে ক্যারিকেচার ট্রাই করছিলাম, ক্যারিকেচারও ওরকম দুই-তিনটা কয়েকটা দাগ দিয়ে একটা ছবি এঁকে ফেলা। ঐটা খুব ভালো প্র্যাক্টিস ছিল আমার জন্য। বইয়ের নাম ‘বেনিফট অফ ডাউট’ তো ডাউট ক্রিয়েট করা কিছু একটা করতে হবে, ক্যাচি কিছু যেটা দেখে বইয়ের ভিতরে যেতে চাইবে মানুষ। তখন মনে হয়েছে একটা বাউন্ডারি লাইন আর বল এইটাই এনাফ। এইভাবেই করা।

 

খোশগল্প.কম: আর্কিটেকচারে ভর্তি হবার পরে বলছিলা অনেক কিছু খেয়াল করো। এরকম আরো  কোন পার্থক্য করতে পারো যেটা আগে ছিল না?

নাজমুস সাকিব: আমি একটা কথা সব সময়ই বলি ‘এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন আর্ট এন্ড আর্কিটেকচার’। একটা ডিজাইন আমার দশটা ফ্রেন্ড বলতেছে “জোস হইছে”, তো অন্য কেউ বলবে “কিছুই তো হয় নাই!” একটা চিত্রশিল্প দেখে আমরা অনেকেই বলি, “কি বানাইলো কিছুই বুঝলাম না” তো আরেকজন বলবে, “মাস্টারপিস !” তুমি অনেক দামি দামি আর দুর্লভ ম্যটারিয়াল দিয়ে একটা ভাষ্কর্য তৈরী করবা, কিন্তু কেউ তাকাবে না ! আর পাবলো পিকাসো কুড়িয়ে পাওয়া সাইকেলের যন্ত্রাংশ দিয়ে কালজয়ী আর্ট ওয়ার্ক সৃষ্টি করবে।

 

আর্ট যে আসলে অনেক কিছুর উপর ডিপেন্ড করে এইটা এখানে এসে বুঝতে পারছি। আমার মতে, কোনটাই ভুল না। হতাশ হবার কিছু নাই। সবকিছুই ঠিক। তোমাকে শুধু কাজ করে যেতে হবে। টিকে থাকতে হবে। এই সূক্ষ্ণ ব্যপারটা এখানে এসে ধরতে পারছি।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত