সাইমুম সাদ। পরিচিতি দেশের প্রায় সবকটি পত্রিকায় ফিচার লিখে। জার্নালিজম বিভাগে পড়ালেখা করছেন স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশে। কর্মরত আছেন বিনোদন সাংবাদিকতায়। এবারের বই মেলায় তার প্রথম প্রকাশিত বই “তারকাদের বিয়ে নিয়ে ইয়ে”

ঢাকার এতো মানুষের ভিড়েও আমার কোন মানুষ ছিল না যে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে

লিখেছেন...admin...মার্চ 11, 2017 , 2:52 অপরাহ্ন

 

খোশগল্প.কম: কিভাবে আপনি নিজেকে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন? 

সাইমুম সাদ: আমি নিজেকে ফিচার লেখক হিসাবে পরিচয় দিতেই বেশি ভালোবাসি। এই পথেই প্রায় ছয়-সাত বছর লিখে যাচ্ছি। এই পরিচয় দিতে নিজের কাছেই ভালো লাগে। তবে, আমি কিন্তু  মূলত একজন ট্রাভেলারও। ভ্রমণ করতে ভীষণ ভালোবাসি। ভ্রমণে আমি আমার এই যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তির অবসর খুঁজে পাই। একই পরিবেশে দীর্ঘদিন থাকা আমার মোটেই ভালো লাগেনা। অবশ্য এই অভ্যেসটা আমার ছোটবেলা থেকেই।

 

খোশগল্প.কম: তার মানে আপনি ছোটবেলা থেকেই ঘর পালানো ছেলে?

সাইমুম সাদ: ঠিক ধরেছেন। আমি ছোটবেলা থেকেই ছিলাম ঘর পালানো ছেলে। বলতে পারেন বাউন্ডুলে ছিলাম। তো এই বাউন্ডুলের বিষয়টি  আমার একেবারে ছোটবেলার সময় ছিলো না। ছোটবেলায় আমার মা মারা যায়। মা মারা যাওয়ার আগে আমি একটু ম্রিয়মাণ ছিলাম। সব সময় মায়ের সাথেই থাকতাম। বন্ধুদের সাথে তেমন মেশা হতো না। কিন্তু, মা মারা যাওয়ার পর আমি একা হয়ে যাই। তখন আমার কেনো জানি ঘরে থাকা ভালো লাগতো না। যখনই মন চাইতো এ গ্রাম থেকে ও গ্রামে চলে যেতাম। যখন গ্রাম ছেড়ে গ্রামের বাজারে আসতাম অবাক হয়ে দেখতাম এতো মানুষ! এতো দোকান!! সবকিছুই আমাকে ভীষণ টানতো। মূলত সেখান থেকেই আমি ঘরের চেয়ে বাহিরের পরিবেশটাকে আপন করে নেই। মাঝে মাঝেই সকালে বাড়ি থেকে বেড় হতাম সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতাম এতে বাড়ি থেকে প্রচুর বকুনি খেয়েছি। কিন্তু, এসব বিষয়গুলো তখন আমার ভিতরে  কাজ করতো না। ছোটবেলায় পড়া-লেখাতেও তেমন ভালো ছিলাম না। তারপরে তো এক সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসি। সেখানে একটা ঘর পালানো ভ্রমণ পিপাসু দল “নিশি দলের“ সাথে যুক্ত হই ।

 

খোশগল্প.কম: তো, সেখান থেকে ভ্রমণ পিপাসু দল “নিশি দলের” সাথে কিভাবে যুক্ত হলেন। আমাদের একটু খুলে বলুন।

সাইমুম সাদ: আসলে এই ভ্রমণের বিষয়টি যদি বলি তবে বলতে হবে এর পরিণতি হয়েছিলো আমার কৈশরে। আরো পরিণতির কথা যদি বলি তবে বলতে হবে ঢাকায় এসে। আমি যখন প্রথম দিকে বেড়িয়ে পড়তাম, তখন নিজে একা একা যখনি মন চাইতো একটা ট্রেনে উঠে পড়তাম। ‍তারপর যেখানে মন চাইতো ট্রেন থেকে নেমে ঘুড়ে বেড়াতাম। কিন্তু, তারপরেও কেমন জানি আমার কাছে এই ভ্রমণে লোনলি লাগতো। মনে হতো কিছু বন্ধু সাথে থাকলে আরো ভালো হতো কিংবা সাথে বন্ধু থাকলে আরো নানান জায়গায় যেতে পাড়তাম এমন কিছু। তো, মূলত সেই ভাবনা থেকেই “নিশি দলের“ সাথে যুক্ত হই। “নিশি দলের“ সাথে ভ্রমণে যতো আনন্দ পেয়েছি একা ভ্রমণ করে সেই ফিল কখনোই পাইনি। “নিশি দলের“ সাথে ভ্রমণ মানেই কেমন জানি ভালো লাগার টান-টান উত্তেজনা ছিলো।

 

খোশগল্প.কম: “নিশি দলে” আপনাদের কাজ কি ছিলো?

সাইমুম সাদ: “নিশি দলে“ আমাদের কাজ ছিলো মাসের যেকোন একটা দিন চয়েজ করে নিশি দলের সবাই মিলে বেড়িয়ে পড়া। নিশি দলের ভ্রমণটা ছিলো রাতে। আমরা রাতে তাবু করে সাবাই থাকতাম। বলতে পারেন যখন রাতের অন্ধকারে পৃথিবী নিস্তব্ধ তখনই নিশি দলের বিচরণ ছিলো। আসলে আমি যখন বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে আসি, তখন হাজারো কাজের মঝে জগৎটাকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চাইতাম। আমার মাঝে কেমন জানি অতৃপ্তি ছিলো।  নিশি দলের সাথে যুক্ত হয়ে আমি সেই অতৃপ্তির খোরাকটা পেয়েছি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার এই বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসার গল্পটা শুনতে চাই

সাইমুম সাদ: আসলে এই সময়টা ছিলো আমার জীবনের সবচেয়ে স্ট্রাগলের একটা সময়। কিংবা বলতে পারেনে আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের সময়। গ্রামে থাকতে আমার আর কিছুতেই আর ভালো লাগছিলো না। তখন ভাবলাম ঢাকায় গিয়ে একটা চাকরি নেবো। ঢাকাতেই থাকবো আমি। একদিন বাড়ি থেকে পাঁচশ টাকা নিয়ে ঢাকায় উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। কিন্তু, তখনো আমার মাথায় ছিলোনা যে আমি ঢাকায় কোথায় যাচ্ছি কিংবা কার কছে যাচ্ছি এসব কিছু। শুধু এমন একটা চিন্তা স্থির করলাম যে আমি আর বাড়িতে থাকবো না। যাই হোক কোন প্রকারে ঢাকায় আসলাম। ঢাকায় নেমেই মাথায় চিন্তা ঢুকলো থাকবো কোথায়?  এখানে তো হাজার মানুষের ভিড়ে আমার কেউ নেই। ঢাকার এতো মানুষের ভিড়েও আমার কোন মানুষ ছিলোনা যে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে। কিছু সময় এদিক ওদিক ঘুরে ঠিক করলাম কমলাপুর রেল স্টেশনেই ঘুমাবো আর খাবো রাস্তার পাশে হোটেলগুলাতে। আর এর মাঝে একটা কাজ খুঁজে নিবো। তারপর যেই ভাবা সেই কাজ। রাতে শুয়ে পড়লাম স্টেশনে। বালিশ  ছিলোনা বলে আমার স্যান্ডেলগুলো কগজে মুড়িয়ে মাথার নিছে দিয়ে শুয়ে পড়লাম। অবাক ব্যাপার হলো সকালে যখন আমার ঘুম ভাঙলো তখন দেখলাম আমার একমাত্র সম্বল জুতা জোড়াও মাথার নিচে নেই। কে যেন নিয়ে গেছে! 

 

17035385_1147400848715819_75497610_n

তখন নিজের কাছে খুব খারাপ লাগতে থাকলো।  ভাবতে থাকলাম বাড়িই কি আবার চলে যাবো! । আবার ভাবলাম না ঢাকাতেই থাকবো। কিন্তু, ঢাকায় থাকলে কাজ কোথায় পাবো। ভাবতে ভাবতে এক পত্রিকাওয়ালাকে পত্রিকা বিক্রি করতে দেখে সিদ্ধান্ত নিলাম আমিও পত্রিকা বিক্রি করবো। এটাই হবে আমার কাজ। তারপর পত্রিকা হকারদের সাথে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু, পত্রিকা ‍বিক্রি করতে হলেও যে নাম, এলাকা, বিভক্তি ইত্যাদি বিষয় গুলো যে ছিলো আমি সেটা জানতামনা। এক সময় ওরা আমাকে না করে দিলো। ঠিক সে সময় সৌভাগ্য ক্রমে আমার সাথে এক ভদ্র লোকের পরিচয় হয়, অপরাধ বিচিত্রা পত্রিকায় কাজ করতেন। উনাকে আমার সকল কিছুই খুলে বললাম। উনি আমাকে অফিসের সহকারি হিসাবে থাকতে পারবো কিনা বলেন। আমি সাথে সাথে হ্যাঁ বলে দেই, কারণ যেখানে পত্রিকা বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেখানেতো অফিসের সহকারী আরো বেটার। তারপরের  দিন অফিসে গিয়ে অফিসের মেইন বসের সাথে দেখা করি। তারপর তারা আমাকে শর্ত দিলো তিন বেলা খাওয়া আর অফিসেই থাকতে হবে আমাকে কোন বেতন দেওয়া হবেনা। আমি টাকার কথা মাথায় নিলাম না একদম। এই অচেনা শহরে তিনবেলা খাওয়া আর থাকার যায়গা পেয়েছি  এইভেবেই আমি তাদেরকে একবারে ধন্যবাদ, শুভেচ্ছা দিয়ে কাজে জয়েন করি। ঐ সময়ে তারা আমাকে শুধু অফিস সহকারীই না, বলতে পারেন অফিসের গার্ড হিসাবেও রেখেছেন। তারপরেও আমি সন্তুষ্ট ছিলাম। ঢাকায় বেঁচে থাকার মাধ্যম পেয়েছি এভাবেই। এটাই ছিলো আমার ঢাকায় পালিয়ে আসার গল্প।

 

খোশগল্প.কম: সেখান থেকে লেখা-লেখির মাধ্যমে প্রবেশ করলেন কিভাবে?

সাইমুম সাদ: আমার লেখালেখির বিষয়টি ছোট বেলা থেকে ছিলো। আমি ক্লাস ফাইভের সময় মা কে নিয়ে আমার প্রথম একটা কবিতা লিখি। সে সময় থেকেই আমার নোট লিখার অভ্যেস ছিলো। তারপর ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় স্কুলের দেয়ালিকায় আমার প্রথম লেখা  ছাপা হয়। তারপর থেকে আস্তে আস্তে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখালেখির হাতেখড়ি হয়। কিন্তু, তখন আমার লেখা ঢাকায় পত্রিকা গুলোতে প্রথম দিকে ছাপা হতো না।  মনে মনে ভাবতাম আমার লেখাগুলে হয়তো গিয়ে পৌছাচ্ছেনা। কিন্তু, আসলে ব্যাপরটা তা নয়। এখন বুঝতে পারছি আসলে আমার তখনকার লেখাগুলোর মান ভালোছিলো না। তারপর পত্রিকার ফিচার লেখার বিষয়টি অন্যরকভাবে শুরু হয়। আমি যখন অপরাধ বিচিত্রায় অফিস সহকারী ছিলাম, তখন আমাকে ওখানে রাতেও থাকতো হতো। তখন আমি লক্ষ্য করতাম অফিসে সবাই বসে কম্পিউটার ব্যাবহার করছে। তো আমারও এই কম্পিউটার চালানোর খুব ইচ্ছে হলো। তখন রাতে যখন আমি অফিসে থাকতাম, তখন ঘুম বাদ দিয়ে আমি কম্পিউটার খুলে বসতাম। তারপর আস্তে আস্তে ক, খ, আ দেখে দেখে একটা একটা টাইপ করতাম। এমন রোজই চুপিসারে এই কাজটা করতাম। এক সময় আমার টাইপিংটা শেখা হয়ে যায়। তারপর আমি একদিন অফিসের বসকে বলি “স্যার,আমিতো টাইপিং এর কাজ পারি, আমাকে টাইপিং এর দায়িত্বতাটা দিলে আমি ভালো করবো“। তারপর সেখান থেকে টাইপিং এর কাজ করতাম। এভাবে আস্তে আস্তে এক সময় অফিসের নিউজও আমি দিতে থাকলাম। এভাবেই ওখানে ছয় মাস ছিলাম।  তারপরে আমি ওখান থেকে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করি। এভাবেই কাজ করি নয়াদিগন্ত, দৈনিক বর্তমান,ডেসটিনি সহ বিভিন্ন পত্রিকায়। এভাবে কাজ করেছি কালেরকন্ঠ পত্রিকায়ও। একদিন কালেরকন্ঠের বিনোদন বিভাগের রনি ভাইকে জানালাম যে আমি বিনোদন বিভাগে লেখতে চাই। তিনি তখন আমকে অনুমতি দিলেন। সেখান থেকেই আমার বিনোদনে পথ চলা। তারপর ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতে থাকি; এমনকি এখনো লিখে যাচ্ছি।

 

খোশগল্প.কম: এবারের বই মেলায় তো আপানার “তারকাদের বিয়ে নিয়ে ইয়ে“  নামক একটা বইও বের হয়েছে। বই বের করার এই প্ল্যানটা কি আগেই ছিলো।?

সাইমুম সাদ: একেবারে তা না। তবে, বিনোদনে কাজ করতে করতে ভাবলাম করা যায় একটা কিছু। আসলে কাজের সুবাদে বিনোদনের বিভিন্ন তারকাদের সাথেই আমার ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। তাদের সাথে নানান সময় আলাপ হয় তাদের স্মৃতিচারণ কিংবা না বলা কথা নিয়ে। সেই থেকেই ভাবলাম একটা বই বের করেবা। সেই প্ল্যান তেকে ফাইনালি কাজটি করতে পেরেছি।

 

খোশগল্প.কম: পড়া-লেখার পাশাপাশি লেখালেখিতে বিস্তর সময় দিচ্ছেন। পড়া-লেখার প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয় না?

সাইমুম সাদ: না, এটা আমার কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনা। আসলে অনেকেই এটাকে প্রতিবন্ধকতা মনে করে। কিন্তু আমি করিনা। আসলে একদিক থেকে দেখলে পড়া-লেখার পাশাপাশি অন্য কিছু করা যাবেনা” আমার কাছে এটা একটা বাজে কনসেপ্ট মনে হয়। এই বাজে কনসেপ্টটি ছোটবেলা থেকে আমারা পরিবেশ কিংবা ফ্যামিলি থেকে পেয়ে থাকি। হয়তো তার প্রভাবেই আমরা জাতি হিসাবে একটু অলস টাইপের। একটা প্রবাদ মনে পড়ে “মানুষ মহাশয়, যাহা দিবে তাহা সয়” আসলেই সত্যি কথা। আমরা প্রতিদিন অনেক সময় পাই, এই বিস্তর সময়ে আমারা যদি মনে করি পড়ার পাঠ চুকিয়ে অন্যকাজ করবো তাহলে কাজটা ঠিকই করা হবে। আবার আমরা যদি বলি না আর অন্য কিছু করবো না, তবে ঠিকই করা হবেনা। অর্থাৎ আমাদেরর মাইন্ডকে আমরা যেভাবে সেটা করবো, সে সেভাবেই কাজ করবে। তো, আমি সব সময় বিশ্বাস করতাম এখনো করি যে পড়ার পাশাপাশি সময় নষ্ট না করে অন্য কিছু করা যায়। হয়তো তারই কারণে লেখালেখিটা আমার কাজে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

সাইমুম সাদ:  প্রতিটি মানুষেই ভবিষৎ পরিকল্পনা করে যতে তার ভবিষ্যৎ জীবন স্বচ্ছন্দ্যে কাটে এমন প্রত্যাশায়। আমিও এই বৃত্তের বাইরে নেই। সাংবাদিকতায় ভালো একটা স্থান তৈরী করে নেবো এমনটাই আশা করি। তবে, আরেকটা পরিকল্পনা আছে। আমি বরাবরই চাইবো নিজেকে যান্ত্রিকতা থেকে দূরে রাখতে। আর সুযোগ পেলেই আমি এই পৃথিবীটা ঘুরে দেখতে চাই।

 

খোশগল্প.কম: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আপনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

সাইমুমম সাদ: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ। আপনার জন্যও শুভ কামনা।

 

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত