আরকানুল ইসলাম, বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যে এক অনন্য ও  সম্ভাবনাময় নাম। ইসলামী বিশ্যবিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ২০১০ সালে। তার প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো “ওরা পাঁচ জন”, “কিশোরী ইমু” এবং “তিন বন্ধুর জ্বিন বন্ধু”

‘যেসব লেখকরা লেখালেখিকে প্রফেশনালি নেয় আমি তাদের সৌভাগ্যবান বলবো’

লিখেছেন...admin...এপ্রিল 6, 2017 , 1:38 অপরাহ্ন

খোশগল্প.কম: প্রথমে খোশগল্পের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা নিবেন।

আরকানুল ইসলাম: ধন্যবাদ আপনাকে।

 

খোশগল্প.কম: যদি কেউ আপনার পরিচয় জানতে চায় কীভাবে পরিচয় দিবেন?

আরকানুল ইসলাম: এটা নির্ভর করে যে পরিচয় জানতে চাইবে সে আসলে কোন সেক্টরের। যেমন আমার এলাকার অপরিচিত কেউ যদি আমার পরিচয় জানতে চায় তাহলে আমি তাকে পরিচয় দেবো আমার বংশ পরিচয় দিয়ে, যে আমি ওমুকের ছেলে বা অমুকের নাতি ইত্যাদি। আবার লেখা-লেখি জগতের কেউ যদি আমার পরিচয় জানতে চায় তবে আমি তার কাছে পরিচয় দেবো একজন শিশু সাহিত্যিক লেখক হিসাবে। আবার ভাইবা বোর্ডে যদি কেউ আমার পরিচয় জানতে চায় তবে আমি আমার পড়া-লেখার সাথে সম্পৃক্ততা রেখে তার জবাব দেবো।

 

খোশগল্প.কম: আপনার শৈশব সম্পর্কে কিছু বলুন।

আরকানুল ইসলাম: আমার জন্ম হয় গ্রামে। গ্রামটা ছিলো বাংলাদেশের অন্য গ্রাম গুলোর মতোই সুন্দর। এখানেই আমার শৈশব কেটেছে। শৈশব থেকেই আমি ভীষণ শান্ত ছিলাম। সবার সাথে আমার একটু কম মেশা  হতো। তার জন্য সবার মতোই আমি শৈশব উপভোগ করেছি বা কাটিয়েছি ঠিকই কিন্তু দুরন্ত ছিলাম না। তবে সময়ের সাথে সাথে আমার  সবার সাথে না মেশা কিংবা একটা হাস্যরসাত্মক পরিবেশেও নীরব ভুমিকা পালন করা এমন অভ্যেসটা ঠিকই পরিবর্তন করে ফেলেছি। এখন যদি কেউ আমায় নিয়ে আড্ডায় বসে তবে সারা-জীবনেই আমাকে মনে রাখতে বাধ্য হবে। এখন সহজেই একটা ঘুমুটে পরিবেশকে  হাসিতে মাতিয়ে তুলতে পারি।

 

খোশগল্প.কম: শান্ত থেকে চঞ্চলতা, আপনার ক্যারেক্টারের এমন তুমুল পরিবর্তন হলো কিভবে? আপনি কি মনে করেন?

আরকানুল ইসলাম:  আসলে আমার এই পরিবর্তনের ব্যাপারটা বন্ধুদের সাথে আড্ডা থেকেই হয়েছে বলবো। আমি যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম তখন কিভাবে জানি আড্ডায় হাসির গল্প জুড়ে দেওয়া কিংবা এমন একটা টপিক তুলে আনতাম যেন সবাই আমার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনে। এতে ঐ আড্ডার প্রধান নিজেকে মনে হতো,এমনকি সবার চেয়ে আমাকে নিজের কাছে ভিন্ন লাগতো। তো, এমন রোজ আড্ডাই আমার ভিতরে তুমুল পরিবর্তন এনেছে বলে আমি মনে করি। আবার আরেকটা ব্যাপারও আমার ভিতরে দারুণভাবে কাজ করেছে বলে আমি মনে করি সেটা হলো আমি ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতমনা ছিলাম। আমি এক সময় এলাকায় একটা সংস্কৃতি সংগঠন এর সাথে জড়িয়ে যাই যেটার মূল ছিলাম আমি নিজে। আমার সাথে কাজ করতো আমাদের পাড়ার আট-দশ জন ছেলে। আমাদের কাজটা ছিলো গ্রামের যেসব বাড়িতে বিয়ে হত সেখানে বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে কখনো নাচ,গান বিভিন্ন ধরণের কৌতুক পরিবেশনা করা। আর আমি মনে করি এই ব্যাপারটিও আমার মাঝে পরিবর্তন আনতে দারুণ কাজ করেছে। আর মজার ব্যাপার হচ্ছে এই সংস্কৃতি সংগঠনটি অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়লো এতে আমাদের জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পেতে থাকলো। তখন থেকেই আমার পড়া-লেখার বাহিরে কিছু একটা করার বিষয়গুলো কাজ করতে শুরু করেছে বলে আমি মনে করি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার লেখালেখির শুরুটা সুচনা হলো কিভাবে? কিংবা কেনই বা লেখালেখিতে আসলেন?

আরকানুল ইসলাম: আমি যদি লেখালেখির একেবারে সুচনার দিকের কথা বলি,তবে আমাকে বলতেই হবে যে আমার লেখালেখির সুচনা হয়েছিলো বই পড়া থেকে ইচ্ছে জেগেই। ছোটবেলা থেকেই দেখতাম আমার বড়ো ভাইয়ারা বিভিন্ন মাসিক পত্রিকাগুলো রাখতো এবং পড়তো। তো, তাদের সাথে সাথে সময়ের পরিক্রমায় আমিও এই বই পড়ার সার্কেলে আবদ্ধ হয়ে যাই এবং  আমি এটাকে ভীষণ উপভোগ করি। আর এই বই পড়ার একটা বড়ো জগৎ আমার তৈরী  হয়েছিলো আমার মায়ের কাছ থেকেও। আমার মা প্রচুর বই পড়তো এবং মা আবার এই  গল্পগুলো আমাকে শুনাতো। এতে একটা দারুণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে রোজই আমি অপেক্ষায় থাকতাম মা আমাকে কখন গল্প শুনাবে, অপর দিকে মা আমাকে গল্প শুনানোর জন্য বই পড়তো। এভাবে ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রেমে পড়ে যাই। আর এভাবেই সময়ের সাথে সাথে আমার ভিতরে ইচ্ছে করছিলো আমি লেখি। সেই ভাবনা থেকেই একদিন সত্যি সত্যি লিখেই ফেলি। তারপরে কয়েকটা পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছি, কিন্তু কষ্টের ব্যাপার হলো আমার লেখাগুলো ছাপা হলো না। তারপরেও আমি থেমে থাকিনি, লেখা পাঠিয়েছি। তখনকার “শিশু-কিশোর দিন দুনিয়া” পত্রিকায়  আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়, লেখাটি ছিলো একটা ছড়া। আমি খুশিতে ক্লাসে গিয়ে স্যারকে দেখালাম। স্যার আমাকে অবাক করে দিয়ে  সবার সামনেই আমার নাম নিয়ে জোরে জোরে করে আমার ছড়াটি পড়তে থাকেলো। এতে আমি ভীষণ লজ্জা পেয়েছি, তবে এই লজ্জার আড়ালেও এক ধরণের ভালোলাগা লুকায়িত ছিলো। সেই থেকেই আমার লেখা-লেখির পথ চলা।

 

খোশগল্প.কম: আপনার লেখাগুলোতো শিশু-কিশোরদের নিয়ে। যদি প্রশ্ন করি কেনো শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখেন? তবে কি বলবেন?

আরকানুল ইসলাম: হ্যাঁ, আমার লেখা বইগুলোও শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা। আসলে শিশুদের আমি ভীষণ ভালোবাসি। এই ভালোবাসা থেকেই তাদের জন্য লিখি। আমি যখন চলতি পথে কিংবা কোথাও কোন শিশুকে দেখি তখন তার মোটিভ বুঝার চেষ্টা করি এবং সাথে কল্পনাও করি একদিন আমিও এমন ছিলাম, তখন হয়তো তার মতোও আমিও এমন করতাম। তো, সাধারণত এমন ভাবনা গুলো থেকে আমার লেখাগুলো আসে। আর শিশু-কিশোরদের নিয়ে আমার লেখার আরেকটি কারণ আছে সেটি হলো, আমি প্রথমে ছড়া লিখতাম আর ছড়াগুলো ছিলো বিভিন্ন বিষয়ে। লেখা-লেখির এক পর্যায়ে দেখলাম আসলে অনেকেই ছড়া লিখছে এমনকি বলতে পারেন প্রত্যেক লেখকের জম্ম হয় কবিতা লিখা দিয়ে, আবার আরেক দিয়ে দেখলাম বাংলা সাহিত্যে বর্তমানে শিশু-কিশোরদের নিয়ে একেবারে কম লেখা হয়। সেক্ষেত্রে ভাবলাম আমি কবিতা না লিখলেও চলে, অনেকেই আছে লেখার। আর যেহেতু আমার শিশুদের নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে কিংবা তাদের নিয়ে লিখে আমি কমফোর্ট ফিল করি সুতরাং তাদের নিয়ে লিখে আমি হাল ধরতে পারি। মূলত এই কারণেই তাদের নিয়ে লিখছি। বলতে পারেন আমার পছেন্দের বিষয়েই আমি লিখছি।

 

খোশগল্প.কম: আপনার লাইফে এই লেখালেখিটাকে কি আপনি প্রফেশনালি নিয়েছেন?

আরকানুল ইসলাম: না, সে সাহস আমার হয়ে উঠেনি। আসলে, পরিবারের সাথে নিজের পরিবেশকে মানিয়ে নিতে গিয়ে লেখালেখিটাকে প্রফেশনালি নিতে পারিননি। তবে যদি আমি সকল কিছু থেকে মুক্ত থাকতাম তখন হয়তো লেখালেখিই আমার জীবনের সকল কিছু থাকতো। যেসব লেখকরা লেখালেখিকে প্রফেশনালি নেয় আমি তাদের সৌভাগ্যবান বলবো, আর এমন সৌভাগ্য খুব কম মানুষের হয়ে থাকে। আমার লাইফের ছোট একটা গল্প বলি আশা করি ক্লিয়ার হবেন কেন আসলে আমি লেখালেখিকে প্রফেশনালি বিষয় হিসাবে নেইনি। আমি যখন মাস্টার্স শেষ করে বাড়িতে প্রায় তিন বছর ছিলাম কাজ করা ছাড়াই তখন আমি ফিল করতে পেরেছি আসলে বেঁচে থাকার জন্য আশ-পাশের সাথে কত টুকু যুদ্ধ করতে হয়। এটাই শিল্পীর শিল্পের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন আমার ফ্যামিলি আমাকে কিছুই বলেনি হয়তো আরো দীর্ঘদিন ঘরে বসে থাকলেও আমাকে কিছু বলতোনা, কিন্তু  পরিবেশের পরিস্থিতিই আমাকে ভিতরে ভিতরে পোড়াতে থাকলো। আমি ভাবতে থাকলাম আমার সাথের সবাই জব করছে, অনেকেই তাদের ফ্যামিলির হাল ধরেছে সেখানে আমি বাড়িতে বেকার হয়ে বসে আছি। ভাবতে থাকলাম আমার প্রতিও তো আমার ফ্যামিলির চাওয়া-পাওয়া আছে। ভাবতে থাকলাম হয়তো আমার আড়ালে-আবডালে অনেকেই হয়তো আমায় নিয়ে কানাকানি করছে, কটু কথা বলছে। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই ব্যাপারটি আমার লেখালেখিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বলতে পারেন এক প্রকার মানুষিক দুশ্চিন্তায় ছিলাম। এক পর্যায়ে চাকরি খোঁজা শুরু করলাম। চাকরি খুঁজতে যখন শুরু করলাম তখন ফিল করলাম আসলে মানুষের জীবনে ম্যাচুরিটি, বন্ধুত্ব কত গুরুত্ব পূর্ণ জিনিস। চাকরির ব্যাপারে যখন পরিচিতরাই আমাকে হতাশ করলো তখন বন্ধুরা এগিয়ে আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছে। এক সময় আমি চাকরি পেয়ে যাই। তখন আবার আমার মুক্ত জগৎ তৈরী হতে থাকলো। হাজারো ব্যাস্ততার মাঝেও নিজেকে অনেক হালকা মনে হতে থাকলো। সময় বের করে লেখালেখির কলমও চললো নিজস্ব গতিতে। তাই, লেখালেখিটাকে প্রফোশনালি নেইনি। ভালো লাগে লিখতে, তাই লিখে যাই।

 

 

খোশগল্প.কম: ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু কি ভাবছেন? নাকি সময়ের সাথে তাল মিলেয়েই চলতে থাকবেন।

আরকানুল ইসলাম: সময়ের সাথে তো তাল মিলিয়ে চলতেই হবে, তারপরেও ভবিষ্যতে চাইবো ফ্রি হতে। যদিও সেটা আমার কাছে মাঝে মাঝে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার চেয়ে স্বপ্নই মনে হয়।

 

খোশগল্প.কম: আপনাকে ধন্যবাদ, মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।

আরকানুল ইসলাম: আপনাকেও।

Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterShare on LinkedIn0Pin on Pinterest0

মতামত