সোহানুর রহমান অনন্ত। বর্তমানে  দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় গ্রফিক্স ডিজাইনার হিসাবে কর্মরত আছেন। মূলত রম্য লেখক হিসাবে পাঠক মহলে বেশি পরিচিত হলেও সমান তালে লিখে যাচ্ছেন গল্পও । তার প্রকাশিত দুটি বই “নীল ক্যাপের ভালোবাস” এবং ” তোমার জন্য এক আকাশ গল্প”

‘আমি তো আর কাউকে ইমপ্রেস করতে লিখি নাই’

লিখেছেন...admin...মার্চ 24, 2017 , 3:46 অপরাহ্ন

 

খোশগল্প.কম: কেমন আছেন আপনি?

অনন্ত: আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।

 

খোশগল্প.কম: প্রথমে পরিচয় নিবো, নিজেকে কিভাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

অনন্ত: আমি নিজেকে লেখক হিসাবে পরিচয় দিতেই ভালোবাসি। আর এর অপর পৃষ্ঠায়  বর্তমানে একজন গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবেই যুগান্তর পত্রিকায় কর্মরত আছি। আর এমনিতে আমার পরিচয় হলো , গ্রাম থেকে পড়া-লেখা শেষ করে ঢাকায় এসে স্বপ্নের মতো জগত সাজাতে এক ব্যাস্ত যুবক হিসাবেই।

 

খোশগল্প.কম: তার মানে আপনার শৈশবটা কেটেছে ঢাকার বাহিরে কোন এক গ্রামে?

অনন্ত: হ্যাঁ, এক প্রকার বলা যায়। আমার শৈশবটা কেটেছে এক প্রকার জার্নির উপরে। আর এর কারণ হলো আমার বাবার কর্মস্থল। বাবা যখন গ্রামে থাকতো তখন আমারা সবাই গ্রামে থাকতাম। আবার বাবা যখন কাজের জন্য ঢাকায় চলে আসতো আমার সবাই আবার বাবার সাথে ঢাকায় চলে আসতাম। এভাবেই আমার শৈশবটা কেটেছে। তবে, আমার বেশিরভাগ সময়টা কেটেছে চাঁদপুর জেলায়। সেখান থেকেই কেটেছে আমার শৈশব। এমনকি এসএসসি এবং ইন্টারমিডিয়েটও সেখান থেকেই কেটেছে।

 

খোশগল্প.কম: শৈশবটা কেটেছে ঢাকায় এবং গ্রামে। এ সময়টা এই দুয়ের কোন স্থানে ভালো লেগেছে? কিংবা কেন?

অনন্ত: আসলে যখন শুনতাম বাবার চাকরি ঢাকায় এবং  আমরা  সবাই বাবার সাথে যেতে হবে তখন আমার মাঝে এক প্রকার ভালো লাগা কাজ করতো। অনেক আনন্দ পেতাম এই ভেবে যে আমি গ্রাম ছেড়ে শহরে যাচ্ছি । আবার গ্রাম ছেড়ে যখন শহরে আসতাম তখন গ্রামটাকে খুব মিস করতাম। সব সময় ভাবতাম কখন ফিরে যাবো আমার নিজ গ্রামে।

এই দুইয়ের মধ্যে আমি গ্রামে থাকতেই সবচেয়ে ভালো ফিল করতাম। কেন? এর সঠিক কারণ হয়তো বর্ণনা করতে পারবো না, তবে এতুটুকু বলতে পারি। গ্রামের সবকিছুই ছিলো আমার মোহে ভরা। গ্রামে থাকার সময় ছিলাম স্বাধীন, বন্ধুদের সাথে হাজার রকম আড্ডা হতো , ইচ্ছে হলেই বেড়িয়ে পড়তাম সবুজের বুকে আর শহরে এমনটার সুযোগই ছিলোনা একেবারে।

 

খোশগল্প.কম: সেখান থেকে সাহিত্যের বীজ কখন হৃদয়ে গেঁথেছেন?

অনন্ত: এই ব্যাপরটি আসলে আমার লাইফে একটা মজার ব্যাপার বলতেই হবে। এর শুরুটা হয়েছিলো আমার এসএসসি কমপ্লিটের আগেই। আমার এক ফ্রেন্ড ছিলো সে সব সময় এরকম গল্প ,কবিতা  টুক-টাক লিখতো। তবে, মজার ব্যাপার হচ্ছে ও কোথায়ও প্রকাশের জন্য এমন লিখতোনা, সে লিখতো একটা মেয়েকে ইমপ্রেস করার জন্য। একটা সময়ে দেখলাম মেয়েটা ওর প্রতি ইমপ্রেস হয়ে গলো। তখন অবাক হলাম এই ভেবে যে, “ একটা গল্প লেখার এমন শক্তি!”। তারপর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমিও লিখে দেখিনা!। এমন ভাবতে ভাবতে একদিন লিখে ফেললাম কবিতা আর একটা গল্প। লেখার পরে ভাবতে থাকলাম এগুলো কি করবো? আমি তো আর কাউকে ইমপ্রেস করতে চাইনা। তখন এক বড়ো ভাই এর মাধ্যমে আমাদের চাঁদপুরের দৈনিক পত্রিকা “চাঁদপুর কন্ঠতে” লেখা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। একদিন সেই ভাই বললো “আচ্ছা দেখি তোমার কবিতাটা”। তখন আমি উনাকে আমার লিখাটা দিয়ে দিলাম। এর কয়েকদিন পরে আমি কেন জানি ঢাকায় চলে আসি। হঠাৎ একদিন বাবা বাসা থেকে ফোন দিয়ে বললো “ তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আয়, তোর নামে কোথায় থেকে যেনো একটি চিঠি এসছে। মনে হয় তোর চাকরি হয়ে গেছে”। আমিতো বাবার এমন কথাতে পুরাই অবাক হয়ে গেলাম। বলে কি! আমিতো কোথাও চাকরির জন্য এপ্লাই করিনি, জয়েন লেটার আসবে কোথা থেকে। যইহোক, বাড়িতে চলে আসলাম। বাড়ি এসে চিঠির খাম খুলে আমি হাসতে হাসতে শেষ, আসলে চিঠিটি ছিলো আমি যে পত্রিকায় কবিতাটা দিয়েছি উনারা এটা একসেপ্ট করেছে এবং আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে এই ব্যাপারে। সেখান থেকেই আমার লেখা-লেখিটা ছুটে চললো উদ্যাম গতিতে। সত্যি বলতে গেলে কি যখন চিঠিটাতে আমার লেখা একসেপ্টের বিষয়টি দেখলাম তখন যে আনন্দ ফিল করেছি সেই আনন্দ আমি কখনো পাইনি। সেই আনন্দকে সাথে নিয়েই লিখতে থাকলাম গল্প,কবিতা, রম্য; এমনকি এখনো লিখছি।

 

খোশগল্প.কম: রম্য যেমন হাসির তেমনি আপনার গল্পগুলো রোমান্টিকতা কিংবা জীবনবোধের এই বিভিন্ন বৈচিত্র প্যাটার্নে দীর্ঘদিনই লিখে যাচ্ছেন। এর পিছনের গল্পটা শুনতে চাই।

অনন্ত: আসলে আমি যে লেখক হবো কিংবা ভবিষ্যতে লিখে যাবো এমন পরিকল্পনা আমার আগে ছিলোনা। আমার পরিকল্পনাটা ছিলো আর আট-দশ জনের মতোই যে পড়া লেখা শেষ করে একটা ভালো চাকরি করবো এমনটা। কিন্তু, এক সময় লেখার প্রতি যখন ঝোঁক চলে আসলো তখন ভাবলাম আমাকে সবার মতোই চাকরি করতে হবে কেন! আমিতো সবার থেকে একটু ভিন্ন হতে পারি। আমি লিখতে পারি। আর লিখে সহজে মানুষের মন জয় করা যায় এই ব্যাপারটি আমকে ভাবাতো বেশি। আমরা যদি হুমায়ুন আহমেদের কথা ভাবি তবে আমারা দেখবো যে তাকে আমাদের দেশের মানুষ লেখক হিসাবে হুমায়ুন আহমেদকে কখনোই ভুলতে পারবেনা। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদ যদি লেখক না হয়ে চাকরি করতেন তাহলে এতো মানুষ তাকে মনে রাখার প্রশ্নই আসেনা। তো, এসব বিষয়গুলো আমাকে ভীষণ ভাবাতো। তারপর আমি যখন লেখা শুরু করলাম তখন একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম পাঠকের ব্যাপারে। যে, কিছু পাঠক গল্প পছন্দ করে আবার কিছু পাঠক হাসি পছন্দ করে। তো, তাদের হয়তো আমার লেখার একটা ফরম্যাট প্রয়োজন কিন্তু অপর দিকে তাদের সবারই আমার মন জয় করা কিংবা তাদের আকৃষ্ট করার প্রয়োজন। সে ভাবনা থেকেই দু ফরমেটেই লিখে যাচ্ছি। এবং সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে দু ফরম্যাটে লিখেই আমি আনন্দ পাই, সেকারণে লিখতে সমস্যা হয়না

 

খোশগল্প.কম: আপনিতো গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবে কর্মরত আছেন সেটাতো আপনার লেখা-লেখির বিষয় থেকে আলাদা বিষয় দুটি সমন্বয় করতে সমস্যা হয়না?

অনন্ত: না কখনোই আমার প্রবলেম হয়নি। কারণ আমি দুটি বিষয়কে দু‘দিক থেকে দেখেছি সব সময়। লেখা-লেখির বিষয়টা আমার মনের খোরাক, যেটা লিখে আমি আনন্দ পাই। আর গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসাবে আমি কর্মরত আছি যেটার পিছনে আমি শ্রম দিয়ে, আর্থিক সহযোগিতা পেয়ে আমার জীবন চালিয়ে নিয়ে যাই। বলতে পারেন অনন্তকে বাঁচিয়ে রাখি গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করে, আর অনন্ত বেঁচে আছে বলেই তার মনের খোরাক পূরণ করতে লিখে যায়। তবে এর মাঝেও একটা মজার ব্যাপার আছে যেটা হলো আমি গ্রফিক্সের মাঝেও শিল্প খুঁজে পাই। আর আমার মনে এই শিল্পের বীজ বুনে দিয়েছেন “ধ্রুব এষ” দাদা। উনার প্রতি আমার অনেক শ্রদ্ধা। আমি উনার সংস্পর্শে থেকে অনেক কিছু শিখেছি এমনকি এখনো শিখছি।

 

খোশগল্প.কম: তাহলে এতো কিছুর মাঝে আপনার ফ্যাশনটা কোথায়?

অনন্ত: এতাকিছুর মাঝে বিচিত্রতাই আমর সবচেয়ে বড়ো ফ্যাশন। আমার ভালো লাগে বলে যেমন লেখে যাই আবার তেমনি জীবনের প্রয়োজনে কিংবা গ্রাফিক্সের মাঝে আমি শিল্প খুঁজে পেয়েছি বলেই সেই কাজটিও সমান তালে করে যেতে চাই। ভালো লাগে বলেই কখেনো গল্প লেখি আবার ভালো লাগে বলেই কখনো মানুষকে হাসানোর জন্য রম্য লিখে থাকি। এই বিভিন্ন বৈচিত্রতাই আমার সবচেয়ে বড় ফ্যাশন।

 

খোশগল্প.কম: আপনি একজন লেখক হিসাবে বাংলাদেশের এই সময়ের লেখা-লেখির অবস্থান কেমন করে দেখছেন?

অনন্ত: নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের এই সময়ে লেখা-লেখির অবস্থান ণনেক ভালো। বিশেষ করে তরুণরা বর্তমানে লেখা-লেখির প্রতি ভীষণ আগ্রহী । যদিও বইয়ের মান নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। অনেক তরুণ লেখকই দু- একটা কবিতা লিখতে পারলেই স্বপ্ন দেখে বই প্রকাশের আর তাই তারা বই প্রকাশের প্রতি আগ্রহ হয়ে পড়ে এর ফলে অনেক প্রকাশকরাও টাকার বিনিময়ে এমন সুযোগকে কাজে লাগায় যা বর্তমানে সাহিত্য জগৎকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমার মনে হয় এমন ব্যাপারের দিকে সবারই সচেতন হওয়া উচিৎ। তবে সব ছাপিয়ে বর্তমানে লেখা-লেখির প্রতি তরুণদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতোই। যেটা আমাদের সবার জন্যই অনেক আনন্দের একটি বিষয়।

 

খোশগল্প.কম: সামনের সময় নিয়ে কেমন ভাবছেন?

অনন্ত: সামনের সময়গুলো প্রোপার ভাবে ইউজ করবো এটাই আমার বেস্ট পরিকল্পনা। সব সময় চেষ্টা করবো যাতে নিয়মিত আমি লিখে যেতে পারি। আর লেখা-লেখিতে নিজের ভালো একটা অবস্থান এমন পরিকল্পনা তো আমার সব সময়ই থাকে ।

 

খোশগল্প.কম: ধন্যবাদ আপনাকে, আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।

অনন্ত: আপনাকেও।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত