তিনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনটি মাস্টার্স আর ভারতের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন, পড়াচ্ছেন এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপরেও বইমেলার ধুলোময় প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে এই সত্তরোর্ধ বয়সে এভাবে বই ফেরী করছেন-সাহিত্যভুক জনসাধারণের কাছে তাচ্ছিল্যও উপহার পাচ্ছেন প্রতিনিয়ত-তারপরেও লিখে চলেছেন, বই নিয়ে ঘুরছেন অবিরত…..

লিখেছেন...admin...ফেব্রুয়ারী 22, 2017 , 4:01 অপরাহ্ন

“প্রবাহিত হও নদীর মত”

-বইমেলায় নিজের লেখা বই ফেরী করা সর্বজনের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু সেই আকন্দ সামসুন নাহারের একান্ত সাক্ষাৎকার

 

কেন এভাবে ঘুরে ঘুরে বই ফেরী করেন? প্রকাশকের চাপ আছে কোনরকম? কিংবা অর্থনৈতিক সংকট?

 

না!আমি কয়েকটা কারণে এভাবে হেঁটে হেঁটে বই বিক্রি করি। একটা হলো, আমি তো আগে তোমাদের প্রজন্মের সাথে অতটা মিশতে পারিনি। তাই, এখন যতটা পারি তোমাদের সাথে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছি। আবার, নিজেকেও তোমাদের কাছে পরিচিত করার চেষ্টা করছি। আর তোমাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করছি। আরেকটা কারণ…

কথা হচ্ছিল লেখিকা আকন্দ সামসুন নাহারের সাথে।

 

সপ্তাহখানেক আগে বইমেলায় বই কিনতে গিয়ে একটা বিচিত্র ব্যাপার দেখলাম। বই কেনা শেষে যখন পকেটে মরুভুমির হাহাকার শুরু হয়েছে তখনি একজন শক্তপোক্ত বৃদ্ধা আমাকে এসে ধরলেন।একটা মাতৃসুলভ আবদারের সাথে বললেন, “বাবা তুমি তো অনেকগুলা বই কিনলে, আমার একটা বই নাও না!”

 

আমাকে ছেড়ে তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন। একের পর এক-যাকেই সামনে পাচ্ছেন ধরছেন তার বই কেনার জন্যে। অধিকাংশ সময়ই প্রত্যাখাত হচ্ছেন।

 

বাড়ি ফেরার পর থেকেই মনের মধ্যে একটা খচখচ করতে লাগলো, সাথে একটা কারণ ছাড়াই অপরাধবোধ। কানে ভাসলো ওনার স্নেহমাখা আবদার। সর্বভুক পাঠক হিসেবে  ওনার বইয়ের প্রতি একটা দূর্নিবার কৌতুহল বোধ করতে লাগলাম। কিন্তু, এত বড় মেলায় কি আর তাকে পাবো?উনি কি অনেক অর্থ কস্টে আছেন?নির্দিস্ট সংখক বই বিক্রি করার আল্টিমেটাম দিয়ে দিয়েছে কি রক্তচোষা কোন প্রকাশনী?

 

এইসব ভালো-মন্দ ভাবতে ভাবতেই অনলাইন মিডিয়া-ফেসবুকে সর্ববৃহত বাংলা বইপড়ুয়াদের ফোরাম “বইপোকাদের আড্ডাখানা” তে তাঁর ব্যাপারে ইনফরমেশন চেয়ে পোস্ট দিলাম। সেখান থেকে জানলাম যে, গতবছরও এই বয়স্কা মহিলাকে জনে জনে নিজের বই ফেরী করতে দেখেছেন অনেকেই। অনেকেই তার মুখোমুখি হয়েছেন। একজনের কাছে জানলাম তার নাম “আকন্দ সামসুন নাহার”। তবে, আমার পোস্টের পর সবার মাঝেই দেখলাম একটা কৌতুহল, আসলে কে এই মানুষটি-যিনি এই বৃদ্ধ বয়সে নিজের বই বিক্রি করতে ঘুরছেন?

 

তার কাহিনী কি তখনো জানি নে। বরং, তার বই পড়ে দেখার আগ্রহ থেকেই তাকে খুঁজতে গেলাম মেলায়। এবং মোটামুটি সহজেই তাকে পেয়ে গেলাম। গতদিনের মতই একইরকমে শাড়ির একইরকম গেট আপে। কিছুটা শ্রান্ত চেহারা।

 

তার থেকে তার দুটো উপন্যাসের বই কিনলাম আর ছবিও তুললাম।
কথায় কথায় জানতে চাইলাম,”অর্থনৈতিক অভাব নাকি প্রকাশকের চাপ,কিসের জন্যে এভাবে নিজ হাতে নিজের বই বিক্রি করা লাগছে?”

 

উত্তর টা চমক জাগানিয়া ছিলো।কিন্তু সেটা লেখার শুরুতেই বলে দিয়েছি। তারচেয়েও বেশি চমক জাগানিয়া ব্যাপার এটা লাগলো যে, তিনি প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনটি মাস্টার্স আর ভারতের কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন, পড়াচ্ছেন এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপরেও বইমেলার ধুলোময় প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে এই সত্তরোর্ধ বয়সে এভাবে বই ফেরী করছেন-সাহিত্যভুক জনসাধারণের কাছে তাচ্ছিল্যও উপহার পাচ্ছেন প্রতিনিয়ত-তারপরেও লিখে চলেছেন, বই নিয়ে ঘুরছেন অবিরত। আরেকটু এগুতেই জানলাম তিনি “শিরোনামহীন” ব্যান্ডের ভোকাল তানজীর তুহীনের মা!

যেদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বুয়েট-ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ার সুযোগ পাওয়ার পরদিনই “কি হণু রে” ভাবোদয় হয় শিক্ষার্থীদের মনে, সেদেশের মানুষের মাঝে এমন একজন মানুষকে পরিচয় করিয়ে দেয়াটা দায়িত্ব মনে হলো।

 

অবশেষে ১৬ই ফেব্রুয়ারী, বিকেলবেলা নবরাগ প্রকাশনীরর স্টলে তার সাথে টানা দেড় ঘন্টার কথোপকথন, যার পুরোটা সময় তন্ময় হয়ে শুনে গেলাম একজন অত্যন্ত আশাবাদী, বিনয়ী মানুষের জীবনালেখ্য।

 

লেখালিখির শুরুটা কবে?

জবাবে বললেন, ভোলার মফস্বল এলাকায় ক্লাস ফাইভ-সিক্সে থাকতেই নাকি শুরুটা। কল্পনা করতেন অনেক। চাঁদ-মেঘ-ফুল-পাখি নিয়েই কিছু লিখতে চেষ্টা করতেন।

 

সাত ভাই-বোন তাঁর। পরিবারের দ্বিতীয় মেয়েসন্তান। বাবা ছিলেন সরকারী ডাক্তার। বদলীর চাকুরি। মেয়ের লেখালিখির প্রতি বাবা প্রসন্ন ছিলেন বলেই মনে হলো। বাড়িতে রাখতেন “আজাদ” পত্রিকা। আর, সপ্তাহে একদিন লেখিকার পাঠচর্চার জন্যে আসতো নূরজাহান সম্পাদিত “বেগম”। এই দুই পত্রিকাতে ছাপা হওয়া সাহিত্য, ছোটগল্প যাই পেতেন,তাই পড়তেন। আর পড়তেন,বড় ভাইদের বই। লুকিয়ে সেসব বই নিয়ে আসতেন নিজের ঘরে, সেগুলো গিলতেন-যেন অমৃত পান করছেন এভাবে।

 

ছাপার হরফে প্রথম লেখাটা ছিলো ইডেন কলেজে পড়াকালীন সময়ে সেখানকার সাহিত্য ম্যাগাজিনে-একটি গল্প।

 

পড়ালেখা আর ব্যাক্তিজীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করতেই অনেকটা স্মৃতিকাতর হয়ে উঠলেন। বাচন ভঙ্গী গল্প বলার ধরনের, কণ্ঠস্বর ঋজু, ধীর।বিকেলের শেষ রোদে কখনো আবেগে আদ্র হয়ে উঠছেন, কখনো হাসির কোন স্মৃতি মনে পড়ায় মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আর, সেগুলো খাতায় তুলে রাখতে ব্যস্ত আমি।

 

বরিশালের পাথরঘাটা স্কুলে প্রাইমারী পাশের আগেই তার শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটতে যায় যায় অবস্থা। লেখিকার বাবার ট্রান্সফার হয়েছেন ভোলাতে। সেখানে বাবার আপত্তি-মেয়ের পড়ার উপযোগী নয় এখানকার কম্বাইন্ড স্কুল।

 

লেখিকা কোন অবস্থাতেই পড়ালেখা ছাড়তে রাজি নন। কেঁদে কেটে একাকার। ভালোমত চোখ লাল করে কাঁদার জন্যে নাকি, হাতে হালকা করে মরিচও ঘসে নিয়েছেন কখনো-সখনো(এটা বলতে গিয়ে লেখিকার মুখে হাসি)।

 

বাধ্য হয়ে চাচাতো বোনের বাসায় থেকে প্রাইমারী পাশ করলেন। এরপর, আবারো পিতা পদে পদে বাঁধ সাধলেন। কখনো এজন্যে যে, মেয়েদের এর বেশি পড়াশুনার দরকার নাই। কখনো মেয়ের আবাসনের সংকটের কথা চিন্তা করে।

কিন্তু, লেখিকা হাল ছাড়েন নি। হাসতে হাসতে বললেন,”যতবারই আমার পড়ালেখা বন্ধ করে দিতে চেয়েছে, প্রতিবার কান্নাকাটি করে হুলস্থুল বাধিয়ে নিজের দাবি আদায় করে নিয়েছি”

 

চাচাতো বোনের বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করেছেন। সেখান থেকে বিরূপ মন্তব্য আসার পর চলে গিয়েছেন বরিশাল সদর গার্লস স্কুলে। থেকেছেন হোস্টেলে। এভাবে দাতে দাত চেঁপে মাধ্যমিক পাশ করেছেন।

 

শক্তিটা পেলেন কোথা থেকে-জিজ্ঞাস করাতে বললেন, দুই ফুপাতো বোন ছিলেন বরিশালের ফয়জুন্নেসা স্কুলের শিক্ষিকা। তাদের দেখেই অনুপ্রাণিত হতেন।

 

আর বললেন, “আমার ভাইগুলোর মধ্যে সেজো ভাইই আমাকে সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট দিয়ে গেছে। ছোটবেলায় ডেকে এনে অংক, বাংলা, ইংরেজি পড়াতো। পরেও অনেক বেশি সাহায্য করেছে”

 

মাধ্যমিক পাশ করলেন। ইচ্ছা সায়েন্স নিয়ে পড়ার। কারণ, ম্যাথ ভালো লাগে। কিন্ত বাবা এবার কঠোরভাবে বিরোধ করলেন। “নাহ! মেয়েকে সায়েন্স পড়াবো না। সায়েন্স পড়ে শেষমেষ ডাক্তার হওয়ার কোন প্রয়োজন নাই মেয়েমানুষের” লেখিকার শিক্ষাজীবন মোটামুটি এখানেই সমাপ্তি হয় হয় অবস্থা।

 

কিন্তু, অপ্রিয় বাস্তবতা মেনে নিলেন। সায়েন্স নিয়ে পড়ার দাবি ত্যাগ করলেন। বাবার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঢাকায় আসলেন। ভর্তি হলেন ইডেন কলেজে।সেখান থেকে বাংলায় সম্মান ডিগ্রি অর্জন করলেন। এরপর, স্নাতকোত্তর করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে হলেন ফার্স্ট ক্লাস ফিফথ।

 

এরপর, পড়ালেখার খাতায় সমাপ্তি টানার জন্যে জোর আদেশ আসলো পিতৃদেবের কাছ থেকে। “অনেক হয়েছে বিদ্যে অর্জন!এইবার বিয়ে করো। সংসার করো”

 

কিন্তু, লেখিকা প্রস্তুত নন।এখনো নিজেকে আত্মবিশ্বাসী আর শক্তিবান মনে করলেন না তিনি। চট্টগ্রামে সেজোভাইয়ের সাথে থাকাকালীন সময়ে নিচতলার ঘরে তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের “রানুদি”র সাথে দেখা। তার সাথে বিএড করতে গেলেন ময়মনসিংহে। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলেন বিএড কোর্সে। নারায়ণগঞ্জে থাকাকালীন বোনের স্কুলের একজন শিক্ষিকার বাসায় উঠলেন। এবং বেসরকারী দুটো স্কুলে পরপর চাকুরি করলেন।

 

ছুটিতে বাড়ি যেতেন না। ভয় পেতেন-ঘরে ফিরলেই যদি বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে কলমের খোঁচায় ঘরকন্না বানিয়ে দেয় তার মতের অমতেই!

 

স্কুল মাস্টারিতে আগ্রহ পাচ্ছিলেন না। আরো বেশি, আরো বড় কিছু করতে চাইছেন। সেজন্যে চান, সরকারী স্কুল কলেজের শিক্ষক হতে।

 

তাই, আরো যোগ্যতা অর্জনের জন্যে ভর্তি হলেন ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সিটিউটে। কিন্তু, সেই পড়ালেখা অসমাপ্ত রেখেই চলে গেলেন। কেননা ডাক এসেছে কুমিল্লা ওমেন্স কলেজে শিক্ষকতার। এরপর চিটাগাং টিচার্স ট্রেনিং কলেজে ছিলেন। চিটাগাং সরকারী কলেজেও শিক্ষকতা করেছেন।

 

এখানে একটা কথা বলতে গিয়ে লেখিকার কন্ঠ থেকে প্রবল ক্ষোভ আর অপ্রাপ্তি ঝরে পড়ল যেন। না উল্লেখ করে পারছিনা। ৭০ সালের বন্যা আর ভুমিধসে  যখন তাদের ভোলার বাড়ি ভেঙে ছাড়খাড় অবস্থা তখন তিনি তার চাকুরির বেতনের টাকা প্রথমবারের মত পিতার হাতে তুলে দিতে আসলেন। কিন্তু,পিতা কোনভাবেই সেই টাকা ছুঁয়ে দেখলেন না। এরপর, যতগুলো বছর বেঁচে ছিলেন লেখিকার পিতা,কোনদিনই একটা পয়সাও নিতে রাজি হন নাই মেয়ের কাছ থেকে।
.

.20170216_171642

 

লেখিকা ক্ষোভের সাথে জানালেন, তার পিতা অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন। বললাম,“অহংকার নাকি অত্মমর্যাদাবোধ?” বললেন, “মেয়ের কাছ থেকে টাকা নেয়ায় আত্মমর্যাদার প্রশ্ন আসে নাকি?”

 

তাহলে অহংকার নাকি অভিমান?
একটু চিন্তা করে- বললেন,”কি জানি!”

 

গুমোটভাব কাটাতে নিজেই একটা ইউটার্ন নেয়ার সুযোগ পেলেন লেখিকা। এরই মধ্যে যে একাত্তর চলে এসেছে! বিয়ের কথা শুরু হলো এবছরের শুরুতেই। কিন্তু,যুদ্ধের ডামাডোলে তা থেমে গেলো অচিরেই। তবে বিয়েটা শেষমেষ এই একাত্তরের তুমুল যুদ্ধের মাঝেই হলো। বরের সাথে পরিচয় এবছরেই। বাড়ি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে। ঢাকা মেডিকেলের কৃতি ছাত্র।

 

সরকারের আল্টিমেটাম ছিলো, সকল সরকারি চাকুরেকে নিয়মিত অফিস আসতে হবে। নতুবা,কঠোর শাস্তি! লেখিকার পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি চট্টগ্রামে সরকারী কলেজের চাকরিতে ফিরে এলেন-লেখিকার ভয় ছিল,তার জন্যে না আবার তার পরিবার সরকারের কোপের মুখে পড়ে!

 

কিন্তু, কলেজের পরিবেশ মোটেও ভাল নেই। রাজাকার গিজগিজ করছে শিক্ষার্থীদের মধ্যেই। সেখানে একজন মহিলা শিক্ষিকা থাকা আসলেই বিপদের। লেখিকা জানালেন, তিনি থাকতেন কলেজের দোতলায়। কলেজের একজন বাবুর্চি ছিলেন অনেক ভালো মানুষ। তিনি প্রতিদিন লেখিকাকে ভেতরে রেখে দোতলার বাইরের দিকে তালা ঝুলিয়ে যেতেন,যাতে রাজাকার আর পাক সেনারা  মনে করে ভেতরে কেউ নেই।

 

এসময় হবু জামাইকে চিঠিমারফত ডেকে পাঠালেন। এবং খুব দ্রুত বাবার অবর্তমানে-অজ্ঞাতে সহকর্মী শিক্ষিকাদের সহযোগিতায় বিয়েটা সেরে ফেললেন। তবে, বিয়ের পর যখন তার পিতা জানলেন যে, তাঁর পছন্দের পাত্রকেই মেয়ে বিয়ে করেছেন তখন তিনি নাকি খুশিইই হয়েছিলেন।

 

৭২ সালে প্রথম সন্তান-একটি ছেলে বাচ্চা জন্ম দিলেন লেখিকা। বর্তমানে ছেলে আর ছেলে-বৌ কানাডার ক্যালগেরি মেডিকেল ইউনিভার্সিটির এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর। আর, দ্বিতীয় সন্তান হলেন শিরোনামহীন ব্যান্ডের-“তানজির তুহিন”-লেখিকা কবি নজরুল কলেজের শিক্ষিকা থাকাকালে যার জন্ম।

 

এরপর পড়িয়েছেন জগন্নাথ কলেজে। আর, জীবনের সিংহভাগ সময় কাটিয়েছেন ঢাকা ট্রেনিং কলেজে শিক্ষকতা করে। এই ছিলো অতি সংক্ষেপে তার বর্ণাঢ্য জীবনের কিছু বিবরণ।

 

ততক্ষণে নবরাগের স্টলে প্রকাশক চলে এসেছেন। এ প্রকাশনী থেকে লেখিকার দুটি বই বেরিয়েছে এবছর। প্রকাশক বই দুটোর সাথে আমাকে পরিচিত করিয়ে দিলেন। “যখন বৃষ্টি নামল না”-লেখিকার বাস্তবজীবনের চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা আর কল্পনার মিশেলে তিনটি গল্প নিয়ে বইটি। আরেকটা “সোহরাব-রুস্তম গল্প” নামে শাহনামার একটা আখ্যানের গদ্যরুপ। জানতে পারলাম, প্রথম প্রকাশিত বইটি ছিলো ছড়ার বই “নীলের ছড়া”। ২০০৪ সালে প্রকশিত।

এরপর লিখেই যাচ্ছেন একাধারে। বের হয়েছে ২০ টি বই। এর মধ্যে “যূথবদ্ধ” উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের পথে। “নিঝুম দ্বীপের মহাকাব্য” নামে আরেকটা উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদের প্রক্রিয়াধীনে আছে।

জীবনের কোন আক্ষেপ? অপ্রাপ্তি?

ছেলে আর সংসারের পেছনে খুব বেশি সময় দিয়ে ফেলেছেন। নতুবা, আরো আগে লেখালিখিতে হাত দিতে পারতেন। এটাই তাঁর আক্ষেপ!

লেখিকা বললেন, বড় ছেলে তাঁর(লেখিকা) মতই অত্যন্ত স্টুডিয়াস আর ছোটজন প্রচন্ড করিৎকর্মা। তাই, এদেঁর পেছনে এতটা এফোর্ট না দিলেও এরা পিছিয়ে থাকতো না।

“কিন্তু,আমি চেয়েছিলাম,আমি যা পারিনি ওরা সেটা করুক। যা পাইনি সেটা পাক। ছোট থেকেই দুজনকেই গান শিখিয়েছি। খেলার মাঠে নিয়ে বসে থাকতাম। শ্রেষ্ঠ মানুষ করতে চেয়েছিলাম।”
(বলতে গিয়ে মাতৃসুলভ গর্ব ফুটে উঠলো তার কন্ঠে আর মুখোভংগিতে)।

কোন ঘরানার লেখক আপনি? মার্ক্সিস্ট? নাকি ডানপন্থী?
আমি ওরকম কোনটাই নই।

 

তাহলে আপনার লেখার শক্তি কোথায়?কেন লিখছেন আপনি?
আমার লিখার  উপজীব্য মানুষ, আর শক্তি ও অনুপ্রেরণা, আমার অভিজ্ঞতা, জীবনের স্মৃতি আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ।

 

আপনি তো দেশভাগ, পাকিস্তান আমল, মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রত্যেকটা পর্বের সাক্ষী। কি মনে হয়, ৭১ এ যেই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আমরা চেয়েছিলাম, তার কতটুক পেলাম আমরা?

 

একেবারে যে কিছুই পাইনি তা নয়।

 

বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতি নিয়ে আপনার মতামত? মানে,আপনি কি আশাবাদী?

 

গত কয়েকবছরে তো উন্নতি দেখছি। আমি আশাবাদী । আমি মানুষের উপর প্রবল বিশ্বাস রাখি। তারা একটা না একটা উত্তরণের পথ বের করে আনবেই।

 

নারীদের সার্বিক জীবন মানের কি আদৌ কোন উন্নতি দেখছেন?

দেখো, আমি অনেকগুলো কাল দেখে এসেছি। সেগুলোর কম্পেয়ার করলে বলতে হয়, অবশ্যই সুস্পষ্টভাবে নারীদের জীবনমানের উন্নয়ন হয়েছে, হচ্ছে। তবে,উন্নতির আরো জায়গা বাকি রয়ে গিয়েছে।

 

এরপর, নানাভাবে খুঁচিয়ে বের করতে চাইলাম, লেখিকা আসলে কোন ঘরানার সেটা। কিন্তু, লেখিকার মাপা-মাপা কিন্তু অতিসরল মন্তব্যের ফলে সে সুযোগ পেলাম না।

 

জবাবে বললেন, “আমি কি লুকোবো। লুকানোর কিছু নেই। মরতে তো হবেই একদিন। তাও বলছি, আমি ওরকম কোন ঘরানার স্বাধীনতার চেতনা থেকে লিখছি না। আমাকে লেখাচ্ছে আমার একজীবনের অভিজ্ঞতা, কল্পনাশক্তি আর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ”

 

আপনার কাদেরকে আপনার পাঠকশ্রেণীতে দেখতে চান?
তরুণ আর মধ্যবয়স্কদের। তবে যে কেউ আমার বই পড়তে পারে। নোংরামি আর চটুলতা নেই আমার লেখায়।

 

প্রিয় লেখক কে?
আমি সর্বভুক। যাচাই-বাছাই না করেই সেই ছোটবেলা থেকে পড়েই যাচ্ছি। সমকালীন লেখকদের মধ্যে হুমায়ন আহমেদের লেখা ভালো লাগে। শেক্সপিয়রের নাটকগুলোতে একসময় বুদ হয়ে থাকতাম। তাছাড়া, রাসেলের(বার্ট্রান্ড রাসেল) লেখায় আগ্রহ ছিলো।

 

নতুন লেখকদের বই পড়েন? তাদের ব্যাপারে মুল্যায়ন কিরকম? আমরা কি একটা সাহিত্যশুন্যতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
নতুনদের লেখা পড়ি।আমি খুবই আশাবাদী। নতুনদের লেখায় নতুন নতুন ধারা দেখছি যা আমাদের সময় ছিলো না।

 

এবার আসলাম সেই প্রশ্নটাতে যেটা দিয়ে এই লেখাটা শুরু করেছিলাম। কেন হেঁটে হেঁটে বই ফেরী করেন?

প্রথম কারণটা তো শুরুতেই আছে। আরেকটা কারণ হিসেবে লেখিকা বললেন, “বৌদ্ধ ধর্মের জীবনদর্শন আমাকে আকৃষ্ট করে। তাদের ধর্মে আমিত্ব বিসর্জনের ব্যাপারটা খুবি ভাইটাল। আমিও প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি আমার আমিত্ব আর অহংবোধকে মাটিচাপা দিতে।

 

২০০৬-৭ এর দিকে হজ্জ করতে গেলাম। একদিন হেটে যাওয়ার পথে দেখলাম কয়েকটা ব্ল্যাক মেয়ে নুডলস খাচ্ছে। আমার মাথায় একটা বাতিক চাপলো। আমি তাদের কাছে গিয়ে হাত পেতে, নুডলস খেতে চাইলাম। প্রথমে একটা মেয়ে ক্ষেপে গেলেও, আরেকজন আমাকে এক বাটি নুডলস দিলো।

 

আমার কেন যেন মনে হয়, আল্লাহ আমার হজ্জ কবুল করেছিলেন, কেননা আমি প্রতিনিয়ত চেস্টা করেছিলাম জাত্যাভিমান আর আমিত্বের সংস্কার ত্যাগ করার।

 

আর সকল বড় বড় মহাপুরুষই তো নিজেদেরকে মাটির কাছাকাছি নামিয়ে এনেছেন..আমি তো নতুন কিছু করছিনা, তাদের আদর্শই অনুসরণ করছি।

এভাবেই হাতে করে করে বই ফেরী করার চিন্তাটা আমার মাথায় আসলো। আর সেটা শুরু করেছি এখন থেকে দুই বছর আগে-একুশে বইমেলাতেই।

 

যখন তোমরা আমার মুখ মনে রাখো, আমার সাথে ছবি তোলো, আমার বই পড়ে এসে ফিড ব্যাক জানাও, তখন আমার খুব ভালো লাগে”

 

আপনি এতগুলো ডিগ্রি কেন নিলেন?ক্যারিয়ার পথ মসৃণ করার জন্যে কি?
নাহ!ক্যারিয়ারের জন্যে তো ওই একটা মাস্টার্স করেছি বাংলায়। আর দুটো করেছি, অনেক পরেই চাকুরিতে থাকা অবস্থাতে।আর, পিএইচডি করেছি অবসরে যাওয়ার পর।

 

আর, কেন এতগুলো ডিগ্রি নিলাম…আসলে,ডিগ্রি নেয়ার উদ্দেশ্যে পড়িনি। আমি পড়তে ভালোবাসি। জানতে চাই আরো। এখনো দেখা যাবে আমি আরো কয়েকটা বিষয়ে গভীরভাবে পড়ালেখা করতে আগ্রহী।

 

সামনের দিনগুলোতে কি লিখবেন? গল্প? কবিতা নাকি উপন্যাস?
উপন্যাস লিখছি। দুটোর তো পান্ডুলিপি রেডি। টাকার সংকটে এবার বের করতে পারিনি।
আর, সামনেও উপন্যাসই লিখতে চাই।

 

নবীন লেখকদের জন্যে কোন গাইডলাইন?

নাহ! কোন গাইডলাইন নাই। আমি গাইডলাইন দেয়ার যোগ্য কেউ না। আর,আমাকেও কেউ গাইডলাইন দেয়নাই। নিজের যা ভালো মনে হয়েছে সেভাবে চেস্টা করেছি। জীবনটাকে প্রবাহমান নদীর মত করার চেষ্টা করাটাই মুখ্য। তাহলে, সবগুলো ধারাই এদিক-ওদিক ঘুরে একই মহাসমুদ্রে গিয়ে পড়বে শেষমেষ।

 

ওঠার উদ্যোগ নিতেই,উনি ওনার ঝোলা-ব্যাগটা থেকে তাঁর একটা উপন্যাস “নিঝুম দ্বীপের মহাকাব্য” বের করে দিলেন আমাকে। বাইরে লিখে দিলেন,”দাদু মাহদি ভালো থেকো। প্রবাহিত হও নদীর মত”।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত