আমাদের অনেক বার পড়া চরিত্রগুলোর মধ্যে শরৎচন্দ্রের লেখা ‘বিলাসী’ গল্পের মৃত্যুঞ্জয় অন্যতম। যার পরিবারে কেউ ছিল না, কায়স্থের ছেলে বলে তাঁর সাথে কেউ কথা কইতো না। হঠাৎ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মরার দশা হলে তাকে বাঁচিয়ে তোলে এক সাপুড়ে মেয়ে। সাপুড়ের মেয়ের হাতের অন্নপাপে তাকে গ্রাম ছাড়তে হয়। আর শেষটায়,  সাপ ধরতে গিয়ে গোখরো সাপের কামড়ে অকালে প্রাণ দেয় মৃত্যুঞ্জয়।

গল্পের অল্প বিস্তারে থাকা সেই চরিত্রের সাথে আজকের কল্পিত সাক্ষাৎকার……

‘সাতদিনের বেশী বাঁচিয়া থাকাটা সে সহিতে পারিল না’

লিখেছেন...admin...মার্চ 20, 2017 , 4:22 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: দুম করে মরে গেলেন, ব্যাপারটা কি ঠিক হলো?

মৃত্যুঞ্জয়: দেখেন, মৃত্যুর উপর তো তো কারো হাত নেই, গোখরা সাপের কামড় খেয়ে বেঁচে আসার তো কথা না!  নাকি বলেন?

 

খোশগল্প.কম: কিন্তু আপনি তো নিজেই সাপুড়ে ছিলেন!

মৃত্যুঞ্জয়:  কায়স্থের আবার সাপ বিদ্যা! হাঁসালেন!!

গুরু, গুরু-কন্যা সব একই ঘরে, না শিখে যাই কোথায়। আর জানেনই থার্ড ক্লাশের পর আর পড়ি নি, রোজগারের জন্য শেখা বিদ্যা ঝালাইয়ে দোষ কি? গর্ত খুঁড়তে শুরু করলে এমনি সাপ পলায়, এ এমন কঠিন কিছু না।

 

খোশগল্প.কম: সোজা বলেই কি অঘোরে প্রাণ দিলেন?

মৃত্যুঞ্জয়: সাপ যে পালাতে না গিয়ে বিষ দেবে তা কে জানতো? আর শিকড়ের ব্যবসার কথা তো জানেনই, কোন শ্রম ছাড়াই কাঁচা টাকা। সোজাই তো!

 

খোশগল্প.কম: আপনার এই ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রয়োজন কি আদৌ ছিল?

মৃত্যুঞ্জয়: দেখুন, অন্নপাপ বলুন আর বিয়েই বলুন, এগুলোর কোনটার পরেই আর স্থিরভাবে বসে থাকার উপায় নেই। খুড়োর প্ররোচনায়ই হোক আর গ্রামের জাত যাওয়ার জন্যই হোক আমাদের স্বাভাবিক সংসার করার জো ছিল না। কায়তের ছেলে হয়ে সাপুড়ে মেয়ে নিয়ে সেই সময়ের ভারতবর্ষের কোথাওই আমি সংসার পাতাতে পারতাম না। ছোটবেলায় বাবা-মা হারিয়েছি, কাজেই ধর্মের নিয়মিত আচারের বালাই আমার ছিলই না, বোধও করি নি, তাহলে আমার সাপুড়ে হয়ে যেতে বাঁধা কোথায়?

 

খোশগল্প.কম: খুঁড়ো, গ্রাম, বাবা-মার দোহাই দিচ্ছেন, বিলাসীর দিক থেকে কোন টান কি ছিল না? তার কথা একবারও বলেন নি।

মৃত্যুঞ্জয়: যদি তার কথা বলি তাহলে ভেবে বসবেন, সেই আমাকে ধর্মান্তরিত করিয়েছে।

 

খোশগল্প.কম: না, না, তা কেন?

মৃত্যুঞ্জয়: হ্যাঁ, বড় টানটা বিলাসীর দিক থেকেই ছিল। আর যাই হোক, তাকে তো আমি খোয়াতে চাই না, কষ্টেও রাখতে পারি না। তার হাতে খেয়েছি আমি, কিন্তু অন্নপাপের মার টা খেল সে, এরকম কতদিন চলত? নির্বান্ধব আমাকে দিনের পর দিন একটা পোড়ো বাড়িতে ম্যালেরিয়া থেকে  সারাতে কি দায় পড়েছিল তাঁর? যদি ভালবাসাকে বাদও দিয়ে দিই, তাঁর প্রতি আমার ঋণ তো কম না! তাঁর স্নেহ আর যত্নের প্রতিদানে আমারও তো কিছু দিতে হতো।

 

খোশগল্প.কম: আচ্ছা, আপনার সেই বিশাল আম-কাঁঠালের বাগানের কি হলো?

মৃত্যুঞ্জয়: সে তো খুঁড়ো ভোগ করে আসছে আমি সাপুড়ে হবার পর থেকেই।

 

খোশগল্প.কম: আচ্ছা, আপনাকে নিয়ে জনশ্রুতি ছিল, ছেলেদের বাবারা আপনার কাছ থেকে স্কুলের মাইনে, বই কেনার টাকা গছিয়ে নিতো ছেলেদের দিয়ে, অথচ দেখা হলে কোনদিন কথাও বলে নি, এর কারণ কী?  

মৃত্যুঞ্জয়: মশাই, যদি কথাই বলবে তাহলে তো  আর গছিয়ে নিতো না।

 

খোশগল্প.কম: মানে?

মৃত্যুঞ্জয়: মানে সেই সম্প্রীতিই যদি থাকতো তাহলে তো আমার কাছ থেকে বই চুরির কথা বলে পয়সা নিতো না।

 

খোশগল্প.কম: কি পরিহাস! সেই গ্রামবাসীই আপনাকে গ্রামছাড়া করলো!!

হুমম……

 

খোশগল্প.কম: বিলাসী কেন মৃত্যুর পথ বেছে নিলো বলুন তো।

মৃত্যুঞ্জয়: সে তো ন্যাড়াই বলে দিয়েছে, ‘সাতদিনের বেশী বাঁচিয়া থাকাটা সে সহিতে পারিল না’ হয়তো আমি ছাড়া নৈমিত্তিক জীবন তাঁর কাছে অসম্ভব ঠেকেছিল, হয়তো নিজেকে দায়ী ভেবেছিল, হয়তো অন্য কিছু, তা সে বলতে পারবে।

 

খোশগল্প.কম: এই যে ভাত খেলে অন্নপাপ, কায়স্থের ছেলে হয়ে ব্রাক্ষ্মণের মেয়েকে বিয়ে করা যায় না, ব্রাক্ষ্মণকে ছুঁলে স্নান সারতে হয়, এত এত সংস্কার বছরের পর বছরের এত দীর্ঘ সময় কীভাবে চলমান থেকেছে?

মৃত্যুঞ্জয়: দেখুন, যারা কলকাঠি নাড়তো তারা তো জেনে শুনে এই সংস্কারগুলো চালু রেখেছে যাতে এই শুদ্র, নাপিত কায়স্থেরা এই টোপটাকেই সত্যি মনে করে। যাদের জানার কথা, বলার কথা তারা তো পড়ালেখা করতে সেই যে শহরে গেছে, শহরের সেই সহজ জীবন রেখে তিন ক্রোশ হেঁটে স্কুলে যাবার ভয়ে আর গাঁয়ে ফেরত আসে নি। আর ধর্মের ভয় সবসময়ই বড় ভয়, এখন কে যাবে সমাজকে উদ্ধার করতে? আমার-ন্যাড়ার মত থার্ড ক্লাশ পর্যন্ত পড়া বালকেরা?

 

খোশগল্প.কম: জীবন এই ভাবে শেষ হবে, এভাবে কী ভেবেছিলেন?

মৃত্যুঞ্জয়: জীবন যে একদিন শেষ হবে এই কথাটাই বা কে ভাবে,  বলুন? কেউই ভাবে না। আমাদের জীবন যায়, এক বৃত্তাংশ ছোঁবার পর আরেকটা  বৃত্তাংশ ছুঁতে, পুরো বৃত্ত হতে হতে এর মধ্যে হঠাৎ একদিন নাই হয়ে যাই।

 

এভাবে না হলে হয়তো অন্যভাবে হতো, নিজে রেঁধে খেতে পারতাম যেহেতু, সুতরাং আম-কাঁঠালের বাগান জমা দিয়েই  বাকী জীবন চলে যেত নিশ্চয়ই! হাঁ হাঁ হাঁ

 

(ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত