ধ্রুব, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অনবদ্য সৃষ্টি দূরবীন এর তুমুল জনপ্রিয় চরিত্র। দূরবীনে একই সাথে তিন প্রজন্মের গল্প বলা হয়েছে। ধ্রুব বিশ শতকের শুরুর দিকের  এক বিদ্রোহী যুবক , একজন উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হওয়ার সব গুণই যার ছিল। বাবা কৃষ্ণকান্ত চৌধুরী একসময় স্বদেশী করতেন, স্বাধীন দেশে পরবর্তীতে মন্ত্রী হন। মন্ত্রী হবার পর ধ্রুব পিতার সেই তেজী সত্তাকে আর খুঁজে না পেয়ে বরং হয়ে যায় তাঁর প্রতিদন্দ্বী। আমরা আজকে ধ্রুব’র কথা শুনবো ধ্রুব’রই এক মেয়ে বন্ধু’র কল্পিত সাক্ষৎকারে, যাকে সে সমমনা ভাবতো……

না সময়ের সাথে এলাইন করে চলতে পারে, না বিদ্রোহী হতে পারে

লিখেছেন...admin...মার্চ 27, 2017 , 3:08 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: আমরা যখন পড়ি তখন নিজেকে রেমি কিংবা শৈশবের কৃষ্ণকান্ত, কিংবা হেমকান্ত, রঙ্গময়ী কোন চরিত্রেই ভাবি না। নিজেকে কেবলই ধ্রুব কিংবা ধ্রুবর আদলের মানুষ ভাবি- কেন?

ধারা: ধ্রুব’র শেষ অংশে ন্যারেটার ধ্রুব নিজে; ধ্রুব’র চিন্তা-ভাবনাগুলো তোমরা সরাসরি পড়তে পারো, যেখানে অন্য চরিত্রগুলো ধ্রুব’র প্রয়োজনে আসে; কাজেই তাকে  তোমাদের কাছাকাছি ভাবতে পারো। আর দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় ধরে ধ্রুবকেই তোমরা পাও, অন্য কোন চরিত্রকে না। ধ্রুব কোন বন্ধনে আবদ্ধ হতে চায় না। একজন পৃথিবীবাসীর প্রতি যেমন হওয়া উচিৎ বন্ধু, স্ত্রী সবার প্রতি তাঁর ভালবাসা তেমনই।

 

খোশগল্প.কম: কিন্তু রেমি’র ন্যারেটারও তো রেমি নিজে, আমরা তাঁর মনকে পড়তে পারি, কই আমরা তো কেউ রেমি হতে চাই না!

ধারা: রেমি’র মত জীবন তোমরা চাও না তাই। তাঁর প্রতি তোমরা পিটি ফিল করো, সফটনেস ফিল করো। বস্তুত, অবেচতনে আমরা মোহগ্রস্থ হয়ে আসলে এমনই একটা জীবন চাই, যেখানে আমার একটা আদর্শিক জীবন থাকবে কিন্তু আমি সবাইকে উপেক্ষা করবো।

 

খোশগল্প.কম: আদর্শিক জীবনের কথা বলছো, ধ্রুব’র মুখে রেমির প্রশংসা শোনা যায় নি, গিয়েছে ধ্রুব’র জ্যাঠাতো-মামাতো ভাই-বোন, তোমার মুখে- এটার কারণ কী?

ধারা: একজন মানুষ তো ঘরে-বাইরে দু’জায়গায় জনপ্রিয় হতে পারে না। ধ্রুব’র ভাই-বোন ওঁকে পছন্দ করতো কারণে সে ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিল, শার্প পার্সোনালিটি ছিল, মন্ত্রীর ছেলে ছিল, সেজন্যেও কিছুটা। আর রেমি তো ধ্রুব’র কোন ভালো আচরণই পায় নি।

 

খোশগল্প.কম: ধ্রুব’র কাছ থেকে ক্রমাগত উপেক্ষা পেয়েও তাহলে রেমি কেন আনুগাত্যবোধ থেকে বের হতে পারে নি? মানুষ এত দীর্ঘ সময় ধরে মোহগ্রস্থ থাকে?

ধারা: রেমি খুবই ট্রাডিশনাল মেয়ে। জীবনে প্রথমবার ভালোবেসেছিল, সেটা ধ্রুব’কে; খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় অন্য কোন দিকে ভাববার সুযোগ ছিল না। আর রেমি’র শ্বশুর কৃষ্ণকান্ত চৌধুরীর অপরিমেয় স্নেহও তাকে আটকে রেখেছিল, নয়তো সে হয়তো ডিভোর্স এটেম্পট নিয়ে ফেলতো।

 

খোশগল্প.কম: রেমি’কে ট্রাডিশনাল মেয়ে বলছো, অথচ সে তাঁর স্বামীর বিশেষ মেয়ে বন্ধুর সাথে মানে তোমার সাথে দেখা করতে আগ্রহী ছিল

ধারা: এটা সাময়িক উত্তেজনা ছাড়া কিছু মনে হয় না আমার কাছে। রেমি’র চিন্তায় শুধু এটাই ছিল আমি ওর থেকে ঠিক কোন কোন দিকে এগিয়ে আছি যে কারণে ধ্রুব আমাকে পছন্দ করবে।

 

খোশগল্প.কম: তোমার আর ধ্রুব’র এই যে বিয়ে ব্যতীত একসাথে থাকা বা কোন কমিটমেন্টে না থাকা-এটাকে তুমি কীভাবে দেখ?

ধারা: আমার কাছে বিয়ে একটা সংস্কার মাত্র যেটাকে ভেঙে দিলেও সমাজ চলে। সমাজে চলতে গিয়ে সংস্কার-আচার এসবে মিলিয়ে আমরা জীবন-ধারণকে জটিল করে ফেলি। শর্ট-কাটে জীবন চলে গেলে ক্ষতি কি?

 

খোশগল্প.কম: তোমার দু’বার খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে বলে তুমি কেন ভাবছো অন্যদের জীবনও জটিল? আফটার অল জীবন তো এত হালকা কিছুও না?

ধারা: বিয়ে ছাড়া থাকা, ফ্রিডম, লিবারেশন এগুলোর সমর্থন করছি কাউকে তো বাধ্য করছি না।

 

খোশগল্প.কম: কিন্তু তোমার আশ-পাশটায় একটা ইফেক্ট তো ফেলছো, চেইঞ্জ তো আনছো

ধারা: এক্সাক্টলি! এগুলো তো আমি শো-ডাউনের জন্য করছি না। আধুনিকতা তো বিশেষ কোন আচরণ না, এটা একটা বিশেষ মনোভঙ্গী! তুমি যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছো, যেটায় করছো সেটাই করো। তুমি দেখো তোমরা এখন যেভাবে জীবনকে ভাবছো, ১০০ বছর আগে মানুষ এত অবাধ জীবনাচরণের কথা ভাবতে পারতো না। আবার হঠাৎ ওয়ান নাইস মর্নিং জীবন এত সহজও হয়ে যায় নি। তাহলে আলটিমেটলি কি হলো? চেইঞ্জ আসবেই। এটাকে ঠেকানো যাবে না, কেউ এটাকে ‘এক্সেস’ বলবে, কেউ ‘সিভিলাইজেশন’ বলবে। চেইঞ্জটা তোমার-আমার মধ্যে দিয়েই আস্তে আস্তে আসবে, জীবন আরো হালকা-সহজ হয়ে উঠবে।

 

খোশগল্প.কম: আচ্ছা, ধ্রুব’র প্রসঙ্গে ফিরি; ধ্রুব ওঁর মায়ের অপঘাতে মৃত্যুকে সবখানে দায়ী করছে- তোমার কি মনে হয়?

ধারা: এটা জাস্ট করানোর জন্য করেছে। হয়তো কোমল মনে প্রভাব ফেলেছে তবে সেটা বাকি জীবনকে পুরো উলটোদিকে নেয়ার মত জোরালো না।

 

খোশগল্প.কম: ধ্রুব এতটা নির্লিপ্ত আচরণ রপ্ত করলো কীভাবে?

ধারা: এটা ওর রপ্ত করা জিনিস না। কিছুটা হয়তো জেনেটিক্যালি, বাকীটা বোধ হয় নিজের খুঁজে না পাওয়া।

 

খোশগল্প.কম: নিজেকে খুঁজে না পাওয়া বলতে?

ধারা: ছোট বেলা থেকেই ওঁর বাবা’র একটা পজিটিভ ইমেজ ওদের সাথে কম্পারিজনের জন্য রেডি করা ছিল। সেখানে ওঁর আলাদা পার্সোনালিটি, ব্রাইটনেস থাকা সত্বেও তা এটেনশন সিক পারে নি। আবার ওঁর বাবার সেই ব্রক্ষচারী, তেজী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সত্তাকে খুঁজে না পাওয়ায় বাবা’র উপর ক্ষোভও ছিল হয়তো। তো সব মিলিয়ে হোপফুল কোন এইম খুঁজে পায় নি।

 

খোশগল্প.কম: ধ্রুব’র একটা লাইন ছিল ‘ born in a wrong place, in a wrong time and in a wrong family’ – এটাকেই তুমি বলতে চাইছো?

ধারা: হ্যাঁ, আমার মনে হয় সব সময়েই এমন একজন-দু’জন মানুষ থাকে যারা তাঁদের জেনারেশনের চেয়ে চিন্তার দিক থেকে এগিয়ে। তারা না সময়ের সাথে এলাইন করে চলতে পারে, না বিদ্রোহী হতে পারে। অথচ তারা প্রথাবিরোধী হতে চায়। ধ্রুব তাঁদের মধ্যে একজন।

 

‘দূরবীন’ বইটি কিনতে চাইলে https://www.rokomari.com/book/43691

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত